১৯ ডিসেম্বর, অনশন

সিরিয়াল ১৫
১৯ ডিসেম্বর, অনশন

ক্লাস শেষে বাসায় এসে ফোন দিলাম
আমিঃ আজকে একটু আসবেন নাকি?
আরিফঃ কেন?
আমিঃ এমনিতেই
আরিফঃ তাহলে তো আসা যাবে না।তোমার জন্য আসতে বললে আসব।
আমিঃ তাহলে আসা লাগবে না। কারণ আমি বলব না আমার জন্য আসতে
আরিফঃ ভেবে দ্যাখো আর আসব না।
আমিঃ না আসলেন!

এই প্রথম আরিফ সাহেব রাগ করে কল কেটে দিলেন।আর কল ধরে না। ১০০০ বার দিয়েও না।হঠাত এত রেগে গেল কেন? অবশেষে আমার জিদ চেপে গেল। রাতে কল ধরল বান্দা।
আমিঃ কল ধরেন না কেন?
আরিফঃ বুঝ না কেন?
আমিঃ আমিতো আসতেই বলেছি
আরিফঃ তোমার জন্য আসতে বলনি।
আমিঃ তাই বলে সারাদিন কল ধরবেন না?

আম্মুঃ কার সাথে কথা বল আরিফ?
আমিঃ হ্যা আম্মু
আম্মুঃ আমাকে দাও। আরিফ, তোমাদের কি ঝগড়া হয়েছে নাকি? ও তো রেগে সারাদিন খাওয়া ছেড়ে বসে আছে। কি বলেছ তুমি ওকে? খালি খ্যপাও মেয়েটাকে
আরিফঃ কই আমি তো কিছু বলিনি
আম্মুঃ অবশ্যই বলেছো। আমার মেয়ে রাগ করে না খেয়ে কোনদিন থাকেনি।
আরিফঃ খিধা লাগলে এমনিই খাবে। ঢং

আমি এই কথাটা শুনে ঝরঝর করে কেদে ফেললাম। আর রাতে আব্বু আসার আগেই ঘুমিয়ে গেলাম। আম্মুকে বলেছি আরিফ সাহেব আমাকে সরি না বলা পর্যন্ত আমি খাব না।পরের দিন দুপুরে আম্মু আরিফ সাহেবকে কল দিয়ে বলল “ ও তো এখনো খাচ্ছে না”।
আরিফঃ এখনো খায় নি!
আম্মুঃ তুমি বলেছ “খিধা লাগলে এমনিই খাবে। ঢং”। এই রাগে পানিও খাচ্ছে না।
আরিফঃ আচ্ছা আমি দেখি কথা বলে

আমি কথা বলিনি। সন্ধ্যা ৭ টা বাজে। চুপ করে শুয়ে আছি।মানুষ কিভাবে এইরকম খোচা মেরে কথা বলে!কলিংবেল বাজল।
আমিঃ আম্মু আব্বু যেন না জানে আমার না খাওয়া প্লিজ! প্লিজ! আমার অপমান হয়েছে।
আম্মুঃ আচ্ছা বলব না
জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি।মানুষটা অনেক নিষ্ঠুর।পাশে এসে কে যেন বসল। হবে আম্মু আব্বু কেউ। আমি তাকাতেও চাই না। কিচ্ছু ভাল লাগছে না।

আরিফঃ কি ব্যাপার! জানালার পাশের বাসায় কি নতুন ছেলে এসেছে নাকি?
আমিঃ আপনি? কেন এসেছেন?
আরিফঃ দেখতে! জানালার ছেলেটার চেহারা কেমন!
আমিঃ আম্মু, এই লোকটাকে নিয়ে যাও তো!

আম্মু খাবার নিয়ে এসেছে।
আরিফঃ আচ্ছা বুঝলাম তুমি অনেক পারো। ২ দিন না খাওয়া খুবি কঠিন কাজ। তুমি জিতে গেছো। সরি, আর বলব না
আমিঃ আপনি এইরকম খারাপ কেন?
আরিফঃ সরি বলেছি তো! এখন কি কানে ধরে বলব নাকি বেত্রাগাত হবে
আম্মু পানি আনতে গেছে।আমি চুপ করে বসে আছি।

আরিফঃ কেন এভাবে না খেয়ে থাকলে (চোখের কোণে স্পষ্ট পানির আভাস, চোখ মুখ লাল। আমার মুখটা দুই হাতের তালুতে নিয়ে বলল)
আম্মুর হাত থেকে খাবার নিয়ে আমাকে মুখে তুলে খাওয়ায় দিল সে।
আরিফঃ এতটুকু খাবার কেন? দুইদিন খায়নি বেচারী
আম্মু হাসতে হাসতে আবার ভাত আনতে গেল।

