চাইনিজ মুসলিম

আমাকে শুধরে দিতে চেষ্টা করেছিলো আমার এক বন্ধু। তার যুক্তি ছিলো মুসলমানদের ভেতর কোন প্রভেদ নেই। নেই কোন জাতি কিংবা জাতীয়তার বিভেদ। সবারই একটাই পরিচয়। আমি অবশ্য তার সাথে এই জটিল বিষয় নিয়ে বিতর্কে যাইনি। তার সাথে কথা বলছিলাম চাইনিজ মুসলিমদের নিয়ে আমার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে।

পরিচিত মহলের সবাই আমার আর আমার স্ত্রীর ‘চায়না কানেকশন’ নিয়ে কম-বেশী জ্ঞাত। এইতো সেদিন বেইজিং-সাংহাই ঘুরে এসে আমাকে বলছিলেন একজন – “ভাই, আপনার দেশ থেকে ঘুরে এলাম”। এ জাতীয় মন্তব্য আমি অবশ্য ‘কমপ্লিমেন্ট’ হিসেবেই নেই সব সময়। চীন সরকারের বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য আমি বেইজিং-এ সাতটি বছর কাটিয়েছি, যখন চীন তার ‘লৌহ যবনিকা’ অল্প অল্প করে তুলে নিচ্ছিলো ‘ওপেন ডোর’ পলিসির মাধ্যমে। আমার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হচ্ছে এই সাতটি বছর। প্রথম বছরটি কাটিয়েছি ‘বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ ইনিস্টিটিউট’-এ ভাষা শিক্ষার জন্য। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকেই ছাত্ররা আসে এখানে চাইনিজ শিখতে। এখানকার ক্যাম্পাসটি ছিলো বিভিন্ন বর্ণের, বিভিন্ন ভাষাভাষীর আর বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের এক মহা মিলনমেলা। আমার সামনে পুরো পৃথিবীর দুয়ার যেন উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এই ইনিস্টিটিউট। বছর খানেক পর ভাষা শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে চলে আসি আমার মূল ইউনিভার্সিটিতে। পুরো ক্লাসে আমরা ছিলাম মাত্র চারজন ফরেন স্টুডেন্ট। সমগ্র চায়নার বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের বেশীর ভাগই আগে কখনো বিদেশী মানুষ দেখেনি স্বচক্ষে – ফলে আমাদের প্রতি তাদের সবারই ছিলো অপরিসীম আগ্রহ। আর যখন তারা দেখত আমরা অবলীলায় বিশুদ্ধ চাইনিজে কথা বলতে পারি, তখন তাদের বিস্মিত চেহারা হতো দেখার মতন। তাদের অনেকেই আমাদের মতন বিশুদ্ধ উচ্চারণে চাইনিজ বলতে পারত না -আঞ্চলিকতার টান থাকত। হাজারো ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে আলাদা করে আমার চোখে পড়ে ‘আইনূর’ আর ‘আলী’-কে। তাদের উইগুর জাতীয়তার কারণে তাদের চেহারা ‘হান’ জাতির চাইনিজদের থেকে অনেকটাই আলাদা। চীনে আসার পরপরই লক্ষ্য করেছিলাম রাস্তার পাশে কিছু লোক সস্তায় গরম গরম ভেড়ার মাংসের ‘শিক কাবাব’ বিক্রি করছে – পরে জেনেছিলাম তারা হচ্ছে ‘শিন চিয়াং’ প্রদেশ থেকে আসা উইগুর জাতির লোক। এই ‘শিক কাবাব’-এর চাইনিজ নাম হচ্ছে ‘ইয়াং রো ঠুয়ান’, অথবা বেইজিং-এর উচ্চারণে ‘ইয়াং রো ঠুয়ার’। বেইজিং-এর মূল বাসিন্দা ‘হান’ জাতির চাইনিজেরা অবশ্য এই ‘ইয়াং রো ঠুয়ার’-এর বিশেষ ভক্ত। রাস্তার পাশে সাইকেল থামিয়ে জিরা আর ঝাল মরিচের গুঁড়ো মিশানো এই শিক কাবাব তারা সাবাড় করে দেয় একটার পর একটা। অবশ্য চাইনিজেরা আমাকে এই শিক কাবাব বিক্রেতাদের সম্পর্কে বলত, ওদের থেকে সাবধান, ওদের সাথে সবসময় ছুরি থাকে, ওরা কিন্তু সাংঘাতিক।

