টেঙ্গা মসজিদ – শ্যামনগর, সাতক্ষীরা

বঙ্গের বীরপুত্র, বাংলার বারভূইয়ার অগ্রগণ্য, যশোরাধিপতি মহারাজা প্রতাপাদিত্যের (রাজত্বকাল ১৫৮৪ খ্রীঃ – ১৬০৯ খ্রীঃ) নৌ-বাহিনী প্রধান খোজা কমল/খাজা কামাল রাজধানী ঈশ্বরীপুরে একটি ‘টেঙ্গা’ প্রতিষ্ঠা করেন। টেঙ্গা ফার্সী শব্দ যার অর্থ ‘সেনাছাউনি/ছাউনি’। ছাউনি থেকে আধা কিলোমিটার দূর দিয়ে বয়ে যাওয়া কদমতলী নদীর পাশে এবং নিকটবর্তী ধুমঘাট নৌ-দূর্গের সৈনিকদের জন্য এই ছাউনি গড়ে তোলা হয়েছিল বলেই প্রতীয়মান হয়। তার বাহিনীতে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ধর্মাবল্বীদের মধ্যে মুসলমান সৈনিকরাও ছিল। সময়ের প্রয়োজনে সৈনিকদের পাশাপাশি পাঠান, মুসলমান প্রজা ও অতিথিদের জন্য পরবর্তীতে এই সেনাছাউনিতে একটি পাকা মসজিদ তৈরী করা হলে তা ‘টেঙ্গা মসজিদ’ হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। যেমনটি দেখা যায় আমাদের সেনানিবাসগুলোর ‘গ্যারিশন মসজিদ’ – তেমনটি আর কি!

সাতক্ষীরা-কলারোয়া-শ্যামনগর মহাসড়কের ঈশ্বরীপুর মোড় থেকে আনুমানিক ২৫০ মিটার পূর্বদিকে শ্যামনগর উপজেলার বংশীপুর গ্রামে টেঙ্গা মসজিদ অবস্থিত। মসজিদটি অত্যন্ত জীর্ণাবস্থায় উদ্ধার করা হলে গ্রামের নামে মসজিদটি ‘বংশীপুর ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ’ নামে নামকরণ করা হয়। মসজিদটি কবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তা নিয়ে মতভেদ আছে। সাতক্ষীরা২৪নিউজ.কম থেকে জানা যায়, “সুন্দরবন অঞ্চলের হাবসি শাসনকর্তা কর্তৃক ১৪৬০ – ১৪৮০ খ্রীঃ মধ্যে মসজিদটি নির্মিত হয়”; আবার অনেকে মনে করেন মসজিদটি পাঠান আমলে তৈরী, বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন বলছে মসজিদটি ১৫৯৯ খ্রীঃ তৈরী – তবে এসব তথ্যের স্বপক্ষে কোন সূত্র বা উপযুক্ত/নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ বইয়ে মসজিদটি ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দশক অথবা সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নির্মিত বলে ধারনা করা হয়েছে। অপরদিকে, মসজিদটি মুঘল নৃপতি আকবরের সেনাপতি মানসিংহ তৈরী করেছিলেন বলে শোনা যায়। যদিও আকবর তার শাসন আমলে মানে ১৫৫৬ খ্রীঃ থেকে ১৬০৫ খ্রীঃ পর্যন্ত বাঙলার এই অঞ্চল নিজ শাসনের অধীন করতে পারেননি। তথাপি বিষয়টির স্বপক্ষে এভাবে যুক্তি দেওয়া যায় যে, ১৬০৩ খ্রীঃ মানসিংহ প্রতাপাদিত্যের রাজ্য যশোর আক্রমণ করে এবং ১৬০৪ খ্রীঃ সন্ধি করে ফিরে যায়। আবার ১৬০৫-৬ খ্রীঃ দিকে ৮ মাসের জন্য পুনরায় বাঙলায় প্রত্যাবর্তন করে। সুতরাং মসজিদের গায়ে “প্রতিষ্ঠাকালঃ মোঘল সম্রাট মহামতি আকবর এর শাষনামল” যেমনটি লেখা রয়েছে তা দিন-তারিখের হিসাবে সঠিক বলা চলে। মসজিদ প্রতিষ্ঠাকারী খোজা কমল ১৬০৯/১০ খ্রীঃ সুবাহদার ইসলাম খাঁর প্রেরিত মুঘল বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার সময় বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে মৃত্যূমূখে পতিত হন (বাঙলার অকুতোভয় এই মহান বীরের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা)।ফলে মসজিদ নির্মাণ করে থাকলে তিনি তা এই সময়ের আগেই করেছিলেন মানে সম্রাট আকবরের আমলেই। তবে এমনও হতে পারে, প্রতাপের পতনের (১৬০৯ খ্রীঃ মুঘল বাহিনীর কাছে তিনি আটক হন) পর ১৬১২ খ্রীঃ দিকে বাঙলার সুবাহদার ইসলাম খাঁর নিযুক্ত মুঘল ফৌজদারের কেউ মসজিদটি নির্মাণ করে থাকতে পারেন।

