রংপুর

ঘাঘট নদীর তীরে অবস্থিত রংপুর বাংলাদেশের একটি অতি প্রাচীন অঞ্চল। রংপুর জনপদের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য বাংলাদেশের তথা ভারতীয় উপমহাদেশের বিশেষ করে কুচবিহার-কামতা, প্রাগজ্যোতিষ-কামরূপ-কামাক্ষ্যা বা আজকের আসাম ও বিহার অঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিক যুগের স্মারক বহন করে চলছে।

জেলার নামকরণ নিয়ে আছে নানা মতবাদ। পৌরানিক যুগে রাজা নরক শ্রীকৃষ্ণের সাথে যুদ্ধে বিজিত হলে তার ছেলে ভগদত্ত প্রাগজ্যোতিষ তথা কামরূপ রাজ্যের রাজা হন। প্রাগজ্যোতিস্বর ভগদত্ত (খ্রীঃপূর্ব ১৫০০ অব্দ) কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কুরুপক্ষ অবলম্বন করে নিহত হবার পূর্বে অবসর যাপন, আনন্দ-উল্লাস ও চিত্ত বিনোদনের জন্য নিজ রাজ্যের এই প্রান্তে রঙ্গশালা বা প্রমোদপুরী তৈরী করে রাজ-আমাত্ব্যদের নিয়ে আনন্দ বিলাস করতেন। রঙ্গশালা স্থাপনের কারনে এলাকার নাম হয়ে যায় রঙ্গপুর। রঙ্গপুর পরে রংপুর নাম ধারন করে।

আনুমানিক ৩ হাজার বছর আগে রং/লেপচা/বোড়ো নৃগোষ্ঠী হিমালয়ের পাদদেশে দিস্তাং নদীর অববাহিকায় এক সম্মৃদ্ধ জনপদ গড়ে তুলেছিল। আমাদের পরিচিতি তিস্তা নদীই কিন্তু দিস্তাং – আর এই জাতির ভাষা ছিল ‘রং/রং-রিং’-ভাষা(বর্তমানে ভারতের সিকিম রাজ্যের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা)।রং-ভাষায় দিস্তাং নদী ‘রংপো/রংপু’ নামে অভিহিত হতো কেননা ‘রংপু’ অর্থ ‘তিস্তা বিধৌত বিস্তৃীর্ণ অঞ্চল’। সম্ভবতঃ এখান থেকেই বাঙলা ভাষায় রংপুর নামকরণ হয়েছে। এই কথা সত্য যে, তিস্তা নদী সমগ্র রংপুর অঞ্চলের ভূ-গঠন ও সভ্যতার অন্যতম নিয়ামক হিসাবে বোদ্ধা মহলে বিবেচিত হয়ে আসছে। কালিকাপুরাণে উল্লেখ আছে যে, তিস্তা ভগবতীর হৃদয় হতে উৎপন্ন। সে অনেক-অনেক-অনেক কাল আগের কথা, এক অসুর শুধু শিবেরই আরাধোনা করে কিন্তু তার বউ পার্বতীকে উপাসনা করে না। সঙ্গত কারণেই অভাগা অসুরের উপর নেমে এল দূর্দশা। পার্বতী অসুরের সাথে যুদ্ধ বাধিয়ে দিলো। যুদ্ধের এক পর্যায়ে অসুর পানির তেষ্টা বোধ করলে শিবের কাছে পানি প্রার্থনা করে। যুদ্ধের ময়দানে পানি কোথায়? শিব ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে তার স্ত্রীর বুক হতে তিনটি ধারা উৎসারিত করলো। ত্রিধারা-ত্রিস্রোতা রূপে কিভাবে যেন মর্ত্যে নেমে এলো। আর ভুটান সীমান্তের হিমালয় পাদদেশ হতে উৎপন্ন হয়ে ঐ ত্রিস্রোতা দক্ষিণবাহী প্রবাহে অর্থাৎ পূর্ব দিকে করতোয়া, মধ্যাংশে আত্রাই ও পশ্চিমে পূর্ণভবা নদীরূপে বাংলাদেশের ভিতরে প্রবেশ করে সংস্কৃত ত্রি-স্রোতা হতে বাংলায় তিস্তা হয়ে গেল। সম্ভবতঃ ১৭৮৭ খ্রীঃ প্রলঙ্কারী বন্যার কারণে আদি তিস্তা দিক পরিবর্তন করে রংপুরের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কালিগঞ্জের নিকট ব্রহ্মপুত্রে পতিত হয়েছে।

