আমি যখন ক্যাডেট ছিলাম

 

লক্ষ্য যখন ক্যাডেট হওয়া :

রাগে গজগজ করতে করতে মোড়টা পেরোলাম ।-“এতো সকালে মানুষ ওঠে ঘুম থেকে ? ওঠে কাক । আমি কি কাক ? কেন কোচিংটা এই কাকডাকা ভোরেই হতে হবে ?” প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে ভীষণ কষ্ট হয় আমার । কোনমতে নামায পড়ে পোশাকটা বদলে আসতে গিয়ে অবধারিতভাবে দেরী হয় প্রতিদিন । তাই প্রথম ক্লাসে দাঁড়িয়ে থাকাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে । আজ কি বার মনে করার চেষ্টা করলাম । শুক্রবার ! ভাবতেই বুকের রক্ত হিম হয়ে এলো , লাকী ম্যাডাম ! ম্যাডামের তেলমাখানো বেতটার সুমধুর শপাং শপাং শব্দটা মনে পড়তেই হাঁটার গতি বেড়ে গেলো অনেকখানি । যখন ভাবতে শুরু করেছি যে কোচিং এ আর পৌঁছাতে পারবনা ঠিক তখন সদর দরজায় পৌঁছে গেলাম । পরিচিত এক আংকেল কে দেখে সালাম ও দিলাম । কিন্তু কপাল মন্দ হলে যা হয় আরকি । কেন যেন আজকেই উনার আমার কুশলাদি জানতে ইচ্ছা করলো এবং আঙ্কেল বেশ আন্তরিকতা নিয়েই আমার পড়াশোনা, আমার বাবা-মায়ের স্বাস্থ্য ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন । আমি মোটামুটি ধৈয্য ধরেই জবাব দিলাম সব প্রশ্নের । বেতের বাড়ির সুমধুর অভ্যর্থনা যখন অবধারিত হয়েই গেছে, তখন দুএকটা কমবেশি হলে আর কি বা এমন হবে ? হঠাৎ কি একটা কথা মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে আঙ্কেল বললেন, “আম্মু, আজকে তো তোমার ক্যাডেট ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে জানো তো ?” কথাটা শুনে চেপে রাখা হাসিটা আর লুকাতে পারলাম না । হি হি করে হাসতে হাসতে বললাম,” না আঙ্কেল, জানিনা তো !” আঙ্কেল এর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম আমাকে হাসতে দেখে উনি অবাক হয়েছেন । আসলে গত ১৫ দিনে এই ফলাফল প্রকাশের গুজবে এতো বেশি নাকাল হয়েছি যে আর ঠিক করেছি আর কারো কথায় কান দেবো না । ক্যাডেট নিয়ে আমার আগ্রহের কথা মোটামুটি সবাই কমবেশি জানে । গতবছর ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজে ভর্তির চেষ্টা করেছিলাম, লিখিত পরীক্ষায় উতরে গেলেও চূড়ান্তভাবে বাদ পরেছি। ফলাফলের পর কিছুদিন খুব মনমরা হয়ে ছিলাম, কান্নাও করেছি একটু একটু কাউকে না দেখিয়ে । তারপর অবশ্য সব স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে, ক্লাস সেভেন এর নির্ঝঞ্ঝাট জীবনটা বন্ধুদের নিয়ে বেশ ভালভাবেই কাটিয়ে দিচ্ছিলাম প্রায়, কিন্তু বাদ সাধলেন মুকুল স্যার । এক কপি প্রথম আলো হাতে হাজির হলেন বাসায়। উনার কাছ থেকেই শুনলাম ফেনী আর জয়পুরহাটে নাকি ২ টা নতুন গার্লস ক্যাডেট কলেজ করা হয়েছে। সেভেন-এইট দুই ক্লাসের জন্যই ভরতির আবেদন করা যাবে। শুরুতে একটু দ্বিধান্বিত হয়ে গেলেও পরে ফর্ম আমিও তুলেছি এবং পরীক্ষাও দিয়েছি। যদিও মনে হয় না এবারেও গতবারের ব্যাতিক্রম হবে। নিছক কৌতুহলের বশেই ফলাফল জানতে চাওয়া।

