কুটিলা মুড়া – কুমিল্লা

আমরা আমাদের আদিমতম সমাজবদ্ধ জীবনে শুদ্ধ প্রকৃতির কোলঘেঁষে কি অকৃত্রিমই না ছিলাম। অরণ্য ছিল আমাদের বিচরনভূমি, গুহা কিংবা গাছের কোটর ছিল আশ্রয়স্থল। আমাদের সংস্কৃতি ছিল খাদ্য সংগ্রহ করা – গাছের ফল আর পশু শিকারই ছিল খাদ্যের উৎস। তখনও আমরা খাদ্য উৎপাদনকারী নই। গাছ থেকে ফলমূল আর পশু থেকে মাংস আহরনের মধ্য দিয়ে আমরা উপলব্ধি করলাম যে আমরাও ঐসব গাছপালা আর জীবজন্তু থেকেই উৎপন্ন, ওসব আমাদের সাথে একাত্মা। তাই এক এক গাছ বা পশুকে নিজেদের পূর্বপুরুষ মনে করে পূঁজা নিবেদন করা শুরু হলো। আর ঐসব পূঁজনীয় প্রতীকই হলো ‘টোটেম’ বা ‘কুলকেতু’ – যা মানব ধর্মের আদিরূপ। অন্যদিকে সূর্য, আকাশ, চন্দ্র, আগুন, সমুদ্র কিংবা বৃক্ষ থেকেও তো বেশ উপকার পাওয়া যায়, সুতরাং এরাও পূঁজানীয়। মানুষের ক্ষতি করে (যেমনঃ ঝড়বৃষ্টি, তুষারপাত, দাবানল ইত্যাদি) এমন সব জিনিসও পূঁজার তালিকায় উঠে এলো যাতে ক্ষতির কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যায় – এভাবে জম্ম হলো সর্বপ্রাণবাদ ধর্মের। এদেরকে অবশ্য আর পূর্বপুরুষের মর্যাদা দেওয়া হলো না, বরং এগুলোকে মহা শক্তিধর বস্তুরূপে পূঁজা দেওয়া হতে থাকলো। ইস্টদেবতার আরাধোনা আর অশুভ আত্মার সন্তুষ্টির জন্য রচিত হলো নানা মন্ত্র-তন্ত্র। এই সবের ব্যবহারিক প্রয়োগে আরো জুড়লো সতর্কতা, নিষ্ঠাবোধ, গোপনীয়তা, পবিত্রতা ইত্যাদি বিধিনিষেধ – যার নাম ‘ট্যাবু’। ট্যাবুও আদিম সমাজের ধর্মের অংশ – আর সেই থেকেই শুরু।

নব্যপ্রস্তর/নবপোলীয়/নিওলিথিক যুগ (খ্রীঃপূঃ ১০,২০০ থেকে খ্রীঃপূঃ ২,৫০০ অব্দ) থেকে মেসোপটেমীয় (খ্রীঃপূঃ ৩,৫০০ থেকে ৩,০০০ অব্দ) ও মায়া (খ্রীঃপূঃ ২,০০০ থেকে ২৫০ অব্দ) সভ্যতার হাত ঘুরে আধুনিক সভ্যতায় ধর্মশালার যে প্রচলন শুরু হয় তাতে সাধারনতঃ উপাসনালয়ে প্রবেশ করেই আরোধ্য দেবতার উপাসনা করার রীতি কমবেশী প্রচলিত ছিল। মসজিদ, মন্দির, গ্যাগোডা, গীর্জা, গুরুনানক ইত্যাদি আমাদের সীমিত পরিসরে জানা সব উপাসনালয়গুলোও কি তাই নয়? কিন্তু কুটিলা মুড়ার বৌদ্ধধর্মীয় উপাসনালয়টি প্রচলিত এই ধারার ব্যাতিক্রম। এখানে প্রতীকি উপাস্যকে প্রদক্ষিন করে উপাসনা করার প্রথা প্রচলিত ছিল। পৃথিবীর আর কোথাও কি এমন নিদর্শন আছে? থাকলেও তা বিরল।

