সমুদ্রসীমা, পররাষ্ট্র কৌশল এবং মায়ানমার

অনেকদিন পর আবার লিখতে বসলাম। ভয় আছে বানান ভুল করি কিনা। অনেক কিছু ঘটেছে, তবে লেখার মত কিছু ছিল না। সম্প্রতি সমুদ্রে জলসীমা নির্ণয়ে জটিলতা আমাদের পররাষ্ট্র কৌশল নির্নয়ে সমস্যা সৃষ্টি করছে। আরেকটি নতুন চ্যালেঞ্জ হল মায়ানমারের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন মোড়।

(১)
২৮ বছর হয়েছে আমরা সমুদ্রসীমা নির্ধারনে অবহেলা করেছি। একদিন যে সমস্যাটি ক্ষুদ্র প্রয়াসে সমাধান করা যেত তা আজ মহীরুহ হয়ে দাড়িয়েছে। আর মাত্র ৩ টি বছর সময় আছে, এর মধ্যে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করতে হবে। সমুদ্রসীমা নির্ধারণে যে সমস্যাটি প্রধান হয়ে দাড়িয়েছে তা হল exclusive economic zone. রাজনৈতিক সীমা প্রসঙ্গে বলা তিন দেশের কোনো আপত্তি নেই। প্রসংগত বঙ্গোপসাগর হঠাৎ করেই ৩টি দেশের কাছে লোভনীয় হয়ে দাড়িয়েছে। এর বিশাল বুক জুড়ে রয়েছে খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য। ভারতীয় সমিক্ষায় দেখা যায় সমুদ্রতলদেশে ১০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট এবং মায়ানমারের অনুসন্ধানে আবিস্কৃত হয় ৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। মায়ানমার ২১ শে মে এবং ভারত ২৯ শে জুন জাতিসংঘের নিকট সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত দাবী ও প্রস্তাবনা পেশ করে। বাংলাদেশ তার দাবী ও প্রস্তাবনা পেশ করে ১ মাস পরে। তবে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আশাপ্রদ নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রানালয় এবং সমুদ্র গবেষণা সংক্রান্ত পৃথক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে আরবিস্টেশনে একবার হারলে আমরা একে উদ্ধার করার মত সামরিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের এমন কোনো পরিক্ষিত বন্ধু নেই যে তারা আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করবে।

ক) মায়নমারের সাথে বিরোধঃ দক্ষিন কোরিয়ান একটি কোম্পানি মায়ানমারের ২ টি যুদ্ধ জাহাজের প্রহরায় সেন্ট মার্টিনের নিকট তেল গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করে। বাংলাদেশ নৌ বাহীনির ৩ টি যুদ্ধ জাহাজ এর প্রতিবাদে অগ্রসর হলে তারা অনুসন্ধান বন্ধ করে পিছু হটে। আমরা একে আমাদের বিজয় ভাবলেও মায়ানমারের এই পশ্চাৎপসারণ সবই ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্রের একটি ক্ষুদ্র নাটক।

খ) ১৯৮১ সালে ভারত সরকার হারিয়াভাঙ্গা নদীর মোহনায় উৎপন্ন দক্ষিন তালপট্টি দ্বীপ নৌ বাহিনী কতৃক দখল করে নেয়। বাংলাদেশের মত সমুদ্র উপকুল ভগ্ন হলে বিন্দুগুলোতে রেখা টেনে তারপর অর্থনৈতিক অঞ্চল বা মহিসোপান অঞ্চল নির্দেশ করা হয়। এবং রেখা সমুহের অভ্যন্তরের জলরাশিকে স্থলভাগ হিসাবে গননা করা হয়। তালপট্টি যদি ভারতের অংশ হিসেবে ধরা হয় তবে স্বাভাবিক গননায় আমাদের সমুদ্রসীমা ছোটো হয়ে আসবে। শুধু ছোটো না আমাদের হারিয়াভাঙ্গা নদীর মোহনা এবং আভ্যন্তরীন জলরাশি ভারতের অংশ হিশাবে পরিগনিত হবে। এতে আমাদের রাষ্টের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখিন হবে।

(২)

বার্মার সাথে হঠাৎ সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। তারা সীমান্তে কাটা তারের বেড়া নির্মান করছে। একই রকম বেড়া ভারত নির্মান করতে চাইলে আমরা তাকে আন্তর্জাতক আইনের লঙ্ঘন বলি কিন্তু মায়ানমার করলে তা বৈধ হয়ে যাচ্ছে কেন? আমার কোনো ভারত প্রীতি নাই। তবে এক্ষেত্রে আমার সান্দেহ হচ্ছে মায়ানমারের কাটা তারের বেড়া প্রশ্নে আমাদের সরকার ও বিরোধীদল কেন নীরব ভুমিকা পালন করছে। কাটা তারের বেড়া প্রশ্নে আমার বিরোধ নেই। তবে এই বেড়া হওয়া উচিত রহিঙ্গা শরনার্থিদের শান্তিপুর্ন স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর। তার পুর্বে নয়।

