গাধা জহির, মাস্তান রাজিব- শেষ পর্ব

গাধা জহির, মাস্তান রাজিব-১
গাধা জহির, মাস্তান রাজিব-২
গাধা জহির, মাস্তান রাজিব-৩
গাধা জহির, মাস্তান রাজিব-৪
গাধা জহির, মাস্তান রাজিব-৫

রাজিব
আমরা পুলিশের কাছে যাব।
এসো আমিই পুলিশের লোক।
কিন্তু আমরা সত্যি সত্যি পুলিশের কাছে যেতে চাই।
আমি সত্যি সত্যিই পুলিশ।
জহির বোকার মতো জিজ্ঞেস করে, পুলিশ হলে পাজামা কেন ?
লোকটি এবার হেসে ফেলে। হাসিতে তাকে ভারি সুন্দর দেখায়। কিন্তু আমরা তো গর-পোড়া গরু। ইরফানের সূত্রে বুঝেছি সবাইকে সন্দেহ করতে হয়। যত কম সন্দেহ তত বেশি বিপদ।
তার কথায় না ভুলে বলি, কিন্তু পুলিশের তো পোশাক থাকে।
তোমাদের কি ধারণা পুলিশ তাদের ঐ পোশাক পরে ঘুমাতেও যায়। এসো আমার সঙ্গে।
আমি আর শফিক মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। ঠিক বুঝতে পারছি না কী করা উচিত।
দৌড় দেব। কিন্তু গত কয়েকদিন শরীরের ওপর দিয়ে যা গেছে তাতে দৌড়ে সুবিধা হবে না। তাছাড়া পাশেই রেল স্টেশন, সেই সূত্রে থানা এবং পুলিশ ! এখন দৌড়াতে গেলে জহিরকে তো ধরাই যাবে না। উল্টা…
আমি আর শফিক মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। তারপর অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, লোকটির কথা মতো আমরা তার পিছু পিছু চলতে শুরু করেছি।
বাসায় ঢুকলে লোকটি বলল, তোমাদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তোমরা খুব ক্লান্ত। খাওয়া-দাওয়া করেছ সকালে।
জহির মাথা নাড়ল।
ঠিক আছে। খাওয়া-দাওয়া করো। করে ঘুমাও। তারপর তোমাদের সঙ্গে কথা বলব।
শফিক বলল, আমাদের ঘুম পাচ্ছে না।
ঘুম পাচ্ছে না। না ! তাহলে তো সমস্যা। কী করতে চাও।
আমরা চলে যাব ?
কোথায় চলে যাবে ?
আমাদের বাড়িতে।
তাহলে পুলিশের কাছে দরকারটা কী !
বাসায় আসার পথে এক ফাঁকে আমি আর শফিক ঠিক করে নিয়েছি কোনো ভাবেই এই লোকের কাছে আমাদের উদ্দেশ্য বলা যাবে না। কারণ উদ্দেশ্য বললে দেখা যাবে নতুন কোনো প্যাঁচ !
ঝামেলায় না গিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেজন্য এখনই তার সঙ্গে শত্র“তায় যাওয়ার দরকার নেই। আগে একটু দেখি বুঝি। তবে কোনো কথা বলা যাবে না।
শফিক ফিসফিস করে বলল, হতে পারে হয়ত দ্বিতীয় চক্রকেও আমরা ধরতে যাচ্ছি। আজ পর্যন্ত কেউ একসঙ্গে দুটো চক্রকে ধরতে পারেনি। আমরাই হব প্রথম।
শফিকের মাথায় দ্বিতীয় চক্রটা এমনভাবে ঢুকে গেছে যে ওকে আপাতত এখান থেকে সরানো যাবে না।
এক ফাঁকে শফিক জহিরকে বলল, ঠিকানাটা মুখস্থ আছে তো !
জহিরের ভুলে যাওয়ার আশংকা ছিল। কিন্তু ভোলেনি।
শফিক তবু নিশ্চিত হতে বলল, বাসায় ঢুকে তোর প্রথম কাজ হল পুরো ঠিকানাটা একটা খাতায় লিখে রাখা। ঠিক আছে !
আমাদের এই গোপন কথোপকথনটা লোকটি যে খেয়াল করেনি এমন নয়। একটু অপেক্ষা করে বলল, তোমাদের আলোচনা কি শেষ। হলে এসো।
তার পিছু পিছু বাসায় ঢুকে এখন আমরা খাচ্ছি।
ফ্রিজে কিছু খাবার ছিল। সেগুলোই তার কাজের লোকটি গরম করে দিয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে যা-তা খাবার খেতে হয়েছে। তুলনায় এই খাবার অমৃত। খাওয়ার স্বাদে লোকটির প্রতি সন্দেহ কমে যেতে শুরু করে। হয়ত যা ভাবছি তা ভুল। হয়ত সে দ্বিতীয় চক্রের হোতা বা নেতা নয়।
এই লোকটির সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ স্টেশনের পেছনের রাস্তায়।
স্টেশনে এসে শফিক কায়দা করে জেনে আসল রেলের থানাটা কোথায়। আমি আর জহির উল্টাদিকে উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে তখনই পাজামা-পাঞ্জাবি পরা মধ্যবয়সী একজন লোকের পিছুডাক।
এই যে খোকারা তোমরা কারা ?
