এই দূর পরবাসে তারা গুনি আকাশে আকাশে…

ওয়াশিংটন ডিসি তে আছি প্রায় তিন মাস হল। গত সপ্তাহে লস অ্যাঞ্জেলস গিয়েছিলাম স্প্রিং ব্রেকে, দারুন একটা শহর! ফেরত এসেই ওয়াসি আঙ্কেলের(অরকা সেক্রেটারি, USA) ফোন-পরের মাসের আপডেট।

গোড়া থেকেই বলি। জানুয়ারী ৭ তারিখ জর্জটাউন ইউনিভার্সিটিতে আসার পর পুরাই মাথা খারাপ হবার জোগাড় হয়েছিল আমার! মানুষ, রাস্তা-ঘাট কিছুই চিনিনা, গলা দিয়ে খাবার নামেনা (এখানকার খাবার অখাদ্য!), সবচেয়ে বড় কথা- তীব্র শীত! (আসলে সবচেয়ে বড় কথা হলো বাথরুম…)! জেট ল্যা্গ বলে যে একটা ব্যাপার আছে তাও বোধহয় এখানকার মানুষ জানেনা! পরের দিন উঠেই ক্লাস করতে হল! এবং তারচেয়েও খারাপ অবস্থা হল যখন শুনলাম আমাকে ইন্টার্নশিপ এর ইন্টারভিউ দিতে যেতে হবে, তাও আবার একা একা! শীতের সকালে আমি স্যুট-বুট পরে রওনা তো দিলাম ঠিকই, কিন্তু পৌছাতে আর পারলামনা! রাস্তা হারায়, শীতে আমার প্রায় মরণ দশা (আমার ফোনও ছিলনা তখন)! শেষমেষ একজন কালো ট্যাকসি ড্রাইভার ডিরেকসন দেবার পর অফিসে গিয়ে পৌছালাম…Hudson Institute-এ অবশ্য আমার ইন্টার্নশিপটা হয়েও গেল! যাই হোক, আসল কথায় আসি। আমি আসার পরপরই আব্বুর যত ক্লাসমেট আছে আমেরিকায়, সবাই একবার করে ফোন করে খবর নিলেন। এমন কি, আমাদের ব্লগের (AMEC) সেক্রেটারি আপার মাধ্যমে এখনকার এমজিসিসি এক্স-ক্যাডেটরাও ফোন করলেন! বড়ই অবাক হয়েছিলাম প্রথমে কারন এনাদের প্রায় কাউকেই আমি চিনিনা।

প্রথম উইকেন্ডের কাহিনী বলি। আমি রুম এ বসে আছি, বিদ্যুৎ আঙ্কেল (আমার আব্বুর রুমমেট-আরসিসি) ফোন করে বললেন রেডী থাকতে, আমাকে ওনারা নিতে আসছেন ভার্জিনিয়া থেকে! প্রথম উইকেন্ডই এত মজায় কাটালাম, পরেরগুলা তো ভাল হবেই! আঙ্কেল এর মেয়ে আমার চেয়ে একটু ছোট, আন্টিও অনে-এ-এ-ক ভাল (ভাত-মুরগী রান্না করেছিলেন যে)! আমরা একসাথে বিভিন্ন মলএ গেলাম, মুভি দেখলাম (স্লামডগ মিলিওনেয়ার), আমার টুকটাক যা কিছু লাগবে রুমে সবই আন্টি কিনে দিলেন! রবিবার তো আমি আসা উপলক্ষে একটা পার্টিও হল-যে যেখান থেকে পারসে্ন আঙ্কেলের বাসায় আসছিলেন, এমনকি ওয়েস্ট কোস্ট (রীনো, ক্যা্লিফোর্নিয়া) থেকে বরকত আঙ্কেল আন্টি এসে হাজির!

তারপরের উইকেন্ডে আমার ১৮ বছরের সিনিওর মেঘলা আপা ম্যা্রিল্যান্ড থেকে তার ২ বাচ্চাসহ ডিসি তে আসলেন আমাকে শহর ঘুরিয়ে দেখাবার জন্য। মেঘলা আপার (ক্যাডেট নাগমা) নাম আমি কলেজ প্রিফেক্ট বোর্ডে দেখেছিলাম, কিন্তু কখনো ভাবিনি এতদূরের কোথাও আমাদের দেখা হতে পারে! কলেজের নতুন নতুন নিয়মকানুন আর ঘটনা শুনে উনি তো অবাক। আমরা ডিসির প্রায় সব গুরুত্বপুর্ন জায়গাগুলা ঘুরলাম (হোয়াইট হাউস, ক্যাপিটাল হিল, ব্লেয়ার হাউস, ওয়াশিংটন মনুমেন্ট, জেফারসন মেমোরিয়াল, ইউনিয়ন বিল্ডিং etc)। যাবার সময় ওনাকে থ্যাংক ইউ বলার আগেই উলটা উনি আমাকে থ্যাংক ইউ দিলেন, আমার সাথে কিছু সময় থেকেই যেন উনি সেই আগের দিনগুলিতে ফিরে গিয়েছিলেন। হাজার হোক আমাদের জীবনের সবথেকে সুন্দর দিনগুলোতো আমরা একই জায়গায় কাটিয়েছি, আজ হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও সেই দিনগুলো একইরকম আছে, একেবারেই ঘোলা হয়নি…কদিন আগেও লস অ্যাঞ্জলস যাবার সময় সেই সাত সকালে ম্যা্রিল্যান্ড থেকে এসে আপা আমাকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, এরকম তো কেউ নিজের দেশেও করেনা!

ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। বিদ্যুৎ আঙ্কেলেদের সাথে একদিন গেলাম চিকো আঙ্কেলের বাসায়, আর আরেক উইকেন্ডে গেলাম দেলাওয়ার এ, দীপক আঙ্কেলের বাসায় (সবাই আব্বুর ক্লাসমেট)। সেখান থেকে দুই ঘন্টা ড্রাইভ করে গেলাম আটলান্টিক সিটি, ক্যাসিনোর শহরে। আমি এর আগে কখনো গ্যাম্বলিং করিনি, তাই দাঁড়িয়ে থেকেই দেখছিলাম। দীপক আঙ্কেল এসে বললেন, আসো তোমাকে খেলা শিখিয়ে দেই! উনি আমাকে একে একে পোকার, জ়্যাকপট, স্লট, রূলে, ব্ল্যাকজ্যাক সব শিখাছ্ছেন, আর এর ফাঁকে বিদ্যুৎ আঙ্কেল সেটার ছবি তুলে বললেন, “এখন তো এই ছবি হীরূ (আমার আব্বু) দেখে তোকে পিটাবে আর মাথা চাপরায়ে বলবে, হায় হায় কাদের কাছে মেয়ে পাঠাইসিলাম…”! আমি অবশ্য ১৪ ডলার জিতলাম স্লট খেলে, কিন্তু পাসপোর্ট নিয়ে যাইনি বলে পুলিশ এসে আর খেলতে দেয়নি 🙁 (পরে লাস ভেগাস এ গিয়ে সেই মনের সাধ পুরন করসি)! বাসায় আসার পর আব্বুদের কলেজের এমন সব ছবি দেখলাম যেগুলা আব্বুর কাছেও নেই, হাসতে হাসতে আমার পেট ব্যাথা হয়ে গিয়েছিল সেদিন। এমনকি আব্বুদেরও একেক জনের আলাদা আলাদা নিকনেম দেয়া হয়েছিল, ঠিক যেমন আমাদের কলেজে ছিল।

প্রথম ঘটনায় ফিরে আসি। ওয়াসি আঙ্কেলের অফিস আমার অফিসের কাছেই। উনি অবশ্য আব্বুর অনেক জুনিওর (১৯৯৯ এ পাস আউট করেছেন)। এইতো কয়দিন আগেই আমরা একসাথে লাঞ্চ করলাম। নেক্সট মাসে অরকার ১টা গেট টুগেদার, পয়লা বৈশাখ আরও কি কি যেনো অনুষ্ঠান আছে। আমাদের কলেজের আপাদেরও বলা হয়েছে। আসলে সব কালের, সব কলেজের ঘটনাগুলো একেবারেই একরকম, ওনাদের সময় যেসব কাহিনী হত, আব্বুদের সময়েও সেই একই ঘটনা আবার আমাদের কলেজেও প্রায় একই স্টোরি। পৃথিবী কোথা থেকে কোথায় চলে গেছে, কিন্তু ক্যাডেট কলেজগুলো যেনো সময়ের সাক্ষি হয়ে একইরকম ভাবে রয়ে গেছে। আমাদের সবার ঘটনা এক এবং অভিন্ন, আমাদের সবার কৈশো্র একই সুতায় গাঁথা। আর তাইতো ক্যাডেট কলেজ নামের অদ্ভুত এই প্র্তিষ্ঠানটি সারা পৃ্থিবীর সব ক্যাডেটদের কি সুন্দর এক করে ফেলেছে! ছোটবেলায় যখন আব্বু রিইউনিয়নে যাবার ১মাস আগে থেকে বাচ্চাদের মত লাফানো শূরু করতো, দেখে আমি আর আম্মু কি বিরক্তই না হয়েছি। কিন্তু এখন বুঝি, বুঝি কারন আমিও যে একজন এক্স-ক্যাডেট!

কলেজ থেকে বের হবার পর এই চার বছরে আমি যা কিছু করেছি, যা কিছু পেয়েছি, তার সবখানেই কলেজের অবদান ছিল, অবদান ছিল আমার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, আমার সিনিওর-জুনিওরদের, আমার বাবার। প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে সবাই আমাদের জীবনে অবদান রেখেছেন। আর তাই পৃথিবীর সকল প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ক্যাডেটদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই! :salute:

২,৭৭৯ বার দেখা হয়েছে

৩২ টি মন্তব্য : “এই দূর পরবাসে তারা গুনি আকাশে আকাশে…”

  1. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)
    গত সপ্তাহে লস অ্যাঞ্জেলস গিয়েছিলাম স্প্রিং ব্রেকে, দারুন একটা শহর!