“May I come in madam?“- অনেক চেষ্টার পরেও চিঁ চিঁ শব্দের বেশিকিছু বের হলনা মুখ দিয়ে। “No, you can’t.”- আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন লাকি ম্যাডাম। অন্য কারো ক্লাসে হলে বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেলত সবাই। কিন্তু ম্যাডামের ক্লাসে নিঃশ্বাস টাও ফেলতে হয় খুব সাবধানে। তাই হাসি চেপেই বসে থাকল সবাই। ঘড়ির দিকে চোখ গেল আমার, পুরো ১০ মিনিট দেরি! ম্যাডামের সামনে দাঁড়িয়ে থাকব না দৌড়ে গিয়ে ট্রাকের নিচে পরে যাব ভাবতে লাগলাম চুপচাপ। ধীরেসুস্থে বোর্ড এর লেখা শেষ করে আমার দিকে তাকালেন ম্যাডাম।”কি করতে পারি আপনার জন্য?”- ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। “ইয়ে মানে তেমন কিছু না ম্যাডাম, শুধু ভেতরে আসতে দিলেই হবে।“-প্রায় তোতলাতে থাকি আমি। “সত্যি?ভেতরে আসতে দিলেই হবে? কিন্তু তার আগে বলেন তো ১০ মিনিট লেট হলেন কেন?’-আসামি জেরা করার ভঙ্গিতে বললেন ম্যাডাম। “ইয়োর অনার,আমি সময়মতই কোচিং এ এসে পৌঁছেছিলাম, কিন্তু দরজায় শ্রদ্ধেয় খায়রুল আঙ্কেল এর সাথে কুশলাদি বিনিময় করতে গিয়ে ১০ মিনিট অতিবাহিত হয়ে গেছে। আমি জানি এই গুরুতর অন্যায়ের জন্য আপনি আমার জন্য বেত্রাঘাত বরাদ্দ রেখেছেন। তা প্রদান করে হলেও আমাকে প্রবেশ করতে দিন।“- আমার দুঃসাহসী উত্তরে প্রথম কয়েক টা মুহূর্ত পুরো ক্লাস স্তব্ধ হয়ে রইলো । তারপর আমাকে হতভম্ব করে  দিয়ে সবাই হোহো করে হেসে ফেলল। তারচেয়েও বিরল ব্যাপার, ম্যাডামও হেসে ফেললেন ভালো মানুষের মতো। ম্যাডাম এমনিতেই দেখতে সুন্দরি,হাসলে যে এতো সুন্দর দেখায় তা কে জানত? ভয়ডর ভুলে গিয়ে আমি হা করে ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে রইলাম। হাসিটা লুকিয়ে ফেলে গম্ভীর হউয়ার চেষ্টা করে ম্যাডাম বল্লেন,”আসেন,ভেতরে আসেন।“ আটকে থাকা নিঃশ্বাস টা সাবধানে বের করে দিলাম, অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে গেছি আজকে। আমাকে দেখে সারা ডানপাশে সরে গিয়ে বসবার জায়গা করে দিল। “homework করেছ তো? “-প্রায় ফিসফিস করে ও জিজ্ঞাসা করে। “হ্যাঁ, করেছি। “-কেউ ফিসফিস করে কথা বললে জবাবটাও সেভাবেই দিতে হয়,তাই কথাটা বললাম খুব নিচুগলায়। কোনোরকম ঝামেলা ছাড়াই ম্যাডামের ক্লাস টা পার হল। শাস্তি ছাড়া আমি মাফ পেয়ে গেলাম এটা মেনে নেয়া ক্লাসের ছেলেদের জন্য খুবই কঠিন ব্যাপার, প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। কাজেই সজীব পাকা গোয়েন্দার মত জিজ্ঞাসা করল,”আচ্ছা খেয়া, কি এমন কথা বললে যে ১০ মিনিট লাগলো? “ আমিও হেসে উত্তর দিলাম,” ফেলুদা, আঙ্কেল আসলে বলছিলেন যে আজকে ক্যাডেট ভর্তির রেজাল্ট বের হয়েছে।“ আমার কথার শেষ অংশটা শুনতে পেয়ে মুকুল স্যার বললেন,”আবারো রেজাল্ট!” স্যারের বলার ভঙ্গিতে না হেসে পারিনা আমরা। হাসাহাসির ফাঁকেই স্যার কিন্তু পত্রিকা আনতে লোক  পাঠিয়ে দিয়েছেন। সারা আর আমি হাত-পা নাড়িয়ে ক্রমাগত বকেই যাচ্ছি, সবাই গা ছাড়া ভাবে গল্প করছে যে যার মত। আর স্যাররা বসে বসে ইনডেক্স নাম্বার মিলাচ্ছেন পত্রিকার সাথে। নিজের অজান্তেই হ্রিদস্পন্দন বেড়ে গেছে আমার। “ইশ, যদি হয়ে যেতো!”- বিড়বিড় করি নিজের অজান্তেই। সারা কনুই দিয়ে খোঁচা দেয় এক টা।