সমুদ্রকন্যার সাথে সাক্ষাৎ

বহুদিন পর ব্লগে আসলাম। আসলে অল্পবিস্তর লিখতে হলে অবশ্যই প্রচুর পড়াশোনা করতে হয় আর সেই অভ্যাসটা আমার একদমই নষ্ট হয়ে গিয়েছে আনফরচুনেটলি। শর্ট কাট প্রসেসে এখন শুধু মুভি আর সিরিয়াল দেখে দিনানিপাত করি। তবে বিগত বছরের শেষ থেকে কিছুটা ঘোরাঘুরি শুরু করেছি আর সেই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু লেখার চেষ্টা করছি। আগেই বলে নেই,লাস্ট ১/২ বছর আমি তেমন কোনো গল্পের বই তো দূরে থাক- কেউ যদি বিশাল আকৃতির ফেইসবুক স্ট্যাটাস দেয় আমি সেটাও পড়ি না; নিতান্ত কষ্ট করে লিখেছে দেখে একটা লাইক দিয়ে দেই। পড়ার অভ্যাস না থাকার কারণে লেখা মানসম্মত হওয়ার পসিবিলিটি কম। তাই লেখায় ভুল হলে ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন সবাই ……

খুব বেশিদিন আগের কথা না যখন আমরা বাংলাদেশের টুরিস্ট স্পট বলতে শুধুই কক্সবাজার, কুয়াকাটা আর সিলেটের চা-বাগান আর জাফ্লং কে জানতাম। এই অবস্থা এখন পুরা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে। এখন কমবেশি সবাই সাজেক, বান্দরবান, বিরিশিরি (সুসাং- দুর্গাপুর), বিছানাকান্দি-লক্ষণছড়া-রাতারগুল-হামহাম এই জায়গাগুলোর কথা জানেন। ঘুরতে জাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রায়োরিটি লিস্টে এসব জায়গাই থাকে। তবে কক্সবাজারের এপিলটা অনেকটা আগেড় মতনই আছে। যারা সাগর ভালোবাসে- এমন অনেকের কথাই জানি যে তারা বছরে কম করে একবার হলেও কক্সবাজার যায়। বন্ধুদের অনেকেই আছে ক্ষানিক চিল মারতে ১/২ দিনের শর্ট ট্যুরে চলে যায় এখানে। আর বিছানাকান্দির লোভে যারা সিলেট যায়,তারা সময় সুযোগ পেলে জাফ্লং টাও দেখে আসে। যদিও আমার পরিচিতদের মধ্যে কেউই এমন পছন্দ করেনি জাফ্লং [আমার অবশ্য পাহাড় আশেপাশে থাকলে বুড়িগঙ্গাও ভালো লাগতো, সেখান জাফ্লং তো ভালো লাগবেই] তবে সবার লিস্ট থেকে অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে যে যায়গা, সেটা কুয়াকাটা। আমার ব্লগ “কুয়াকাটা” কে নিয়েই।

কুয়াকাটা- “সমুদ্রকন্যা” যার অপর নাম। এখানে যাওয়ার শখ আমার স্পেসিফিকালি ২০০৭ থেকে। আমার বড় ভাই তার ভার্সিটি ফ্রেন্ডদের সাথে পুরাদেশ ঘুরে বেড়াতো। তখন ছবি তোলা আর ফেইসবুকে পোস্টের ট্রেন্ড চল ছিল না। তারপরেও শুধু গল্প শুনেই ট্যুরের পুরা ফিল পেয়ে যেতাম। ভাইয়ারা সব ফ্রেন্ড (মেয়েরাও কেউ কেউ) কুয়াকাটা থেকে ফেরার সময় মাথা টাক্কু করে ফেলেছিল …. কুয়াকাটা দেখার ইচ্ছা আমার সেই তখন থেকে। যাই হোক, মেলা অদরকারি কথা যখন বলেছিই আরো দুই-একটা বলেই ফেলি। আমাদের দেশে মেয়েদের কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপারে ট্যাবুগুলো কবে যাবে জানি না। হয় ফ্যামিলি সাপোর্টিভ হবে না, নাহয় সেইফ- সাউন্ড ট্যুর গ্রুপ পেতে সক্ষম হবে না। আরেকটা ব্যাপার হলো, আমার অনেক মেয়ে ফ্রেন্ড আছে যারা নিজেরাই ইচ্ছুক না। অন্যদের ছবি দেখে হা-হুতাশ করবে কিন্তু যাওয়ায় আগে যদি জিজ্ঞেস করি, যাবি? তখন অদরকারি এক্সকিউজ শুরু হয়ে যাবে। অনেক ক্ষেত্রে বয়ফ্রেন্ড এর নিষেধ মান্য করে যেতে চায়না কিংবা থাকার যায়গাটা খুব আরামদায়ক না হওয়ায় যেতে চায়না (১ দিনের ট্যুর হলেও), আবার অনেক ক্ষেত্রে শুধু শারীরিক কষ্টের ব্যাপারটা চিন্তা করেই পিছপা হয়। এসব কারণে আমি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ট্যুরমেট ম্যানেজ করতে পারিনা, অনেক প্ল্যান ক্যানসেল করতে হয়। ‘কুয়াকাটা’ যাওয়ার সময়ও এমন কিছু ব্যাপার ফেইস করতে হয়েছে। যাহোক, আনপ্লিজেন্ট ব্যাপারগুলো বাদ দিয়ে এখন মূল ঘটনায় আসি ….

