আত্ম- সমালোচনা

অনেক ছোট ছোট ঘটনা মাঝেমাঝে ভাবিয়ে তোলে। নিজেকে বিচার করতে শেখায় নিজের সম্বন্ধে। সেদিন ক্লাস শেষে বাসায় ফিরছিলাম শর্টকাট রাস্তা ধরে। ওই রাস্তায় আবার টেম্পুতে চলাচল করতে হয়। আমি টেম্পুতে বসেছিলাম আর অপেক্ষা করছিলাম কখন ছাড়বে। হঠাৎ বিড়ির ঝাঁঝাল গন্ধ নাকে এল। আমার পাশে কয়েকজন মহিলা বসে ছিলেন, তারা বিরক্তিতে নাক সিটকালেন। আমি তাকিয়ে দেখলাম এক মধ্যবয়স্ক লোক টেম্পুর পাশে দাড়িয়ে বিড়ি ফুঁকছে। সবাই বিরক্ত হলে ও আমাকে লোকটা অবাক করল। আমি ভালমত চেয়ে দেখলাম লোকটার দিকে। তার গায়ে ছিল একটা পুরোনো ধূসর রং য়ের ব্লেজার। একটা ফ্যাকাসে জিন্স যার নিচের অংশ তার কালো মোজায় গোজা। পায়ে একজোড়া কালো বুট, মাথায় পুরোনো রং চটা ধূসর হ্যাট। তবে সবচেয়ে যে জিনিসটা আমায় অবাক করল তা হল তার গায়ে প্যাঁচানো সাদা রং য়ের শেকল যার মাঝে বেশ কয়েকটি টিনের পিস্তল আটকানো।
প্রথমে ভাবলাম ফেরিওয়ালা, কিন্তু সাথে কোন বাক্সপোটরা নেই, তাহলে কি পাগল? তবে তার কথার ভংগি বলে দিল যে না, সে পাগল নয়। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোন ওয়েস্টার্ন মুভি থেকে উঠে আসা কাউবয়। যাত্রিরা হাসাহাসি করছিল লোকটার বেশভূষা দেখে। আমিও প্রথমে মনে মনে হাসছিলাম। কিন্তু সেই লোকটা সবার হাসিকে থোড়াই কেয়ার করে টেম্পুতে উঠে বসল। এবং পুরো রাস্তা সে সবার বাকা দৃষ্টি উপেক্ষা করে তার গন্তব্যে নেমে গেল। তার নামার পরেই তাকে পাগল বলে আখ্যা দিল কয়েকজন। আমি একবার শুধু বলেছিলাম, ‘পাগল বলেন কেন, সে পাগলামির কি করল?’ এবং এরপর নামার আগপর্যন্ত আমাকে নানা কথা শুনতে হল তাদের কাছে। যেমন, তোমরা তো বর্তমান যুগের ছেলে, তোমাদের কাছে এটাই ফ্যাশন। তোমরা তো নিজেরাই পাগল ইত্যাদি। আমি আর কিছু বললামনা, নেমে গেলাম। কিন্তু একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পারিনি, লোকটা কী পাগলামি করেছিল?
যাইহোক, রাতে শুতে যাবার আগে আবার মনে পরল সেই লোকটার কথা। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর মনে হল লোকটা কোন ভুল করেনি। সে তার যায়গায় অটল ছিল। তার আত্মবিস্বাসটাই সবাইকে ঈর্ষান্বিত করেছিল। নিজের কথা চিন্তা করলাম। কে কি বলবে সেটা ভেবে নিজের শত ইচ্ছা এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে,লোকে কি ভাববে এই চিন্তা করে নিজের অনেক শখ পূরন হয়নি। প্রেমিকা হয়তো খারাপ ভাববে সেইজন্য অনেক সুন্দরী মেয়েদের রূপের প্রশংসা করা হয়নি। অনেক প্রিয় পোশাক পরা হয়নি যদি খারাপ লাগে দেখতে,এই ভেবে। বন্ধুরা আগে হলে গিয়ে সিনেমা দেখতো, আমি দেখতে যেতামনা বাসায় জানলে কি হবে এই ভেবে। প্রিয়তমাকে ফুল দিতামনা নাটুকেপনা হবে এটা চিন্তা করে। একবার বাসে এক ভিখারিকে দশ টাকা দিয়েছিলাম বলে এক আংকেল টাইপ লোক বলেছিলেন,’ টাকা কি গাছে ধরে?’ তাকে বেশ কয়েকটা কথা শোনানোর ইচ্ছা ছিল, কিন্তু পারিনি, লোকে বেয়াদব ভাববে বলে। মাঝেমাঝে অনেক মুখচেনা মানুষের সাথে দেখা হয়ে যেত, কিন্তু কথা বলা হতনা যদি আমাকে চিনতে না পারে এইজন্যে। অনেক কথা কাউকে খুলে বলা হত না, যদি অন্যরকম মনে করে এই ভেবে।
বন্ধুরা হয়তো পচাবে এই চিন্তা করেতো এখনো মাঝেমাঝে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেইনা। মার কাছে বেশি টাকা চাইনা,”এত টাকা দিয়ে কি করবি?” এই প্রশ্নের ভয়ে। অথচ চাইলে মা কিছুই জিজ্ঞেস না করে টাকা দিয়ে দেন। বৃষ্টিতে ভিজতামনা ঠান্ডা লাগবে এই ভেবে অথচ মাসের পর মাস গরম পানি খেয়ে, ব্যবহার করে ঠান্ডা থেকে মুক্তি পাইনি। প্রিয়তমাকে বিদায় জানানোর সময় ও বলা হয়নি কেন আমি সরে এলাম। ক্যাডেট কলেজ ব্লগে দুইটা লেখা প্রকাশ করার পরে আর লিখলাম না যদি কেউ পছন্দ না করে এই ভেবে। অবশেষে প্রায় এক বছর আগে নিজেই উপলব্ধি করেছিলাম, এভাবে আসলে জীবন চলেনা। জীবনটা খুবি ছোট। হয়তো একজন মানুষের পক্ষে সব ইচ্ছে পূরন করা সম্ভব নয়, কিন্তু সাহস করে যদি চেষ্টা করা যায় তবে কিছু হলেও পাওয়া যায়। সেই চেতনাটা প্রায় চাপা পড়তে বসেছিল, কিন্তু আবার জেগে উঠল সেই মধ্যবয়স্ক লোকটাকে দেখে।
কে কি ভাববে তা নিয়ে সে ভাবেনি, হয়তো তার ইচ্ছে করেছে কাউবয় হওয়ার, সে হয়তো টেক্সাস যেতে পারেনি, হয়তো তার কাছে রিভলভার নেই, কিন্তু তারপরেও সে হাতের কাছে যা পেয়েছে তা দিয়েই নিজের ইচ্ছে পূরন করার চেষ্টা করেছে। এর জন্য তাকে কিছুলোক পাগল ভেবেছে, কিন্তু সে কাউবয় ঠিকই সেজেছে।
হ্যাটস অফ টু দ্য কাউবয়।

৬৬৩ বার দেখা হয়েছে

১০ টি মন্তব্য : “আত্ম- সমালোচনা”

  1. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    ''পাছে লোকে কিছু বলে'' এবং ''আমার যা ইচ্ছে তাই করব'' এ দুটোর মাঝে যে সুন্দর সমন্বয় করতে পারে সেই সফলতা পাবে। কিন্তু আমরা বেশিরভাগ এটা ঠিক মতন করতে পারি না।

    লেখালিখি বজায় রাখিও... :thumbup:

    (ভাল কথা, কাউবয়ের বিড়ি খাওয়ার সমালোচনা তোমার করা উচিত ছিল :-B )


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।