একটা ‘ধন্যবাদ দিবস’ চালু করলে কেমন হয়?

কয়েক বছর আগেকার কথা। মতিঝিলে একটি অনেক উঁচু ভবনে লিফটে করে উঠে নামার সময় লিফট-ম্যানকে ‘ধন্যবাদ’ দিতেই তিনি আমার হাত খপ করে চেপে ধরে বলেছিলেন, ‘আপনাকেও ধন্যবাদ; আমার কুড়ি বছরের কর্ম-জীবনে আপনিই প্রথম আমার কাজের জন্য ধন্যবাদ দিলেন’। আমার এক ধন্যবাদে এই মানুষটির খুশি দেখে আমি ঠিক করেছিলাম মানুষকে আরও বেশি-বেশি করে ধন্যবাদ দিতে হবে। এই মানুষটির সঙ্গে আমার যেমন মনের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল, তিনি যেমন আমার মনের ইতিবাচক দিকটি দেখতে পেয়েছিলেন, তেমনি তিনি তার কাজ আরও মন দিয়ে করার একটা উৎসাহ অবশ্যই পেয়েছিলেন।
একদিন একজন রিক্সাওয়ালাকে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম। তারপর থেকে তিনি আমার অফিস যাওয়ার সময় আমার বাড়ির সামনে এসে দাঁঁড়িয়ে থাকতেন। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি প্রতিদিন এখানে দাঁঁড়িয়ে থাকেন কেন?’ তিনি বলেছিলেন আমাকে যাত্রী হিসেবে নিতে তার ভাল লাগে। একেবারে ছোটবেলায় ধন্যবাদ দেওয়াটাকে মনে করতাম এটি একটি বিদেশি সংস্কৃতি। ধন্যবাদ তারা দেবে; এটি আমাদের জন্য নয়। আমাদের বাবা-মা’র প্রজন্মও তাই-ই জানতেন।
আমি প্রথম ধন্যবাদ বলা শিখলাম ক্যাডেট কলেজে পড়তে গিয়ে। আর্মি-ধাঁচের শিক্ষায়তন, তাই ইংরেজিতে ধন্যবাদ বলতে শিখলাম। সেখানে কারও সাথে কথা বা কাজ শেষ করলেই ‘থ্যাঙ্কইউ স্যার’, ‘থ্যাঙ্কইউ ভাইয়া’–এগুলো বলা বাধ্যতামূলক ছিল। ছুটিতে বাড়ি এসে অভ্যাসবশত কাউকে ধন্যবাদ দিলে দেখতাম তারা খুব খুশি হত। কিন্তু তা নিয়ে খুব ভাবিনি কখনোই। তবে ভাবতে ভাল লাগতো যে ক্যাডেটদের ধন্যবাদ দেওয়ার সংস্কৃতি দেখে সবাই আমাকে স্মার্ট অথবা বিদেশি-বিদেশি ভাবছে। তারপর অভ্যাসবশত কিছুদিন সবাইকে ধন্যবাদ দিয়েছি এবং ধীরে-ধীরে সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। তারপর আবার ধন্যবাদ দেওয়ার সংস্কৃতি আবিষ্কার করলাম যখন জীবনে প্রথম লন্ডন গেলাম।
ইংল্যান্ড গিয়ে অনেক কিছু নতুন শিখেছি দেখেছি। তবে ‘থ্যাঙ্কইউ’ দেয়ার সংস্কৃতি মনে দাগ কেটেছিল। সেখানে সবাই সবাইকে কারণে-অকারণে ধন্যবাদ দেয়। ঠিক যেন আমার ক্যাডেট কলেজের মতো। শুধু সেইদেশে ধন্যবাদ না দিলে শাস্তির কোনও বিধান নেই। সবাই সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধন্যবাদ দিচ্ছে। আমারও সবার কাছ থেকে ধন্যবাদ পেয়ে খুবই ভাল লাগছে। সেখানে ‘ধন্যবাদ’ তাদের জীবনের একটা অংশ। সেখানে থাকতেই মনে হল আমিতো কখনই আমার স্ত্রীকে আমার স্ত্রী হওয়ার জন্য ধন্যবাদ দেইনি, আমার বাবা-মাকে আমাকে খাইয়ে-পড়িয়ে বড় করার জন্য ধন্যবাদ দেইনি, আমার সন্তানদের আমায় মান্য করার জন্য ধন্যবাদ দেইনি, আমার শিক্ষকদের আমায় পড়াশোনা শেখানোর জন্য ধন্যবাদ দেইনি, আমার বন্ধুদের বন্ধু হওয়ার জন্য ধন্যবাদ দেইনি। তাদের এসব কারণের জন্য ধন্যবাদ দিলে তারা কতইনা খুশি হবেন!