অতি সম্প্রতি শোনা যায় মায়ানমার নাকি পারমানবিক অস্ত্রীকরন করতে চাচ্ছে। গুজব হলে আশার কথা। সত্যি হলে ভয়ানক ব্যাপার। তবে ওবামা প্রশাষনের পুর্বে মায়ানমারের সাথে সম্পর্কে একতরফা সুবিধা ভোগ করে আসছিল চীন। ওবামা চীনকে মায়ানমার হতে একতরফা সুবিধা দিতে নারাজ। তাই ওবামা মায়ানমার সামরিক সরকারের সাথে আলোচনা করতে চায়। চীন ও আমেরিকার স্বার্থে মায়া্নমার এখন বেশ সুবিধাজনক জায়গা হতে bargaining করতে পারবে। এতে কৌশলগত অবস্থান হতে বাংলাদেশের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে হ্রাস পাবার সম্ভাবনা রয়েছে।
আমার কাছে মনে হয়েছে মায়ানমারের পারমানবিক অস্ত্রীকরণ নিরাপত্তা ইস্যু হতে অধিক কৌশলগত। তারা এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকে মায়ানমারের প্রতি আকর্ষণ করতে চাচ্ছে।
মায়ানমারের সকল উদ্যোগ দেশের স্বার্থ হতে অধিক শাষকবর্গের স্বার্থকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। মায়ানমার যা করছে সবই শাষকের বৈধতা পাওয়ার জন্য। তারা আন্তর্জাতিক শক্তিসমুহের নিকট বৈধতা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাই আমাদের সরকারের উচিত হবে মায়ানমারের সকল সিদ্ধান্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করা। তাদের কোনো উদ্যোগ আমাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি না হয়।

২,২৯৫ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “সমুদ্রসীমা, পররাষ্ট্র কৌশল এবং মায়ানমার”

  1. রাজীউর রহমান (১৯৯৯ - ২০০৫)

    বাংলাদেশী জলসীমায় মিয়ানমারের যুদ্ধ জাহাজ সমেত গ্যাস অনুসন্ধান, সীমান্তে কাটাতারের বেড়া, সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় বিপুল পরিমান সেনা উপস্থিতি,,,,,, 😕 😕

    এরা খুব বড় কোন পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে বলে মনে হয়।

    জবাব দিন
  2. রকিব (০১-০৭)
    আমাদের সরকারের উচিত হবে মায়ানমারের সকল সিদ্ধান্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করা। তাদের কোনো উদ্যোগ আমাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি না হয়।

    সহমত।
    তবে কালক্ষেপন এবন্দ দূর্বল পররাষ্ট্রনীতির যে নজির পূর্বে বাংলাদেশ সরকারকে রাখতে দেখা গিয়েছে, তা বজায় থাকলে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোন সম্ভাবনা চোখে পড়ছে না। এখনো সময় আছে সচেতন হবার।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  3. বাংলাদেশে এই সমুদ্র সীমা ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক কোন বিশেষজ্ঞকে প্রধান করে ৬ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, তারা আগামী ১ মাসের মধ্যে রিপোর্ট দেবে বলে আশা করা হবে। ৬ মাস পার হয়ে যাবে। ব্যাপারটা সবাই আস্তে আস্তে ভুলে যাবে। টিপাইমুখের মত।

    এলাকার পাতি মাস্তান, খুনী, রাজাকার, দুর্নীতিবাজ এরাই যখন দেশের চালকের আসনে আসে নিয়মিত বিরতিতে, এনাদের কাছ থেকে এর চেয়ে ভাল কি আশা করা যায়? পররাষ্ট্র নীতির "প" টাও কি এনারা বোঝেন? বিম্পি-আম্লীগ সব হালায় একে অপরের পশ্চাদ্দেশ খননে ব্যস্ত। ওদিকে সব লুটে নিলেও উনারা হাসিমুখে বিবৃতি দেবেন। ওনাদের তো কোন সমস্যা নেই, ১৪ গুষ্টি ম্যাঢ়িখা আর ল্যানডেনে পাঠিয়ে ওনারা এইদেশে উনারা ব্যস্ত টক শো নিয়ে।

    যাইগা, ইদানিং অল্পতেই মিজাজ বিলা হয় 🙁

    জবাব দিন
  4. রশিদ (৯৪-০০)

    সরকার তো জাতিসংঘে যাচ্ছে......আশা করি হিসাব মতে রায় আমাদের পক্ষে আসবে, কেননা অতীতের নজির আমাদের পক্ষেই.......

    কিন্তু ইন্ডিয়া তো নানা জিও-পলিটিক্যাল ইস্যুতে ব্ল্যাকমেইল করে না রায় পাল্টিয়ে ফেলে......

    জবাব দিন
  5. নাঈম (৯৪-০০)

    যখন সময় ছিল, তখন ছিলাম ঘুমিয়ে। জেগে দেখি কচ্ছপ তার দৌড় শেষ করে ফেলেছে। দশ বছর আগেও আমাদের সামরিক শক্তি মায়ানমার থেকে ভালো ছিল। তখন যদি ব্যাপারটার সুরাহা করা যেত, আমরা আপার হেন্ড এ থাকতাম। আমাদের গলার জোরটাও বেশী থাকত। বিগত বছর গুলাতে আমরা সামরিক দিক থেকে তেমন আগাতে পারিনি। কিন্ত এই ফাকে ওরা অনেক এগিয়ে গেছে। এখন ওদের যতই কথা শুনাই, ওদের কাছ থেকে তেমন কিছুই আদায় করা যাবে না। আমাদের দেশের শাসকরা নিজেদের আখের গুছাইতেই ব্যস্ত থাকেন বেশি, তাদের কাছ থেকে আর কি ই বা আশা করা যায়। আমাদের মন্ত্রীদের একটা গাড়ী দিলেই গ্যাস ফিল্ড পাওয়া যায়!!

    আমাদের বুদ্ধিজীবিদের অনেকেই বলে থাকেন যে, আমাদের সামরিক বাহিনী থাকার কি দরকার?? আমাদের একটা নৌবাহিনী থাকাতে গত বছর মায়ানমার এর সমূদ্র থেকে গ্যাস তোলা থামান গেছে। যাই হোক, এ নিয়ে বিতর্ক করার কোন ইচ্ছে নেই। আমাদের সবারই reactive না হয়ে proactive হওয়া উচিত, না হয় সাম্নের দিন গুলি আর ও খারাপ হবে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।