যখন আমি ক্যাডেট ছিলাম (পর্ব ৪)

নতুন জীবন ও একজন জুনায়েদ স্যারঃ

নেমপ্লেটটার দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি। পাশের বেডে বসা তারান্নুম (সেই রোগা টিংটিঙে মেয়েটা) পা দোলাতে দোলাতে জিজ্ঞাসা করলো,” এমন বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলছিস কেন?” আমি আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি,”আমার নেমপ্লেট দেখে! এটা কোন নাম হলো বল তো? রাহাত আরা! খেয়া নামটা কতো সুন্দর না?” তারান্নুম হি হি করে হাসে,” সত্যিই তো! রাহাত আরা,কি আজব নাম! রাহাত নাম তো ছেলেদের হয়।আমার নামটাও দেখিস না,তা-রা-ন্নু-ম।এর চেয়ে রেনেসাঁ নামটা কতো ভাল ছিল!” আমি মাথা নেড়ে তৎক্ষণাৎ একমত হয়ে গেলাম। ক্যাডেট কলেজে মোটামুটি দশ-পনেরো দিন পার করে দিয়েছি আমরা। যদিও আমার হিসেবে মনে হচ্ছে প্রায় একযুগ ধরে এখানে আটকা পড়ে আছি! অনেক নতুন কিছু শিখে ফেলেছি এরমধ্যে। প্রতিদিন সকালে ড্রিল করতে মাঠে নেমে যাই আমরা। ক্লাস করার বিল্ডিংটার নাম হল একাডেমিক ব্লক, কোথাও যাওয়ার আগে তিনজন তিনজন করে যে লাইন করতে হয় তার নাম ফলইন, সন্ধ্যায় ক্লাসরুমে পড়তে আসার নাম প্রেপ! এরকম কতকিছু যে শিখেছি আর কতকিছু যে শেখা বাকি তা এখনো বুঝতে পারছিনা। ভর্তি হবার আগে ক্যাডেট কলেজের সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে অনেক রোমহর্ষক কাহিনী শুনেছিলাম মানুষের মুখে মুখে। আমাদের কলেজে সেরকম কোন ব্যাপার নেই। দুটো মাত্র ব্যাচ,আর সব্বাই নতুন এখানে। অনেকটা বন্ধু, অনেকটা বোনের মত সম্পর্ক আমাদের। সারাদিনে আমাদের কাজ হলো নতুন নতুন শব্দ শেখা, ডাইনিং এ গিয়ে খাবার সামনে নিয়ে বসে থাকা আর গলা জড়াজড়ি করে কান্না করা। এইতো সেদিনও মিল্কব্রেকে সবাই গেলাম ডাইনিং এ। কাপে দুধ ঢেলে তাতে চুমুক দিতে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎ কি যে হয়ে গেল আমার! বাসার কথা মনে পড়ে গেল।পাপা কত কষ্ট করে কতদূর থেকে খাঁটি দুধ নিয়ে আসতো! মা সেই দুধ ক্ষীরের মতো ঘন করে জ্বাল দিয়ে খাওয়ার জন্য তোষামোদ করতো। আর দুধ-বিদ্বেষী আমি হাতপা ছোঁড়াছুঁড়ি করে ঘাড় বাঁকা করে চিৎকার করতাম। আজকে দুধ না খেলে অনুরোধ করার কেউ নেই,আদর করে নানাকিছুর লোভ দেখানোর কেউ নেই। স্বাভাবিকভাবে আমার খুশী হওয়ারই কথা। কিন্তু ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুতে ক্রমশই নোনতা হয়ে এলো দুধের পেয়ালা। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না থামানোর চেষ্টাও করলাম অনেক, কিন্তু টেবিলের অন্যদের চোখ এড়ালোনা সেটা। তার কিছুক্ষন পর দেখা গেলো  আশেপাশের সব মেয়েরাই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে! কান্না যে কতোটা ছোঁয়াচে তা এখানে না আসলে বুঝতেই পারতাম না। কলেজের স্যার-ম্যাডামদের খাওয়া-ঘুম মাথায় উঠলো আমাদের কান্না থামাতে গিয়ে।এই তো সেদিন রাতেও আকাশে ইয়া বড় একটা চাঁদ উঠেছিল দেখে হাউসমাস্টার স্যার সবাইকে নিয়ে খোলা ব্যালকনীতে গানের আসর বসালেন। দখিনা বাতাস, চাঁদের আলো আর গানের সুর-সব মিলিয়ে প্রথমে  বেশ ভালোই লাগছিল।