১২০৪/৫ খ্রীঃ তুর্কী বংশজাত মালিক-উল-গাজী ইখতিয়ার-উদ-দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক মুসলিম শাসন কায়েম করে। যেহেতু ‘রঙ্গ’ একটি ফার্সী শব্দ সেহেতু রঙ্গপুর নামটি খলজী আমলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা পরে রংপুর হয়েছে – এমন ধারনা রয়েছে অনেকের। বিখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিক মহম্মদ কাসিম হিন্দু শাহ আস্ত্রাবাদী ওরফে ফেরেশতা লিখিত ‘তারিখ-ই-ফেরেশতা’ গ্রন্থ হতে জানা যায় যে, বখতিয়ার নাকি বাংলাদেশের রঙ্গপুর নামে একটি রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিল। বিষয়টি বিতর্কিত এবং একথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, খলজীর মাতৃভাষা তুর্কী, ফার্সী নয়। যদিও সুলতানি আমলে ও পরবর্তী মুঘলামলের প্রায় ৫০০ বছর রাজভাষা ছিল ফার্সী কিন্তু তুর্কী বংশজাত সুলতানরা নিজেদের বাইরে অন্য কারোর সাথে ফার্সী ভাষায় কথা বলতেন না। আর তাছাড়া খলজীর সময় বাংলায় ফার্সী ভাষার ব্যাপক প্রচলন সম্ভব হয়নি বলেই মনে হয়।

১৫৭৫ খ্রীঃ মুঘল সেনাপতি মানসিংহ রংপুর অঞ্চলের আংশিক স্থান দখল করতে সক্ষম হয়। ১৬৬০-৬১ খ্রীঃ দিকে সম্রাট আওরঙ্গজেবের বাংলার সুবাহদার মোহাম্মদ মীর জুমলা নবাব মোয়াজ্জম খাঁ খান খানান দ্বারা আসাম অভিযান পরিচালনার সময় রংপুরে মুঘল কর্তৃত্ব ও ১৬৮৬ খ্রীঃ যখন পুরো রংপুর মুঘলদের হস্তগত হয় তখন রংপুরের নাম ‘ফকরকুন্ডি/ফকিরকুন্ডি’ পাওয়া যায়।

মুঘলামলে (১৬৮৬/৭ খ্রীঃ পরে) মুঘল সম্রাটের প্রতিনিধি নবাব বাকেরজঙ্গের রংমহল থেকে রংপুর নামের উৎপত্তি। কেউ কেউ দাবী করেন, এই সময় এর প্রকৃত নাম ছিল ‘জঙ্গপুর’ যা পরে রংপুর নামে পরিবর্তিত হয়েছে। সুদূর অতীতের ইতিহাস থেকে জানা যায়, বৃহত্তর রংপুর অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের স্বাধিকার আন্দোলন শুরু হয়েছে বিশেষ করে মুঘল ও বৃটিশামলে (১৬৮৭ – ১৭১১ খ্রীঃ)তা ব্যাপক আকার ধারন করেছিল। এই সবের মধ্যে কৃষক – প্রজা বিপ্লব (১৭৮৩ খ্রীঃ), সিপাহী বিপ্লব (১৮৫৭ খ্রীঃ), নীল বিপ্লব (১৮৬০ খ্রীঃ), ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন (১৭৬৭ খ্রীঃ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্বাভাবিকভাবেই রংপুরের নানাস্থান তখন ‘রণভূমি’তে পরিনত হয়। সুতরাং জঙ্গপুর (ফার্সী জঙ্গ অর্থ যুদ্ধ আর সংস্কৃত পুর অর্থ নগর) হওয়া সেক্ষেত্রে যুক্তিযুক্ত – এমন মতও পোষন করে থাকেন অনেকেই।