আমরা ! আমরা এখানে একটু কাজে এসেছি।
কী কাজ ?
আমাদের পুলিশ দরকার !
পুলিশ দরকার ? লোকটি যেন একটু অবাক। এই বয়সের ছেলেদের পুলিশের সঙ্গে দরকার আছে এমন কথা আগে কখনো শোনেনি বোধহয়।
সে অবাক ভঙ্গিটা সামলে নিয়ে বলল, চলো।
কোথায় ?
আমার সঙ্গে।
আপনার সঙ্গে যাব কেন ? আমরা তো পুলিশের কাছে যাব।
আমিই পুলিশ।
তারপর তার সঙ্গে আমাদের আসতে হয়েছে। এসে পেট ভরে খেয়েছিও।
খাওয়ার পর ঘুমানোর কথা, কিন্তু শফিক দ্বিতীয় চক্রের সন্ধান পেয়ে গেছে ধরে সে ঘুমিয়ে গিয়ে তাদের ফাঁদে ধরা দিতে চায় না।
লোকটি বলল, তোমরা তাহলে ঘুমাবে না !
আমরা চলে যাব।
কোথায় যাবে ?
জহির এবার বলে, আমাদের বাড়িতে। বাবা-মায়ের কাছে।
বাবা-মায়ের কাছে তো যাবেই। তাদের ঠিকানাটা বলো। আমিই পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করব।
ঠিকানা জানি না।
ঠিকানা জানো না ?
যদিও কথা ছিল কিছু বলব না, কিন্তু জহির বলে বসে, ফোন নাম্বার ছিল। সেটা হারিয়ে ফেলেছ।
কোথায় হারিয়ে ফেলেছ ?
এই তো রাস্তায়।
লোকটি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে।
তাহলে তো আমার বিপদ হল ?
শফিক দ্বিতীয় চক্রের গন্ধ আরো বেশি করে পায়।
আপনার বিপদ মানে ? আমাদের বাবা-মাকে আপনার কী দরকার ?
তাদের সঙ্গে একটু কথা বলতে হত।
কথা বলে কি তাদের কাছে টাকা চাইতেন !
লোকটি হাসে। বাহ ! তোমরা তো বুদ্ধিমান ছেলে। এই বুদ্ধিমান ছেলেরা তো এমনি এমনি পুলিশের খোঁজ করে না। তোমাদের বিষয়টা কী বলো তো !
শফিক বলে, বলব না। আমরা চলে যাব। আপনার কোনো উদ্দেশ্যই আমরা পূরণ করতে দেব না।
বুঝেছি। সোজা কথায় হবে না। বাঁকা হতে হবে।
বাবা-মায়ের ঠিকানা জানো না, অথচ পুলিশ খুঁজছিলে ! বিষয়টা কী বলো !
বলব না।
বলবে না। না ! পুলিশের মার খেয়েছ কখনো। বলে লোকটি তার আলমারি খুলে একটা বিশাল ডাণ্ডা বের করে। দেখেই ভয় লাগে।
ডাণ্ডাটা শফিকের সামনে এনে ঘোরাতেই জহির বলে, খবরদার গায়ে হাত তুলবেন না। গায়ে হাত তুলবেন না।
এই তো ভালো ছেলে। এবার আরো ভালো ছেলের মতো বলে ফেল।
জহির সব বলে ফেলল। দাড়ি কমাসহ। বাড়ি থেকে পালানোর উদ্দেশ্য থেকে জহিরের বাসার ঠিকানা পর্যন্ত।
লোকটি মগ্ন হয়ে শুনে বলল, কিন্তু তোমাদের বাড়ির ঠিকানা। ফোন নাম্বার।
জহির বলে, বললাম না হারিয়ে ফেলেছি। কাগজ পত্রে নাম্বার লেখা ছিল। ঐ লোকটি নিয়ে গেছে।
আর শফিক কেঁদে ফেলল। তার দ্বিতীয় চক্র তো গেলই। প্রথমটাও গেল।
সে সাবধান করেছিল এসব চক্রের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ থাকে। স্বার্থের বেলায় সব এক।
লোকটি সব শুনে বলল, বুঝতে পারছ তো আমি সুবিধার লোক নই। কাজেই পালানোর কোনো চেষ্টা করবে না। তোমরা যা চাও সব হবে। এখন ভালো ছেলের মতো ঘুমাও। টিভি দেখো। এখানে অনেক চ্যানেল আছে। কিন্তু খবরদার পালানোর চেষ্টা করবে না। করলে কিন্তু…
লোকটি আবার ডাণ্ডা ঘোরায়।