“এত কি ভাবো? ক্যাডেট এর রেজাল্ট নিয়ে? “ আমি মাথাটা উপরনিচ করি কয়েকবার। “আচ্ছা খেয়া, তোমার ক্যাডেট এ যাবার এত ইচ্ছা কিভাবে হল?” সারাকে আমি একটু ভেবে বলি,” পাপা-মামনি খুব চাইতো আমি যাতে ক্যাডেট এ পড়ি। ময়মনসিংহে পরীক্ষা দিয়েছিলাম শুধু ওদের স্বপ্ন পূরণ করতে।“ “আর এবার? “- সারা জানতে চায় কৌতুহলি গলায়। “ইয়ে মানে সবসময় ইচ্ছা করতনা,শুধু অর্ক যখন ছুটিতে এসে কোচিংয়ে দেখা করতে আসে সবার সাথে,তখন খুব আফসোস হতো কেন  টিকে গেলাম না। সবাই কেমন প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকায় না ওর দিকে?” সারা মাথা নেড়ে সায় দেয় আমার কথায়। “ওরা কি সুন্দর বন্ধুরা একসাথে থাকে,মজা করে। ওদের খাকী পোশাকটাও আমার খুব পছন্দের। জান সারা, প্রথম আলোর গল্প লেখার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে খাকী পোশাক পরা এক আপু কে দেখেছিলাম,রিফাত আঞ্জুম পিয়া। কি যে স্মার্ট লাগছিল আপুটাকে! সেইদিন থেকে আমার ক্যাডেট হউয়ার ইচ্ছাটা খুব প্রবল হয়ে গেছে।“- এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামি একটু। সারা কেমন দুখি দুখি গলায় বলে,”কিন্তু ক্যাডেট এ হলে ত তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাবা!” একটু থতমত খেয়ে যাই আমি, পরক্ষনেই হেসে বলি,”আরে ধুর,হলে তো!” সারা আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে বলে,” থাক খেয়া মন খারাপ কর না। ক্যাডেট এ না পড়ে কি মানুষ ভাল করেনা? “ আমি কিছু না বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি। “স্টুডেন্টস, অ্যাটেনশন প্লিয। “- ক্লাসে ঢুকে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন ইমরান স্যার, উনার পিছুপিছু মুকুল স্যার। সবাই চুপ হয়ে যায় মুহূর্তেই। পুরো ক্লাসের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে মুকুল স্যার বক্তৃতা দেয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “তোমরা জানো আজকে ক্যাডেট ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছে পত্রিকায়। লিখিত পরীক্ষায় আমাদের ১২ জন চান্স পেয়েছিলো। আর চূড়ান্ত ফলাফল এখন আমাদের হাতে।“ একটু থেমে থেমে নামগুলো পরে শোনান স্যার। সবাই মিলে জোরে জোরে হাত তালি দিলাম নামগুলো শোনার পরে। ক্লাস সেভেন এ চান্স পাওয়া নামগুলো পরে শোনানোর পরে স্যার বললেন, “নতুন দুইটি গার্লস ক্যাডেট কলেজে ক্লাস এইটে ও ক্যাডেট নেওয়া হচ্ছে এটা তো নিশ্চয়ই জানো সবাই। আমাদের একজন ছাত্রী চান্স পেয়েছে  ফেনীতে, শেমী। “ স্যারের কথাটা শুনে আবার হাততালি দেই আমরা। ও আমার ভাল বন্ধু,কাজেই অর চান্স পাওয়ায় খুশি হলেও ভেতরের তেতো ভাবটা দূর করতে পারিনা আমি। কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হয় আমার। কি যেন একটা ঠিক হয়নি, এমন মনে হতে থাকে। আমাকে বিষণ্ণ দেখে মুকুল স্যার হাসেন, ডান ভ্রুটা উঁচু করে জিজ্ঞাসা করেন,”মন খারাপ?” আমি কাষ্ঠহাসি  হেসে বলি, “একটু ত খারাপই। “ “ভালই ত হল চান্স পেলে সারাকে রেখে যাওয়া লাগতনা?” স্যার হাসেন। সারা আমার কাঁধে হাত রেখে হাসিমুখে বলে, “বন্ধুত্তের জোর আছে না স্যার?” ওর কথা শুনে স্যার মিটিমিটি হাসেন,”সারা, তোমরা কত ভাল বন্ধু সেইটা এবার বোঝা যাবে। একজন নরসিংদী, একজন ফেনী।“ “কি?”- আমি আর সারা একসাথে চেঁচিয়ে উঠি। “ডিয়ার স্টুডেন্টস, ফেনীতে চান্স পাওয়া আরেকজনের নাম খেয়া!” জল ভরা চোখে আমরা একজন আরেকজনের দিকে তাকাই।আমি ত আনন্দে কাঁদছি, কিন্তু সারার চোখে অশ্রু টা ঠিক কিসের জন্য তা বলতে পারিনা!

