নীলকুঠি – দিনাজপুর

মোমেনপুর ইউনিয়নের অপ্রশস্ত মেঠো পথ ধরে এগোচ্ছিলাম। বালু মাটি দ্বারা গঠিত বলে এই অঞ্চলের রাস্তা-ঘাট ভঙ্গুর প্রকৃতির। বাংলার গ্রামের ‘রাস্তা ও সেতুমুখ’ – এই দু’য়ের বন্ধন দীর্ঘ বিবাহিত অভিমানি দম্পতির ন্যায়। ক্ষনে ভাল, অধিকক্ষনে বিমুখ। মহাসড়ক ছেড়ে গ্রামীন এই পথে নেমে হঠাৎ বিপাকে পড়লাম। গাড়ী করে আর সামনে এগোনো যাবে না, তাই বাধ্য হয়ে গাড়ী ছেড়ে হাঁটা শুরু করলাম। শীতের সকাল, তার উপর সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আড়মোড়া ভেঙে গ্রাম এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। তবুও সামনে এগোতেই পেয়ে গেলাম মধ্য বয়সী এক গ্রাম্য নারীকে। তারই সহায়তায় অল্পক্ষনেই পৌঁছে গেলাম নীলকুঠিডাঙ্গার ‘নীলকুঠি’তে – বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ইংরেজ বেনিয়ার নীলকুঠির এক নিশ্চিহ্ন প্রতিষ্ঠান। নানা তথ্য-উপাত্ত নিরীক্ষা করে জানতে পারলাম, মিস্টার হলান নামক এক বৃটিশ এখানে নীলের কারবার ফেঁদে বসেছিল। বোঝাই যাচ্ছে, নীলকুঠিকে কেন্দ্র করেই গ্রামের বর্তমান নাম ‘নীলকুঠিডাঙ্গা’ হয়েছে। দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার প্রত্যন্ত এই গ্রাম চরাচর পেরিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে অভিমানে মুখ গুঁজে আছে।

এখানেই মিস্টার হলান গড়ে তুলেছিল তার নীল তৈরীর কারখানা

নীলকুঠির অস্তিত্ব বৃটিশ আমলে হলেও এই অঞ্চল যে বেশ প্রাচীন তা বোঝা যায় এর আশপাশের অন্যান্য প্রত্ন-নিদর্শনের উপস্থিতি দেখে। অনেকেই হয়ত বলবেন, কাল ক্রমিক প্রাচীনত্ব নির্ণয় করা আজ বোধ হয় সম্ভব নয়। তবে বরেন্দ্র ও দিনাজপুর জাদুঘরে রক্ষিত এখান থেকে প্রাপ্ত মুদ্রা নিরীক্ষান্তে সে বাঁধা অতিক্রম করা কি দুস্কর? এখানকার বিস্তৃত এলাকা জুড়ে যে অসংখ্য পুকুর ও দিঘীর সমাহার আজও দেখতে পাওয়া যায় তা আমার এই বক্তব্যকে বেশ জোরালভাবেই সমর্থন করে। এখানকার ঝাড়ুয়ারডাঙ্গা ও রাজাবাসর দিঘী এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যায়।

ধ্বংসপ্রাপ্ত নীলকুঠির জায়গায় এখন চাতাল

 

ধারনা করি, নীলচাষ করার জন্য এখানে যথেষ্ট পরিমান জমি ছিল এবং উৎপাদনকৃত নীল এখানেই প্রক্রিয়াজাত করে অতি নিকটবর্তী ‘বন্দর’নামক স্থান হতে তা রপ্তানী করা হত। নীলকুঠির কোল ঘেঁষে একে-বেঁকে বয়ে চলা যমুনা নদীর পাড়েই ছিল এই বন্দর। বর্তমানে পার্বতীপুর – দিনাজপুর সড়ক বরাবর ভবেরবাজার ও জশাই মোড় বাজারের মধ্যবর্তী স্থানে নদী ও রাস্তার উপর যে পুরাতন ভাঙ্গা সেতুটি রয়েছে সেখানেই ছিল উক্ত আদি বন্দরটি। সেখানে এখন বন্দরের কোন চিহ্নই আর নেই। নীলকুঠির চৌহদ্দির ভিতর-বাহির দু’টি পুকুর ছিল যেখানে নীলগাছ ধোঁয়া হত বলে জানালেন স্থানীয়রা। পুকুর দু’টির একটি সামান্য পানির তলানী নিয়ে কোন রকমে টিকে আছে কিন্তু অপরটি মাটি দ্বারা ভরাট করে ফেলা হয়েছে।

এই পুকুরে নীলগাছ ডুবিয়ে রাখা হতো

 

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নীলকুঠির অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে অনেক কাল আগেই। এখন শুধু এক কোদাল মাটি কাটলে ইংরেজদের ফেলে যাওয়া সেই বাড়ীর মেঝের শান বাঁধানো অস্তিত্ব কেবল লক্ষ্য করা যায়। চুন-সুরকীর সম্বন্নয়ে চ্যাপ্টা বড় ইট দ্বারা নীলকুঠিটি নির্মান করা হয়েছিল। নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত তথ্যের অভাবে এখানে আর বিশেষ কিছু উল্লেখ করতে পারলাম না। সরেজমিন দেখলাম, নীলকুঠির ভৌত অবকাঠামোর উপর এখন বাঁশ-ঝাড়, পতিত জমি, স্থানীয় মানুষজনের বসতভিটা কিংবা ধান শুকানোর চাতাল বিরাজমান।

 

১৯০ বছর যাবৎ বাংলার মানুষের হাড়-মাংস একাকার করে, শোষনের পরাকাষ্ঠ দেখিয়ে, নৃশংস অত্যাচার-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে আগ্রাসী বৃটিশরা নীল চাষের যে অমানবিক সভ্য (?) নিদর্শন প্রদর্শন করেছে – তা কি ইতিহাস বিস্মৃত?

হতাশ হলাম যখন এই প্রজম্মের স্থানীয় একজন আমার কাছে জানার আগ্রহ প্রকাশ করলেন এই বলে যে – ‘নীল’কি?

 

০৭ অক্টোবর ২০২০/ঢাকা-১২৩০/

mamun.380@gmail.com

৪ টি মন্তব্য : “নীলকুঠি – দিনাজপুর”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।