কিন্তু “আমি খুঁজেছি তোমায় মাগো” গানটা গাইতেই কারো চোখের জল আর বাঁধা মানতে চাইলোনা। ধু ধু ক্যাম্পাসের উথালপাতাল বাতাস জানালার বন্ধ কাঁচে বাড়ি খেয়ে যেমন হাহাকার করে উঠে, সেই ধ্বনির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো সদ্য মায়ের আঁচল ছেড়ে আসা এই আমাদের চোখে নামা বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ। নিত্য নতুন কায়দা বের হতে থাকলো  বাড়ির কথা ভুলিয়ে রাখতে। আমাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি ছোটাছুটি করতে হচ্ছে জুনায়েদ স্যারকে, মেজর জুনায়েদ আলম খান, অ্যাডজুটেন্ট। প্রত্যেক ক্যাডেট কলেজেই নাকি এরকম একজন আর্মিপারসন থাকেন, কলেজের সার্বিক তত্তাবধানে। স্যার নিজেও এক্স ক্যাডেট, রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের। অসাধারণ একজন মানুষ, এতো চমৎকার করে গুছিয়ে কথা বলতে পারেন! আর আল্লাহ বোধহয় উনাকে বানানোর সময় কমপক্ষে দশকেজি বেশি ধৈয্য দিয়ে দিয়েছেন। একইসঙ্গে নতুন একটা কলেজের সবকিছু তদারকি করা, কন্সট্রাকশনের কাজ আর ১০০ ক্রন্দনরত ক্যাডেটদের সামলানো- দু’হাতে শত কাজ সামলাতে হচ্ছে স্যারকে। কোন অবস্থাতেই স্যারকে কখনো ধৈর্য হারাতে দেখিনি আমরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পযন্ত সারাক্ষণ স্যার থাকেন আমাদের সাথে। রাত্রেও বিশ্রাম নেওয়ার উপায় নেই তার। স্যার যে রাতেও ঘুমান না সে ব্যাপারটা আমি টের পেয়েছি গতকাল রাতে। আমার দুঃসাহসী(!) রুমমেট তারান্নুম সারাদিন কান্নাকাটি করে ক্লান্ত হয়ে যখনতখন ঘুমিয়ে পড়ে। অবধারিত ভাবে গভীর রাতে তাকে প্রকৃতি হাঁক ছেড়ে ডাকতে শুরু করে। আর সে করুণ সুরে ডাকতে থাকে আমাকে! অগত্যা বিছানা ছেড়ে তাকে নিয়ে টয়লেটে যেতে হয়। গতরাতেও তার ব্যাতিক্রম হয় নি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি যখন তারান্নুম কে পাহারা দিচ্ছিলাম, তখনই হাউসের চারপাশে ঘুরতে দেখি টর্চের আলোটাকে। ভালো করে উঁকিঝুঁকি মারতেই বুঝতে পারলাম টর্চের মালিক জুনায়েদ স্যার। আমাদের কলেজে কোন বাউন্ডারি ওয়াল নেই, এই অবস্থায় আমরা হাউসে থাকবো আর স্যার আরাম করে নিশ্চিন্তে ঘুমোবেন এটা উনার পক্ষে মেনে নেওয়া রীতিমতো অসম্ভব! তাই স্যার প্রতিরাতেই টর্চহাতে চারপাশে ঘুরে বেড়ান! আবার ভোর না হতেই বাঁশি হাতে চলে আসেন আমাদের ড্রিল শেখাতে! আমাদের মধ্যে অনেকের বড় ভাইবোন ক্যাডেট কলেজে পড়ে, আপাতত তাদের কথাই আমাদের কাছে বেদবাক্যের মতো! ওদের মুখে শুনেছি সব ক্যাডেট কলেজেই নাকি ড্রিল-পিটি শেখানোর জন্য কয়েকজন স্টাফ থাকেন। কিন্তু আমাদের কলেজে এখনো সেরকম কেউ নেই, তাই আমাদের ড্রিল-পিটি ও শেখান অ্যাডজুটেন্ট স্যার স্বয়ং! তবে কালপরশুর মধ্যেই তিন হাউসের জন্য তিনজন স্টাফ চলে আসবেন, ‘নভিসেস ড্রিল’ বলে কোন একটা ব্যাপার আছে, সম্ভবত তিন হাউসের মধ্যে ড্রিল প্রতিযোগিতা। সেজন্যেই উনারা আসবেন প্রতিযোগিতার জন্য আমাদের প্রস্তুত করতে।