টেঙ্গা মসজিদ – প্রাথমিক সংস্কারের পর

মসজিদের কোন শিলালিপি না পাওয়ায় বা নির্মাণের তারিখ কারোর জানা না থাকায় এবং পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে তবে স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে ধারনা করা যায় এটি মুঘলামলের কীর্তি – কার্নিশ ও বপ্র, ছোট ছোট ইট, টেরাকোটার কারুকাজের পরিবর্তে পলেস্তারর উপর নকশা ইত্যাদিতে মুঘল বৈশিষ্ট্য ও স্থাপত্যশৈলীর ছাপ লক্ষ্য করা যায়। তবে গম্বুজগুলো খানজাহানী গম্বুজের অনুকরণে নির্মিত যেখানে সুলতানি যুগের বাংলার ইটের পেন্ডেন্টিভ ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতাপাদিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরী একই স্থানের মানে ঈশ্বরীপুরের বারদুয়ারী প্রাসাদ ও যশোরেশ্বরী মন্দিরের ইট ও কারুকাজময় ইটের সাথে এই মসজিদের ইটের মিল রয়েছে। খুব জোরাল প্রমাণ না থাকালেও পারিপার্শ্বিক নিয়ামকসমূহ বিবেচনা করে মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যশৈলীতে মহারাজা প্রতাপাদিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় সম্ভবতঃ ১৭ শতাব্দীতে নির্মিত বলেই ধরে নিলাম।

সুন্দরবন সংলগ্ন মহারাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্যের ২টি মসজিদ এখনো টিকে আছে। টেঙ্গা মসজিদ এর মধ্যে একটি। শুধু প্রাচীনত্বের কারণেই নয় বরং এই মসজিদ এর ভূমি নকশা ও এক সারিতে ৫ গম্বুজ থাকার কারণেও বাংলাদেশের প্রত্ন ঐতিহ্যের বিরল নিদর্শন হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ পর্যন্ত প্রাচীন বাঙলার মাত্র ২টি ৫ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

বেগম বাজার জামে/করতলব/কারতালাব খান মসজিদ – ঢাকা

ঢাকার ৬২, বেগম বাজার রোডে বাংলাদেশে মুঘলামলের সব থেকে বড় মসজিদ বেগম বাজার জামে/করতলব/কারতালাব খান মসজিদ (স্থাপিতঃ ১৭০১ – ১৭০৪ খ্রীঃ) ৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের অপর নিদর্শন হিসাবে এখনো আমাদের সামনে টিকে আছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, টেঙ্গা মসজিদ বাঙলায় নির্মিত এক সারিতে ৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ স্থাপনার সর্বপ্রাচীন নিদর্শন। অভিজ্ঞরা বলছেন, সম্ভবতঃ বাঙলায় ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট যে সব মসজিদ ছিল তারই সম্প্রসারিত রূপ ৫ গম্বুজের এই মসজিদ ২টি। যাহোক, ভারতবর্ষে এরূপ নিদর্শনের দৃষ্টান্ত আরো দেখতে পাওয়া যায় যেমন ভারতের দিল্লীর ‘বড় গম্বুজ মসজিদ (১৪৯৪ খ্রীঃ)’ কিংবা ‘মথ-কি-মসজিদ (১৫০০ খ্রীঃ)’ ও পাটনার ‘চান্নিঘাট মসজিদ’।