সরকারী ছুটি আর শুক্র-শনি মিলিয়ে ২৪ অগাস্ট রাতে আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করবো ঠিক করলাম। প্রথমে বরিশালের লঞ্চের টিকেট কাটতে গিয়ে জানা গেলো যে লঞ্চ স্ট্রাইক। বাসে যেতে নাকি কম করে হলেও ১৬-১৭ ঘন্টা লাগবে এমন ভবিষ্যৎবাণী করে অনেকেই ট্যুরে যাবে না বলে দিল! মানুষ কম মানে খরচ বেশি, আরো ১ জন ক্যানসেল করল। আমি নাছোড়বান্দা, গেলে কুয়াকাটাই যাবো- অন্য কোথাও না। ঢাকা- কুষ্টিয়া ১৬/১৭ ঘণ্টা জার্নির অভিজ্ঞতা আমার আছে তাই সাহস করে বাসের টিকেট করে ফেললাম, ‘সুরভী এক্সপ্রেস’- ঢাকা টু কুয়াকাটা। সাথে আরো ৫ জন। দ্য আইরনি ওয়াজ লঞ্চ স্ট্রাইক উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল। আমার হাঁটু বন্ধু লঞ্চের টিকেটও কর ফেললো। বাস এবং লঞ্চ দুই ধরনের টিকেট তখন আমাদের হাতে। পরে লঞ্চের টিকেট সেল করে আমরা বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই কারণ অনেকেই কম খরচ, কম আরাম এই মন্ত্রে বিশ্বাসী…. আর আমি ট্যুরে যেতে পারলেই খুশি। যাহোক ফিরে যাই ২৪ অগাস্টের রাতে। ঢাকা সেদিন ছিল আসন্ন তিনদিন হলিডে প্রেসারে পুরা ডেডলকড।বাস ছাড়ার কথা কলাবাগান থেকে, আমরা কলাবাগান পৌঁছে জানলাম জ্যামের কারণে বাস ছাড়বে গাবতলি থেকে… কোনো সিএনজি আমাদের কে গাবতলি নিতে রাজি না, চাইলেও পারত না। জ্যাম এর কারণে সব যানই রাস্তায় সেম যায়গায় দাঁড়িয়ে আছে আর বাস থেকে উপচে পড়া মানুষগুলো তখন খুব আগ্রহ নিয়ে আমাদের ৬ জনের দৌড়াদৌড়ি দেখছে। বিশিষ্ট হাঁটু পার্টিদের ইন্সপিরেশনে আমরা কলাবাগান থেকে প্রায় কলেজগেট হেঁটেই চলে আসলাম, তারপর অবশেষে সিএনজি দিয়ে গাবতলি এসে বাসে চেপে পড়লাম। ছোট্ট একটা সাজেশন দিয়ে রাখি, বাসে যাওয়ার কথা কেউ মাথায় আনবেন না। জার্নির কষ্ট তেমন না কিন্তু বাসের লোকগুলোর ব্যাবহার ভাল না। কুয়াকাটায় আসলে গিয়ে যা দেখলাম, বরিশাল বিভাগের বাইরে থেকে খুব একটা মানুষ যায় না ( হতে পারে অফ সিজন বলে যায় নি, আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বললাম)। লোকাল বা বিজনেসম্যান ছাড়া যারা যায় তারা বেশির ভাগ লঞ্চেই যায় হয়তো, যে কারণে বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটা মানুষের ব্যাবহারই বেশ খারাপ ছিল… হতে পারে ‘সুরভী’ বাস এমন কিংবা আমাদের লাক খুব খারাপ ছিল। যাই হোক আরেকটা ব্যাপার হলো, ফরিদপুর থেকে বরিশাল এর রাস্তা ভাল না। আমি অবশ্য ঝাঁকিওয়ালা রাস্তায় খুব ভাল ঘুম দিতে পারি, স্মুদ রাস্তায় আমার ঘুম হয়না। কুয়াকাটা পৌঁছলাম পরদিন সকাল ৭ টার দিকে।

