সিরিয়াল ২৩ ও ২৪, হাজতে বাসর

সিরিয়াল ২৩
২২ ডিসেম্বর, ২০০২, হাজতে বাসর

মাথা নিছু করে কাঁদছিলাম আম্মুর হাত ধরে। কিন্তু ওসির কথায় সম্বিত ফিরল।আমি থাকতে আরিফ হাজতে ঢুকবে! আহারে, আমার জন্য বেচারা আর কত কষ্ট করবে!
আমিঃ আব্বু, আমার ১৮ বছর হয়েছে। আমার জন্ম ১৯৮৪ সালের ৫মে।
ওসিঃ উনি কি ঠিক বলেছেন?
আব্বুঃ হ্যা।
ওসিঃ তাহলে আপনি বাবা হিসেবে কেস তুলে নিতে পারেন
আমিঃ আমাকে কেউ জোর করে আনেনি এখানে। ওদের ছেড়ে দিন
আব্বুঃ তুলব কিন্তু এসব কিভাবে হল? আমাকে তোমরা দুইজন একবারও বলার সাহস করলে না কেন?
আরিফঃ আমরা আসলে…
আব্বুঃ থাক, তোমার মুখ থেকে আর কিছুই শুনতে চাই না। মিতু, তোমার এখনি আমাদের সাথে যেতে হবে
আমিঃ কিন্তু ওরা?
আব্বুঃ ওরাও চলে যাবে। আমি ৭ দিনের মধ্যে তোমাকে বাইরে পাঠিয়ে দেব।ওর সাথে কোন যোগাযোগ হবে না আর
আমিঃ আব্বু আমি উনাকে ছেড়ে থাকব কিভাবে?
আম্মুঃ আমাদেরকে ছেড়ে থাকতে পারবে?
আমি নিশ্চুপ। কি জবাব দেব?
আম্মুঃ কি হল বল? আমাদের ছেড়ে থাকতে পারবে? তুমি আমাদের সাথে না গেলে আমি বিষ খাব এখনি।
আমিঃ আমি চলে গেলে ওরা সবাই হাজতে আটকে থাকবে। ওদের কোন দোষ নেই। আমার জন্য ওরা কেন শাস্তি পাবে? ওদের ছেড়ে দিতে বল আম্মু প্লিজ
আম্মুঃ তুমি আগে চল আমাদের সাথে
আমিঃ আমি ওদের ফেলে যেতে পারব না।
আব্বুঃ থাকো তাহলে। আমরা যাচ্ছি। আমি কেস উঠাব না। এভাবে এক মাস থাকতে পারবে?
আমিঃ পারব আব্বু। আরিফসাহেব একা কেন হাজতে থাকবে! আমিও পাশে থাকব।আব্বু, ওরা কোন দোষ করেনি। ভাইয়াদের যেতে দাও, প্লিজ। আমি আর আরিফসাহেব আছি।

আরিফ সাহেবের বন্ধুদের ছেড়ে দেয়া হল। কেবল আমি আর আমার অভাগা স্বামী পড়ে আছি পুলিশের কবলে।আব্বু-আম্মু-ভাই আমাকে অনেক বোঝানোর পরেও আমি আরিফসাহেবের মায়া ছেড়ে যাইনি। তাই আমার পরিবারও চলে গেছে। আমরা দুইজন ওসির রুমের বারান্দায় বসে আছি। অনেক রাত হয়েছে তাই কাল আবার বিচার হবে।

আরিফঃ কত সাহস তোমার, ওসির মুখে কথা বল!
আমিঃ বিপদে সবার সাহস এমনিই বাড়ে
আরিফঃ আমাকে বিয়ে করে বিপদে পড়লে
আমিঃ আমাকে বিয়ে করে হাজতে যাচ্ছিলেন তো প্রায়
আরিফঃ তুমি না ঠেকালে যেতেই হত
আমিঃ দেখেছেন বাইরে পুর্ণিমা?
আরিফঃ তোমার মুখে তার আলো এসে পড়েছে।
আমিঃ আপনি কত ফর্সা আর আমি কালো। লোকে কি বলবে?
আরিফঃ ঠিক আছে ছাড়া পেয়ে কক্সবাজার গিয়ে গা পুড়িয়ে আসব।
আমিঃ আমিতো তাহলে নিগ্রো হয়ে যাব।
আরিফঃ ভালোই হল, হাজতে হলেও আমাদের বাসরে তোমাকে তো পেলাম পাশে। তা নাহলে এখন তো বাসায় বালিশে মুখ গুজে কাঁদতে।

সিরিয়াল ২৪
২৩ ডিসেম্বর, ২০০২, নতুন দিন

সারারাত বারান্দায় বসে মশার কামড় খেলাম আর দুইজন কথা বললাম।সবাই আমাদের গল্প আর হাসি দেখে অবাক।
আয়াঃ কেউ হাজতের বারান্দায় বসে এত গল্প করে কিভাবে!