আমিঃ নিজেও তো খান নাই দুইদিন
আরিফঃ কে বলে?
আমিঃ দেখেই টের পাই
আরিফঃ এতো দেখলে তো ৩ বছর অপেক্ষা করা লাগত না।
আমিঃ এই ডায়রীটা নিয়ে যাবেন আজ। পড়ে কল দিবেন

সিরিয়াল ১৬
২০ ডিসেম্বর, প্রপোজ

রাত ১২ টা বাজে। হঠাত ফোন বেজে উঠল।সবাই ঘুমিয়ে গেছে। আমি জেগে পড়ছি
আমিঃ পড়েছেন?
আরিফঃ হুম।আগে বললেই হত। জুনের গরমেও জ্যাকেট পরেই দেখা দিতাম। আর তুমি কি জানো আমার নানার দেয়া নাম “ রায়হান”?
পরদিনও নিয়ম মত হেটে ধানমন্ডী গেলাম। ফেরার পথে আরিফ সাহেব হাজির।
আরিফঃ চারুকলায় গানের আসর বসেছে, যাবে?

চারুকলার গেটের পাশে বসে আছি।
আমিঃ অনেকক্ষণ হল, এবার যাই
আরিফঃ চল তোমাকে রিকশা করে দিই
আমিঃ লাগবে না
আরিফঃ কেন? চল তো!
আমিঃ আমার কাছে রিকশা ভাড়া নেই
আরিফঃ কেন?
আমিঃ সব টাকা আপনাকে কল দিয়ে ফুরিয়ে যায়। তাই হেটে আসি আর হেটে যাই

আরিফ একদম বাচ্চা ছেলের মত তাকিয়ে রইল। আর তার চোখের কোনে পানি।
আরিফঃ এরকম কেউ করে! এই নাও টাকা আর কোনদিন এভাবে হাটবে না।
আমিঃ না, টাকা নেয়া যাবে না।
আরিফঃ আমি দিতে পারি না?
আমিঃ এখনো না। বিয়ের পর ছাড়া না।
আরিফঃ তুমি জানো পুর্ব রাজাবাজার আর ধানমন্ডি ১৫ কত দূর?চারুকলা আর পুর্ব রাজাবাজার কতদূর?
আমিঃ জানব না! এই দ্যাখেন! আমার পায়ের তালুতে কালোদাগ পড়ে গেছে।

সবার সামনে ঝরঝর করে কেদে ফেলল এত বড় মানুষ।সবার সামনে হাটু গেড়ে রোমিওর মত আমার হাত দুইটা ধরে…।
আরিফঃ এখন থেকে তুমি শুধু আমার জন্য বাচবে। চল আজই বিয়ে করি।ওহ, না, তোমার তো আবার ২২ ডিসেম্বর বিয়ে করার শখ
আমিঃ কে বলল?
আরিফঃ তোমার ডায়রী
আমিঃ ইস, এইটা যে লিখা ছিল, মনে ছিল না।

চারুকলার সবাই হা করে দেখছে। কেউ কেউ হাসছে। তাই দেখে আমার গা জালা করল। আরিফ মোটেই লোকের সামনে এমন করার মানুষ না। আমার পায়ের কালোদাগই তাকে এমনটা করতে বাধ্য করেছে।আমি তার কাছে পুরোটা দুনিয়া থেকে দামী।আমি তাই সবার সামনে এই পাজী অথচ শিশুর মত মনের অধিকারী মানুষটাকে সোজা করে দাড় করিয়ে পায়ে ছুয়ে সালাম করলাম।যেমন একজন বউ তার বরকে করে।
ডায়রীর প্রতিটা ইচ্ছা মিলে গেছে…
১। নাম রায়হান
২। নাম আমার হাতে লিখা “ A” দিয়ে শুরু
৩। শিউলির শরত পুরণ
৪।জ্যাকেট
৫।বিয়ে ২২ ডিসেম্বর
২২ ডিসেম্বর ২০০২ আমাদের বিয়ে হয়েছিল। এ বছর ২২ ডিসেম্বর আমাদের এক যুগ পুরতি।

৬৮১ বার দেখা হয়েছে

১০ টি মন্তব্য : “১৯ ডিসেম্বর, অনশন”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।