২০০২ জুন…মিশন নানাবাড়ী

সিরিয়াল ৫
২০০২ জুন…মিশন নানাবাড়ী

বাসের ভেতরে আব্বুর কথায় জানা গেল এই লেটু লোকটির নাম আরিফ। প্রিন্টিং এর কাজ করে। আব্বুর সাথে অনেক দিনের পরিচয়। আমিই কেবল ওইদিন প্রথম দেখলাম। বাসার সবাই তাকে ভালো মতই চিনে।নানাবাড়ী নাটোর পৌছালাম দুপুর ৩ টায়। জুনের গরমে আমার মনে হল আমার গা ফুটছে। কিন্তু যখন আরিফ সাহেবের ফরসা মুখটা তেতে লাল হয়ে গেল, আমার ভিতরে এসির শীতল শান্তি। এইবার বুঝবে, নাটোরের গরম কাহাকে বলে। বিয়ে! এক নিমিষে ইচ্ছা উবে যাবে।
নানাবাড়ীতে আমরা পৌছানোর পর হুলুস্থুল পড়ে গেল। কে কি করবে, খাওয়াবে! তবে ভাব দেখে বুঝলাম, সবাই জানত যে পাত্র আসছে, পাত্রী দেখতে। আমার তিন তিনটি খালামনি রেডী। ইয়া আল্লাহ! একি অবস্থা! কোথায় আসলাম!
ব্যাপক খাওয়াদাওয়ার পর আমি আমার অভ্যাস মত যাচ্ছি গ্রামের বিলে। এখানে বলে রাখা ভালো যে, আমার নানা আর দাদা দুটোবাড়ীই নাটোরে। নানাবাড়ী প্রথম গিয়েছি সেবার। কিন্তু গ্রামে তো আর প্রথম না। আব্বু বলে, “আরিফকেওনিয়ে যাও। আমরা একটু বিশ্রাম করি। তোমার আম্মু একটু অসুস্থ।রাতে তোমার দাদুবাড়ী যাবো।”
কি বিপদ! আমি এখন একে গ্রাম দেখাব! নিরুপায় আমি তাকে রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছি বিলের দিকে। গাইডের মত গ্রাম নিয়ে বলছি। দেখি বান্দা বলে” hi”। মনে মনে ভাবি, কাকে বলে! তাকিয়ে দেখি পাশ দিয়ে স্কুলের মেয়েরা বাসায় ফিরে যাচ্ছে। দিনে দুপুরে এই ব্যক্তি টাংকি মারছে!
আরিফঃ দেখো ওই মেয়েটা বেশি সুন্দর তাই না। লম্বাও আছে বেশ। ওর বাবা মাও লম্বা
আমিঃ হুম, সুন্দর। কিন্তু ওকে বিয়ে করা যাবে না
আরিফঃ কেন? ছোট বেশি হবে?
আমিঃ না, ছোট হবে না! ক্লাস নাইনে পড়ে।
আরিফঃ নাকি তুমি হিংসা করছো!
আমিঃ হিংসা! আমি! আপনি জানেন ও আমার আপন চাচার মেয়ে?
আরিফঃ ও তাহলে শালি হবে?
আমিঃ মানে কি? আপনি ওই ৮ বছরের বাচ্চাকে বিয়ে করবেন?
আরিফঃ ৮ বছরের বাচ্চা! সেইটা আবার কে?
আমিঃ ওই যে, রাস্তায় খেলছে, ওইটা আমার চাচার ছোট মেয়ে
আরিফঃ তোমার দেখি অনেক বুদ্ধি! এই বুদ্ধি নিয়ে ক্যাডেট কলেজে পড়েছো!
মনে হল হাতের কাছে যা পাই, সোজা লোকটার মাথায় ছুড়ে মারি। কিন্তু কিছুই নেই। সুতরাং রাগদমন।
বিলে পৌছে দেখি সেই চিরচেনা জায়গা, এখনো আগের মতই সুন্দর। এটা কি ওইটা কি জবাব দিতে দিতে আমি হয়রান। জীবনেও গ্রাম দেখেনি মনে হচ্ছে। একটু পর দেখি পাটের ক্ষেত। কি সুন্দর রঙ। পাটগাছ এত লম্বা, প্রায় আমার সমান। আমি হাত দিয়ে পাতা ধরতে যাব, আরিফ সাহেব ” ধর না” বলে খপ করে আমার হাত আটকালেন। আমি রেগে বোম। এই মানুষটা আমার হাত ধরার সাহস পায় কিভাবে!
আমিঃ আপনি আমার হাত ধরলেন কিভাবে?
আরিফঃ পাটগাছে পোকা থাকে জানো না তুমি?
আমিঃ জানি না। আমি কি গ্রামে থাকি নাকি? আপনি জানেন কিভাবে?
আরিফঃ জানব না আবার, আমিতো গ্রামের ছেলে
আমিঃ তাহলে এতক্ষন এতো কথা জিজ্ঞাসা করলেন কেন?
আরিফঃ তোমার কথা শোনার জন্য!
আমিঃ ছাড়েন আমার হাত!
তারপর তিনি আমাকে পাটগাছের পাতায় থাকা ভয়ংকর পোকা দেখালেন। আমি দেখে চিতকার।হঠাত খেয়াল করলাম কথা বলতে বলতে আমরা পাটখেতের আইলের মাঝ বরাবর আছি। সামনে পিছনে সমান রাস্তা পেরিয়ে আগানো অথবা ফিরে যাওয়ার রাস্তা। পোকাওয়ালা পাটের পাতা গায়ে বারি খাচ্ছে। গায়ে পোকা উঠছে। আইল এতো সরু। আমি অবশেষে ভয়ে কেদে ফেললাম। কিভাবে এত লম্বা পথ যাবো।
আরিফ নামক পাজী মানুষটা আমাকে চোখ বন্ধ করতে বললেন। তারপর আমার হাত ধরে তার গ্রামের গল্প করতে করতে নিমেষেই লম্বা পথটা শেষ করে দিলেন। এবার আমি আর হাত ধরার জন্য দাবর দিলাম না।