বৃটিশ দখলদারিত্বের আমলে (১৭৬৫ খ্রীঃ পরে) বৃহত্তর রংপুর ও এর আশপাশ জুড়ে নীল চাষের ব্যপক প্রসার ঘটে। ‘নীল’কে স্থানীয়রা ‘রঙ্গ’ বলতো, আর তা থেকে প্রথমে রঙ্গপুর ও পরে রংপুর নামকরণ হয়েছে – এমন তথ্যও পাওয়া যায়। রঙের সাথে সম্পৃক্ত আরেকটি মতও বেশ প্রচলিত আছে। অনেকে ধারনা করেন যে, পাট ও পাটজাত কাপড়ের রং করার কারখানা ছিল এখানে আর তাই এলাকার নাম ছিল ‘রংরেজপুর’ যা পরে রংপুর হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, রংপুর অঞ্চল অনাদি কাল থেকে শতরঞ্জি শিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ। ১৩০০ খ্রীঃ সুলতানি আমলে, মুঘল সাম্রাজ্যের ৩য় সম্রাট আকবরের (১৫ অক্টোবর ১৫৪২ – ২৭ অক্টোবর ১৬০৫ খ্রীঃ) দরবারে, বিংশ শতাব্দীর ৩য় দশকে রাজা-জমিদার-জোতদার প্রভৃতি অভিজাত শ্রেণির ভোজনালয়ে শতরঞ্জির সরব উপস্থিতি এই শিল্পের গৌরবময় দিনের কথাই আমাদেরকে স্মরণ করে দেয়। ১৮৩০ খ্রীঃ দিকে রংপুরের তৎকালীন কালেক্টর মিস্টার নিসবেত শতরঞ্জির মাধুর্য্যে মুগ্ধ হয়ে এই শিল্পের ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বাংলার তথা রংপুরের মানুষ কৃতজ্ঞতার ভান্ডার উজার করে নিজেদের ‘পীরপুর’ এলাকার নাম ‘নিসবেতগঞ্জ’ হিসাবে উৎসর্গ করেন মিস্টার নিসবেতের সৌজন্যে। শতরঞ্জি বর্তমান বিশ্বের বুনন শিল্পের প্রাচীনতম বুনন পদ্ধতি ও যান্ত্রিক ব্যবহার বর্জিত এবং এই পীরপুর তথা নিসবেতগঞ্জই আমাদের শতরঞ্জি শিল্পের আদি সূতিকাগার।

সম্ভবতঃ বৃটিশ আমলেই এখানে মহামারি আকারে ম্যালেরিয়া রোগের প্রাদূর্ভাব দেখা দেয় ফলে স্থানের নাম হয় ‘যমপুর’ আর সেখান থেকে রংপুর নাম হয়েছে – কেউ কেউ এমন ধারনা পোষন করেন।

ঘাঘট নদী তীরেই মধ্যযুগের সুলতানি ও মুঘলামলে মীরগঞ্জ হতে মাহিগঞ্জ এলাকায় আদি রংপুর শহরের গোড়া পত্তন হয়। কিন্তু ঘোড়াঘাটের মোঘল ফৌজদার এবাদত খাঁ ১৬৮৭ খ্রীঃ কোন এক সময় মাহিগঞ্জ এলাকা যা অতীত কালের ভূটানী বাজার ছিল সেখানেই একটি বাজার স্থাপন করে পুরোনো রংপুর সদর গড়ে তোলে। তবে ১৭৮৭ খ্রীঃ ভয়াবহ বন্যায় তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হলে ঘাঘট নদী তার নাব্যতা হারায়, ফলে নৌযান চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। ফলে মাহিগঞ্জ থেকে জেলা সদর প্রায় ৯০ বছর পর ১৮৭৫ খ্রীঃ পর্যায়ক্রমে ধাপ এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। বাংলাদেশের ৫টি জেলার সাথে সীমানা ভাগাভাগি করে থাকা দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলার আয়তন প্রায় ২৩০৮ বর্গ কিলোমিটার। আয়তন বিবেচনায় রংপুর বাংলাদেশের ২৯ তম বৃহত্তম জেলা। আনুমানিক ১৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ও আটটি জেলা নিয়ে ২০১০ খ্রীঃ ২৫ জানুয়ারী রংপুর বাংলাদেশের সপ্তম বিভাগ হিসাবে স্বীকৃতি পায়।

