যুগ শেষের ভাবনা

২০.০৫.২০০০

টি ব্রেক শেষে আমার গাইড ফুয়াদ ভাই যখন বললো , যাও তোমার প্যারেন্টস কে বিদায় দিয়ে আসো। এখন যেমন বাসা থেকে আসার সময় বলি আম্মা গেলাম তখন ও সেভাবে বলেছিলাম । একবার ও পিছনে ফিরে তাকালাম না , ৩১ নাম্বার রুমে এসে পেয়ে গেলাম নতুন তিন রুমমেট সাজ্জাদ , আমি , রেজা আর জাহিদ । দুনিয়ার অদ্ভুত সব নিয়মকানুন আমাদের শেখানো শুরু হলো । ডিনারে কাটা চামচ দিয়ে খাবার গুলোর সাথে ছোটখাটো যুদ্ধ করলাম, সিনিয়র ভাই দের সে কি হাসাহাসি আমার অবস্থা দেখে । রাতে বুাঝলাম আমি আর জাহিদ বাদে বাকি দুজনের মন খারাপ । এই তুমি এই গানটা পারো, তুমি এইটা এরকম করতে করতে আমি আর জাহিদ বেসুরা গলায় ইচ্ছামতন গাইলাম । হয়ত তা মন ভালো করার অপচেস্টা ছিল ।

পরদিন ভোরে বিকট বাশিঁর শব্দে বিছানা ছাড়লাম । বিশাল মাঠটায় তাহের স্টাফ সেই যে বললেন “শুট” আর ” টাচ এন্ড ব্যাক ” সেই থেকে জীবনে এখন ও running এর উপরি আসি । প্রথম সাতদিনের তিনদিনের মাথায় হাসপাতালে। মেডিকেল অফিসার কে গিয়ে বল্লাম, স্যার শুট দিতে দিতে আমার হাটুর বাটিটা নড়ে গেছে , স্যার আমার দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে হাসপাতালে থাকতে বল্লেন ।কি শান্তি !!!! হাসপাতাল গিয়ে মেডিকেল স্টাফ আলম ভাই কে দেখলাম । মনে পড়ে গেলো ভাইভা সময় সেই বিখ্যাত উক্তি “কাশি দাও “আর সম্ভ্রম হানি তো সব ক্যাডেট এর ওনার হাতেই শুরু ! প্রথম ছুটিতে বাসায় এসে বল্লাম আর যাব না কিন্তু কি জানি কি ভেবে যেদিন ছুতি শেষ সেদিন নিজেই সব গুছালাম ।

এর পর দিনগুলো ভালই চলতে লাগল। যে যার নিজ যোগ্যতা দিয়ে ক্যাডেট নাম এর বদলে একটা করে নিক নেম যোগাড় করে ফেললো। হাউস মসজিদের ঈমাম বর্তমানে ডেন্টিস্ট ইশফাক যখন গাজি আজমলের বায়োলজী বই থেকে আমাদের হিউমেন এনাটমি পড়াতো! বি ফর্মের তিতাসের মাসুম এখন পুরাই আল্লাহ র রাস্তায় ! বিয়েও করসে সুন্নতি তরিকায় অথচ শয়তানের উপাশনায় তিনি এহসান আর বেগা কত সময় না ব্যায় করেছেন, খোদার কি ইচ্ছা , তিন জনের ই এখন বুক পর্যন্ত দাড়ি! গোড়ালির উপরে কাপড় ! সিনিয়র ভাই ইংলিশে গালি দিল , রুমে এসে অক্সফোর্ডে সেটার মানে খুজে পাবার পর আমার সে কি কান্না ! পরে যতবার এই মুখ দিয়ে একজন ক্যাডেট এর ভাষা যতটা মার্জিত হতে পারে তার পুরোটা ব্যবহারের পরে ওই কান্না শুধু এটাই মনে করিয়ে দিয়েছে কি বাচ্চা ই না ছিলাম ।ফর্ম লিডার মুরগী রাফী ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ক্যাডেটে যাবার আগেও জাহিদের সাথে , এখনও তারা এক ই মেডিকেলে, হয়তো প্রকৃতি চায় না তারা আলাদা থাকুক !২১ত ইনটেক জায়েনময় , কত ঘটনা আর চাপা জায়েন এর। চিনির সাথে চোগা ফ্রি, টবে খুজে পাওয়া চাবির রিং, তোর বউ, তিন নাম্বার নিপল, মানবিকে অমানবিক জায়েন , গোলকিপাড়, জেনারেল নলেজ, আম্মি আপ্পি , ক্লাসমেট থাকতে জুনিয়র কেন , কে পারবি , নভিসেস ড্রিল, জেপি জায়েন , গভীড় রাতের এক্সসারসাইজ আরও কত কি, সত্যি জায়েন তুই না থাকলে মনে হয় না কখনো ওই কারাগার টা স্বর্গ মনে হতো ।

