ছোট ছোট বিষয়

আমেরিকা ও কানাডা প্রবাসীর মধ্যে পার্থক্য ধরবেন কিভাবে? জিজ্ঞেস করুন অমুক জিনিসটার দাম কত। কানাডা বাসী বলবেন অত ইউএস অথবা অত কানাডিয়ান ডলার।  অন্যজন বলবেন অত “টাকা”। একজন সৌদি আরবে থাকেন বা ছিলেন অনেক দিন। তিনি পুরো সৌদি আরব নামটা বলবেন না, বলবেন “সৌদি”। জার্মানীতে থাকেন যারা তারা দেশটাকে বলেন “জারমান”। মালয়েশিয়ার বিশাল প্রবাসী জনগন আপনার পরিচয় জানতে জিজ্ঞেস করবে, “ভাই, আপনি কি বাংলা?”  বাঙালি বা বাংলাদেশি নয়- সরাসরি একে বারে “বাংলা”। একে অন্যের পরিচয়ও তারা এভাবেই দিয়ে থাকেন। যেমন ওই কম্পানীতে সাতজন “বাংলা” কাজ করে। আরেকটা মজার বিষয় আছে। যখনই এরা অন্যদেশের কারো সাথে কথাবার্তা কি হয়েছে না হয়েছে এসব বর্ননা করেন তখন তুই বাচক পদ ব্যাবহার করেন। যেমন মালিক বললো- “তুই বাড়ী গিয়ে বিশ্রাম কর”। বা ডাক্তার বললো- “এই অষুধটা তিন দিন খা, এরপরে দেখা কর”। অথবা স্ত্রী (অবাঙ্গালী) বললো- “তুই আগে দেশে যা, তোর বাপ মাকে দেখে আয়”।

এক থেকে দশ বোঝাবার জন্য প্রায় দেশেই সংখ্যাটি বলার সময় আঙ্গুলে ইশারা করার চল আছে। তবে হাতের তালু কার দিকে সেটি লক্ষ্য করার বিষয়। যতদূর দেখেছি তাতে পাঁচ সংখ্যাটি সবাই একই ভাবে দেখায়, প্রসারিত হাত, আঙ্গুল গুলো আকাশের দিকে। ব্যতিক্রম মালয়েশিয়া। পাঁচ বলার সময় লোকমা তোলার ভঙ্গীতে আঙ্গুল কটি একসাথে জমিয়ে দেখাবে। মার্কিনীরা বাচালতা বোঝাতে যেমন মুখের কাছে হাত তুলে পাঁচ আঙ্গুলের মুদ্রা দেখায়। আরেকটা মজার বিষয় এদের মোটর সাইকেল চালানোর ভঙ্গী। সাধারনত দেশে দেখেছি চালক সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে পা দুটো সমান ভাবে দু পাশে চাপিয়ে রাখেন। এখানে অন্তত শতকরা দশজন পাবেন যারা বসেন সোজা হয়ে, কিন্তু এক পা তিরিশ থেকে পয়তাল্লিশ ডিগ্রী কোনে বাইরে দিকে বের করে এবং অন্য পা সাইকেলের সাথে চেপে।এমন তেরচা হয়ে বসার কি সুবিধা আছে জানিনা। মোটর সাইকেলের চালকেরা সবাই উলটো ভাবে জ্যাকেট পরে, অর্থাৎ খোলা দিকটা সামনে না হয়ে পিঠের দিকে। এখানে সর্দারজীর সেই বিখ্যাত কৌতুক খাটবে না। আর আছে ঝোলা ব্যাগ, ছেলে বুড়ো সবার কাছেই তবে সেটি পাশে বা পিঠের দিকে না রেখে সামনের দিকে ঝুলিয়ে রাখে।

হোটেল রেস্তোরায় বিল দেয়ার সময় পারিবেশক ছোকরা মুখে কিছু বলবে না। পকেট থেকে ক্যালকুলেটর বের করে দ্রুত হিসাব কষবে, এরপর সেটা বাড়িয়ে দেবে আপনার দিকে পড়ে নিন। বখশীশের রেওয়াজ বোধহয় নেই, আমি বার কয়েক বখশীশ দিতে গিয়ে কিছুটা বিব্রত হয়েছি।  সে ভাবলো হিসাবে ভুল হয়েছে কিনা, বার বার ক্যালকুলেটর টিপে প্রমান করল যে তার হিসাব নির্ভুল।

