দুই জীবন

দু:খ হয় দেখে তোর এই
পাথুরে ককর্ষ জীবন মোজাইক টাইলসে মোড়ান
চকচক ফকফক মেঝে ঝকঝক কাচের দেয়াল
চারদিক ফিটফাট ইট কাঠ চৌকাঠ
লোহা ও ইস্পাত গড়া ঘরের দরজা জানালা দেয়া
ব্যাংকের ভল্টের মাঝে বসবাস, হাসফাস নিশ্বাস
প্রানটা বুঝি যায়।

বলতো ঘর কাকে বলে ? সে কি দালান কোঠা
ফ্লাট বাড়ী, কোটি টাকা ব্যাংকের দেনা কেনাবেচা
১০০০ বা ২০০০ স্কয়ার ফুট বেডরুম, টয়লেট
কাজের বূয়ার পায়খানা সেটাও আলাদা
গাড়ীর গ্যারেজ ড্রাইভার দারোয়ান বসার আসন
কথা টেলিকমে, উঠানামা লিফটের সাথে
পা দুটা আরাম চায় ।

জানিস আমাদের ঘর ছিল
মাটির কাদার , ছিল টিনের চাল, পিছল উঠান
ঠনঠন বাতাসের গান আনচান উড়ে যেত পরান
কড় কড় ঝড় নড়বর বাঁশের ঝার মরমর
খিল আটা দরজা জানালা
উঠোনের কোনে হেসেলের ঘর উনুন কাটা
যাকে তোরা বলিস কিচেন।

কুয়োর পাড়, পুকুরের ধার
গোসল চান সেখানেই মাজন থালাবাসন,
কাথা ও কাপড়, উনুনের চাল ধোয়া খাওয়া
সব যত কাজে লাগে আরো বাগের সেচ ,
কপিকল তোলা বালতির জল
বিদ্যুৎ বিজলী লাগতোনা কিছু
শুধু ছিল হাতের জোর ।

দু:খ হয় দেখে তোর
এই চাল চলন পোষাক আসাক খাওয়া দাওয়া
কেক, পেস্ট্রি, কোক, মোড়কের জুস লিচু আম
চিনিস কি গাছের ধরন ? তক্তা হয় না ধানের গাছে
বাগর্ার, হটডগ, টগবগ সিজলিং
চৌমিন উনথুন সিচুয়ান কেনটুকি , কত কি খাস
পেটটা ভরে কি?

প্যান্ট শাটর্ টাই জামা জুতো পরে ঠাই
খাস টেবিল এ বসে কসে কথা কস,
সন্ত্রস্ত বেয়ারা বয় খানা তুলে দেয়
কেমন লাগে তোর বল খেতে ?
হাত ছাড়া কাটা চামচে খামচে ধরে
হাড় কামড়ান ,মাংস ছড়ান
কি সোজা কথা বল।

ছিল না টেবিলের চল, পানির কল ছেড়ে হাত ধোয়া
ছিল চিলুনচী , পাটিটা বিছিয়ে বসে যেতাম সবাই
জামা জুতো ছেড়ে দাওয়ায় হাওয়ায় ফুরফুর বাতাস
প্রাতে দুপুর রাতে খেয়েছি একসাথে
মায়ের হাতে পাতে তুলে উড়কিতে দুধ
মাখিয়ে লবনে ভাত চেটেপুটে হাপুসহুপুস
পাকা আম কিংবা আমশক্তে দই ।

জানিস আমরা তো খেয়েছি
আলু, পটল, বেগুন ভতর্া ; ডাটা ডাল শাক
ঝাল তেল কষান ষোল টাকি ঝোল
চিংড়ির ভূনা, ভাজা কৈ, সর্ষে ইলিশ
আমের আচার ডলে খিচুড়ি ঢেলা
চিতলের কোপ্তা আর কালিয়া রুই
মনে হয় শুনেছিস তুই ।

দু:খ হয় দেখে তোর এই
সারাক্ষন পড়া মুখস্থ করা রাত জেগে নিঘর্ুম
ঘুম থেকে টেনে তোলা বাথরুমে ঠেলা
গাড়ী চড়া স্কুল ভ্যান বাস কার একাকার
সকালের দৌড় যান জট ঘোর
বাড়ীর কাজ ইউনিফমর্ সাজ ব্যাজ টাই হায়
কত কি গায়ে পড়িস ।

নেই দৌড় লাফ ঝাপ, মুখ গোঁজা সোজা
মোবাইল ট্যাবলেট ডেস্কটপ কম্পিউটার যত সব
লোড আনলোড চাপাচাপি মাউসে আঙ্গুল
একাই খেলা বেলা অবেলা চিত্তের দোলা আপনি আপন
নেই বন্ধুর সাথে কোন লেনা দেনা ভাব অভাবের
একাই উঠিস হেসে ভেসে আনন্দ গানে
সাথে নেই কেউ।