বাংলার প্রাচীনতম ভূমির বরেন্দ্র অঞ্চলের রংপুর নামকরণের সাথে রাজা ভগদত্তের রঙ্গশালা সম্পর্কিত বিষয়টি সচেতন রংপুরবাসী সহজে মেনে নিতে চান না। রাজা-বাদশা-নবাব-জমিদারদের দেশের বিভিন্ন স্থানে রঙ্গশালা থাকা সত্ত্বেও কেনো শুধু রংপুরের নাম এমন হবে – এটি তাদের যুক্তিযুক্ত দাবী। প্রত্ন-নিদর্শন, ইতিহাস, ভৌগলিক ও নৃ-তাত্বিক গবেষণায় দিস্তাং/ত্রিস্রোতা/তিস্তা অববাহিকায় রং ভাষাভাষীদের রংপো/রংপু থেকে রংপুর নামকরণ হয়েছে বলেই তাদের বলিষ্ঠ যুক্তি। যেমন, ইংলিশ থেকে ইংল্যান্ড, ফ্রেঞ্চ থেকে ফ্রান্স, ফিনিশীয় থেকে ফিনল্যান্ড, বাংলা থেকে বাংলাদেশ তেমনি রংপু থেকে রংপুর নামকরণ হয়েছে। রংপুর নামের আদি উৎস কি আদৌ উম্মোচিত হবে…??!!

——————————————————————-

২৯ মে ২০১৭/খোলাহাটি

তথ্যসূত্রঃ

১. বৃহত্তর রংপুরের ইতিহাস, মোস্তফা তোফায়েল হোসেন, পৃঃ ১০-২৫/৪০/

২. বাংলায় ভ্রমণ, ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে (১৯৪০)/BANGLAY BHRAMAN, a `Travelogue on historical documents and legends by E. B. RAILWAY (1940), পৃঃ ৫/

৩. বাঙ্গালার ইতিহাস, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ২য় খন্ড, পৃঃ ১৪-১৫/

৪. আলোকচিত্রে ইতিহাস, বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর, এরিয়া সদর দপ্তর, রংপুর, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পৃঃ ১৫৩/২০৯/

৫.  বগুড়ার ইতিকাহিনী, কাজী মোহাম্মদ মিছের, পৃঃ ৩০/

৬. ৬৪ জেলা ভ্রমণ, লিয়াকত হোসেন খোকন, পৃঃ ৩৯৮/৪৪৯/

৭. উইকিপিডিয়া/

৮. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন/

৯. Statistical Accounts of Rangpur District, William Hunter/

১০. বাংলা অঞ্চলের ইতিহাস, নতুন দৃষ্টিকোণে একটি সমীক্ষা, সৈয়দ আমীরুল ইসলাম, পৃঃ ৭৩/

১১. প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ড. আবদুল মমিন চৌধুরী, পৃঃ ২৬/

১২. কোচবিহারের ইতিহাস, খাঁ চৌধুরী আমানতউল্লা আহমদ, পৃঃ ৬১/৬৫-৬৬/২২৮/৩৫১-৩৫২/

১৩. পঞ্চগড় জেলার ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি, নাজমুল হক, পৃঃ ২০-২১/

১৪. ইতিহাসে বাংলাদেশ, সুব্রত বড়ুয়া, পৃঃ ৬৫/

১৫. প্রাচীন বাংলার ধুলো মাখা পথে, খন্দকার মাহমুদুল হাসান, পৃঃ ৩৭৪-৩৭৫/

১৬. বাংলাদেশের জেলা-উপজেলার নামকরণ ও ঐতিহ্য, মোহাম্মদ নূরুজ্জামান, পৃঃ ৫১-৫৪/

২ টি মন্তব্য : “রংপুর”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।