ঈদে পরবে নতুন পোষাক কেনে সবাই। তবে আমাদের দেশে যেমন ফ্যাশনের বিরাট প্রতিযোগ চলে, তেমন কিছু দেখলাম না। আমাদের প্রায় প্রতিটা ফ্যাশন হাউজ এইসময় নিত্যনতুন ডিজাইনের পোষাক নামায়। এক পাঞ্জাবীতেই কত বৈচিত্র। শাড়ীর কথা নাই বললাম, সে এক অগাধ শাস্ত্র। এছাড়া ভারতীয় আমদানী তো আছেই। এদেশে ছেলেদের ঈদের পোষাক একটাই। এক রঙ্গা লম্বা হাতা ফতুয়ার মত, ঝুল কোমরের সামান্য নীচে। একই রঙের পাজামা। কোন কারুকাজ নেই। গাঢ় লাল, কমলা, টিয়া সবুজ ইত্যাদি উজ্জ্বল রঙের দিকে বিশেষ ঝোঁক দেখা যায়। একটা শাল বা চাদর জাতীয় কারুকাজ করা কাপড় কোমরে পেঁচিয়ে রাখে যার ঝুল হাটু অবধি। মহিলাদের পোষাক লম্বা বোরখা জাতীয়, মাথায় আলাদা কাপড়। এবং এক পরিবারের ছেলেবুড়ো সবাই সাধারনতঃ একই রঙের পোষাক কেনে। এখানে বলে রাখা যায়, এদেশে পরিবার গুলো বেশ বড়, প্রত্যেক বাড়িতে ছেলেমেয়ে গড়ে ছয় জন। ঈদের সময় প্রায় সপ্তাহ জুড়ে চলে দাওয়াত পর্ব। প্রতিদিনই কোন না কোন বাড়ীর সামনে রাস্তা আটকে শামিয়ানা খাটিয়ে ভোজের আয়োজন। তবে, আমাদের মত শাহী খাবারে বোধহয় এদের রুচি নেই। কাচ্চি, রেজালা, পোলাও কোর্মা টিকিয়া রোষ্ট এসব অনুপস্থিত। সাদা ভাত, মাছ, গরু ও মুরগীর ঝোল, শুঁটকি, শাকশব্জি এসবই খাওয়া হয়। লামং এর কথা আগে বলেছিলাম। এমনকি বিয়ের ভোজেও ওই একই ব্যাবস্থা। আর মিষ্টি জাতীয় খাবার যেমন ফিরনী পায়েস শেমাই লাচ্ছি এসবের কোন দূর প্রজাতীও নেই। তবে চায়ে প্রচুর চিনি থাকে। এদের প্রিয় চা, যাকে বলে তে-তারিক, কনডেন্স মিল্ক ও চিনি দিয়ে বানানো হয়।  ওই জিনিস আমি এখনো আধ কাপের বেশি খেতে পারিনি।

নিত্যদিনের খাবারের মধ্যে আছে নাসি লেমাক, এটাকে জাতীয় খাদ্যও বলা যায়। নারকেল তেলে রাধা সাদা ভাত, সাথে ঘন শুঁটকির ঝোল, ডিম সেদ্ধ ও কিছু চীনা বাদাম। অনেকে এমনকি সকালেও এটা খান। অবশ্যি বিদেশীদেরকে এটা বিশেষ করে সকালে খেতে নিরুৎসাহিত করা হয়। কারনটা পরিষ্কার। আমি একবার এই কাজ করে রাত অব্ধি ভুগেছিলাম।

আম থাকতে কিনা ফলের রাজা দুরিয়ান! হা ঈশ্বর। চেহারা কাঠালের মত, ভেতরে কোয়া আছে তবে প্রবাদ তূল্য সেই আঠাটি নেই। দুরিয়ান গাছের সাথে অবশ্য কাঠাল গাছের কোন মিল নেই। বিশাল উঁচু সেই গাছ, একেবারে মগডালে ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া পাতার সমাবেশ। বছরে দুবার তীব্র গন্ধে চরাচর আচ্ছন্ন করে সেই ফলরাজের আগমন ঘটে।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রনে এয়ার কন্ডিশনার, যাকে আমরা সংক্ষেপে এসি বলি। এখানে এসি বললে কেউ বুঝবে না, বলতে হবে “এয়ার কন”।

৮৩২ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “ছোট ছোট বিষয়”

  1. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    খুব ভাল লাগলো, মাহবুব।
    তথ্য সমৃদ্ধ কিন্তু তথ্যভারাক্রান্ত নয়।
    অবলিলায় বলা।
    পড়ার সময় মনে হলো গল্প পড়ছি। পরে বুঝলাম, আরে অনেক কিছু তো জানা ও শেখা হয়ে গেল...


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  2. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    মাহবুব ভাই,

    আপনার অভিজ্ঞতা থেকে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে লেখাটা ভালো লেগেছে।

    তবে, দুয়েকটা ছোট ছোট তথ্য যোগ করে দিলে আরো ভালো লাগত। যেমন- তৃতীয় ও চতুর্থ প্যারা মনে হলো মালয়েশিয়ার প্রেক্ষিতে। দ্বিতীয় প্যারা থেকে এই অনুমান করেছি। কিন্তু সব প্যারাতেই ব্যাপারটা স্পষ্ট করে লিখলে বুঝতে আরেকটু সুবিধা হতো।

    সিনিয়রের ব্লগে এসে একটা "সামান্য" সংশোধনী দাবী করে যদি কোন রকম ভুল করে থাকি, সেই ডাউটে আগে থেকেই কয়েকটা :frontroll: :frontroll: দিয়ে রাখি।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  3. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    অপূর্ব ধর্মীয় সহাবস্থানের এই দেশটাতে মাছের রকমারী রান্না সত্যিই ভীষণ সুস্বাদু ।
    পড়তে পড়তে আরো একবার যেনো ঘুরে এলাম ।

    তবে হ্যাঁ ... আই ইকো পারভেজ ।
    প্রোপিক চাই শিগগির ।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।