দেশে ফিরে প্রথম ধন্যবাদ দিলাম আমার স্ত্রীকে। অবাক হয়ে দেখলাম তার খুশি; আমার প্রতি তার শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো। তারপর বাবা, মা, আমার ছেলে-মেয়ে, আমার শিক্ষক, বন্ধু সবাইকে ধন্যবাদ দিলাম। সবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক একেবারে অন্য পর্যায়ে চলে গেলো। আমার প্রতি সবার শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো। এরপর থেকে যার সংস্পর্শে আসি তাকেই ধন্যবাদ দেই। দেখলাম, আমার প্রতি আমার চারপাশের মানুষের ব্যবহার বদলে গেল। আমার প্রতি তাদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেড়ে গেল। বুঝলাম এটা ধন্যবাদের ক্ষমতা।
ধন্যবাদের এই সংস্কৃতি আমাদের দেশে স্থায়ী একটা রূপ না পেলেও আমরা অনেকে সবাইকে ধন্যবাদ দেওয়া শুরু করেছি। আগে কখনওই দেখিনি কোন কোম্পানি তাদের পণ্য কেনার জন্য ক্রেতাদের ধন্যবাদ দিচ্ছে। তবে এখন কিছু-কিছু কোম্পানি ধন্যবাদ দেওয়া শুরু করেছে। তারা এখন ঘটা করে সমাবেশ ডেকে ক্রেতাদের ধন্যবাদ দিচ্ছে। চিন্তা করুন, ব্যবসায়ীরা সবাই তাদের পণ্য কেনার জন্য যদি আমাদের সবাইকে ধন্যবাদ দেওয়া অথবা কৃতজ্ঞতা জানানো শুরু করতেন তাহলে কী হতো! যে ব্যবসায়ী তার ক্রেতাদের ধন্যবাদ দিচ্ছেন আমরা সবাই তাকে সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল মনে করতাম এবং অবশ্যই তার পণ্যই কিনতে চাইতাম।
আমাদের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দেশের অনেক বিষয়ে কথা বলেন, পরামর্শ দেন। তারা অনেক সভা-সমাবেশও করেন। মাঝে-মাঝে মনে হয় তারা যদি একটা ‘ধন্যবাদ সমাবেশ’ করতেন তাহলে খুব ভাল হতো। ধন্যবাদ দেওয়া হবে রাজনীতিকদের তাদের দেশের জন্য ভাল কাজের জন্য। সেই সমাবেশে আরও বলা হবে তারা (রাজনীতিকরা) এমন ধন্যবাদ পেতেই থাকবেন যদি তারা মানুষের জন্য ভাল কাজ করেন। এতে বোধ হয় রাজনীতিকদের মধ্যে একটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হতো। আর দেশের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে যারা আছেন, তারা যদি দেশের মানুষকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য একটি সমাবেশ আয়োজন করতেন, তাহলে কী হতো? আমার মনে হয় না বাংলাদেশে এমন সমাবেশ কখনও হয়েছে। কোনও দলকে নির্বাচিত করার জন্য ‘ধন্যবাদ সমাবেশ’ হয়েছে এমন কথা আমার মনে পড়ে না। রাজনীতিকদেরই উচিৎ সবার আগে দেশের মানুষকে ধন্যবাদ দেওয়া। আমাদের অর্থমন্ত্রী যদি কৃষকদের জন্য একটা ‘ধন্যবাদ সমাবেশ’ ডাকতেন তাহলে সরকারের সন্মান কত উঁচুতে চলে যেতো!
ধন্যবাদ সংস্কৃতি যদি ব্যক্তি পর্যায়ে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনতে পারে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তা আরও বেশি আনবে বলে আমার মনে হয়। যারা আয়কর দিচ্ছেন তাদের ওপর চড়াও হওয়া ছাড়া তাদেরকে আমাদের কোন সরকার কবে ধন্যবাদ দিয়েছে কর দেওয়ার জন্য? উদাহরণ দিলে বলে শেষ করা যাবে না। তাই আজ এখানেই আমি শুরু করি: সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাই যারা আমার, আমার পরিবারের ও আমার দেশের উপকার করে সামান্যতম পরিবর্তন এনেছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে একটা ‘ধন্যবাদ দিবস’ চালু করলে কেমন হয়?