ভূমি বিন্যাসে টেঙ্গা মসজিদটি আয়তকার, উত্তর-দক্ষিণে লম্বা, দৈর্ঘ্য ৪১.৪৫ মিটার ও প্রস্থ ১০.০৬ মিটার। পূর্ব দেওয়ালে ৫টি আর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ১টি করে ২টি পত্রাকারের খিলানযুক্ত দরজা আছে। মাঝের দরজাটি অন্যগুলো থেকে খানিকটা বড়, এর প্রশস্ততা ২.২৩ মিটার আর অন্যগুলো ১.৯২ মিটার করে। কোন জানালা দেখলাম না তবে মিহরাবসমূহের উপরে আধা-পত্রফলকের মত অংশ খালী রাখা হয়েছে যেখান দিয়ে দিনের বেলায় সূর্যের আলো এসে নামায কক্ষগুলোকে আলোকিত করে রাখে। দেওয়ালের পুরুত্ব গোটা মসজিদের সবখানেই ২.১৩ মিটার। মসজিদের ভিতরের অংশ ৫টি বর্গাকার প্রকোষ্ঠে ভাগ করা। মাঝখানেরটি আকারে খানিকটা বড় আর প্রতি পাশে যে ২টি করে ঘর রয়েছে সেগুলো খানিকটা ছোট। বড়টি/মাঝেরটির প্রতিবাহু ৬.৩৭ মিটার পরিমাপের আর ছোট ঘরগুলোর প্রতিবাহু ৫.৭০ মিটার করে (সংষ্কারের পর সামান্য পরিবর্তন হতে পারে)।দু’ঘরের মাঝে আক্ষিক খিলানের সংযোগ পথ রয়েছে ফলে উত্তর বা দক্ষিণের যে কোন পাশে দাঁড়ালে সামনের অংশটি সরু প্যাসেজের মত দেখতে লাগে। মজার ব্যাপার হল, মসজিদের প্রতিটি দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেই মনে হবে আলাদা একেকটি ছোট মসজিদে ঢুকছি। দেওয়ালে কুলুঙ্গি ছিল কিনা তা টাইলস দ্বারা আবৃত করে ফেলায় এবং বর্তমান মুয়াজ্জিন সাহেবকে জিঙ্গাসা করেও বুঝতে বা জানতে পারলাম না।

টেঙ্গা মসজিদ – দক্ষিণ দিক হতে উত্তর দিকের ছবি

৫টি ঘরের পশ্চিম দেওয়ালে প্রতিটির পূর্ব দেওয়ালের দরজা বরাবর ৫টি অর্ধবৃত্তাকার অবতল মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি অন্যগুলো থেকে একটু বড়। প্রবেশপথসমূহ ও মিহরাবসমূহ রীতিবদ্ধভাবে বাইরের দিকে সামান্য উৎগত। কেন্দ্রীয় মিহরাবের পাশে ইসলামিক চিরায়ত ধারায় একটি মিম্বার আছে। সম্পূর্ণ ইটের তৈরী মসজিদটির খিলানপথের সামনে ও মিহরাবে খাঁজকাটা নকশা করা ছিল। কিন্তু সংস্কারের ফলে এ সবের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। বাহিরের দিকে চার কোণায় ৪টি বেশ বড় আকারের ৪টি অষ্টভূজাকার মিনার ছিল যা এখন নেই।