সিরিয়াল ৬
২০০২ জুন, পাত্রের আপ্যায়ন…।

পাটক্ষেত জনিত অভিজ্ঞতা আর বাসায় বলা হয়নি। নানাবাড়ীর সকলে ব্যস্ত জামাই( আমার আব্বু) এর আপ্যায়নে। সাথে আরেকজনেরও। যিনি নাটরে পাত্রী দেখতে এসেছেন। সবাই মিলে তাকে এমন খাওয়ালো যে তিনি রাতে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলেন। আমি বেশ আনন্দে আছি। বুঝুক মজা! কারণ, পাটক্ষেতে তার অদ্ভুত সাহায্যে একটু মনে ভালো লাগা উদয় হতে যাচ্ছিল; কিন্তু তিনি যে হারে সকল নারীকে ফ্লারট করছেন, তা দেখে, ভালো লাগা উবে গেল। পাত্রী তিন জন ছাড়াও পাত্রীদের ভাবীও আছে তার লিস্টে।রাস্তা দিয়ে এক বুড়ী যাচ্ছে আমি সালাম দিলাম। আর বুড়ী বলে, ” আস্তাগফিরুল্লাহ”। আমি অবাক, আমি কি করেছি। পরে জানলাম, আরিফ সাহেব বুড়ীকে চোখ টিপ দিয়েছে। এইরকম চারিত্রিক গুন আর দেখিনি। আমি রীতিমত অবাক। আমাকেও বাদ দেয় না। কি বিপদ! সবার সামনে বলে” পরীর বাচ্চা”। আমি কিভাবে কি জবাব দিব তাই ভেবে পাই না। আমার অবস্থা মাইরালা…।
পরদিন সকালে ভাই বোন সবাই মিলে খেলা করে কথা বলতে বলতে আমি পা ধুতে গেছি বাথরূমে। দরজা একটু চাপানো ছিল। পায়ে পানি দিয়ে সামনে তাকাতেই দেখি আরিফ সাহেব। আমি কিছুই না দেখে …” আ আ আ”
আরিফঃ চিতকার দিচ্ছ কেন? আমিতো দাড়ি শেভ করছি। জামা কাপড় সবই পড়ে আছি
আমিঃ হ্যা, তা ঠিক। কিন্তু আপনি বাথরুমে কিভাবে? আমিতো দরজা খোলা দেখে ঢুকেছি
বড় মামীঃ কি হল মা? ( পাশের রান্নাঘর থেকে)
আমিঃ তেলাপোকা
বড়মামীঃ বাথরুমে স্যান্ডেল আছে। একটা বারি দাও, চলে যাবে
আরিফ হাহাহা করে হাসছে। আর আমি ভয়ে শেষ। মামী যদি দেখে। আমি মরেই যাব।
আমিঃ আপনার না ডায়রিয়া! আপনি কিভাবে আমাদের সাথে বেড়াতে যাবেন? শেভ করেন কেন?
আরিফঃ আমার মোটেই ডায়রিয়া না।
আমিঃ আপনি মিথ্যা বলেছেন সবাইকে
আরিফঃ দেখা দরকার ছিল, আমার ডায়রিয়ায় তুমি কেমন চিন্তায় পড়ে যাও!
আমি রেগে খটখট করে হেটে চলে গেলাম রেডী হতে। সবাই হারডিঞ্জ ব্রীজ দেখতে যাব। সবাই সানগ্লাস পড়েছে আমি পড়িনি
আরিফঃ তোমার চোখ সুন্দর এটা দেখানোর জন্য সানগ্লাস পড়নি?
আমিঃ আমি কানা, তাই পড়িনি। আমার চশমার পাওয়ার ৩
মাইক্রোতে সবাই খেয়াল করেছে আরিফ সাহেব লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে আছে। কাকে দেখছে সবাই কনফিউসড। একদম পিছনে খালামনি তিন জন, মামী। তার আগের সারিতে আমি, আব্বু আম্মু। ভাই আর আরিফ সাহেব সামনে। সবাই বলল আমাকে চেক করতে, পাত্র কাকে দেখে।আমি ঠিক তার পিছনের সিটে। আমার মনে হল তিনি আমার এক খালামনির দিকে তাকিয়ে আছেন। শিওর হবার জন্য আমাকে খালামনিরা সবাই ঠেলে পাত্রের বাম পাশে বসালো। তখন পাত্র একটু পর পর বামে তাকানো শুরু করল। আর সবাই বুঝতে পারল যে, পাত্র আমাকেই দেখছে! আমার মান ইজ্জত পুরটা ফালুদা।রাগে কষ্টে আমার মনে হল হারডিঞ্জ ব্রীজ এ গিয়েই একটা লাফ দিব।

৭২৪ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “২০০২ জুন…মিশন নানাবাড়ী”

  1. সামিউল(২০০৪-১০)
    আমিঃ তেলাপোকা
    বড়মামীঃ বাথরুমে স্যান্ডেল আছে। একটা বারি দাও, চলে যাবে।

    বাড়ি দিয়ে দিতেন একটা স্যান্ডেল দিয়ে, 😛 😛 😛


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।