একটা কথা আলাদা করে বলি, বরিশাল- কুয়াকাটা যাওয়ার রাস্তা অনেক ইম্প্রুভড এখন। মাত্র একটা ফেরি আর সবখানে পারাপারের জন্য ব্রিজ ছিল। বরিশাল থেকে কুয়াকাটা যেতে আমাদের মাত্র আড়াই ঘন্টা লেগেছে।

কুয়াকাটাতে আমরা ছিলাম “হোটেল নিলাঞ্জনা”তে। চেইক ইন করে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে নিতে নিতে প্রায় ১০ টা বেজে গেল। কুয়াকাটায় টুরিস্ট স্পট গুলো ঘুরিয়ে দেখায়, এমন নেক গুলো প্যাকেজ আছে। ট্রাভেল গ্রুপ গুলো থেকে আইডিয়া নিয়ে গিয়েছিলাম কিছুটা। কুয়াকাটার প্রধান ট্রান্সপোর্ট হল মোটর সাইকেল। আমার চোখে আর বাইক আর কিছু ভ্যান ছাড়া আর কোনোকিছুই পড়ে নি। একটা বাইকে দুইজন করে টুরিস্ট নেয় ওরা। আমরা জনপ্রতি ৫০০/- করে বাইক ঠিক করলাম। পুরোদিনে আমাদের কে ঘুরিয়ে দেখাবে গঙ্গামতীর চর- কাউয়ার চর- লাল কাঁকড়ার চর- ঝাউবন- বৌদ্ধমন্দির- রাখাইনপল্লী- কুয়াকাটার ‘কুয়া’- ত্রিমোহনা- ঝিনুক মেলা- লেবুর চর। ওরা আপনাকে লেবুর চর আগে দেখাতে চাইবে, বলবে দুপুরের খাবার ওখানে খাওয়ার জন্য, পাত্তা দিবেন না। লেবুর চর’কে রাখবেন দিনের শেষ ভেন্যু হিসেবে। লেবুর চরে সন্ধ্যা দেখার অভিজ্ঞতা আপনার জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম অভিজ্ঞতার একটি হবে। বাইকে চড়ে যাওয়ার সময় কোথাও ছবি তুলতে চাইলে তুলে নিবেন, ফেরার সময় তুলবো ভেবে বাদ দেবেন না। কারণ ফেরার সময় অন্য পথ ধরে ফেরা হয়।
সাগরকে হাতের ডান দিকে রেখে শুরু করলাম আমাদের বাইক রাইড। প্রথম গন্তব্য, গঙ্গামতীর চর। কুয়াকাটার একটি বিশেষত্ব হল, এটি (আমার জানামতে) পৃথিবীর একমাত্র সমুদ্রসৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায়। আর সূর্যোদয় দেখার জন্য আপনাকে যেতে হবে এই গঙ্গামতীর চরে। আমরা গঙ্গামতীর কাছে গেলাম প্রায় দুপুর যখন ছুঁইছুঁই।

গাছের নাম গোমাগাছ

গাছের নাম গোমাগাছ

গঙ্গামতীর চরে

গঙ্গামতীর চরে

এরপর কাউয়ার চর। কিন্তু কাউয়ার চরে কোন কাউয়ার দেখা পেলাম না। দ্রুত বাইকে পার হয়ে লাল কাঁকড়ার চরের উদ্দেশ্যে যাত্রা চালিয়ে গেলাম।