না ঘুম, না ক্লান্তি আর না মন খারাপ। ভাগ্য মেনে নিয়েছি আমরা। যা হবে দেখা যাবে। যদি সত্যি ১ মাস হাজতবাস করতে হয় করব।ওসি আমাদের জন্য নানারকম নাস্তা আর ফলমূল আনিয়ে আমাদের খাবার আয়োজন করলেন। আমি ভেবেছিলাম পুলিশরা আমাদের সাথে বাজে ব্যবহার করবে। কিন্তু তারা সবাই শুধু আফসোস করছে আমাদের কষ্ট দেখে। সবার খুব মায়া আমাদের জন্য। আমরা দুইজন মিলে ভাবছি কাজী ব্যাটাকে কিভাবে শাস্তি দিব।সবকিছু গুলিয়ে গেল কাজীর কারনে। আরিফসাহেব ব্যবসায় আগাবেন, আমি বিদেশ যাব। কিছুই হল না।

সকাল হলে আব্বু-আম্মু আবার এল। আরিফ সাহেবের মামা, কাকা সবাই এলেন।সবাই বলছে আমাকে আপাতত যেতে, যাতে আরিফ ছাড়া পায়। কিন্তু আমি যেতে রাজী না। আমার ভ্ যদি আর আমি আসার সুযোগ না পাই!এত বছরের পর পাওয়া প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে ফেলি! সবাই রাগ আমার ওপর – আমি কেন জিদ করছি। কেবল আমার মনের মত মনটায় কোন রাগ নেই।
আরিফঃ লক্ষী তুমি যাও। কিচ্ছু হবে না
আমিঃ না, আমি আপনাকে ফেলে কোথাও যাব না
আরিফঃ এভাবে কত কষ্ট করবে
আমিঃ আমি চলে গেলে আপনাকে কেউ আর বাচাতে পারবে না! আপনি অনেক বিপদে পরবেন
আরিফঃ তাও তুমি যাও। আমাদের অনেক বিপদ হবে।তুমি থেকো না এসবের ভিতর।
আমিঃ হোক বিপদ, তাও যাব না
আব্বুঃ আমি তাহলে কেস উঠাব না
আমিঃ আমি একা ফেলে কিভাবে যাই আব্বু! আমি বিয়ে করেছি।
আব্বুঃ এই বিয়ে আমি মানি না
আব্বু আমাদেরকে নিয়ে আবারো বিয়ে পড়িয়ে দিল। তারপর সবাই আমার ওপর রাগ করে চলে গেল।আমরা মুক্তি পেলাম থানার গন্ডী থেকে।ফিরে গেলাম আরিফসাহেবের বাসায়।আমার কথামত খালি হাতে এক কাপড়ে।

****আশা করি সকলেই আমাদের ভয়ংকর বিবাহের কাহিনী পড়ে আমাদের অবস্থা বুঝে গেছেন। জীবনে কষ্ট ছাড়া কিছুই মেলে না। তাওতো আল্লাহ আমাদের দিকে মুখ তুলেছিলেন বলে আমাদের পথ এক হতে পেরেছিল।

৩৩০ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “সিরিয়াল ২৩ ও ২৪, হাজতে বাসর”

  1. অপেক্ষার অবসান ঘটালেন তাহলে 🙂 অনেক ভাল লাগল 😀 আপনার শেষের কথাটি খুব সত্য "জীবনে কষ্ট ছাড়া কিছুই মেলে না" লেখাটি উপহার দেয়ার জন্য শর্মিলী আনোয়ার কে অনেক অনেক ধন্যবাদ..............

    জবাব দিন
  2. আমার ভাগ্যটা ভালো মনেহয়, আপনার সব 'সিরিয়াল' লেখার পর এ ব্লগের দেখা পেলাম।যেন একটি রোমান্টিক উপন্যস পড়ে শেষ করলাম।এক দিেন না পড়তে পারলে টেসসন হত!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।