What happens in Swandip, stays in Swandip

এই ট্যুরের গল্পটা বলা যায়। যদিও এতদিন ‘what happens in Swandip stays in Swandip’ মোড়কে গল্পটা চাপা রাখার পরিকল্পনা ছিল। কোন এক নববর্ষের গল্প। ইচ্ছা ছিল বছরের প্রথমদিনটা বাইরে থাকব। খোলা আকাশের নীচে। হাজারো তারার নীচে। বেছে নিলাম সন্দীপের আকাশ। দ্বীপ ভ্রমণ বলতে এর আগে নিঝুম দ্বীপ আর সেন্ট মার্টিন। তাই দ্বীপ ভ্রমণের প্যাটার্ন ঠিক তখনো ধরতে পারিনি। জায়গা নির্বাচন যে ভুল সেটা ধরতে পারি সন্দীপ পৌছে। অসহ্য গরম। বিদ্যুৎ নেই। হাটতে হাটতে পৌছালাম দ্বীপের অন্য প্রান্তে। খোলা জায়গা। জায়গায় জায়গায় দুই একটা করে নারকেল গাছ বাদে আর কিছু নেই। সামনে ধূ ধূ প্রান্তর। পিছনে লোকালয়। ক্লান্তির চরম পর্যায়ে তখন আমরা। একটুখানি ছায়া খুজে তাতে বসি। সূর্য যেন তখন আমাদের সাথে খেলায় মেতে ওঠে। ছায়া সরিয়ে অন্যখানে দেয়। দুচোখ খুজতে থাকে কোথায় তাবু খাটানো যায়। ক্লান্তি দিয়েই ক্লান্তি জয় করতে ভরদুপুরে আবার হাটা শুরু করি। রাত্রিযাপনের জায়গা নির্বাচনে।