বাইক রাইড

বাইক রাইড

লাল কাঁকড়ার চরে প্রচুর লাল কাঁকড়া আছে কিন্তু মানুষের আওয়াজ পেলেই গরতে পালিয়ে যায়। গাইড হাত ঢুকিয়ে কাঁকড়া বের করে এনে হাতে দিয়ে দিলো ছবি তোলার জন্য। কাঁকড়া যে এত্ত এডোরেবল এটা জানতাম না। এন্টেনা থেকে বের হওয়া চোখ খুব্বি কিউট। গাইড আমাদের জানালো এই লাল কাঁকড়া গুলো নাকি খাওয়ার জন্য না। এগুলো টুরিস্টদের ওরা সংরক্ষন করে। খাওয়ার গুলো নাকি আলাদা।

বিষময় চোখ নিয়ে বিস্মিত কাঁকড়া

বিষময় চোখ নিয়ে বিস্মিত কাঁকড়া

বহুত প্যারা দিসি এই কাঁকড়াটাকে আমি

বহুত প্যারা দিসি এই কাঁকড়াটাকে আমি

এরপর গাইড আমাদের নিয়ে গেলো ঝাউবনে। নাম শুনে যেমন মনে হয় ঠিক তেমন না ঝাউবনটা। ব্লগ লিখব এমনটা চিন্তা করে যাইনি, তাই বেশিরভাগ যায়গাতেই পার্সোনাল ছবি তোলা হয়েছে। ব্লগে পার্সোনাল ছবি এটাচ করা যায় কিনা আমি জানি না। তবে এই ছবিতে ঝাউবনের সৌন্দর্যের ৫% ও নাই।

ঝাউবন

ঝাউবন

ঝাউবনে তোলা প্রিয় ছবিটা__

মডেল বান্ধবীর ফটোশ্যুট ক্রে দিলাম

মডেল বান্ধবীর ফটোশ্যুট করে দিলাম

ঝাউবনের পরে গাইড নিয়ে গেলো আমাদের রাখাইন পল্লী আর বৌদ্ধমন্দির। যাওয়ার পথে রাস্তায় কেওড়ার বন এর মাঝ দিয়ে পাকা সড়ক ধরে যেতে হয়। সুন্দরবনের মিনিয়েচার যেন দুপাশে। গাইড বাইক থামিয়ে আমাদের কেওড়ার ফল পেড়ে দিয়েছিল, খেতে অনেকটা আমলকির মতন। রাখাইন পল্লির ব্যাপারে গাইড থেকে জানতে পারলাম ওরা মূলত এখন যেখানে বাস করে এখানে আগে বাস করত না। বীচ এর কাছে যেখানে সব হোটেল-মোটেল গড়ে উঠেছে, ওখানে ছিল ওদের বাস। ধীরে ধীরে সরে আসতে হয়েছে ওদের। এখন যেখানে আছে এখানেও খুব কম রাখাইনই থাকে। খুব বেশি হলে ২০ টি পরিবার। বেশিরভাগই অন্য কোথাও চলে গেছে। যারা আছে তাদেরকে সরকার এখানে টীনশেড বাড়ি বানিয়ে দিয়েছে থাকার জন্য। কিছু দোকান আছে এদের কিন্তু সেখানে যা কাপড়-শাড়ি-ব্যাগ দেখলাম তার সবই ঢাকার নিউ মার্কেটে এভেইলেবল। খুব একটা বিকিকিনি হয়না। আমরা বাদে অন্য কোন পর্যটক চোখে পড়েনি। যাই হোক, এখানকার মন্দিরে আছে একটি ঐতিহ্যবাহী ৩৬ ফুট লম্বা বৌদ্ধমূর্তি। তারপরে দেখলাম কুয়াকাটার বিখ্যাত ‘কুয়া’।

তিনফুট বেদিতে ৩৬ ফুট লম্বা মূর্তি

তিনফুট বেদিতে ৩৬ ফুট লম্বা মূর্তি

সেলফিদর্শন

সেলফিদর্শন

পরের যাত্রা সাগরসৈকত এর উদ্দেশ্যে, এবার সাগর পড়লো হাতের বাম পাশে। কক্সবাজারের মতন এখানকার ঢেউগুলো ফেনিল না। ঢেউয়ের আকৃতিও ছোট। তব যে ব্যাপারটায় আমি সবচেয়ে অবাক হয়ছি তা হলো, কুয়াকাটায় সাগর হরাইযন থেকে উপরের দিকে উঠে গেছে ক্রমশ কিছুটা। প্রচুর মানুষ ছিল বীচে। ওদের কথার টোনে বুঝতে পারলাম অধিকাংশই বরিশাল বিভাগের মানুষ।

