যখন আমি ক্যাডেট ছিলাম (পর্ব ৩)

প্রথম দিন,অমলিনঃ

“দেখি ভাই, আমাকে একটু দেখতে দেন………“- বলতে বলতে ভীড় ঠেলে নিজের জন্য একটু জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা চালায় পাপা। “আয়েশা হাউস।“- বিড়বিড় করে নামটা বারকয়েক আউড়ে নিলাম আপনমনে। ইতোমধ্যে জানা হয়ে গেছে আমার, ক্যাডেট কলেজে ‘হল’ বলা হয় না, বলতে হয় হাউস; রুম না বলে বলা হয় ডরমেটরি। পাপা অভিভাবকদের লিস্টে স্বাক্ষর করে বিজয়ীর ভঙ্গিতে ফিরে আসে। “বেটি, তোমার ডর্ম নাম্বার ২০৭, দোতলায়।“বিশাল ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে হাঁচড়েপাঁচড়ে উঠে যাই দোতলায়, একপ্রান্তে আমার ডর্ম। চমৎকার দক্ষিণমুখি রুম, মা তাড়াতাড়ি করে জানালার পাশের একটা বেড নিয়ে নেয়। বড় রুম, সেভেন-এইট মিলিয়ে মোট ৮ জন থাকবে এখানে। বাকিরাও আসতে শুরু করেছে একজন দু’জন করে। আমি বিছানায় বসে পা দোলাতে দোলাতে সবাইকে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করি। আমার পাশের বেডটা নিয়েছে রোগা টিংটিঙে একটা মেয়ে; কলেজের সাদা পোশাক পড়ে ঘুরছে, প্রচুর কথা বলছে এবং হাসছে। আন্টিও মজার মানুষ। সিঁড়ি দিয়ে উঠবার সময় একটা মজার ঘটনার জন্ম দিয়েছেন উনি। ব্যাগটা খুব ভারী হওয়ায় তুলতে খুব হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন, তাই একজন হাউস বেয়ারাকে ডেকে মধুর সুরে বললেন,” আপনি তো এই হাউসের বেয়ারা তাই না বোন? একটু ব্যাগটা ধরেন না, বকশিস পাবেন।“ বিব্রত হাউস বেয়ারা আরেকজন মহিলা কে ডেকে ব্যাগটা ধরতে বলে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,” আমি ফিজিক্সের লেকচারার!“ একটা পিচ্চি মেয়েকে দেখলাম, আমার কাঁধেরও নিচে পড়বে। কারো ছোটবোন নিশ্চয়ই। আদর করে গাল টিপে দেব কিনা ভেবে এগোতেই দেখি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আমাকে জিজ্ঞাসা করছে,” তুই বালতি কিনে এনেছিস?” ছোটখাটো আরেকটা মেয়েকে দেখলাম ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না শুরু করে দিয়েছে। কারো কান্না দেখলে আমার নিজেরও কান্না পেয়ে যায়। তাই তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিলাম ওর উপর থেকে। নায়িকা নায়িকা টাইপের আরেকটা মেয়েকে দেখলাম বেডে চুপচাপ বসে আছে আর আরেকজন ফোনে রকেটের বেগে কথা বলে যাচ্ছে। খুব দ্রুত কথা বলে মেয়েটা। রুমের ৮ নাম্বার সদস্যকে এখনো দেখতে পেলাম না, কে জানে হয়ত না আসবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেয়েটা। বুকটা কেমন কেঁপে উঠলো ওর শূন্য জায়গাটার দিকে তাকিয়ে। শংকা হতা। কে জানে এসে আমিই ভুল করলাম কিনা!

আমার প্রিয় সালোয়ার কামিজটা পাল্টে কলেজের সাদা পোশাকটা পরে নিতে হোল। মা ইতোমধ্যে সব গুছিয়ে ফেলেছে লকারে আর টেবিলে। কোথায় কি রাখা তা বুঝিয়ে দিল বারবার করে। মায়ের চোখেমুখে বিষাদ আর দুশ্চিন্তার ছাপ পাকাপাকি ভাবে বসে গেছে। গতকাল রাতের কথা মনে পড়লো, রাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে কি কাঁদাটাই না কেঁদেছে। পরে অবশ্য নিজেকে সামলে নিয়ে অনেক উৎসাহও দিয়েছে, অনেক সুন্দর কিছু কথা বলে। সকাল থেকে কান্নাকাটিও করেনি। নিজেকে সামলে রাখতে তার যে খুব কষ্ট হচ্ছে  এইটা আমি স্পষ্টই বুঝতে পারি। পাপাও খুব গম্ভীর, সৃষ্টি আমার হাত ধরে চুপ করে পাশে বসে আছে। সবার মুখে শুনলাম এখন পরিচিতি পর্বের জন্য যেতে হবে, জুতো-মোজা পরে। আমি কখনই ঠিকভাবে মোজা পরতে পারিনা, উল্টো হয়ে  বারবার। তাই আমি খাটে পা ঝুলিয়ে বসলাম, আর পাপা মোজা পরিয়ে দিলো পরম মমতায়। গলার কাছটায় কি যেন দলা পাকিয়ে রইল আমার, এরপর কে পরিয়ে দিবে মোজা? সৃষ্টি ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠলো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে,” আপু, তুমি প্রতিদিন দুধ খাবে তো?” আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না, ওকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগলাম। মা আর পাপা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল আমাদের দুজনকে।