টেঙ্গা মসজিদ – ভূমি নকশা

ছাদের উপর যে অর্ধ-গোলাকার ৫টি গম্বুজ রয়েছে তা বর্গাকৃতির ঐ আপাত একক ঘরগুলোর উপরেই অবস্থিত। স্বাভাবিকভাবেই মাঝের গম্বুজটি অন্যগুলো থেকে আকারে একটু বড়। প্রতিটি ঘরের ভিতরের দিকে মাঝাখানে ৪টি বদ্ধ খিলানের উপর ৪ কোণার অর্ধগম্বুজ আকৃতির স্কুইঞ্চ তৈরী করে তার উপরই গম্বুজ স্থাপন করা হয়েছে। মেঝে থেকে গম্বুজের উচ্চতা ১০.৯৮ মিটার। গম্বুজগুলো পদ্ম ও কলশ নকশায় অলংকৃত, আর এর কার্ণিশ ও বপ্র প্রচলিত মুঘল রীতিতে অনুভূমিক। মূলতঃ প্রতিটি গম্বুজ সম্বলিত ঘরের সাথেই যেহেতু একটি করে খিলানপথ আছে সেহেতু প্রতিটি কক্ষই ‘আপাত একক ঘরের’ মতই লাগে।

মসজিদের পূর্ব-দেওয়াল ঘেঁষে দোতলা একটি বারান্দা তৈরী করা হয়েছে যা আদি মসজিদের সাথে ছিল না। এই বারান্দার বাহিরের দিকে নীচতলার উত্তর-পূর্ব কোণায় পাশাপাশি তুলনামূলক বড় ২টি কবর আছে। কবরের দক্ষিণে পূর্বোক্ত দোতলা বারান্দার সাথে ১ তলা একটি বারান্দা সংযোজন করা হয়েছে। এই সম্প্রসারণের ফলে এখানে থাকা মসজিদের কুয়াটি চিরতরে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছে। মসজিদের পশ্চিমদিক ছাড়া বাকী ৩ দিকে পাঁচিল ঘেরা ছিল। উঠানের মত সেই জায়গায় এখন অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদ যখন তৈরী করা হয়েছিল তখন এর দরজা থেকে পাঁচিলের দরজাটি প্রায় ২৬.২১ মিটার দূরে ছিল।

টেঙ্গা মসজিদ – বার ওমরাহ কবর

বারান্দার সাথে যে ২টি কবরের কথা আগে উল্লেখ করেছি তা ‘বার ওমরাহ কবর’ নামে সকলের কাছে পরিচিত। কবর ২টি পাকা ও ১৪ হাত পরিমান লম্বা। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, প্রতাপাদিত্যকে পরাজিত করার জন্য প্রেরিত বারজন মুঘল সেনাপতি যুদ্ধে প্রতাপের সাথে পরাজিত হলে প্রতাপ তাদেরকে সম্মানের সাথে এখানে সমাহিত করেন। ২০০৬ খ্রীঃ থেকে কবর ২টি প্রাচীর ঘিরে সংরক্ষণ করা হলেও মসজিদ চত্বরের উত্তরে সারি সারি আরো কয়েকটি কবর ছিল, কেউ বলেন এই সংখ্যা ২২টি কেউ বলেন ২৪টি। এখনো মসজিদের পাশে একটি প্রাচীন কবরস্থান দেখতে পাওয়া যায়। এই জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার মৌতলা শাহী মসজিদ (প্রতাপাদিত্যের সময়ের টিকে থাকা অপর মসজিদ এটি) ও বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার চাকশ্রী মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর সাথে এই মসজিদের বেশ সাদৃশ্য রয়েছে।

মুঘলদের দ্বারা ১৬০৯ খ্রীঃ দিকে প্রতাপাদিত্যের রাজ্যের পতনের পর এক সময় এই এলাকা জনশূণ্য হলে মসজিদটি প্রতাপের অন্যান্য স্থাপনার মতই জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। পুনরায় জনবসতি গড়ে উঠলে, ১৯১৮ খ্রীঃ দিকে স্থানীয় একজন ব্যাক্তি মাটি কাটার সময় মসজিদের গম্বুজের একটি চূঁড়া দেখতে পেলে সকলের প্রচেষ্টায় মসজিদের বাকী অংশ উদ্ধার করা হয়। রাতারাতি মসজিদটি ‘গায়েবী মসজিদ’, ‘এক রাতে হওয়া মসজিদ’ ইত্যাদি জনশ্রূতিতে চারিদিকে ব্যাপক কৌতুলহের জম্ম দেয়। তবে মসজিদটি এদ্বাঞ্চালে প্রাপ্ত প্রত্ন-স্থাপনার মধ্যে বেশ শক্ত-পোক্তভাবেই তৈরী করা হলেও বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে উদ্ধার হবার পর দেখা যায় মসজিদটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ, বিশেষ করে এর দক্ষিণের গম্বুজটি ভাঙ্গা ও দেওয়াল মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। হতে পারে শেষের দিকে মসজিদটি পরিত্যাক্ত হয়ে পড়েছিল ফলে উদ্ধারের আগেই খানিকটা বিধ্বস্তাবস্থায় পরিনত হয়। মসজিদটি খানিকটা মাটির নীচে বসে গেছে, কেননা বর্তমানে মেঝেটি যে সারফেস থেকে খানিকটা নীচে তা বেশ বোঝা যায়। খিলানপথ ধরে মসজিদে প্রবেশ করার সময় তা যে কেউ বুঝতে পারবেন।

