কনা’র বিয়ে

আজ কনা’র বিয়ে। বিয়ে মানেই আনন্দ, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে হৈ চৈ করে বাজার করা, রঙ্গিন স্বপ্নের জাল বোনা। অথচ কনা’র এগুলো কিছুই করা হয় নি, ওর হয়ে আত্মীয়-স্বজনরাই সব করেছে। কমিনিউটি সেন্টারে কণা বৌ সেজে, স্টেজে চুপচাপ বসে আছে। চারিদিকে বাচ্চাদের চেঁচামেচি আর দৌড়াদৌড়িতে কানে তালা লাগার অবস্থা। মনে হচ্ছে ওদেরই সবচেয়ে বেশী আনন্দ। অথচ কনা’র একটু আনন্দ লাগছে না, বরং সবকিছু বিরক্ত লাগছে। একরকম ভাবলেশহীন। আসলে তার আনন্দ-বেদনা কিছুই লাগছে না। মনে হচ্ছে কোন ড্রামা চলছে, সে শুধু চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। বরযাত্রী অনেক আগেই এসে গেছে। পরিচিত-অপরিচিত সবার মধ্যে কেমন যেন একধরনের ব্যস্ততা, মনে হচ্ছে খাওয়া-দাওয়া সেরে কে কত তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে যাবে সে প্রতিযোগিতায় সবাই ব্যস্ত। কণা’কে নিয়ে ভাবার সময় কারো নেই। তার খুব ভালো বিয়ে হচ্ছে। পাত্র প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, ভাল ফেমেলীর ছেলে। বিয়ের সবকিছু এত তাড়াতাড়ি আয়োজন করা হয়েছে, মুরুব্বিরা কেউ কনা’র মতামত নেবার প্রয়োজনও বোধ করেননি। আর করবেই বা কেন? কনা’র মত একটা অল্প বয়সের মেয়ে কি ই বা বুঝবে? ভিড়ের মধ্যে একটা মুখ দেখে কনা’র দৃষ্টি থেমে গেলো। হঠাত জাহেদ ভাইকে দেখে কনা যেমন অবাক হোল তেমনি তার খুব রাগও হোল। দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। দেখতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে গলা চেঁচিয়ে জেজ্ঞেস করে, ছয় মাস পড়ে কি ঢং দেখতে এসেছেন?

জাহেদ ভাই তার সবচে প্রিয় বান্ধবী ইরা’র বড় ভাই। ঢাকা ভার্সিটিতে ফাইনেন্স-এ পড়ছে। ইন্টারমিডিট ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েই ইরা’র সাথে পরিচয়। সেই সুবাদে ইরা’দের বাসায় আসা। জাহেদ ভাই প্রথম প্রথম একটু গম্ভীর থাকলেও পরে অনেক গল্প করতো। কনা’র জাহেদ ভাইকে কেন এতবেশি ভালো লাগে তা সে নিজেই জানে না। সব মেয়েরই পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের বাইরে আরও এক ইন্দ্রিয় থাকে। এই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের কারনে কণা প্রায় নিশ্চিত জাহেদ ভাইও তাকে পছন্দ করে। জাহেদ ভাই ঢাকা থেকে ছুটিতে বাড়ী আসলেই কনা’র ইরা’র কাছ থেকে নোট আদান-প্রদানের প্রয়োজনীয়তা বেশ বেড়ে যায়। ইরা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মিটিমিটি হাসে কিন্তু কিছু বলে না। শুধু ইরা না, ইরা’দের বাসায় সবাই মনে হয় কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছে। আর সবারই কনা’কে খুব পছন্দ। কণা মাত্র ইন্টারমিডিয়েট পড়ছে বিধায় কেউ এখনো বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কিন্তু কনা’র এভাবে হঠাত বিয়ে ঠিক হয়ে যাবে তা কেউ ভাবে নি। কনা’র বাবার শরীর ভালো না, মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিত হতে চান, বিশেষ করে একজন ভালো পাত্র পাওয়াতে এ ব্যাপারে কেউ আর তেমন একটা আপত্তি করে নি।

