আমার বাবা-বেলা – ১

[শূণ্য] আমি যখন প্রথম বাবা হই, তখন থেকে ছ’মাস পরে আমার মেয়ে তার প্রথম ধ্বনী উচ্চারণ করে – ’বা বা বা বা উঁ উঁ উঁ’ যার অর্থ করলে দাড়ায় আমার এখন ক্ষিদে লেগেছে। কিংবা আমার ডাইপারটা এক্ষুণি বদলে দাও। কিংবা সবকিছু বাদ দাও, এখন আমি ঘুমোব। এটি কমবেশী সব বাবা মা ই জানেন। বাকী গুলো বাবা-মা বিশেষে বিস্তারিত এবং ইউনিক!

[এক] আরো ছ’মাস পর যখন সে তার চারদেয়ালের ঘরের ভিতরকার জগত্‍াআবিষ্কার করলো তখন আরো কিছু কথা সে বলা শুরু করলো। প্রথম যে কথাটি আমার মনে আছে, সেটা হলো একদিন উইকএন্ডের দুপুরবেলা। ভাতঘুম দিবো বলে চোখ একটু বোধহয় লেগে এসেছে। আমার মেয়ে ওই সুযোগে তার মায়ের সাজের সরঞ্জাম থেকে লিপস্টিক এনে আমার চোখে আচ্ছা করে ঘষে দিলো। কোনো প্রকার ব্যাথা তো নেই ই শুধু বোধ করছিলাম তার নরম আঙুলের কোমল স্পর্শ। কিছুক্ষণ পরেই ঘুম ভেঙে গেল – আমার মেয়ে একহাতে ভুরু আর অন্যহাতে চোখের নীচে ধরে দুইদিকে টান দিয়ে আমাকে খুব খুশির সাথে বলছে, ”বাবা চোখ জ্বালাও।”

[দুই] আমার বড় মেয়ের বয়স তখন প্রায় এক বত্সথর। বাবা মা যা কিছু করে তা ই তার করা চাই। একদিন আমাদের রাতের খাবারের পর আমি আর ওর মা বসে বসে টিভি দেখছি। হঠাত্‍াখেয়াল হলো আমার মেয়ে টিভির সামনে নেই কিন্তু লিভিংরুম বরাবর রান্নাঘর থেকে থেমে থেমে একটা শব্দ আসছে – ’ইঁয়াওঁ ইঁয়াওঁ’। উঁকি দিয়ে দেখি রান্না ঘরের কাবার্ড খুলে সে তিন লিটার ভেজিটেবল অয়েল মেঝেতে ঢেলে দিয়ে মেঝেটা মপ করার পর উঠার চেস্টা করছে। কিন্তু না পেরে গ্লানি-মাখা গলায় ’ইঁয়াওঁ’ বলে সাহায্য চাইছে।

[তিন] আমার বড় মেয়ের বয়স তখন আড়াই ছুঁই ছুঁই করছে। আর ওদিকে আমার বাসায় আমার ছোট মেয়ে কেবল এসেছে। একেবারে ছোট্ট – মাত্র তিনদিন তার বয়স। আমি পালা করে কাজ এবং বেবীসিটিং ব্যালান্স করছি। যথারীতি আমার ছোট মেয়ে মনোযোগ পায় অনেক বেশী। একদিন দুপুরবেলা আমার ছোট মেয়েকে এক ঘরে ঘুম পাড়িয়ে রেখে অন্য ঘরে আমার বড় মেয়ের সাথে খেলা করে সময় কাটাচ্ছিলাম। কোন ফাঁকে চোখ দুটো লেগে এসেছিল টের পাইনি। হঠাত্‍াঘুম ভাঙলো ধপ করে বিছানায় কিছু পড়ার শব্দে – চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি আমার বড় মেয়ে তার ছোট বোনকে পাশের ঘর থেকে এনে আমার বিছানার ওপর ফেললো আর বললো, ”যা তোর বাপের কাছে যা!”

[চার] হাটি হাটি পা পা করে আমার দুই মেয়ে দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে। ছোটটি তিন ও বড়টি সাড়ে পাঁচ। মাঝে মাঝে তাদের অসুখ করে জ্বর সর্দি কাশি ইত্যাদি। ওদের মার হাতে পড়লে ও ডাক্তারের কাছে চলে যায়। কিন্তু আমার হাতে পড়লে আমি গরম পানির গড়গড়া, কপালে ঠান্ডা পানির পট্টি ইত্যাদি দিয়ে ওদের ভালো করার চেষ্টা করি। একদিন দুইবোনেরই খুশখুশে কাশি হয়েছে। আর সে দিন ছিলো উইকএন্ড। দুই বোন ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথে দুইজনকে বাথরুমে লবন ও গরম পানির গ্লাস হাতে দাঁড় করিয়ে দিলাম: ”গড়গড়া কর।” বড়টি গাঁই গুঁই করলেও গড়গড়া করে চলে গেলো। ছোটটি পানি মুখে নিয়ে একবার গড়গড়া করেই জিজ্ঞেস করলো, ”বাবা ওটা পিপি?”

২,৬৫৫ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “আমার বাবা-বেলা – ১”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।