বিকাল হলেই বা বড় কোন মাঠে কাউকে খেলতে দেখলেই খুব খারাপ লাগে । ফুটবল মাঠে এখনও মনে হয় উপরে ফরহাদ , মসি আমার সাথে খেলতেসে , ভুল করে ডিফেন্সের কাউকে হাসিব বা মোস্তাফিজ বলে ডাক দিয়ে ফেলি । আর সেই কথা , “বয়েস খাইটা খেল “। হকির প্রেমে যখন হাবুডুবু খাচ্ছি তখন সবাই মিলে চিন্তা করলাম বাইরে এসে একটা হকি টিম বানাবো কিন্তু সময় আর বাস্তবতা খুব নির্মম । ফেসবুকে গাফফার স্যারকে দেখে চোখের সামনে ভাসতে লাগলো অডিটোরিয়ামে বই নিয়ে ধরা খাওয়া , চুল না কাটার জন্য সে কি পিটানি , হাউসে এসে উল্টা করে ঘুম, জাকিয়া ম্যাডামের সাথে মোস্তাফিজ এর কথোপোকথন, জ্ঞানপাপী,হাউস এসিমব্লিতে লিয়াকত স্যার এর i am nt in piece , আমার আর ফাহিম এর জাতীয় সংগীত, হাউস মাস্টার রুমে স্যারের সেই বিখ্যাত উক্তি ” আমি তো খালি দেহি একটা ব্যাট আর দুইটা বল ঝুলতাসে ” । বউ মারা যাবার পর শেষ বিকালে 12 এর ব্লকে উদাস গফুর ভাই আর দ্বিতীয় বিয়ের পর ৫৬ থেকে ২৬ বছরের যুবক গফুর ভাই ! টি আলী র মত বারবার আর পেলাম না , কমলা কি আর সাবাই ঘুষ হিসাবে নেয় ?? নেয় না । জাহিদ এর সুন্দর হাতের লেখায় রহিম ভাই এর মেয়ে র কাছে লেখা ধোপা গ্রীন মোল্লার অসাধারন সব প্রেমপত্র মনে হয় না কেও কখনো লিখসে। ফয়েজ স্যার এর কাছে করা অসংখ্য প্রতিজ্ঞা জীবনে মিথ্যা বলবো না , সৎ থাকব , আলমগীর স্যার এর রেগুলার চাপা, মাসুদ স্যার এর ” এটা কি মাশ” শীল স্যার এর প্র্যাকটিক্যাল , জুলেখা স্টাফের সাইকেলের পাম্প ছেরে দেওয়া , গভীর রাতের পানিশমেন্ট আর who is major moshiur !!!!!, লাউয়ের ভর্তা আরও হাজারো সব ঘটনা ্‌,