    B-) B-)

    :thumbup: :thumbup:


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  2. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)
    লাস ভেগাস এ গিয়ে সেই মনের সাধ পুরন করসি

    আমিও যাওতাছি, আর ঠিক ৫ দিন পরেই। 😛 😀 😀


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  3. সামি হক (৯০-৯৬)

    অরকা ইউএসএ অসাধারণ একটা সংগঠন আর দীপক ভাই, বিদ্যুৎ ভাইরা পুরাই সেইরকম মানুষ। ভালো লাগল জেনে তুমি আমাদের ভাতিজী। ওয়াসী ভাই কে বলো এই ফোরামের কথা উনি অসাধারণ লিখতেন। আমার দেখা বেস্ট কলেজ কালচারাল প্রিফেক্ট।

    জবাব দিন
  4. অর্চি,
    দীপক ভাই এবং অন্যান্য যারা আছেন ইউ এস এ তে, তাদের এই ব্লগ সম্পর্কে বলিস। উনারা লেখালেখি করতে পারেন ভাল।
    অরকা ইউ.এস.এ. তো অসাধারণ একটা সংগঠন সেইটা তো জানিস মনে হয়...

    লিখতে থাক... ভ্রমণ কাহিনী লিখে পরে ধারাবাহিক দিস...।
    ভাল থাক।

    জবাব দিন
  5. নাজমুল (০২-০৮)
    াজার হোক আমাদের জীবনের সবথেকে সুন্দর দিনগুলোতো আমরা একই জায়গায় কাটিয়েছি,

    :boss: :boss:

    কলেজ থেকে বের হবার পর এই চার বছরে আমি যা কিছু করেছি, যা কিছু পেয়েছি, তার সবখানেই কলেজের অবদান ছিল, অবদান ছিল আমার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, আমার সিনিওর-জুনিওরদের, আমার বাবার। প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে সবাই আমাদের জীবনে অবদান রেখেছেন। আর তাই পৃথিবীর সকল প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ক্যাডেটদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই!

    :salute:

    জবাব দিন
  6. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    আটলান্টিক সিটির ক্যাসিনো (তাজমহল সম্ভবত) প্রথমে ৭০ ডলার হেরেছিলাম। পরে এক ধাক্কায় ৭৮ ডলার ফেরত পেয়ে লগে লগে অফ গেলাম। ওটা ছিল ২০০৪ সাল। বুশ আর কেরির নির্বাচন কাভার করতে গিয়েছিলাম। এক মাস ছিলাম। ওয়াশিংটন ডিসি, ডেট্রয়েট, নিউইয়র্ক............। কেরির একটা সমাবেশও কাভার করেছিলাম ডেট্রয়েটে। ডেট্রয়েটে অবশ্য ১০০ ডলার জিতেছিলাম মনে পড়ে।

    আটলান্টিক সিটি চমৎকার শহর। চোখ ঝলসে দেয়। বিশেষ করে রাতে। শহরটা দিনে ঘুমায়, জেগে থাকে সারারাত। নিউজার্সি থেকে আমাদের এফসিসির বন্ধু সুলতান নিজে ড্রাইভ করে নিয়ে গিয়েছিল।

    ধন্যবাদ অর্চি। পেছনে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য। :hatsoff:


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  7. আলম (৯৭--০৩)
    আমরা ডিসির প্রায় সব গুরুত্বপুর্ন জায়গাগুলা ঘুরলাম (হোয়াইট হাউস, ক্যাপিটাল হিল, ব্লেয়ার হাউস, ওয়াশিংটন মনুমেন্ট, জেফারসন মেমোরিয়াল, ইউনিয়ন বিল্ডিং etc)।

    ধন্যবাদ অর্চি। সামনে এগিয়ে দেয়ার জন্য। :hatsoff:
    জর্জটাউন ভার্সিটিতে কিসে কী পড়? এসব অভিজ্ঞতা আরো লিখ, পড়ে পড়ে আমরা আরো সামনে এগিয়ে যাই (কেবল কল্পনায় :-B )।

    জবাব দিন
  8. পড়ে খুব মজা পেলাম। ভ্রমণকাহিনী পড়তে আমার ভীষণ ভালো লাগে। এই সাইটের চকচকে ভাবটাও বেশ পছন্দ হয়েছে। এবার থেকে মাঝে মাঝেই পড়তে আসবো এখানে। তবে রেজিস্টার করতে পারবো না। আমি তো আর ক্যাডেট নই।

    জবাব দিন
  9. অর্চি (৯৯-০৫)

    আপু আমার লাস্ট সেমিস্টার চলছে, থিসিস করছি। একদমই সময় পাইনা ব্লগে আসার। 🙁 আর কেন জানি এই ওয়েবসাইটের কিখাগুলা অনেক ছোট ছোট দেখা যায়, পড়তে পারিনা। 😕

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।