বৌদ্ধ ধর্মের অনন্য এক স্থাপনা কুটিলা মুড়া ময়নামতি-লালমাই পাহাড় শ্রেণির সবচেয়ে উচুঁ স্থানে, ময়নামতি সেনানিবাসের বাংলা বাজারে অবস্থিত। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের আর কোথাও এমন স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায় না। স্থাপত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুটিলা মুড়ার স্থাপনাটি এখানে যে সমস্ত স্থাপনা রয়েছে যেমন বিহার, মন্দির, স্তুপ ইত্যাদি থেকে খানিকটা ব্যাতিক্রম। সময়ের ৩টি স্তরে এখানে নির্মাণ/সংস্কার কাজ করা হয়েছিল। ১ম নির্মাণযুগটি ৭ম শতাব্দীর, তখন খড়গ রাজবংশ (আনুমানিক ৬২৫-৭২০ খ্রীঃ) সমতট শাসন করছিলো। তাই ধারনা করা হয় বাঙলার অসাধারন এই স্থাপনাটি ৭ম/৮ম শতকে অথবা তারও আগে নির্মিত হয়েছিল।

পূর্বদিক দিয়ে কুটিলা মুড়ায় প্রবেশ করতে হবে। পূর্বদিকে বা পূর্ব প্রাচীরে ৩টি প্রবেশ পথ ছিল যদিও এখন কেবল উত্তর দিকেরটি ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় আছে। প্রবেশ পথের কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে মূল চত্বরে প্রবেশ করা যাবে। ধারনা করা যায়, প্রাচীর দ্বারা পুরো স্থাপনাটি এক সময় সুরক্ষিত ছিল। বর্তমানে পূর্ব দিকের প্রাচীরের চিহ্ন পাওয়া গেছে আর তাতে আমাদের এই ধারনা আরো বদ্ধমূল হয়। পুরো প্রাচীরের অংশ পাওয়া না যাওয়ায় স্থাপনার মূল সীমানা নির্ণয় করা সঠিকভাবে সম্ভব হয়নি। বেষ্টন প্রাচীরটি খোপযুক্ত ইটের নকশার অলংকার দ্বারা সজ্জিত ছিল।

সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে সামনে তাকালে প্রথমেই গোলাকার ৩টি স্তুপ আপনার চোখে পড়বে। তবে স্তুপত্রয় ও প্রধান ফটকের মধ্যবর্তী স্থানে পাশাপাশি ৩টি আয়তকার ঘর রয়েছে। উত্তর দিকের ঘরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় এর আয়তন জানা যায়নি। তবে মাঝেরটির দৈর্ঘ্য ১৩.৭৪ মিটার ও প্রস্থ ১৩.১৮ মিটার আর দক্ষিণের ঘরটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ১৫.৬৩ মিটার ও ১১.৫১ মিটার। উত্তরের ঘরের আয়তন নির্ণয় করা সম্ভব না হলেও ধারনা করি এটিও অপর দু’টির ন্যায়। আপনি চাইলে হলঘরের আদলে তৈরী আয়তকার এই কক্ষগুলোর চারিদিকে প্রদক্ষিন করতে পারেন যেমনটি ১২/১৩শ বছর আগে করতো এখানে আগত উপসনাকারীরা। পূর্বদিকের যে ৩টি প্রবেশ পথের কথা আগে বলেছিলাম তা যদি আজ ব্যবহার উপযোগী থাকতো তাহলে আপনিও বিরাট আকারের ঐসব সিঁড়ি বেয়ে প্রতিটি হলঘরে প্রবেশ করতে পারতেন।

 

তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, স্তুপ ৩টি আয়তকার হলঘরগুলোর পিছনেই/পশ্চিমে অবস্থিত। প্রতিটি স্তুপ একটি বর্গাকার বেদীমূলের উপর দন্ডায়মান। দেখা যায়, বর্গাকার বেদীমূলটিই পুরো স্থাপনার একমাত্র অলংকৃত অংশ (অবশ্য কেউ কেউ বলেন স্থাপনাটি টেরাকোটা ফলক দ্বারা সুশোভিত ছিল)। এই বেদীমূলের উপর অনেকটা ড্রামের মতো দেখতে গোলাকার স্তুপটি উপরে উঠে গেছে। এর উপর অর্ধ গোলাকার গম্বুজ ছিল যা এখন আর নেই। গম্বুজগুলোর উপর ছিল হার্মিকা ও চূঁড়া। এই নিবেদন স্তুপ/অচলস্তুপগুলোর মাঝেরটির উপরের পিঠে ৮টি বিভাজক দেওয়াল রেখার মতো টেনে ৮টি খোপ/কুঠুরী/প্রকোষ্ঠের সৃষ্টি করা হয়েছে অর্থাৎ এই স্তুপটির ভূমি পরিকল্পনা ধর্মচক্রের ন্যায়। সাধারনতঃ নিবেদন স্তুপে বৌদ্ধধর্মীয় মন্ত্রযুক্ত সীল ও অস্থিধাতু থাকতো। আর এর কেন্দ্রীয় কক্ষের ভিতর অংসখ্য নিবেদন স্তুপ ও সিল পাওয়া যাওয়ায় মনে হয় সেই সময় এটি অত্যন্ত পূণ্যের কাজ হিসাবে বিবেচিত হতো। পাশের স্তুপ দু’টি নিরেট ইটের তৈরী তবে এর কেন্দ্রস্থলে একটি করে গভীর কক্ষ আছে। কিন্তু সেখানে কোন সীল কিংবা মূর্তি পাওয়া যায়নি।