আইনূর আর আলী হচ্ছে আমার প্রথম দু’জন কাছ থেকে দেখা উইগুর জাতির মানুষ। উইগুরেরা মূলত ‘সেন্ট্রাল এশিয়া’র মানুষ, ধর্মে মুসলমান। কিন্তু রাজনৈতিক প্রহসনের কারণে আজ তারা চীনের অধিবাসী। বেইজিং-এর ‘মিন-জু’ (এথেনিক মাইনরিটি) ইউনিভার্সিটিতেই উইগুর ছাত্র-ছাত্রীর আধিক্য বেশী। তবে অন্যান্য ইউনিভার্সিটিতেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদেরকে পড়তে দেখা যায়। বলে রাখা ভালো যে বেইজিং-এর কোন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়াটা সহজ কোন ব্যাপার নয় -এর জন্য পার হয়ে আসতে হয় ন্যাশন ওয়াইড এক কঠিন ভর্তি পরীক্ষার বৈতরণী।

তৃতীয় যে উইগুর ব্যক্তিটি আমার মেমোরীতে স্থান করে নিয়েছে, তার নাম ‘উয়ার খাইশি’। অধিকতর গণতন্ত্রের দাবীতে বেইজিং-এর ছাত্রছাত্রীরা যখন রাজপথে আন্দোলনে নামে, ‘উয়ার খাইশি’ তখন হয়ে উঠেছিলো একজন শীর্ষস্থানীয় ছাত্র নেতা। আন্দোলন শেষে তাকে অবশ্য দেশ ত্যাগ করে ‘আমেরিকা’তে স্বেচ্ছা নির্বাসনে যেতে হয়েছিলো। পরে আমেরিকা থেকে তাকে যেতে হয় তাইওয়ানে। এরপর অবশ্য বেশী দিন তিনি আর আলোচনায় থাকেননি। চাইনিজ কর্তৃপক্ষও তাকে নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চায়নি।

চীনের সংখ্যা গরিষ্ঠ ‘হান’ জাতির মধ্যেও মুসলমানদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সরকারী ভাবে তাদেরকে আলাদা করা হয়েছে ‘হুই’ জাতি হিসেবে। বেইজিং-এর আনাচে কানাচে রয়েছে বেশ কিছু মসজিদ, সেগুলোতে যখন জুম্মার নামাজ পড়তে যেতাম তখন সেই সব ‘হান’ (অথবা ‘হুই’) মুসলিমদের দেখা পেতাম। লক্ষ্য করে দেখেছি যে চীনের মসজিদ্গুলোর নির্মাণশৈলীতে ব্যবহৃত হয়েছে প্রথাগত চৈনিক স্থাপত্যকলা, গম্বুজাকৃতি কাঠামোকে অনুসরণ করা হয়নি। ঈদের নামাজ পড়ার জন্য আমরা যেতাম বেইজিং-এর বিখ্যাত ‘নিউ চিয়ে’ মসজিদে। ঈদের দিনগুলোতে ‘নিউ চিয়ে’ মসজিদ চত্বরের ভীড় ছিলো লক্ষ্য করার মতো। মসজিদ ছাড়া ‘হুই’ মুসলিমদের দেখা পেতাম কাঁচা বাজারের মাংসের দোকানে, সেখানে তারা হালাল মাংস বিক্রী করত।

কম্যুনিস্ট চায়নার একটি কালো অধ্যায় হচ্ছে তার ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’। সেই সময়ে আরোপিত অন্যান্য বিধিনিষেধের মাঝে উল্লেখযোগ্য ছিলো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের উপর বিধিনিষেধ। এতে ‘হুই’ মুসলমানরা প্রায় ভুলতে বসে তাদের ধর্মীয় অনুশাসন। আর তাদের পরবর্তী প্রজন্ম বেড়ে উঠে ধর্মীয় জ্ঞান ব্যতিরেকে। তারা শুধু ধারণ করেছিল তাদের চাইনিজ নামের পাশাপাশি বাবা-মা’র রাখা একটা মুসলিম নাম, যা শুধু মাত্র ডাকা হতো বাড়ীতে একটা বিশেষ বয়স পর্যন্ত। হংকং-এর এক কফিশপে একবার পরিচয় হয়েছিলো গণচীনের এক উঠতি আর্টিস্টের সাথে। আমাদের মুসলিম পরিচয় পেয়ে সে বলেছিলো তার বাবা-মা তার একটা মুসলিম নাম রেখেছিলো ‘কাদির’, যার কথা সে অনেকটা ভুলেই গিয়েছিলো। ‘কাদির’-এর মতো আরও অনেকের সাথে দেখা হয়েছিল আমার চীনের জীবনে।