জাহেদ ধীরে ধীরে কাছে এসে কনা’র পাশে এসে বসল। কণা আড় চোখে তা দেখেও না দেখার ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। জাহেদের মুখ ভার, সে কিছুক্ষণ কনা’র পাশে চুপচাপ বসে থাকলো। উঠে যাবার সময় কনা’র কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, বেইমান কোথাকার। কথাটা শুনে কনা’র সারা গায়ে একধরনের জ্বালা অনুভব করল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। সে যে অনেক রাগ হয়েছে তা তাকে দেখলে সহজেই বুঝা যাচ্ছে। কনা’র জোর গলায় জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল, বেইমান আমি, না আপনি? কাপুরুষ কোথাকার? প্রপোজ করার সাহস পর্যন্ত নেই। কিন্তু কনা’র গলা বুজেঁ আসছে, কোন শব্দ বের হোল না। তার দু’চোখ ঝাঁপিয়ে তার কান্না আসছে, টপটপ করে পানি পড়তে শুরু করল। কনা’র এটাই একটা সমস্যা, কাউকে কিছু বলতে পারে না। আজও জাহেদ ভাইকে কিছু বলতে পারল না।

ইতিমধ্যে পাত্রকে বিয়ের খুদবা পড়ানো হয়েছে, খেজুর বিতরণও শেষ। এখন কাজী সাহেব আর মৌলভী সাহেব এসেছেন কনের মতামত নিতে। সবার ঠেলাঠেলি আর ভ্যাবসা গরমে নিশ্বাস নেয়া দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ কেউ সরে যাবার লক্ষণ পর্যন্ত নেই। এটাই বিয়ের ক্লাইম্যাক্স, কেউ এটা না দেখে যেতে রাজী নয়। কনা মুখ নিচু আছে, তার চোখের পানি এখনও বন্ধ হয় নি। কনা’র বাবা ফয়েজ সাহেব মেয়ের কাছে বসলেন, বললেন, মা কবুল বল, কাজী সাহেব আর মৌলভী সাহেব তোমার উত্তর শুনার জন্য অপেক্ষা করছেন। কণা কিছু একটা বলার চেষ্টা করলো, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হোল না। সে ঠিকমত নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। অনেক কষ্টে বাবার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, বাবা আমি এখন বিয়ে করবো না। হৈ চৈ এর মধ্যে কনা’র সব কথা ফয়েজ সাহেব ঠিকমত শুনতেও পেলেন না। যতটুকু শুনতে পেলেন, তাতে তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। বুকের বাম দিকটায় তিনি ব্যাথা অনুভব করছেন। কণাও হঠাত প্রায় অজ্ঞানের মত হয়ে গেলো। কয়েকজন পাখা এনে কনা’কে বাতাস করতে থাকলো। ফয়েজ সাহেবকে ধরাধরি করে পাশের রুমে নিয়ে শুইয়ে দেয়া হোল। সবাই বলাবলি করতে লাগলো এমন ভ্যাবসা গরমে কয়জনের শরীরই বা ঠিক থাকে। কণা অসুস্থ হয়ে যাওয়াতে কনা’র বর ভাই কনা’র হয়ে কাবিননামায় সাক্ষর করে দিলেন। অনেক রাত হয়ে যাওতে পাত্র পক্ষের পিড়াপড়িতে কনা’কে কোলে করে পাত্রের গাড়িতে তুলে দেয়া হোল। গাড়ী কিছুক্ষণ চলার পর কারো হাতের স্পর্শে কণা চোখ খুলল। কনা’র সে দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। তার চোখ দিয়ে আবারও পানি পরতে শুরু করেছে। কণা বাবাকে খুব বলতে চেয়েছিল, বাবা, পৃথিবীতে মেয়েরা শুধু মাত্র একজনকেই ভালবাসতে পারে। কনা’র এই অশ্রুর অর্থ সে ছাড়া আর কেউ জানে না।

 

১,৭৫০ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।