সমুদ্রকন্যা

সমুদ্রকন্যা

সাগরদর্শন

সাগরদর্শন

সাগরের নোনতা জলে অনেকক্ষণ ডুবোডুবি করে আমরা ফিরে আসলাম হোটেল। চেঞ্জ করে দ্রুত খেতে চলে গেলাম কাছের একটা হোটেলে। আমার ধারণার চেয়ে খাবার বেশ এক্সপেন্সিভ ছিল। হোটেলের চেহারা নিতান্ত সাধারান ভাতের হোটেল দেখে ধারণা করেছিলাম। তবে তাজা মাছের সুস্বাদু টেস্ট এখনো মুখে লেগে আছে। কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে আমরা শেষ বিকেলে আবার বের হলাম। সাগর হাতের বাঁয়ে রেখে সূর্যকে একদম সামনে রেখে ত্রিমোহনার দিকে।

সাগর যে হরাইযন থেকে কিছুটা উপরের দিকে উঠে গেছে ক্রমশ তা কি ছবিতে বোঝা যায়?

সাগর যে হরাইযন থেকে কিছুটা উপরের দিকে উঠে গেছে ক্রমশ তা কি ছবিতে বোঝা যায়?

ত্রিমোহনা- তিনটা নদী এখানে এসে সাগরের সাথে মিশে গেছে। পেছনে ঝিনুক মেলা আর পাশে অনেক দূরে ছোট্ট করে দেখা যায় ফাতরার বন। নদীগুলোর নাম মনে নাই।

ত্রিমোহনা

ত্রিমোহনা

লেবুর চরে যাওয়ার পথে পড়ে ঝিনুক মেলা। অসংখ্য শামুক-ঝিনুক-কড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ভাগ্য প্রসন্ন হলে আমাদের মতন আপনিও পিচ্চি স্টারফিশের দেখা পেতে পারেন।

ঝিনুকমেলা

ঝিনুকমেলা

ঝিনুকমেলার স্টার এই পুচকে স্টারফিশ

ঝিনুকমেলার স্টার এই পুচকে স্টারফিশ

এইবার বার্নি স্টিনসনের মতন বলতেই হবে, Wait for it….. কারণ পুরা ট্যুরের সবচেয়ে লিজেন্ডারি যায়গা ছিল “লেবুর চর”। লেবুর চরের সন্ধ্যা ছিল আমার অলমোস্ট আধা পার করে দেয়া জীবনের দি মোস্ট বিউটিফুল ডাস্ক। কালার প্যালেটের কোন রঙটা নেবে আর কোনটা নেবে না এটা বোধয় আকাশ ডিসাইড করতে পারছিল না। সব রঙের মিশেলে এমন মায়াবী একটা আকাশ ছিল সেদিন!!

সূর্য ডুব দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে

সূর্য ডুব দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে

বাইকে মাঝে মাঝে সাগরে নামিয়ে নিচ্ছিলো পাইলট ভাই। ঢেউগুলো স্ফুরণ উড়িয়ে যাচ্ছিল তখন...

বাইকে মাঝে মাঝে সাগরে নামিয়ে নিচ্ছিলো পাইলট ভাই। ঢেউগুলো স্ফুরণ উড়িয়ে যাচ্ছিল তখন…