চীনের শিক্ষা জীবন শেষে আমি বেশ কিছু বছর কাটিয়েছি মালেয়শিয়া এবং সিঙ্গাপুরে। সেখানকার চাইনিজদেরকে আমি গণচীনের চাইনিজদের সাথে মেলাতে পারিনি কোনভাবেই। না ভাষার দিক থেকে, না আচার আচরণের দিক থেকে, না ধর্মীয় মূল্যবোধের দিক থেকে। মূলতঃ গণচীনের ‘হান’ চাইনিজরা প্রচলিত কোন ধর্মেই বিশ্বাস করে না – এমনকি তাদের নিজস্ব ‘তাও’ ধর্মতেও তাদেরকে বিশ্বাস করতে দেখিনি কখনও। অথচ সিঙ্গাপুর আর মালেয়শিয়ার চাইনিজদেরকে দেখেছি একই সাথে বৌদ্ধ ধর্ম, ‘তাও’ ধর্ম, এমন কি খ্রিষ্টান ধর্মকেও পালন করতে। হাতে গোনা দু’একজন চাইনিজকে পেয়েছিলাম যারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত।

আমরা তখন মাত্রই এসেছি টরেন্টোতে। ক্যারাবব কোর্টের এক অ্যাপার্টমেন্টে আমাদের বাস। সেই এলাকাতে চোখে পড়ল হালাল সাইন দেয়া চাইনিজ রেস্টুরেন্ট – নর্দার্ন চাইনিজ কুইসিন। টরেন্টোতে সাধারণত চাইনিজ রেস্টুরেন্ট বলতে বুঝায় ‘হাক্কা’ রেস্টুরেন্ট, যেগুলোর বেশীর ভাগই মালিকানা কলকাতার চায়না টাউন থেকে আসা ভারতীয় চাইনিজদের দখলে। খেয়াল করলে দেখা যাবে যে এই হাক্কা রেস্টুরেন্টগুলির কাস্টমারের সিংহভাগই হচ্ছেন বাংলাদেশ থেকে আসা ইমিগ্রান্টেরা (অর্থাৎ আমরা)। যাহোক, সেই নর্দার্ন চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মালিকের সাথে আমাদের আলাপ জমে গেলো সহজেই। সম্পর্কটা আরো গড়াল যখন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে প্রায়ই হাজির হতাম সেখানে। হাক্কা স্বাদের বাইরে এই ধরণের চাইনিজ খাবারের স্বাদ চেখে আমাদের বন্ধু-বান্ধবদেরকে বেশ তারিফই করতে দেখেছি। এমন সময় রেস্টুরেন্টের মালিক আমাকে ধরলো পাশের মসজিদের গন্যমান্য কিছু লোকের সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিতে। তিনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে চান। তার রেস্টুরেন্ট চাইনিজ মুসলিম এসোসিয়েশন-এর বার্ষিক ডিনারের আয়োজন করছে, সেই উপলক্ষ্যে। সহজ মনে রাজী হয়ে তাকে নিয়ে গেলাম মসজিদে মাগরিবের নামাজের সময়। বেচারার নামাজ পড়ার কসরৎ দেখেই বুঝতে পারলাম এরা ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’-এর মাঝে বেড়ে উঠা জেনারেশন। যাই হোক নামাজ শেষে তাকে নিয়ে গেলাম মসজিদ কমিটির কয়েকজনের কাছে। মনে হলো তারা যেন এই রেস্টুরেন্টের মালিককে ধরার জন্য তক্কে তক্কে ছিলো – আজ ‘মাওকা মিলেগা’। কথোপকথন শুরু হলো, দোভাষীর ভূমিকায় আমি। মসজিদ কমিটির কড়া প্রশ্ন – রেস্টুরেন্টের মাংস কি হালাল? রেস্টুরেন্টে কেন মদ বিক্রী হয়? অনেকক্ষণ পর তারা সম্মত হলেন দু’জন প্রতিনিধি পাঠানোর। তাদের এই সম্মত হওয়ার পিছনে আমার অবশ্য ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা ছিলো। আমি শুধু তাদেরকে মনে করিয়ে দিয়েছিলাম বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলমানরা যদি ‘চাইনিজ মুসলিম’দেরকে আলাদা করে রাখে তবে কি সেটা সঠিক কাজ হবে। যা’হোক মূল অনুষ্ঠানের রাতে আবারও আমাকে থাকতে হলো দোভাষীর ভূমিকায়। মসজিদ কমিটির ভদ্রলোক দু’জন এসেছেন বটে তবে উসখুস করছেন কখন ছাড়া পাবেন এই যন্ত্রণা থেকে। খাবার তখন মাত্র সার্ভ করা হয়েছে, এ’শার আযানও শোনা গেলো কোন একজনের সেল ফোন থেকে। ভদ্রলোক দু’জন এখন উঠে পড়বেন জামাতে নামাজ পড়ার অজুহাতে। এ কথাটা জানাতেই রেস্টুরেন্টের মালিকের মুখে হতাশার ছায়া। বুদ্ধি খাঁটিয়ে তাদেরকে বললাম, আমার জানামতে খাওয়া আর নামাজ যদি একসাথে হয়ে যায়, তবে আগে খাওয়ার বিধান এবং কোনরূপ তাড়াহুড়া না করে। আসলে এটি একটি হাদিস, মালেয়শিয়াতে এক সোমালিয়ান হাফেজ-এর কাছ থেকে আমার শেখা। অগত্যা তারা খেতে রাজী হলেন। এরপর থেকে আমি ঝামেলা এড়াতে সেই রেস্টুরেন্টকেই অবশ্য এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিলাম।

