ক্যান্সার

প্রিয়তমা,

কেমন আছ? নিশ্চই ভাল। আমি? আমার হিসেব করা সময় যদি ঠিক হয়, তাহলে তুমি যখন এ লেখাটা পড়ছ, আমি তখন নেই। নেই মানে নেই। আমি চলে গিয়েছি এই জীবনের প্রতি প্রচন্ড এক বিতৃষ্ণা নিয়ে। প্রকৃতির নিয়ম মেনেই হয়ত তোমার জীবনের শূন্যস্থান পূরন হয়ে গেছে।

তুমি হয়ত ভেবেছিলে যে আমিতো এটাই চেয়েছিলাম। হ্যা, আমি চেয়েছিলাম, আমি স্বীকার করছি। কিন্তু, কখনো কি চিন্তা করে দেখেছ কেন আমি এমনটা চেয়েছি? তোমার কি সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে? সেই বিকেলগুলোর কথা, একে অপরের চোখে চোখ রেখে যখন বাকরুদ্ধ মূহুর্তগুলো পার হয়ে যেত। সেই নির্ঘুম রাতগুলো যখন আমরা একে অপরের স্বপ্নের মাঝে হারিয়ে যেতাম। একটা কথা মনে পরলে এখনও হাসি পায়। আমরা যখন রিকশায় চড়ে ঘুরতাম, তোমার পাশে শক্ত হয়ে বসে থাকতাম আমি। তুমি আমার উপর রাগ করতে। জানো, রেগে গেলে তোমাকে আরও বেশি সুন্দর লাগতো। তাই মাঝে মাঝে তোমাকে ইচ্ছে করে রাগাতাম। কি? মনে পড়ে? তুমি হয়ত অবাক হচ্ছো এটা ভেবে যে এগুলো আমার মনে আছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, এগুলো আমি এক মূহুর্তের জন্যেও ভুলিনি। তুমি সবসময় জিজ্ঞেস করতে তোমার কোন খুত আছে কিনা, আমি সবসময় মিথ্যে বলতাম যে না, নেই। কিন্ত খুত ছাড়া তো মানুষ হয়না। সবারই কোন না কোন খুত থাকে। আমার মনে হত, ভাল যখন তোমাকে বেসেছি, তখন তোমার গুন আর দোষ দুটোকেই ভালবাসব।আর আমি? আমি তো ছিলাম দোষে ভরা। আমার প্রতিটা কাজেই তুমি ভুল খুজে পেতে। সেইযে একবার চড় মেরে তোমার গালে পাচ আংগুলের দাগ বসিয়ে দিয়েছিলাম, সে কথা কি মনে আছে? আমার কাছে সমতা প্রিয় ছিল, তুমিই তো আগে মেরেছিলে, তাইনা? কত স্মৃতি লুকিয়ে আছে মনে, যা এখনও আমার একাকী মুহুর্তগুলোকে রঙিন করে তোলে। সেইযে একবার ঘুরতে গিয়ে হারিয়ে গেলাম, হ্যা, আমার মনে আছে, তোমার আছে কি? তারপর রিকশাচালক বলেছিল,” আপনারা পোলাপান মানুষ, এত ডরান ক্যান?” সেই একটা ঘটনা নিয়ে কত হাসাহাসি করেছি দুজন। তুমি বলতে, তোমার স্বপ্ন ভাংগার জন্য তুমি আমাকে সবসময় দোষী ভাববে। কিন্তু এটা কি ভেবে দেখেছ, আমি স্বপ্ন ভাংলাম বলেই তো এখন তুমি নতুন স্বপ্ন দেখছ। তুমি ভাল থাকতে পারছ। তুমি হয়তো ভাবছ, কী লাভ এসব কথা মনে করে, আমিই তো বারবার দুরে ঠেলে দিয়েছি তোমায়। কিন্তু আমার মনে পড়ে, কারন আমার জীবনের প্রথম এবং শেষতক তুমিই ছিলে একমাত্র ভালবাসা। আমি কখনো তোমার অতীত বা গোপনীয় কোন ব্যাপার নিয়ে ঘাটাইনি। তুমি যে আমাকে ভালবাসতে, তাতেই আমি সুখী ছিলাম। যখন আমি ছেড়ে যাই, তুমি বলেছিলে আমি তোমার জীবনের কতগুলো বছর নস্ট করেছি। হ্যা, হয়ত আমি করেছি। কিন্তু, আমি এভাবে ভাবিনি। আমার এই ছোট জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি ছিল তোমার ভালবাসা। আমার সাদাকালো জীবনের অনেক মূহুর্তকে তুমি রঙিন করে দিয়ে গেছ। হয়ত তুমি ভেবেছিলে আমি স্বার্থপর, হ্যা, একটু স্বার্থপর তো সবাই হয়, তাইনা? স্বার্থপর না হলে এ চিঠিটা তোমাকে লিখতামনা। তুমি সবসময় বলতে, তোমার চেয়ে আমাকে আর কেউ বেশি ভালবাসবেনা। বোধহয়, মন থেকে বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম। তাই কেউ বেশি ভালবাসলেও বুঝিনি। কিন্তু, আমি বলব আমি তোমাকে খুব বেশিই ভালবেসেছিলাম, আর তার প্রমাণ আমি তোমার সামনে রেখে গিয়েছি। তোমার অশ্রুর কি কোন দাম আমি দেইনি? অথচ আমার অশ্রু কখনোই তোমার দৃস্টিগোচর হয়নি। নিজের ভালবাসাকে আমি কি তোমার সুখের জন্য বিসর্জন দেইনি? কি ভাবছ? মিথ্যে কথা?
না। এটা মিথ্যে নয়। তুমি এখন ভাল আছ। আর আমিও এটাই চাইতাম। তুমি আমার সাথে কখনোই সুখি হতে পারতে না। আমার শরীরে যে মরণ বাসা বেধেছে। আমি যে কাউকে এই জীবনের সঙ্গী করতে চাইনি। তাই মনের সব কষ্ট গোপন করে নিজে দোষী হলাম। আমার ভালবাসাকে জিতিয়ে গেলাম। আশা করি এখন আমি তোমার মনে রাখার যোগ্য হব। ভাল থেকো।