১,৬২৮ বার দেখা হয়েছে

৯ টি মন্তব্য : “একটা ‘ধন্যবাদ দিবস’ চালু করলে কেমন হয়?”

  1. সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

    প্রথমেই ধন্যবাদ ভাইয়া চমৎকার এই লেখাটির জন্য :clap: :clap:

    আমেরিকাতে আমরা নভেম্বরের চতুথর্ বৃহষ্পতিবারে থ্যাংকসগিভিং ডে উদযাপন করি। শুরুতে এটি ধর্মীয় উৎসব থাকলেও পরবর্তীকালে এটি সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকেই স্কুল কলেজে বা কর্মস্থলগুলোতে থ্যাংকসগিভিং পাটর্ির আয়োজন করা হয়। এইসব পাটর্িতে ব্যাপক খাওয়াদাওয়ার আয়োজন থাকে। টেবিলের মধ্যভাগে বেইকড টার্কি আলো ছড়ায়। সাথে থাকে ম্যাশড আলু, ক্র্যানবেরির সস, সেদ্ধ ভুট্টা, মিষ্টি আলু ভাজা আর সবুজ বিনসের ক্যাসেরোল। পামকিন পাই থাকে ডেজার্টে।

    স্যালভেশন আর্মি শহরে শহরে লেস ফরচুনেট মানুষদের জন্য ব্যাপক ভোজের আয়োজন করে। কমু্যনিটিতে ফুড ড্রাইভের উদ্যোগ নেয়া হয়। বিনামূল্যে চুল কাটানোর ব্যবস্থা থাকে গৃহহীন মানুষের জন্য। যে যার সামর্থ্যমতো দান করেন এই সময়ে।

    দেশে ধন্যবাদ সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়নি নট ইভেন ইন ক্যাডেট কলেজ। এখানে এসে দেখলাম ধন্যবাদ দেয়াটা ডালভাত খাওয়ার মতোই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। মুদি দোকানদার থেকে জেনিটর, অফিসের বস থেকে দুই বছরের শিশু সবাই চলছে এই ধন্যবাদের যাদুতে 😀

    গত পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে হোসে ফিড দা হাংরি (এইচএফটিএইচ) নামের একটি সংগঠন আমাদের শহরে থ্যাংকসগিভিং ডে' তে দশ হাজার মানুষের ভোজের আয়োজন করে।

    থ্যাংকসগিভিং ডে'র পরের দিনটি হলো ব্ল্যাক ফ্রাইডে। রিটেইল শপগুলো অনেক প্রমোশনাল মূল্যহ্রাসের আয়োজন করে থাকে। লোকজন ছোটখাটো তাবু খাটিয়ে মধ্যরাত্রি থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে নিজের পছন্দসই জিনিসটি স্বল্পমূল্যে কিনতে!

    থ্যাংকসের দেশে জন্মেছে বলেই হয়তো আমার কন্যারত্ন ডিনার শেষে থ্যাংকস বলতে ভোলেনা। একটা অংক করে দিলে থ্যাংকস; স্কুল শেষে বাড়ি ফিরলে এক পেয়ালা লেমোনেড দিলে থ্যাংকসের সাথে হাগও জোটে। রাতে ঘুমোতে যাবার আগে আমার তারাটি ম্যাসেজ পাঠায়, থ্যাংকস ফর বিয়িং দা লাইট ফর মি, মা!