যাহোক, মসজিদ উদ্ধারের পর তৎকালীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংস্কারের ‍উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু স্থানীয়রা দ্রূত নিজ উদ্যোগে মসজিদটি মেরামত করে ফেলেন। ফলে মসজিদের আদিরুপ এখন আর দেখতে পাওয়া যায় না – আনাড়ী হাতের ছোঁয়ায় অমূল্য এই প্রত্ন-স্থাপনার শৈল্পিক কাঠামোটি সেই সময় হারিয়ে যায়। গম্বুজের নীচের আটকোনার ঘাড়, উত্তর-দক্ষিণের খিলানপথ, পূর্ব-দেওয়ালের কয়েকটি খিলানপথ, ইটের কারুকাজ, পূর্ব দেওয়াল ঘেষে থাকা অপ্রশস্ত বারান্দা ইত্যাদি সংস্কারের প্রভাবে আর আগের মত নেই/ভেঙ্গে নতুন করে তৈরী করা হযেছে। উপরন্তু মাটির মেঝেটি মোজাইক করা, প্রতিটি দরজায় কলাপসিবল গেট, থাই কাঁচের গেট ও প্রধান প্রবেশপথের দক্ষিণে সুউচ্চ মিনার সংযোজন করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে মসজিদটির আমূল সংস্কার করা হয়। এই সময় ভিতর-বাহিরে আধুনিক টাইলস দিয়ে প্রায় পুরোটাই মুড়ে দেওয়া হয় – বাহিরের দিকে গম্বুজসহ পুরোটাই টাইলস থাকলেও ভিতরের দিকে গম্বুজের অবতল অংশ এখনো টাইলস দ্বারা আবৃত হয়নি।

টেঙ্গা মসজিদ – সম্প্রসারিত বারান্দা

মসজিদের উত্তর দিকে আটকোণাকার, এক গম্বুজ বিশিষ্ট, ইটের তৈরী ছোট আকারের একটি স্থাপনা জরাজীর্ণাবস্থায় বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে বিরাট এক বটগাছের কোটরে সতীশ বাবু দেখতে পেয়েছিলেন। বর্তমানে স্থাপনাটি নিশ্চিহ্ন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই স্থাপনাকে ‘লক্ষীদেবীর মন্দির’ আর মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এটি ‘বিবির আস্তানা’ নামে পরিচিত। মসজিদ সংলগ্ন স্থাপনাটি বিবির আস্তানা হবার সম্ভাবনা বেশী। সেক্ষেত্রে এখানে মহিলাদের নামায আদায়ের ব্যবস্থা ছিল বলে অনুমান করা হয়। তবে সরেজমিন দেখতে পেলাম টেঙ্গা মসজিদে মানত করার জন্য অনেকেই প্রতিদিন ভীড় করে থাকেন এবং এদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যা চোখে পড়ার মত। মানত করার প্রবনতা এবং সেই উপলক্ষ্যে তাদের উপস্থিতি বিবির আস্তানার সাথে এক ধরনের যোগসূত্র আছে বলেই মনে হয়। কিন্তু স্থাপনার অবয়ব ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য দেখে এটা নামাযের স্থান না মাযার সে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

টেঙ্গা মসজিদ – বর্তমান রূপ (উত্তর দিক)