আমরাও উঠেছি ভোরে
সারারাত ঘুম পেরে অঘোরে তারপর হয়েছে সকাল
পাখির ডাকে শাখে নিমের ডালে মেজে বিকশিত দাঁত
বাহ্যি পায়খানা সেরে ছাই দিয়ে হাত ধুয়ে
পান্তা ভাত খেয়ে ছুটেছি ইস্কুলে মিলে সদলে
পায়ে হেঁটে খেটে হাতে ধরে বই খাতা
নিতাম যতনে কাধে ।

ছিল ছোটাছুটি লুটোপটি ধুলোয় খেলা কত
কানামাছি ,বউচি ,এক্কাদোক্কা ,ডাংগুলি ,মাবর্েল কাচের
লুকোচুরি পলায়ন দাঁড়িবাধা রাধা বাড়া খাওয়া
মিছেমিছি টক ঝাল ,চোখ লাল চুলোর ধোয়া
হাতে হাতে ধরে শত মায়াডোরে কেটেছে বেলা অবেলা
মেতেছি গানে তানে মিলে মিশে আগান বাগানে
আমরা সাথীরা একসাথে।

দু:খ হয় দেখে তোর এই
চাওয়া পাওয়া বায়না বাহানা খেলনার ধরন
বুলেট পিস্তল তরবারি বন্দুক রাইফেল
রেল ট্যাংক লরী গাড়ি বাড়ির লেগো ভেঙে গড়া
টিভিতে শুনিস ছড়া নাচিস মাজা বাঁকা ব্রেক ডান্স
স্কেটিং রোলার চলার পায়ে নাইকি রেবক
আরো কত কি?

আমাদের ও বায়না ছিল খেলনার
মাটির কলস, হাড়ি পাতিল, কড়াই , কাঠের পিরি
রং করা পুতুল, ধান ভানা ঢেকি, পালকি, চরকি
কাগজের ফুল , বাশের বাশি ছিল গান হাসি
উঠে মগডালে টক আম ঝালে কচুরী দামে
ঝাপ দিয়ে জলে ঢেউ তুলে খেলেছি কত
সব কিছ ভুলে।

বেরাবি কোথায় রাস্তা ঘাট যানজট ছিনতাই
হাইজ্যাক কিডন্যাপ মুক্তিপণ সিরিয়াল দেখিস যেমন
খেলার মাঠ নেই ফাট যত শপিং মল ঝলমল
বিউটি পালর্ার বুটিক কেনা কাটা ফাস্ট ফুড
বড় জোড় শিশু পাকর্ এর মাঝে ঘোরাফেরা
ভালো কি লাগে তোর বল ৩৬৫ দিন
একই জীবন ।

অবারিত মাঠ নদীর ঘাট পাঠ চুকে ঘরে ফেরা
বলতো মায়ে যাবিনা কোথাও আছে ছেলে ধরা
সাহস যোগাত দাদা ঘুংরি থাকতো কোমরে বাধা
বটের ছায়া জড়ান মায়া ঝোপ ঝাড় তেতুল বেতুল
লাল টকটক ফুল মাদার শিমুল কত শত রঙে
হিজল বকুল কদম কেয়া মেঘ ভেঙে নামত দেয়া
কাদা জলে ভেসে শাপলা শালুক ।

দু:খ হয় দেখে তোর এই
শত কাজে জীবন মোড়া তোর আর হয়না ঘোরা
বাবা মার অফিস আদালত নোটিস দিনরাত ব্যাস্ত সবাই
দাদি থাকে দুরে , নানি গেছে মরে , দাদা নানা কেউ নেই
চাচা ফুফু যে যার , মামু খালু কে কার সম্পকর্ে ফাটল
দুনিয়া বেসামাল চারিদিক গোলমাল হুটহাট
ছিনতাই রাহাজানি অকারন খুনাখুনি নিরাপত্তা নাই
একাকি বেরোবি কোথায় ?

আমি এসে হেটে পথ যেখানে দাঁড়ায়
তোর পথ শুরু কি সেথায় ?

৪ টি মন্তব্য : “দুই জীবন”

  1. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    ছিল না টেবিলের চল, পানির কল ছেড়ে হাত ধোয়া
    ছিল চিলুনচী , পাটিটা বিছিয়ে বসে যেতাম সবাই
    জামা জুতো ছেড়ে দাওয়ায় হাওয়ায় ফুরফুর বাতাস
    প্রাতে দুপুর রাতে খেয়েছি একসাথে .......

    হুমমমম্মমমম

    জবাব দিন
  2. সাইদুল (৭৬-৮২)

    মিনি, ম্যাক্সির যুগে একেবারে পূর্ণ দৈর্ঘ কবিতা।
    অনেক আক্রণে ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে শব্দ নিয়ে খেলেছেন। খুব একটা রুপক টুপক নেই , কঠিন কোন শব্দ নেই অথচ শব্দ গুলি একেবারে ঠিক ঠাক । অনুপ্রাসের বাড়াবাড়ি নেই, অথচ ব্যঞ্জনাটা ষোল আনা।
    আর কতকিছু যে এসেছে , কিন্তু ফেলে দেবার নত কিছু নেই। এমন কি পায়াখানা শব্দটিও না।
    দুই সময়ের জীবন যাপনটা এসেছে একেবারে পরিষ্কার।

    খুব ভালো। খুবই


    যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।