টরেন্টোতে দ্বিতীয় যে চাইনিজ মুসলিম ব্যক্তির সাথে আমাদের আলাপ হলো তার নাম মুসা। আসলে আমার স্ত্রীর সাথে মুসার স্ত্রীর আলাপ হয় প্রথম, মসজিদে নামাজ পড়ার সময়। মুসা পেশায় রিয়েলেটর আবার চাইনিজ মুসলিম এসোসিয়েশনের সক্রিয় সদস্য। মুসার সাথে আমাদের যাওয়া হয়েছিল বেশ অনেকগুলো অনুষ্ঠানে যেখানে দেখা পেয়েছি আরো অনেক চাইনিজ মুসলিমের। লক্ষ্য করে দেখলাম,এই এসোসিয়েশনটি রেস্টুরেন্টে আসা এসোসিয়েশন থেকে ভিন্ন। মুসাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করাতে সে জানালো যে তারা দুটি ভিন্ন এসোসিয়েশন। আমি অবশ্য তাদের ভিতরের ব্যাপারে আর কোন আগ্রহ দেখাইনি। আরেক দল চাইনিজ মুসলিমের দেখা পেয়েছিলাম রমজান মাসে ‘আবু হুরাইরা’মসজিদে। তারা ছিল আসলে বেশ কয়েকটি ফ্যামিলির সমষ্টি, তাদের নেতৃত্বে ছিলেন যিনি, তিনি চীনে ইমামতি করতেন। বয়সে বেশ তরুণ সেই ইমামের সাথে কথা বলে বুঝলাম তিনি ‘চাইনিজ মুসলিম এসোসিয়েশন’ সম্পর্কে জ্ঞাত, কিন্তু তাদের ব্যাপারে আগ্রহী নন। আরেকটি বিষয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো যে এ পর্যন্ত কোন উইগুর চাইনিজ মুসলিমের দেখা পাইনি, যাদের সাথে পরিচয় হলো তারা সবাই ‘হান’ চাইনিজ। এদের সাথে কথা বলে জানতে পারি চীনে তারা কেমন প্রতিকূলতার মাঝে ধর্ম পালন করত। সাত বছর কাটিয়ে এসেছি চীনে, অথচ আমার চোখে পরেনি সেগুলো। হয়ত আমার সেই অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টির অভাব ছিলো তখন।