বৌদ্ধ ধর্মের ৩টি মৌলিক বিষয়কে/বৌদ্ধ ত্রিরত্নকে এই ৩টি স্তম্ভের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এগুলো হলো বুদ্ধা/জ্ঞান, ধর্ম/ন্যায় বা নৈতিকতা ও সংঘ/শৃঙ্খলা। অচলস্তুপগুলোর মাঝেরটির উপরের পিঠে যে ৮টি বিভাজক দেওয়াল রেখার মতো টেনে ৮টি খোপের সৃষ্টি করা হয়েছে সেটার অর্থ হলো সূর্য থেকে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। ধর্ম চক্রের আদলে তৈরী উপাস্য ৩টি স্তুপ সচারচার মন্দির কনসেপ্ট থেকে আলাদা। স্থাপনার ধর্মীয় উপসর্গসমূহ বিবেচনায় নিলে তাই মনে হয় এর নির্মাতারা ছিলেন মহাযানী ধারার অনুসারী।

স্তুপগুলোর পশ্চিমদিকে এই রকম আরো অংসখ্য স্তুপ ছিল, তার মধ্য থেকে ৯টি স্তুপের ভিত্তিমূল চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। প্রত্যেকটির মধ্যখানের গর্ত পরিলক্ষিত হয়। কেন্দ্রীয় স্তুপের মতো এই সবের মধ্য থেকেও অসংখ্য মাটির তৈরী নিবেদন স্তুপ ও সিল পাওয়া গেছে।

এখান থেকে পোড়ামাটির সিল, স্থানীয় পাথরের তৈরী ভাস্কর্য যেখানে মূখ্য মূর্তি হলো উপবিষ্ট বুদ্ধ ও বোধিস্বত্ত মূর্তি, আরাধনারত মানব মূর্তি, ধুসর রংয়ের স্তরীভূত পাথরের তৈরী বৌদ্ধ দেব-দেবীর মূর্তি, মাটির তৈরী নিবেদন স্তুপ, ১টি স্বর্ণমূদ্রা, মূর্তির নীচে খোদিত বৌদ্ধধর্মীয় মন্ত্র ইত্যাদি পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এখান থেকে গুপ্ত ও পাল আমলের মধ্যবর্তী সময়ের মূর্তি বা ৭ম/৮ম শতাব্দীর মূর্তি পাওয়া গেছে, সর্বশেষ আব্বাসীয় খলিফা আবু আহমেদ আব্দুল্লাহ আল মুস্তাসিম বিল্লাহ (৭৫০–১২৫৮ খ্রীঃ) কর্তৃক প্রচলিত ১টি স্বর্ণমূদ্রা পাওয়া গেছে, মাটির তৈরী নিবেদন স্তুপগুলো কাঠের তৈরী ছাঁচে ঢেলে তৈরী করা হয়েছে – অর্থাৎ এই স্থাপনার সাথে বহিঃবিশ্বের বাণ্যিজিক সম্পর্ক, বাঙলার শিল্পশৈলীর দক্ষতা সর্বোপরি স্থাপনার প্রাচীনতা সহজে অনুধাবনযোগ্য। অপরদিকে, মূর্তির নীচে খোদিত বৌদ্ধধর্মীয় যে মন্ত্র পাওয়া গেছে তা বিচার বিশ্লেষন করে ধারনা করা হয় এটি ৭ম শতকের পরিচায়ক।