হারানো ভালবাসা

বি:দ্র:
এই লেখাটি একজন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী থেকে অনুপ্রাণিত। সময়টা ছিল ২০১২। তখন আমাকে রেডিওথেরাপি নেয়ার জন্য প্রায় প্রতিদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের রেডিওথেরাপি বিভাগে যেতে হত। ওই ছেলেটির সঙ্গে তখন আমার দেখা হয়। সে ও প্রায় প্রতিদিনই আসত। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে গেলে, সাড়ে এগারটার দিকে সিরিয়াল মিলত। তখন তার সাথে কথা হত। বয়সে সে আমার চেয়ে দুই-এক বছরের বড় ছিল। তার ফুসফুস বা তার কাছাকাছি স্থানে ক্যান্সার ধরা পরেছিল। তার কাছে শোনা তার জীবনের নানা ত্যাগগুলোর কথা, তার আফসোস গুলো আমার মনকে নাড়া দিয়েছিল। সে অনেক কষ্ট নিয়ে আমাকে বলেছিল, ” যদি ভালও হয়ে যাই, তাকে তো আর ফিরে পাবনা।” আমি তাকে সান্তনা দেবার ভাষা খুজে পাইনি। শুধু বলেছিলাম,”যা করেছেন ভাল করেছেন।” সে আমার কাধ চাপড়ে দিয়ে বলেছিল,” ধন্যবাদ।”
সে এখন কোথায় আছে, কেমন আছে, আমার জানা নেই। আশা করি, সে এখন সুস্থ হয়ে গেছে। নতুন কোন ভালবাসা খুজে পেয়েছে।
আর আশা করি তার প্রিয়তমাকে এখনো এই চিঠিটা পরতে হয়নি।

১,০১৯ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “ক্যান্সার”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।