(চলবে)

৩৩ টি মন্তব্য : “আমি যখন ক্যাডেট ছিলাম”

  1. রাব্বী আহমেদ (২০০৫-২০১১)

    আগেও একবার পড়েছি। আবার পড়লাম। সাবলীল ও ঝড়ঝড়ে লেখা। ক্যাডেট কলেজ ব্যাচ ০৫-১১ থেকে আগে আমি একা লিখতাম। তোকে দেখে ভালোলাগছে। হাত খুলে লিখতে থাক..


    নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কাঁদতে নেই
    খুব সহযে বিশ্বাসে বুক বাঁধছ কেন, বাঁধতে নেই
    বুকের কিছু গভীর কান্না চোখের মাঝে আনতে নেই
    কিছু অতীত স্মৃতির কথা জানার চেষ্টা বৃথাই, জানতে নেই...

    জবাব দিন
  2. সালেহ (০৩-০৯)

    তুমি মনে হচ্ছে FGCC 2011 ব্যাচের ক্যাডেট। তোমাদের একটা মেয়েকে একদিন ম্যাথ পড়িয়েছিলাম। ওর নামধাম কিছুই মনে নাই। এই লেখাটা সেই একদিনের টিউশনি নিয়ে। (সম্পাদিত)


    Saleh

    জবাব দিন
  3. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    চমৎকার লিখেছ :boss: :boss:


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
    • মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

      ইয়ে আপু এই ব্লগের নিয়ম অনুযায়ী প্রথম ব্লগ লিখলে ১০ টা ফ্রন্ট্রোল দিতে হয়। কুইক স্টার্ট :grr: :grr: :grr:


      "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

      জবাব দিন
  4. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    ফেনির প্রথম ক্যাডেট হিসেবে ব্লগে স্বাগতম খেয়া। নিয়মিত লিখতে থাকো 🙂


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  5. জিহাদ (৯৯-০৫)

    চমৎকার লেখা, খেয়া। লেখালেখি ব্যাপারটা সহজাত, তোমার মধ্যে সেটা বেশ ভালোভাবে আছে। 🙂

    সিসিবিতে স্বাগতম। আর নিয়মিত লিখবে আশা করি।

    রিফাত আঞ্জুম পিয়া নামে সিসিবিতে একজনের লেখা দেখেছি মনে হয়। দু'জন সম্ভবত একই ব্যক্তি, নাকি ?


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।