কিছুদিন আগের ঘটনা। আমরা যেখানে গ্রোসারি শপিং করি, সেই স্ট্রিপ মলে দেখি নোতুন এক রেস্টুরেন্ট খুলেছে – নাম ‘ক্রোরান’, উইগুর কুইসিন। যে কোন নোতুন রেস্টুরেন্টের প্রতি আমাদের আগ্রহ থাকে প্রচুর, তার উপর এটা হচ্ছে উইগুর খাবারের রেস্টুরেন্ট। ঢুঁ মেরে দেখতে গেলাম। মালিকের নাম মাহমুদ। বেইজিং-এর বিখ্যাত ‘রেন-মিন’ অথবা ‘পিপলস্ ইউনিভার্সিটি’ থেকে পাশ করা, মাঝে অনেক বছর জাপান প্রবাসী ছিলেন টরেন্টোতে আসার আগে। ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে ‘রিফাত’ আর সহধর্মিনী ‘ফাতিমা’কে নিয়ে তিনি চালান এই রেস্টুরেন্ট। এরপর একদিন রাতে ঘটা করে খেতে গেলাম সেখানে। আমরা ছাড়া আরো দুটি টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছেন কয়েকজন। বেশ কয়েকটি বাচ্চা ছেলেমেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে সারা রেস্টুরেন্টময়। মাহমুদ আমাদেরকে দেখেই চিনতে পারল, আগে একবার এসে ঢুঁ মেরে গিয়েছিলাম। ফাতিমা মেন্যু নিয়ে এলো। বেশ কিছু পরিচিত খাবারের নাম দেখলাম মেন্যুতে – সেগুলো থেকেই অর্ডার দিলাম আমরা। খাবার তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল মাহমুদ আর রিফাত। আর সেই ফাঁকে ফাতিমা এসে বসল আমাদের টেবিলে। কথা শুরু হলো আমাদের বেইজিং-বাসের অভিজ্ঞতা দিয়ে। সেও প্রাণ খুলে তার জীবনের কথা বলা শুরু করলো। ‘শিন চিয়াং’-এ তার বৃদ্ধ বাবা-মা আর এক ভাই থাকে। সেই ভাই-ই বাবা-মার দেখভাল করে। বছরে কিংবা দুই বছরে তিনি তাদেরকে দেখতে যান। তবে ‘শিন চিয়াং’-এর পরিস্থিতি নিয়ে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন। পত্রিকাতে পড়েছিলাম চীন সরকারের কঠোর দমন নীতির কথা। ধর্ম পালনের ব্যাপারে নির্মম বিধিনিষেধের কথা। এই প্রথম কোন উইগুরের মুখে সেই ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার ছায়া দেখতে পেলাম। কোন এক বাংলা পত্রিকায় ছবিসহ নিউজ হয়েছিল যে, ‘শিন চিয়াং’ -এ ইমামদের বাধ্যতামূলকভাবে পাশ্চাত্য গানের সাথে নাচতে হচ্ছে। ফেসবুকে আমার এক বন্ধু কমেন্ট করেছিলো, এদেরকে আসলে ব্যায়াম করানো হচ্ছে এবং যেটা তাদের জন্য খুবই দরকারী। আমি কখনই ফেসবুকে কমেন্টের উত্তরে কমেন্ট করিনা। কিন্তু আমি জানি ‘শিন চিয়াং’-এ যা হচ্ছে তা শুধু অন্যায় নয়, অমানবিকও বটে। চীনের ‘লৌহ যবনিকা’র ফাঁক গলে সেই চিত্র বাইরের পৃথিবীতে কখনোই এসে পৌঁছায় না। আমরা যে এই চিত্র সম্পর্কে উদাসীন সেই কথাটা কিন্তু হালে শোনা গিয়েছে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল-এর বক্তব্যে।

যাই হোক যথাসময়ে খাবার এসে গেলো। ফাতিমাও আমাদেরকে নিরিবিলিতে ‘উইগুর খাবার’-এর স্বাদ নেয়ার সুযোগ করে দিয়ে উঠে পড়ল। আমরাও সেই খাবারের স্বাদ নিতে নিতে বেইজিং-এর সেই পুরানো দিনগুলিতে হারিয়ে গেলাম। আইনূর, আলীর কথা মনে এলো, জানিনা আজ তারা কেমন আছে।

১৫৬ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।