আমাকে রেখে মা,পাপা আর সৃষ্টি যখন রওয়ানা হয়েছে, আমি তখন জানালার পাশে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম ওদের দিকে। আমার ছোটভাইটার হাত ধরে ওরা পা ফেলছে চোখ মুছতে মুছতে। অসম্ভব মনখারাপ করা দৃশ্যটার দিকে আমি তাকিয়ে রইলাম ঝাপসা দৃষ্টিতে। আমার ভেতরে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছিলো ভীষণ বেগে। কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠি আমি। হঠাৎ কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠতে হয়, সেই ফোনে কথা বলা মেয়েটা এসে দাঁড়িয়েছে। হড়বড় করে সে কিছু একটা বলেও ফেলল যার একটি বর্ণ ও বুঝলাম না আমি।দু’তিনবার চেষ্টা করার পর শুনতে পেলাম মেয়েটা বলছে,” কান্না করোনা আপু। সব ঠিক হয়ে যাবে।“

ক্লাস সেভেনের ছোট্ট মেয়েটার সান্ত্বনায় আমি কান্না থামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।“ওদের নিয়েই শুরু হচ্ছে আমার নতুন জীবন, আমার স্বপ্নের ক্যাডেট লাইফ।“

(চলবে)

২,৩৫৮ বার দেখা হয়েছে

৩২ টি মন্তব্য : “যখন আমি ক্যাডেট ছিলাম (পর্ব ৩)”

  1. জাহিদ (২০০০-২০০৬)

    :clap: :clap: :clap:
    দারুন লিখছো। প্রথম ২ পর্বও পড়েছি, ভাল লেগেছে। আর আমাদের থেকে তোমাদের ক্যাডেট কলেজ যাত্রা অন্যরকম জন্যে আগ্রহটা আরো বেশি পাচ্ছি। নতুন কলেজে ঠিক কিভাবে ট্র্যাডিশনগুলো শুরু হয় আশাকরি তোমার লেখায় সেটা উঠে আসবে।
    পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।

    জবাব দিন
  2. রাব্বী আহমেদ (২০০৫-২০১১)

    এই প্রতিভা নিয়ে এতদিন কোথায় লুকিয়ে ছিলি? ভালো হচ্ছে। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায়


    নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কাঁদতে নেই
    খুব সহযে বিশ্বাসে বুক বাঁধছ কেন, বাঁধতে নেই
    বুকের কিছু গভীর কান্না চোখের মাঝে আনতে নেই
    কিছু অতীত স্মৃতির কথা জানার চেষ্টা বৃথাই, জানতে নেই...

    জবাব দিন
  3. রিদওয়ান (২০০২-২০০৮)

    :clap:
    অসাধারন লিখেছ। পুর সিরিজের অপেক্ষায় রইলাম। আগামী ২ সপ্তাহ থাকতে হবে ইন্টারনেটের বাইরে, তাই দুই সপ্তাহ পর ব্লগে ঢুকেই পেছনের পেজ থেকে খুজে নেয়ার চেষ্ঠা করব। তার আগেই সিরিজ পোশ্ট করতে থাকবা, নইলে খবর আছে। :gulli2:
    off topic- ফিজিক্সের যে ম্যাডামের কথা বলেছ, উনি কি নাজনিন ম্যাডাম? CCR থেকে উনি FGCC গিয়েছিলেন। যতদুর জানি এখনও ওখানেই আছেন। আমাদের ইনটেকের ফর্মমাস্টার ছিলেন। একবার ইন্সপেকশনের আগে আমাকে উনি :duel:

    জবাব দিন
  4. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    দারুন হচ্ছে, সিরিজ চলতে থাকুক।

    বিব্রত হাউস বেয়ারা আরেকজন মহিলা কে ডেকে ব্যাগটা ধরতে বলে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,” আমি ফিজিক্সের লেকচারার!“

    :khekz: :khekz: :khekz:


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  5. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    আপু চমৎকার হচ্ছে চলুক :boss: :boss:


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  6. ইসলাম (১৯৯৬-২০০২)

    নাজনিন ম্যাডাম প্রথম জয়েন করেন আমাদের কলেজে এবং প্রথম ক্লাস আমরাই পাই। ম্যাডামের বাসা ছিল মোহাম্মদপুর ছুটিতে আসলে ম্যাডামের সাথে ফোন কথাও হত। 😀 😀 🙂 🙂


    Islam, CCR (1996-2002)

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।