আমার ঘুরাঘুরির ফিলোসোফি একটু অন্যরকম। সবসময় সুন্দর জায়গাই হয়ে হবে এমন কথা নেই। বরং যেখানে যাব সেখানকার এক্সপেরিয়েন্সটা বেশি ম্যাটার করে। লোকালয় ঘেষে হাটতে হাটতে আমরা বেশ খানিকটা ভেতরে চলে আসি। বেশ কিছু স্থানীয়দের সাথে কথা হয়। তাবু টানানোর জন্য বেশ কিছু আদর্শ জায়গার সাজেশন পেলাম। গ্রামটা সম্পর্কেও জেনে নিলাম। দ্বীপবাসিরা যে কতটা আন্তরিক হয় তার ধারনাওটা পাই এখান থেকে। পরের প্রতিটা ভ্রমণেই এর যথার্থতা মিলেছে। একজনকে গোসলের ব্যবস্থার কথা বলতেই সাথে করে নিয়ে গেল গ্রামের ভিতরে। একটা পুকুরে সবার গোসলের ব্যবস্থা করে দিল। বেলা গরালে স্থানীয় দের সাথে আমরা কয়েকজন ক্রিকেট খেললাম, আবার কয়েকজন ফুটবল। সন্ধ্যা নামার আর কিছু সময় বাকি, এবার তাবু টানায় ফেলতে হবে।
সত্যি বলতে দুপুরের দিকটা এখানে যতটা খারাপ লাগছিল, এই সময়টা ঠিক ততটাই ভাল লাগতে লাগল। আকাশের রংটা ঠিক বলে বুঝাতে পারব না। গোধূলির মাঝে কেমন বেগুনি একটা আভা। খোলা সবুজ প্রান্তর। ঝিরিঝিরি বাতাস। আড্ডার জন্য এর চেয়ে ভাল পরিবেশ আর হতেই পারে না।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত চলে আসলো। রাতের খাবার বাজার থেকে এনে তাবুতে বসেই খেলাম সবাই মিলে। স্থানীয় কিছু লোক ছিল। গল্প করছিল। তারাও যোগ দিল। রাত কিছুটা বাড়লে স্থানীয়রা চলে যায়। দূর থেকে তাদের ঘর দেখায় দেয় এবং যেকোন প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে বলে। আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে মজার সময়টা শুরু হয়।
তাবুর বাইরেই শুয়ে ছিলাম। খোলা আকাশে একসাথে এত তারা এর আগে কখনো দেখা হয়নি। সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক। অনেকরকম আড্ডা। হয়তো এরকম আরো কোন রাত কাটানোর পরিকল্পনা। অতীতের কত কথা। ঝিরিঝিরি বাতাস আর আকাশভরা তারা। এর চেয়ে সুন্দর রাত, সুন্দর পরিবেশ আর হতে পারে না। তারায় তারায় দাগ টেনে চাইলেই প্রেমিকার অবয়ব এঁকে ফেলা যায়। বা এমন তারার মেলার নীচে বসে এক টুকরো কাগজ পেলেই হয়ত একটা কবিতা লিখে ফেলা যায়। এমন আকাশের নীচে বসে আরো অনেক কিছুই করা যায়। কিন্তু নিয়তিতে অন্যকিছুই ছিল।
রাত বাড়ার সাথে সাথে বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে। আমরা কয়েকজন ব্যাপারটা পাত্তা দেইনি। কয়েকজনের ধারনা ছিল বাতাসে তাবু উড়ে যাবে। যদিও আমি ও সাহিদ ভালভাবেই জানতাম এই তাবু এত সহজে উড়বার নয়। এদিকে বাতাসের গতি আরো বাড়তে থাকলে তাবু নড়াচড়া শুরু করে দেয়। তাতে কেমন একটা পতপত শুব্দ। প্রান্ত বসে গুগলে বাতাসের গতি দেখা শুরু করে, সালমান এককোনে চুপচাপ, শাকিল আসলে কি করতেছিল বলতে পারব না, সে ভয় পাওয়ার দলে নাকি না ভয় পাওয়ার দলে তাও বোঝাতে পারব না। সৌরভ কোন একটায় শুয়ে অলরেডী ঘুম। আমি, সাহিদ আর ইসমাইল বাকিদের বুঝাচ্ছিলাম এটা কোন ব্যাপারই না। কিছুই হবে না। কিন্তু আসলে সবসময় যা বুঝাতে চাই তা বুঝানো সম্ভব হয় না। বেশিরভাগেরই প্রথম তাবুতে রাত্রিযাপন। কয়েকজনের মনে বৃষ্টি আসলে কি হবে সেই সঙ্কা বাধে। এর মধ্যে অলটারনেটিভ কি করা যায় তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। লোকালয়ে কারো বাসায় যাওয়া যায়। লোকালয়ে হাটলে ভেতরে একটা মসজিদ আছে, সেখানেও যাওয়া যায়। বাতাসের গতি বাড়ছে আর এর মাঝে শাকিল করে বসে চরম এক ব্লান্ডার। সালমানকে ধরে বলে “দোস্ত তুই সামনে আগায় যেয়ে আযান দে।” আর এতেই ঘটে সালমানের ব্রেক ডাউন। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও শুরু হয়ে গেছে। সালমান বলে বসে “দোস্ত, আমি এখানে থাকব না, ভেতরে নিয়ে চল।” প্রান্তর তাতে সম্মতি। আর শাকিল, ওইযে বললাম, সে কোন দলে বোঝার উপায় নাই।
সৌরভকে ঘুম থেকে তোলাতে সে চরম পর্যায়ে বিরক্ত। তার চেয়েও বেশি বিরক্ত আমরা তাবু খুলতে যেয়ে। এই অন্ধকারে আর বাতাসে তাবু ভাজ করাই দায়। সব গুছায়ে লোকালয়ের ভেতর দিয়ে হেটে বাজারে চলে গেলাম। আমি পার্সোনালি তাবু ছেড়ে আসায় বিরক্ত। তাই সবাই কি করবে ঠিক করছিল আর আমি এক দোকানের সামনে একটা ফাকা চকি দেখে ব্যগ রেখে শুয়ে পড়লাম। সাহিদও। হয়ত ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙতে দেখি চারটা বাজে। সাহিদ বলল বাকিদা মসজিদে। বাতাস, বৃষ্টি দুটোই কমেছে। সাহিদকে বললাম, চল আবার তাবুটা করে ফেলি। দুজনে ঘুমাই।
এবার ঘুমটা ভাঙে সূর্যের আলোতে। চোখ খুলতে যেন এক অপরূপ দৃশ্য। এত সুন্দর দৃশ্য দেখে ঘুম থেমে ওঠা এর আগে কখনো হয়নি। ছয়টার বেশি বাজে। ধীরে ধীরে বাকিরাও চলে আসলো। শুরু হলো জনে জনে ধরে ধরে হাসাহাসি। কি একটা রাতই না কাটালাম। মনে রাখার মত। এবার যে ফিরতে হবে।
কিন্তু এইরাতের কাহিনী কাউকে জানানো যাবে না। What happens in Swandip, stays in Swandip.

৩৪৬ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।