লেবুর চর

লেবুর চর

before sunset

before sunset

walking into the sea

walking into the sea

লেবুর চরে বেশ কিছু দোকান আছে যেখানে অনেক রকম তাজা মাছ পাওয়া যায়। পছন্দ করলে ওরা ভেজে দেয়। সাথে দেয় প্যাকেট সস। মাছ পছন্দ করে তারপর সবাই বীচে বসে সানসেট দেখে। সূর্যটা একদম পানির সাথে মিশে যায় ভ্যানিশিং পয়েনটে। গরম গরম সামুদ্রিক মাছ ভাজা, আকাশে রঙ বেরঙ এর খেলা আর তার প্রতিচ্ছবি বীচে, সাগরের শেষ বেলার গর্জন আর ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসা……… সবমিলিয়ে সন্ধ্যাটা ছিল ম্যাজিকাল!!!!
লেবুর চর থেকে আমরা হোটেলে ফিরে আসি সন্ধ্যার বেশ কিছু পরে। কফি খেয়ে কিছুটা ফ্রেশ হয়ে চলে যাই বীচে আবার। প্রায় রাত ১২ টা পর্যন্ত আমরা বীচে ছিলাম। এখানে একটা কথা বলে রাখি। আমাদের টিমে মেয়েদের সংখ্যা ছিল বেশি। কুয়াকাটা যাবার আগে আমি অনেকবার শুনেছি যায়গাটা সেইফ না, সন্ধ্যার পর ইলেক্ট্রিসিটি থাকে না, ট্রান্সপোর্ট ব্যাবস্থা ভাল না, ফোন এর নেটওয়ার্ক ভালোনা এটসেট্রা এটসেট্রা…. কিন্তু যা দেখলাম তা হল প্রচুর টুরিস্ট পুলিশ, টুরিস্টদের মধ্যে মেইল ফিমেল প্রায় সমান সংখ্যাক, সন্ধ্যার পরেও ইলেক্ট্রিসিটি ছিল, জেনারেটর ছিল, ফোনে নেটওয়ার্কও ছিল, ট্রান্সপোর্ট নিয়ে চিন্তা করতেই হয়নি। সবখানে বুক করা বাইক নিয়ে গিয়েছি সন্ধ্যা পর্যন্ত আর তারপরে বীচ থেকে হোটেল ভ্যানেও গিয়েছি আবার হেঁটেও গিয়েছি। ওয়াকিং ডিস্টেন্স ১০ মিনিটের মতন। মেয়েদেরদের কে রাতে বীচে বারবিকিউ করতেও দেখেছি- তবে আসল কথা সেইফ থাকার মতন সিচ্যুয়েশন আছে। নেহাৎ বোকামি বা অতি স্মার্ট না হলে ট্রাবল হওয়ার কথা না। এই কথা কেন বললাম? কিছু গ্রুপ কে দেখলাম রাতের বেলা ফোনের ফ্ল্যাশলাইট অন করে সাগরে নামতে ভাঁটার সময়।
রাতে হোটেলে ফিরেই ঘুম। পরদিন খুব ভোরে অন্ধকার থাকতেই বের হয়ে পড়লাম সানরাইজ দেখতে। হোটেল থেকে বের হয়ে অনেক কেই দেখলাম বীচে যেতে। মেঘ থাকায় সানরাইজ দেখতে পারলাম না। শীতকালে নাকি একদম ক্লিয়ার দেখা যায়।

সূর্যের ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষায়

সূর্যের ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষায়

কাঁকড়ার মর্নিং ওয়াক

কাঁকড়ার মর্নিং ওয়াক

সকালে ব্রেকফাস্ট শেষ করে আমরা সব গুছিয়ে হোটেল থেকে চেইক আউট করলাম। ব্যাগগুলো হোটেলের লবিতে রেখে বের হলাম। এইবার গন্তব্য ফাতরার বন- শুঁটকি পল্লী- লাল কাঁকড়ার দ্বীপ- সোনাদিয়ার চর। ফাতরার বন আসলে সুন্দরবনের একটা ছোট অংশ। ট্রলারে করে যেতে হয় এখানে। ভাড়া ছিল ২০০/- পার হেড। ফাতরার বন যাওয়ার পথেই পড়ে একপাশে শুঁটকিপল্লী আর আরেক পাশে লাল কাঁকড়ার দ্বীপ। ফাতরার বনে ট্রলার ভিড়িয়ে বনের মাঝ দিয়ে হেঁটে পৌঁছে যায় সাগরের মোহনায়। আমরা শুঁটকি পল্লীতে নামিনি। লাল কাঁকড়ার দ্বীপেও দেখলাম কাঁকড়া তেমন নেই। ট্রলারের গাইড তেমন আগ্রহীও ছিল না কাঁকড়া খুঁজে টুরিস্টদের হাতে তুলে দিতে।