বর্তমানে এখানে একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করা হচ্ছে। ৫ কাতারের এই মসজিদে নিয়মিত ওয়াক্তিয়া নামায আদায় সহ অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করা হয়। বাংলাদেশে মসজিদ স্থাপত্যে ৫ গম্বুজওয়ালা মসজিদের সংখ্যা বিরল, এখন পর্যন্ত মাত্র ২টির সন্ধান পাওয়া গেছে সে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত উভয় মসজিদই প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিচারে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ২টি মসজিদসহ বাংলার সকল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ সংরক্ষণে সরকারের পাশাপাশি আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, কালজয়ী এই সব নিদর্শনসমূহ কেবল যে মহাকালের সেই সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে তাই নয় বরং বিশ্বের মানব সভ্যতার অতল সমূদ্রে বাঙলার নিদর্শনসূহ যে একেকটি মুক্তোর ন্যায় মূল্যবান তাও প্রমাণ হবে।

————————————————————————————————————————————————

১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীঃ

mamun.380@gmail.com

ঢাকা-১২৩০

 

তথ্যসূত্রঃ

বই

১. ৬৪ জেলা ভ্রমণ, লিয়াকত হোসেন খোকন, ফেব্রূয়ারী ২০০৭ খ্রীঃ, অনিন্দ্য প্রকাশ, পৃঃ ২৯৬/

২. পুরাকীর্তি পুরাতত্ত্ব, মোঃ মোশাররফ হোসেন, প্রথম প্রকাশ ফেব্রূয়ারী ২০১০ খ্রীঃ, দিব্যপ্রকাশ, পৃঃ ১০৪/

৩. প্রাচীন বাংলার আনাচে কানাচে, খন্দকার মাহমুদুল হাসান, প্রথম প্রকাশঃ একুশে বই মেলা ২০০৯ খ্রীঃ, পার্ল পাবলিকেশন্স, পৃঃ ৩৫৩/

৪. প্রাচীন বাংলার পথে প্রান্তরে, খন্দকার মাহমুদুল হাসান, একুশে বই মেলা ২০০৭ খ্রীঃ, পার্ল পাবলিকেশন্স, পৃঃ ২৩৮-২৩৯/

৫. বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, প্রথম দিব্যপ্রকাশ সংস্করণ ফেব্রূয়ারী ২০০৭ খ্রীঃ, দিব্যপ্রকাশ, পৃঃ ৪৩২-৪৩৪/

৬. বাঙালীর ইতিকথা, খন্দকার মাহমুদুল হাসান, দ্বিতীয় মুদ্রণ মার্চ ২০১০ খ্রীঃ, বাংলাপ্রকাশ, পৃঃ ৫৪/

৭. বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস, খন্দকার মাহমুদুল হাসান, প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রূয়ারী ২০১৬ খ্রীঃ, তাম্রলিপি, পৃঃ ৬২/

৮. বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, রওশন আরা রুশনী, অমর একুশে বইমেলা ২০১৭ খ্রীঃ, জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, পৃঃ ১৬৩/

৯. বাংলাদেশের জেলা উপজেলা ও নদ-নদীর নামকরণের ইতিহাস, ড. মোহাম্মদ আমীন, প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রূয়ারী ২০১৮ খ্রীঃ, শোভা প্রকাশ, পৃঃ ২২১/২২৫/

১০. বাংলাদেশের মুসলিম পুরাকীর্তি, ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান, প্রথম সংস্করণ, ফেব্রূয়ারী ২০০১ খ্রীঃ, মাওলা ব্রাদার্স, পৃঃ ৬৭-৬৮/

১১. বাংলায় ভ্রমণ, ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে (১৯৪০), শৈব্যা প্রকাশন বিভাগ, পৃঃ ১৪৭/

১২. যশোহর খুলনার ইতিহাস, দ্বিতীয় খন্ড, সতীশ চন্দ্র মিত্র, লেখক সমবায় দ্বিতীয় প্রকাশ জুলাই ২০১১ খ্রীঃ, লেখক সমবায়, পৃঃ ১২২/২৫৯/২৬৩/২৭১/ ২৭৪/৫৪৮/