ময়নামতি-লালমাই পাহাড় শ্রেণির প্রত্ন-নিদর্শনের মধ্যে প্রথম যে ৫টি স্থান চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে খনন কাজ করা হয় তাদের মধ্যে কুটিলা মুড়া অন্যতম। ১৯৫৫-৫৬ খ্রীঃ তৎকালীন প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর বিভাগ কর্তৃক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই খনন কাজ পরিচালনা করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে কুমিল্লার ৫টি প্রাচীন রাজধানীর (বিক্রমপুর, জয়কর্মান্ত বসাক, রোহিতগিরি, পট্টিকেরা) অন্যতম দেবপর্বতে ২টি ‘রত্নত্রয়’ মন্দিরের উল্লেখ আছে। এর একটি যদি ‘কুটিলা মুড়া’ হয় তবে অন্যটি কোথায়?

————————————————————————————————————————————————

১৩ ডিসেম্বর ২০১৭/ঢাকা-১২৩০/

 

তথ্যসূত্রঃ

১. প্রত্নতত্ত্বের সন্ধানে ভ্রমন, খান মাহবুব, দৈনিক যুগান্তর, ১৫ জুন ২০১২ খ্রীঃ/

২. প্রত্নতাত্ত্বিক ঐম্বর্য্যে সম্মৃদ্ধ কুমিল্লা, ০৪ ফেব্রূয়ারী ২০১৪ খ্রীঃ/

৩. কোটবাড়িতে দেখে আসুন ঐতিহাসিক নিদর্শন, শ্যামল রুদ্র, দৈনিক প্রথম আলো, ২৭ জানুয়ারী ২০০৪ খ্রীঃ/

৪. ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার এক ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যকীর্তির নাম, রমজান বিন মোজাম্মেল, দৈনিক ইত্তেফাক, ১৩ আগষ্ট ২০০৭ খ্রীঃ/

৫. রূপবান মুড়া ময়নামতি লালমাইর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, খায়রুল আহসান মানিক, দৈনিক ইত্তেফাক, ০৩ ফেব্রূয়ারী ২০০৭ খ্রীঃ/

৬. The Remains of a Rich & vibrant Past, Reema Islam, The Daily Star, 10 November 2006 AD/

৭. মনোলোভা শালবন বিহার, গাজীউল হক, দৈনিক প্রথম আলো, ০৮ জানুয়ারী ২০১৫ খ্রীঃ/

৮. কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু, মো. লুৎফুর রহমান, দৈনিক ইত্তেফাক, ৩০ জানুয়ারী ২০১৬ খ্রীঃ/

৯. মহাস্থান ময়নামতি পাহাড়পুর, ডক্টর নাজিমুদ্দিন আহমেদ, পৃঃ ৬৭/৭০/৮০/৮৪-৮৫/

১০. বাংলাদেশের সন্ধানে, মোবাশ্বের আলী, পৃঃ ২১৫/

১১. বাংলার প্রাচীন সভ্যতা ও পুরাকীর্তি, খন্দকার মাহমুদুল হাসান, পৃঃ ৮৭/১৪৬-১৪৭/

১২. Early Terracotta Figurines of Bangladesh, Saifuddin Chowdhury, পৃঃ ১৩০-১৩২/

১৩. পুরাতত্ত্বের বাংলাদেশ ঐতিহ্যের বাংলাদেশ, মোহা. মোশাররফ হোসেন, পৃঃ ১৫৭/

১৪. বাংলাদেশের প্রথম ও প্রাচীন, খন্দকার মাহমুদুল হাসান, পৃঃ ১৫১-১৫২/

১৫. গ্রাফোসম্যানের ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা, ড. ছন্দশ্রী পাল, পৃঃ ৯৪/

১৬. হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, গোলাম মুরশিদ, পৃঃ ৩৯৯/

১৭. প্রাচীন বাংলার ধুলো মাখা পথে, খন্দকার মাহমুদুল হাসান, পৃঃ ৬০/১১০-১১১/

১৮. বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, পৃঃ ৬৬১-৬৬৩/

১৯. বাঙলাদেশ, মনসুর মুসা সম্পাদিত, পৃঃ ১৬৯-১৭০/

২০. The Birth of Religion By Charles C.Mann, National Geographic Magazine, June 2011 AD

২১. বাংলাপিডিয়া/উইকিপিডিয়া/

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।