সময়মতো এসে গেলেন তিনজন স্টাফ।“ তোমাদের মত কত ক্যাডেট চড়ায়ে আসছি”, “পাঙ্গা লাগায়ে দিব, সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মাঝখানে দৌড়াতে থাকবা” তাদের এই টাইপের শুনে আমাদের সবার মুখ শুকিয়ে গেলো। কয়েকদিন যেতেই অবশ্য ভয়টা আর থাকলনা। ছোট হলেও আমরা এতোটুকু বুঝতে পারলাম ঠিকই, উনাদের রাগ আর চেঁচামেচি কেবলই বাহিরে বাহিরে। কিন্তু আসলে উনাদের মনে আমাদের জন্য অনেক স্নেহ! প্রতিদিন সকালে ড্রিল শেষে আমরা যখন রুমে আসি, ঘামের তীব্র সুবাসে( !) টেকাই দায় হয়ে পড়ে। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি হচ্ছে  ড্রিল করতে গিয়ে, মরুভুমির মতো কলেজ ক্যাম্পাস, বিমানবন্দরের পাথুরে মাটিতে কোন গাছই জন্মায় না ভাল করে। আগুনের মতো গনগনে সূ্যের প্রখর তাপে ঘেমেনেয়ে উঠতাম আমরা। সমস্যা আরো আছে, মাত্র দুইসেট সাদা পোশাকই আমাদের সম্বল। আমরা ড্রিলও করি এই পোশাকে, ক্লাসেও যাই এই পোশাকে, এমনকি ঘুমিয়েও পড়ি এই পোশাকেই! কয়েকজন আবার আরেক কাঠি সরেস, ঘুম থেকে উঠে রেডি হওয়ার সময় বাঁচাতে তারা রীতিমতো জুতা-মোজা পড়ে ঘুমুতে যায়! প্রথম প্রথম খুব অস্বস্তি লাগলেও খুব দ্রুতই আমরা নিজেদের গায়ের গন্ধে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম!

বেচারা জুনায়েদ স্যার তার সমুদ্রসম ধৈর্য নিয়ে আমাদের ক্যাডেট বানানোর চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছেন। সারাদিন আমাদের সাথে অনর্গল কথা বলেন যার পুরোটাই হয় ইংরেজীতে! কলেজে আসার প্রথমদিনই স্যার আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন,”Speak in English, think in English, dream in English.” প্রথম প্রথম আমাদের ইংরেজীটা হতো খুব মজার, নিজেরাই হাসিতে গড়িয়ে পড়তাম নিজেদের ইংরেজী শুনে। তবু আমরা হাল ছাড়লাম না, ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতেই চলে কথা বলা আর চিঠি লেখা। বাংলাদেশের মৃতপ্রায় ডাকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার সুমহান ব্রত নিয়ে প্রতিসপ্তাহে ঝাঁপিয়ে পড়ি চিঠি লিখতে। উত্তরও আসে নিয়মিত। একটা চিঠির জন্য সবার সে কি অপেক্ষা! যে কারও চিঠি আসলেই সেটা পড়া হতো সবাই মিলে গোল হয়ে বসে। কারো মা হয়তো লিখেছেন পেটভরে খেতে, গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়তো সবাই। আবার কারো চিঠিতে হয়তো আদর আর আবেগের কথা লেখা-সেটা পড়ে অশ্রুসজল হয়ে উঠে সবার চোখ। আমাদের হাসি-কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় একে অন্যের সাথে।