১৩. সাতক্ষীরার পুরাকীর্তি, মিজানুর রহমান, প্রথম প্রকাশ, ফেব্রূয়ারী ২০০৮ খ্রীঃ, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, পৃঃ ৭৫-৭৯/১৬১/

১৪. DHAKA PAST PRESENT FUTURE, Editor Sharif Uddin Ahmed, পৃঃ ৩৫৪/

 

উম্মুক্ত উৎস

১. ঈশ্বরীপুরের প্রাচীন মসজিদে, জাকারিয়া মন্ডল, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ খ্রীঃ/

২. ঐতিহাসিক ‘টেঙ্গাহ’ মসজিদ এর পরিচয়, মো জাহিদুর রহমান, ৪ আগষ্ট ২০১৮ খ্রীঃ, সাতক্ষীরা২৪নিউজ. কম/

৩. বাংলাপিডিয়া/

৪. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন, সাতক্ষীরা, শ্যামনগর/

২ টি মন্তব্য : “টেঙ্গা মসজিদ – শ্যামনগর, সাতক্ষীরা”

  1. রেজা

    আল-মামুন ভাই, আপনার লেখা পড়ে খুব ভালো লাগলো। আপনি যে ইতিহাস ও পুরাকীর্তি নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করেন, আপনার লেখা পড়লে বোঝা যায়।
    আমার একটি প্রশ্ন রয়েছেঃ
    পুরাতন/ আদি কবরগুলোর দৈর্ঘ্য স্বাভাবিক এর চেয়ে লম্বা কেন?
    আশা করি উত্তর দিবেন।


    বিবেক হলো অ্যানালগ ঘড়ি, খালি টিক টিক করে। জীবন হলো পেন্ডুলাম, খালি দুলতেই থাকে, সময় হলে থেমে যায়।

    জবাব দিন
    • কাজী আব্দুল্লাহ-আল-মামুন (১৯৮৫-১৯৯১)

      রেজা,
      প্রথমেই তোমাকে আমার এই লেখা পড়া, সুন্দর মন্তব্য ও প্রশ্ন করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

      প্রাচীন সমাধি/কবরগুলো কেনো বড়/লম্বা আকৃতির হয়?
      ১২/১৩ শতাব্দীর পর পর মুসলমানরা যখন মূলত ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাঙলার বিভিন্ন অন্চলে যাচ্ছিলেন তখন স্থানীয় সামন্ত প্রভূ, জমিদার, গাতিদার, রায়ত শ্রেণি এমনকি বৃটিশ প্রশাসনের সাথে তাদের যুদ্ধ করতে হয়। শুধু ধর্ম প্রচার নয়, পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণেও কখন কখন যুদ্ধ করতে হয়েছিল তাদের। সেই সব যুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছিল তারা শহীদ আর যারা বেঁচে ছিল তারা গাজী উপাধি লাভ করে। ঐ সব শহীদদের মৃতদেহ সতকার করার জন্য গাজীরা যথেস্ট সময় পেতেন না ও শত্রুভুমিতে সতকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও ছিল না, ফলে সাধারনত সকল মৃতদেহ এক জায়গায় সমাধিস্থ/কবর দিতে হত। আর এ জন্যই ঐ সব কবরগুলো বড় আকৃতির হত। এ প্রসঙ্গে, রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার লালদিঘি গ্রামের লালদিঘি মসজিদ প্রাঙ্গনে মাসিমপুর যুদ্ধের ২টি কবর, ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারবাজার গ্রামের গাজী-কালু-চম্পাবতীর মাযার সংলগ্ন কবর, দিনাজপুর জেলার সদর উপজেলার চেহেলগাজী গ্রামের চেহেলগাজীর মাযার, ঘোড়াঘাট উপজেলার হযরত দাড়িয়া বোখারী (রহ) এর মাযার সংলগ্ন কবর, কাহারোল উপজেলার কান্তনগর গ্রামের কান্তনগর চেহেলগাজী মাযারসহ আরও অনেক উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে। টেঙ্গা মসজিদের সমাধির কথা ত আগেই উল্লেখ করেছি।

      ভাল থেক। শুভেচ্ছা রইল।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।