ফাতরার বনের গহীনে

ফাতরার বনের গহীনে

ফাতরার বনের পাড়

ফাতরার বনের পাড়

সোনাদিয়ার চর____

সোনাদিয়ার চর

সোনাদিয়ার চর

শেষমেশ সোনাদিয়ার চর ঘুর ফিরে এলাম বীচে। আবারো জলকেলি পর্ব। আসলে সাগর সামনে দেখে পানিতে ঝাঁপ না দেয়াটা ব্যাপক সংযমের বহিঃপ্রকাশ।
হোটেলে ফিরে ম্যানেজার কে বলার পর একটা খালি রুম খুলে দেয় আমাদের ফ্রেশ হওয়ার জন্য। এর জন্য তারা কোনো চার্জও রাখেনি। কারো পূর্বপরিচিত না হওয়ার পরেও এতোটা অমায়িক ব্যবহার আমরা আশা করি নি। তাই আমার পরিচিত কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি “হোটেল নীলাঞ্জনা” রিকমেন্ড করেছি কয়েকজনকে।
সবশেষে লঞ্চে চড়ে দিগন্তের শেষ সীমা পর্যন্ত তারায় ভরা একটা আকাশ মাথায় নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসা…. সুন্দর কিছু মুহূর্তের অভিজ্ঞতা ‘কুয়াকাটা’ আমার ল্যাপটপে আর মেমরিতে ফোল্ডার করে নিলো। যারা আমার মতনই জানতেন এবং জানেন যে কুয়াকাটা পিছিয়ে আছে সুযোগ সুবিধা আর সবকিছুতে, তাদের কাছে রিকোয়েস্ট একবার ঘুরে আসুন। খুব লাক্সারিয়াস না হলেও খুব খারাপ অভিজ্ঞতা হবে না। ন্যাচারাল দিক থেকে কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা কোনটাই কম সুন্দর না। কুয়াকাটা কম্পারেটিভলি এখনো অনেক ন্যাচারাল আর পরিষ্কার। এখানকার ডাবওয়ালারা দেখলাম ডাব নিয়ে বীচে যেতে দিচ্ছে না। তারপরেও মানুষের ব্যাবহারে যে পরিবর্তন হয়েছে তা না। অনেককেই দেখি মালদ্বীপ, বালি, পাতায়া এসব জায়গার প্রশংসা করে। সত্যি বলতে কি, আমি নিজে তো এসবের কোনোটাতেই যাইনি তারপরেও ছবি দেখে যা মনে হয় সেটাই বলি; ওদের ট্যুরিজম অনেক এগিয়ে গিয়েছে ওদের সচেতনতা আর ইফোর্ট এর মাধ্যমে। ‘বালি’ সার্চ দিলে তো বেশির ভাগ ছবিতে আমি রিসোর্ট আর ফাইভ স্টার হোটেল এর লাক্সারিই দেখা যায় দেখলাম। মালদ্বীপের মতন অতটা না হলেও তার কিছুটা হয়তো আমাদের দেশেও করা সম্ভব তার জন্য আমাদের দরকার নিজেদের দেশের ট্যুরিজমের প্রতি মনোযোগী হওয়া আর যায়গাগুলোর সৌন্দর্য নষ্ট না করা। হয়তো আমাদের দেশেও এমন হবে। আশা করতে ক্ষতি কি!!!

৩,৬০১ বার দেখা হয়েছে

১৩ টি মন্তব্য : “সমুদ্রকন্যার সাথে সাক্ষাৎ”

  1. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    আমাদের দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ গত দেড় দশকে। কিন্তু সে মাত্রায় বাড়েনি, সেবা, যাতায়াত ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গে আবশ্যক অনেক কিছুই। তবু আমরা অনেক অনেক নতুন পর্যটন স্থানের সন্ধান পেয়েছে এই সময়ে। যা সবাইকে ঘুরে বেড়াতে আরো উৎসাহী করছে।
    লেখাটায় কুয়াকাটা নিয়ে অনেক তথ্য তুলে ধরায় সাধুবাদ। পড়ে যাবার আগ্রহ জোরদার হবে অনেকেরই।

    জবাব দিন
  2. আমিন(০০-০৬)

    কুয়াকাটার নাম ছোটবেলা থেকেই শুনেছি কিন্তু কখনো দেখার আগ্রহ জাগে নি। প্রতিবারই মনে হয়েছে চট্রগ্রাম, কক্সবাজার কিংবা সেন্ট মার্টিনের চেয়ে নতুন কিছু তো আর দেখবো না ! আমার মতো অনেকেরই ভুল ভাঙ্গানোর জন্য ধন্যবাদ । খুবই প্রাঞ্জল একটি লেখা । ভালো লাগছে :clap: :clap:


    Coming together is a beginning; keeping together is progress; working together is success..