    সামান্য একটু হাসি, একটি উষ্ণ সম্ভাষণ, সস্নেহ আশ্বাস অথবা একটি ধন্যবাদ আমাদের মেঘমেদুর দিনটি রংধনুর রঙে রাঙিয়ে দিতে পারে 😀

    জবাব দিন
  2. মাহবুব (৭৮-৮৪)

    আমদের সমাজ রীতি আচার সাহিত্য সংস্কৃতির কোথাও "ধন্যবাদ" নেই, শব্দটাও কেমন বেখাপ্পা কঠিন, যেন অনেকটা জোর করে বসানো, আঞ্চলিক বা গ্রাম্য ভাষার সাথে তো একদমই যায় না, তাই এটার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়নি এতদিন। এর মূলে হয়তো আছে "সে তো এটা করবেই" জাতীয় মনোভাব, বা "বুঝে নাও- আমি বড়ই কৃতজ্ঞ"- ধন্যবাদ ইমপ্লাইড।
    সময় বদলেছে, সাথে সবকিছুই বদলাতে বাধ্য। লেখার সাথে সম্পূর্ন একমত, এবং লেখাটার জন্য ধন্যবাদ।

    জবাব দিন
  3. রাব্বী আহমেদ (২০০৫-২০১১)

    প্রথমেই ধন্যবাদ লেখাটার জন্য।

    ধন্যবাদ দিবসের মতো একটা সরি দিবস থাকলেও মন্দ হতো না। ক্যাডেট কলেজে গিয়েই সরি বলার অভ্যাস শুরু হয়েছিলো। এখনো কোন ভুল করলে বা কারো গায়ে টাচ লাগলেলে সরি বলতে ভুলি ন। তেমনি ধন্যবাদ দেয়ার অভ্যাস থাকাটাও বেশ জরুরী। (সম্পাদিত)


    নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কাঁদতে নেই
    খুব সহযে বিশ্বাসে বুক বাঁধছ কেন, বাঁধতে নেই
    বুকের কিছু গভীর কান্না চোখের মাঝে আনতে নেই
    কিছু অতীত স্মৃতির কথা জানার চেষ্টা বৃথাই, জানতে নেই...

    জবাব দিন
  4. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    ধন্যবাদ ইকরাম ভাই লেখাটার জন্য। আমি নিজে যথা সম্ভব চেষ্টা করি ধন্যবাদ বলার, আর প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই ধন্যবাদ দেয়ার পরের প্রতিক্রিয়া পরবর্তীতে আরো বেশি করে ধন্যবাদ দেবার জন্য অনুপ্রানিত করে।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  5. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    এতে আবার কার কি কমে যায় ! দেয়া দেয়ি মানেই তো ঝঞ্জাট ।
    এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার দিন শুরু বলে ।
    আর আসলেই আমরা না জানি শিশু সন্তানটির খামোখা কোনো কিছু করবার প্রয়াসেও যেমন তাকে উতসাহিত করতে। তেমনি প্রয়োজনে কী অপ্রয়োজনে কারো কোনো সাহায্য পেলেও তাকে এক বিন্দু ধন্যবাদ দেবার তাগিদ থাকে না মনের কোণেও।

    ~ ধন্যবাদ বন্ধু । ধন্যবাদ তোমার চর্চা ও লেখাকে ।

    জবাব দিন
  6. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    ইকরাম ভাই,
    আমাদের দেশের সরকারি-বেসরকারি অফিস, দোকান-শপিং সেন্টারে সামান্য হাসিমুখ দেখলেই আমরা গলে যাই। সেখানে যদি উলটো 'ধন্যবাদ' পাই, তাহলে তো খুশিতেই অনেকে মরে যাবে!

    লেখাটির জন্য ধন্যবাদ। 😀


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  7. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    খুবই চমৎকার একটি প্রস্তাব। এমন সুন্দর একটি প্রস্তাব রাখার জন্য প্রথমেই তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
    একটা ছোট্ট ধন্যবাদ অনেক সময় একটা পাহাড়কেও নাড়াতে পারে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।