অবরুদ্ধ

বহুকাল ধরে দিগন্তের দৃশ্য একপলক দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ এই দুটি চোখ আজ যেন কাতর। দু চোখ মেলে যখনই চেয়েছি দৃষ্টিকে অসীমতার মাঝে হারিয়ে ফেলতে, নগরায়নের আশীর্বাদপুষ্ট দালানগুলো দাঙ্গার পুলিশ এর মত আটকে দিয়েছে তাকে।আনুভুমিক ভাবে যখন এই প্রয়াস বিফল, তখন সাহস করে আকাশের দিকে বিলম্ব না করেই উলম্ব ভাবে তাকিয়েছি।কিন্তু গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলোর বদৌলতে আমি যেন নিজেকে মনে করছিলাম গুহাবাসী,গুহার ফোঁকরে যতখানি দেখা যায় আর কি।আমার মত কেও এরকম দৃষ্টিশক্তিকে উলম্ব অথবা আনুভূমিক দিকে ব্যয় করছে কিনা কৌতূহলী হয়ে চারপাশে যখন তাকাই তখন অদ্ভুতভাবে দেখি সবাই চতুষ্কোণা ANDROID সেট এর দিকে নিন্মমুখী হয়ে গভীর মনোযোগে নিবিষ্ট ।ভার্চুয়াল স্বর্গের কোন এক অপ্সরীর সাথে চ্যাটপচটন এ ব্যস্ত কেও, কোন রমণী সেখানে খুঁজে পেয়েছে বিল গেট্‌স এর মত ধনকুবের কে। আবার কেও বংশীয় রক্তাক্ত যুদ্ধে মেতে পড়েছে ড্রাগন এবং দৈত্যকে লেলিয়ে দিয়ে অচিনপুর নামক গ্রামে। ক্ল্যাশ অফ ক্লান্স বলে কথা।শুধু এইটুকুই বুঝলাম পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে,ফলে দৃষ্টি এখন নিন্মমুখী।মানুষের গর্দান কে আর ঊর্ধ্বমুখী করা সম্ভব নয়।
দৃষ্টিশক্তির এরুপ অপব্যবহারে মনক্ষুন্ন হয়ে নতুন এক কল্পনাতে বুঁদ হয়ে গেলাম। এবার কল্পনার জগতে মনপাখিকে ছেড়ে দিলাম স্বাধীনভাবে, যেখানে তার দুচোখ যাবে সেখানেই সে উড়ে যাবে। এখানে তো আর হস্তক্ষেপ করার কেও নেই, আমার রাজত্বে কারো আইন প্রণয়ন কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। পাখি তার সমস্ত জীবনীশক্তিকে দেহের প্রতিটি কোষে সঞ্চারণ করে উদ্দ্যাম গতিতে ছুটে চলল অজানার উদ্দেশে।কল্পনার মাঝে আমি এভাবে হারিয়ে যাই অকৃত্তিম ভাবে,অনাবিল শান্তিতে ভরে যায় মন। পাখিটি উড়ছে তো উড়ছেই। কিন্তু,হটাত ছোট বেলার ভূগোল ক্লাসে শেখা বিশ্ব মানচিত্র এসে সেখানে গোলমাল পাকিয়ে দিল। কৃত্তিম কল্পিত সীমানাতে বিভক্ত বিশ্ব কল্পনার পাখির জন্যও উড্ডয়নকালে বিপদজনক। কেন যেন মনে হচ্ছিল সীমান্ত রক্ষী বাহিনী গুলি করে পাখিটাকে মেরে ফেলবে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করার কারণে অথবা পিছু নেবে কোন জঙ্গি বিমান। কি আশ্চর্য, প্রথমে দালান এরপরে কিছু রাজনীতিবিদের কল্পনার কাটাতারের বেড়া আমার এই কল্পনার বিহঙ্গটিকেও কি মুক্তভাবে ওড়ার স্বাধীনতা দেবে না?এই বিশ্ব আমার জন্য উন্মুক্ত নয়;এ আমার বা আমি তার এই চিন্তা এখানে নিষিদ্ধ।বিশ্বনাগরিক ব্যাপারটা যেন ফরাসীদের ক্ষেত্রেই শোভা পায়,আমাদের জন্য তা শুধু কল্পনাবিলাস অথবা সুশীল চক্রে ব্যবহৃত পরিভাষা যার কোন বাস্তব প্রতিরুপ নেই।পরিশেষে,বহু ঈগলের তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে বিদ্ধ হয়ে কল্পনার জগত থেকে বিরতি নিলাম।
বাস্তব এবং কল্পনা, উভয়জগতেই দৃষ্টির উপর এরকম বাধা সত্যিই মনকে বিষিয়ে তুলেছে।মানবিক এই প্রকৃতি যখন সভ্যতার নামে নিষ্পেষিত হয় তখন হৃদয় হয়ে যায় কাটাতারের বেড়াটিতে আটকে পরা আহত কবুতরের মত।
কেন যেন মনে হয় সভ্যতার অর্থ হল নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে কিছু পুজিপতির “মেগামেশিন” নামক মহাপ্রকল্পতে সুফিসাধকদের মত ফানা(বিলুপ্ত) হয়ে যাওয়া,নিজের শৈল্পিক চেতনার জগতে মহা প্রলয় ডেকে, এবং পরিশেষে সৃজনশীল সত্ত্বাকে নিজ হাতে কবর দিয়ে লোহায় গরা কোন যন্ত্রমানব হয়ে যাওয়া। ইচ্ছা নামক প্রবৃত্তি এখানে অনাহুত,অনাকাঙ্খিত এবং দূষণীয়।সমাজের রেললাইনে ইচ্ছাগুলো প্রতিনিয়ত আত্নহত্যা করে ভবিষ্যৎকে সুদূর পরাহত মনে করে। ভালবাসা যখন বিমূর্ত না হয়ে, হয়ে পরে পঞ্চইন্দ্রিয় ভিত্তিক কিছু বৈষয়িক পরিমাপকের অধীন তখন পৃথিবীর উপরিভাগ থেকে অভ্যন্তরকেই শ্রেষ্ঠ মনে হয়।

১,৮০৪ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “অবরুদ্ধ”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।