    জবাব দিন
    • মীম (২০০৬-২০১১)

      আসলে আমাকেও সবাই এই কথাটাই বলেছিল যে কক্সবাজার দেখার পর কুয়াকাটা ভাল্লাগবে না...... কিন্তু আমার তো বেশ ভালোই লাগলো... আর কুয়াকাটা এখনো বেশ ন্যাচারাল আছে আর বীচটাও বেশ পরিষ্কার...... সময় পেলে ঘুরে আসবেন ভাইয়া আশা করি 🙂


      দ্যা 'দুই' নাম্বার ক্যাডেট

      জবাব দিন
  3. জিহাদ (৯৯-০৫)

    বেশ ঘুরাঘুরি করে বেড়াচ্ছো কয়েকমাস ধরে! কুয়াকাটা নিয়ে আমিও একটা ব্লগ লিখসিলাম। তোমার ব্লগ পড়ে অনেক ঘটনা আবার মনে পড়ে গেল।


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
  4. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    আমি ২০০৫-২০০৬ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসে কুমিল্লা এরিয়ার কর্নেল এডমিন হিসেবে কর্মরত ছিলাম। তখনকার দায়িত্ব হিসেবে ফেনী গার্লস ক্যডেট কলেজ প্রকল্পটির সাথে আমিও কিছুটা যুক্ত ছিলাম। স্থান নির্ধারণ, অবকাঠামো নির্মাণ, ২০০৬ থেকে শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান, ইত্যাদি আমার কার্যপরিধির আওতাভুক্ত ছিল। নির্মাণাধীন অবস্থায় বেশ কয়েকবার কলেজটি পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। আজ খুব ভাল লাগলো এই ব্লগে ঐ কলেজেরই প্রথম ব্যাচের দ্বিতীয় (ক্যাডেট নং অনুযায়ী) ক্যাডেটের একটা সুন্দর ভ্রমন কাহিনীমূলক পোস্ট পড়ে।
    কুয়াকাটায় আমি অনেক আগে একবারই গিয়েছিলাম, ২০০১ সালের শেষের দিকে। তখন এটা তেমন সুন্দর কিছু ছিলনা। একটা মাত্র ভাল হোটেল ছিল, নাম মনে নেই। আকাশে বাতাসে শুধু শুঁটকির গন্ধ ছিল। হাঙ্গর মেরে সেগুলোকে রোদে শুকানো হতো। বৌ্দ্ধমূর্তিটাও দেখেছিলাম। রাখাইন সম্প্রদায়ের মেয়েগুলোকে খুব স্মার্ট মনে হয়েছিলো।
    যে ব্যাপারটায় আমি সবচেয়ে অবাক হয়ছি তা হলো, কুয়াকাটায় সাগর হরাইযন থেকে উপরের দিকে উঠে গেছে ক্রমশ কিছুটা - বেশ চমকপ্রদ তথ্য।
    ফাতরার বন - এত সুন্দর জায়গায় এমন অসুন্দর নামটা ঠিক মানায় না।
    কালার প্যালেটের কোন রঙটা নেবে আর কোনটা নেবে না এটা বোধয় আকাশ ডিসাইড করতে পারছিল না। সব রঙের মিশেলে এমন মায়াবী একটা আকাশ ছিল সেদিন!! - চমৎকার এ কাব্যিক মন্তব্যে এবং ছবি দেখে মুগ্ধ হ'লাম।
    গরম গরম সামুদ্রিক মাছ ভাজা, আকাশে রঙ বেরঙ এর খেলা আর তার প্রতিচ্ছবি বীচে, সাগরের শেষ বেলার গর্জন আর ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসা……… সবমিলিয়ে সন্ধ্যাটা ছিল ম্যাজিকাল!!!! - একটা সুন্দর সন্ধ্যার মনোরম বর্ণনা দিয়েছো।
    কারো পূর্বপরিচিত না হওয়ার পরেও এতোটা অমায়িক ব্যবহার আমরা আশা করি নি। তাই আমার পরিচিত কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি “হোটেল নীলাঞ্জনা” রিকমেন্ড করেছি কয়েকজনকে। - ভাল করেছো। ভাল কাজের প্রশংসা করাই উচিত, না করাটা বরং দোষের। আর তা ছাড়া হোটেলের কাব্যিক নামটাও আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।
    তবে যাত্রার প্রস্তুতি পর্বের বর্ণনাটা আরেকটু ছোট হলে ভাল হতো।
    ভাল পোস্ট, অভিনন্দন!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।