তুরস্ক থেকে মেহেদি বলে বন্ধু ভাতের ক্ষুদা আমি বলি আগে কও এখন তোমার কয়জোড়া জুতা ! বি,এম,এ র ম্যানার শারেক আর এখনকার বারেক , বিবাহিত গেদা আর তার সেই বিখ্যাত গান in the night sitting alone, আর যাই হোক গভীর রাতে গেদা তো আর একা ঘুমায় না ! সুন্দর কোন ডিব্বাতে রাখা মারডুকের সেই কাটা আঙ্গুল বা সেই বিখ্যাত প্রশ্ন ” কাউসার তুমি কি করো ?” মিল্ক ব্রেকে এর ফল ইনে মহি কেন ভূগোল ক্লাস শেষ করে সময়মটো আসতে পারতো না তা যদি একবার প্রিফেক্টরা জানতো ! ১১ এর এক্সকারশনে নিজাম এর শপিং ! ম্যাংগোর সেই বিখ্যাত আফ্রিকা কবিতা আবৃতি রবিন্দ্রনাথ একবার শুনতো তাহলে আর কবিতা লেখতো না এটা নিশ্চিত। কুমিল্লা মেডিকেলে গিয়ে দেখলাম বাতাসি আগের মতই আছে , ওজন মনে হয় আরও কমসে সকালের পিটির ফল ইনে সোহানের লাল হাফপ্যান্ট আর রাহাতের ক্রিকেট নিয়া টিভি রুমের যুদ্ধ। চুপচাপ আসাদ কে জালালাবাদ ক্যান্টনম্যান্টে ক্যাপ্টেন আসাদ হিসাবে দেখলাম পুরাই উল্টা মানুষ। অনেক দিনের রুমমেট হাসিব কে এখন ও বুয়েটে গেলে দেখি সেই কাউয়া গোসল দিতে , আর টেবিলের উপর তিব্বত ঘামাচি পাঊডার। আমাদের পালের গোদা সি , পি ফয়সল এর মোজা থেকে কি এখন ও সুগন্ধ আসে ? মাতাল ডাঃ তানভির মন্তব্য থাক আসলেই ভালো ছেলে । ডাঃ পিয়াস ওরফে মোটা” বৃহস্পতিবারের স্পেশাল ডিনার আর তোর আলুর দলাটা আহারে! কোটি টাকা খরচ করলেও সেই ডিনার আর পাব না । কুমিল্লার সালেকিন আর তার জলযোগের মিষ্টি , দুইটাই এখন ও ক্লাস সেভেন এর মতই আছে । ক্লাস নাইনের ব্যাঙ এর ধমনী তন্ত্র , ক্লাস ইলেভেন এর নতুন আশফাক আর হালের মেডিসিনের ডেভিডসন, তিনটাই কঠিন । তারিফ আর গারিফ ! সিরিয়াস এখনো। নেতা নাহিদ আর ট্রাক্টর সাঈদ চরম মেয়ে বিরোধি হবার পর ও মেয়ে রাই তাদের কতটা বদলে দিল , আসলেই মেয়েরা সব পারে । ক্লাস সেভেন এ হাউস মস্কে সাইদ এর সে কি কান্না। সময় সবচেয়ে সুন্দর ভাবে বদলে দিয়েছে সাইফুল কে , এতটাই যে মাঝে মাঝে বিশ্বাস হয় না । নজরুল টা আর মানুষ হইল না , এখনো লুজ , সব জায়গা তে লেট ! হাইস এর ভাল ছেলে আর ইটালির জামাই আরেফিন ! মামা তুমি আসলেই একটা মাল।বেক বেঞ্চ এর আসওয়াদ এর যে কি হইসে কে জানে ! পাত্তাই দেয় না এখন আমাগো । আহমেদ , cave man খুব কম খবর পাই তোদের , ভালো থাকলেই ভালো। নেকা জিল্লুর মায়ের আদরের কাতরতায় নাইনে চলে গেল আর এখন, থাক ইহা জ্যামিতিক হিসাব , মিলানো কঠিন ।ফেসবুকের কল্যানে প্রায় হারাতে বসা শাহরিয়ার , কামাল, ওয়াসি কে খুজে পেয়ে আমআদের পরিবারটা আজ পূর্ন। এক জোকসে কয় হা! (হামিম) বের করতে পারলে জানাইস, আর মেকানিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপর তো আর পাঞ্জড়ী গাইড নাই , কেমনে যে তুই পাশ করবি!!! বেচারা রইস , ছবি আকল , গান গাইলো কিন্তু দিন শেষে একাই রইলো। সাকিফ ব্যস্ত মানুষ তাও মাঝে মাঝে খবর নেয় এতেই মুশফিক খুশি , আমরাও খুশি। বায়েজিদের লেখা কস্টের জীবন গল্পটা বাইরের দুনিয়াতে পাবলিশ হয়ে গেলে এতদিনে বাংলাদেশ আরেকটা হুমায়ূন আহমেদ পেয়ে যেত নিশ্চিত।

লিখে শেষ করা যাবে না ।শেষ যেদিন চলে আসি , তিন হাউস এর সবাই একসাথে ঠিক যেখানে বাসার সবাইকে বিদায় দিয়েছিলাম সেখানটায় সে কি কান্না!!! পুরো কলেজ আমাদের বিদায় দেবার অপেক্ষায় কিন্তু আমাদের চোখের পানি আর শেষ হয় না । মাকে বেশ স্বভাবিক ভাবেই বিদায় দিয়েছিলাম কিন্তু বন্ধুদের কে পারি নি । হয়ত এটাই ক্যাডেট দের বন্ধু ভাগ্যের প্রমান। যা বাইরের দুনিয়ার কেউ কোনদিন ও বুঝবে না , এখন ও যেকোন গ্যাদারিং এ সবাই কে দেখলে , কথা শুনলে বুঝা যায় বাইরের জীবনে সবাই অনেক বদলে গেছি , কিন্তু ভিতরে আমরা এখন ও সেই দিগুলোর মতই আছি । কারন তো আর কিছুই না , আমদের সবার বয়স যে মাত্র ১২ হলো এবার ।

৬০১ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “যুগ শেষের ভাবনা”

  1. শাহরিয়ার (২০০৪-২০১০)
    বউ মারা যাবার পর শেষ বিকালে 12 এর ব্লকে উদাস গফুর ভাই আর দ্বিতীয় বিয়ের পর ৫৬ থেকে ২৬ বছরের যুবক গফুর ভাই ......

    ক্লাস সেভেনে গফুর ভাইরে চাচা ডাকতাম...হঠাৎ একদিন কইল,আমারে গফুর ভাই ডাকতে পারেন না?আমার বয়েস কি বেশী হইসে যে চাচা ডাকা লাগবো?...btw ইশফাক ভাইয়ের fb টা একটু দেন তো..@কাউসার ভাই


    People sleep peaceably in their beds at night only because rough men stand ready to do violence on their behalf.

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।