কোনো কোনো দিন আসে আনন্দের উপলক্ষ হয়ে, জুনায়েদ স্যার সবাইকে নিয়ে হাইকিং এ বের হন। এখনো আমাদের কলেজে কোনও বাউন্ডারি ওয়াল নেই, আমরা মেঠো পথে হাঁটতে থাকি। কথা বলতে বলতে এগোন স্যার, আর তাকে অনুসরণ করি আমরা। মনে হয় স্যার যেন হ্যামিলনের বংশীবাদক, আর আমরা সেই শিশুর দল-মনের আনন্দে পথ চলেছি স্যারের পিছুপিছু। রাস্তার দু’ধারের নানারঙ্গের নাম না জানা ফুল,পাখির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন স্যার। পথ চলতে চলতে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনি আমরা, আর ভাবি মানুষ কি করে এতো সুন্দর করে কথা বলতে পারে! কবিতার মতো কথামালা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় দু’পাশের চোখ জুড়ানো সবুজের সাথে।

(চলবে)

সেমিস্টার ফাইনালের কারণে ১ মাস নতুন কোন পর্ব আপলোড করতে পারছিনা।ইনশাল্লাহ তার পর আবার ;;) ;;) ;;)

২,৮৯৬ বার দেখা হয়েছে

৪৪ টি মন্তব্য : “যখন আমি ক্যাডেট ছিলাম (পর্ব ৪)”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    দুই সেট কাপড় তো বেশিদিন পরার কথা না; ফাস্ট টার্ম শুধু। খাকি ড্রেস বানানো হলেই তো সাদার উপর অত্যাচার সেরকম হয় না।
    আর আমাদের সময় তো (৯৪ সাল থেকে হয়তো?) ডিনারের সময় কালো প্যান্ট চালু হয়।
    পোলাগো কলেজে গেলে পিঠে ডাল ভাইঙ্গা ঐ একই অ্যাডজুট্যান্ট গাছের নাম শেখাইতো।

    লেখা ভালো।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  2. দিবস (২০০২-২০০৮)
    পোলাগো কলেজে গেলে পিঠে ডাল ভাইঙ্গা ঐ একই অ্যাডজুট্যান্ট গাছের নাম শেখাইতো।

    কথা পুরাই সত্য 🙁

    লেখা ভাল ছিল,চালিয়ে যাও 🙂


    হেরে যাব বলে তো স্বপ্ন দেখি নি

    জবাব দিন
  3. সালেহ (০৩-০৯)

    তোমাদের "শশী"কে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওদের কি পানিশমেন্ট দেয়? ও বলল যে কিছুই দেয় না। সত্যিই কি তাই? পানিশমেন্ট নিয়ে একটা লেখা আশা করছি তোমার কাছ থেকে।


    Saleh

    জবাব দিন
  4. ইসলাম (১৯৯৬-২০০২)
    সেমিস্টার ফাইনালের কারণে ১ মাস নতুন কোন পর্ব আপলোড করতে পারছিনা।ইনশাল্লাহ তার পর আবার

    এই অপেক্ষার পালা বড়ই কঠিন হবে... সত্যি খুবই ভাল হচ্ছে ...


    Islam, CCR (1996-2002)

    জবাব দিন
  5. রিদওয়ান (২০০২-২০০৮)

    অফলাইন থেকে বেড়িয়ে এসে তোমার লেখাটা দারুন লাগল। :clap: সিনিয়ার-জুনিয়ার ব্যাপার গুল কিভাবে গড়ে ওঠে, লিখবে আশা করি। এখনও মানে এই ২০১২ সালেও বাউন্ডারি ওয়াল হয় নাই? তোমরা কলেজ পালানোর অ্যাডভেঞ্চার করতে পারতা! :grr: বয়েজ ক্যাডেট কলেজে আকাশে চাদ উঠলে হাউস মাস্টার রাউন্ডে আসে, কেউ রুমের বাহিরে আছে নাকি লাইটস অফের পর! আমরা অবশ্য তখন ছাদে থাকতাম!

    জবাব দিন
  6. টিটো মোস্তাফিজ

    জুনাইদ আমার ব্যাচমেট। ক্যাডেট লাইফে ভয়ংকর :grr: ছিল। এডজুটেন্ট হিসেবে খুব নিষ্ঠার কাজ করেছে জেনে ভাল লাগলো। :-B
    তোমার লেখাও চমৎকার :hatsoff: :teacup: ক্যারি অন।


    পুরাদস্তুর বাঙ্গাল

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।