শফিক কেঁদে ফেলে। ডাণ্ডার ভয়ে নয়। সব শেষ হয়ে গেল বলে।
লোকটি বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাইরে থেকে তালা দিয়ে গেল।
আমি বললাম, শফিক এবার।
শফিকের চোখে তখনো পানি। বলল, এবার আর কিছু হবে না। গাধাটা সব বলে দিল। এখন মরো। আমি আর এসবে নেই। আমার কী ! আমার তো সব আছে।
জহির মিনমিনে গলায় বলল, কিন্তু ঐ ডাণ্ডা দিয়ে যে তোকে পেটাত।
পেটালে সেটা আমি দেখতাম। তোকে কে বলেছিল। আমি এখন ঘুমাব।
বলে শফিক সত্যি সত্যি বিছানায় চলে যায়।
সহ উদ্যোগী হিসেবে শফিককে না পেলে আমার মাথাও কাজ করে না। তাছাড়া কয়েকদিনের অনাহার আর উদ্বেগে ক্লান্তও ছিলাম খুব।
বিছানায় গেলাম এবং ঘুমিয়েও পড়লাম।
ঘুমাতে গিয়েই মনে হল মা দাঁড়িয়ে বিছানার পাশে। এখনই বলে উঠবেন, রাজিব এভাবে ঘুমায় না। ঘুমানোরও একটা নিয়ম আছে।
মায়ের মুখটা ভেসে উঠলেই বাকি সব এত অর্থহীন মনে হয় যে আমি খুব দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করি।
সেই ঘুমটা ভাঙল সন্ধ্যায়।
লোকটি এসে ডেকে তুলল। সঙ্গে আরেকজন লোক।
আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, বাহ ! তোমরা তো ভালো ছেলে হয়ে গেছ। বেশ ঘুমিয়েছ। এখন যাও হাত-মুখ ধুয়ে দুপুরের খাবারটা খেয়ে নাও। তার আগে এখানে দাঁড়াও একে একে।
সঙ্গের লোকটি ক্যামেরা ঠিক করছে।
আমি বললাম, আমাদের ছবি ওঠাবেন।
হু। ঠিক তাই।
কেন ?
আরে বোকা ছবি না ওঠালে বাবা-মায়ের কাছে যাবে কীভাবে ? তোমরা যে কিছুই বলতে পারছ না।
লোকটি হাসে। সন্দেহ কমে যাওয়ার হাসি। কিন্তু কমানো যাবে না। কমালেই বিপদ। জোর করে রাগ ধরে রাখি।
ছবি তোলা হলে লোকটি চলে যায়।
দুপুরের খাওয়ার জম্পেশ আয়োজন। চিকন চালের ভাত। মাংস-ডাল সব।
জহির বলে, মাঝে-মধ্যে তো মনে হচ্ছে লোকটি…
শফিক সকালের পর এই প্রথম কথা বলল, মনে হচ্ছে লোকটি ফেরেশতা। তাই না !
জহির মাথা নাড়ে।
ইরফানকেও ট্রেনে সেরকমই মনে হয়েছিল।
তা ঠিক, তবে…
জহির কথাটা শেষ করতে পারে না। আমিও কিছু বলি না, কিন্তু মনে হয় হয়ত !
শফিক বলে, ছবি তুলে নিয়ে গেল কেন ? বুঝতে পারনি।
কেন ?
খদ্দেরদের কাছে দেখাবে। নমুনা হিসেবে।
কথায় যুক্তি আছে। ছবি ওঠানো তো এসবেরই লক্ষণ হওয়ার কথা। পাল্টা যুক্তি নেই, তাছাড়া একবার ঠকার উদাহরণও টাটকা। চুপ করে থাকি।
শফিক বলল, কী করবি তাহলে ! এখানে বসে বসে শুধু খিচুড়ি খাওয়া। জহিরটার তো মনে হচ্ছে এতেই চলবে। তোরও চলবে নাকি !
বলি,তুই-ই না বললি…
শোন। একটা কিছু ভাব। মনে আছে ইরফানের বাসায় সব লোকজন আসে গভীর রাতে। সে সময় পুলিশ নিয়ে গিয়ে হাজির হতে পারলে।
আমি কেন যেন এখান থেকে পালানোর ব্যাপারে খুব উৎসাহ বোধ করি না। তবু বলি, হু !
শফিক জানালার শিকগুলো একটু টেনে দেখে বলে, শালা এমন যে হাতির শুঁড় দিয়ে নড়ানোই যাবে না।
হঠাৎ কী ভেবে বাথরুমে গিয়ে ঘুরে এসে বলে, সেখানে একটা সুযোগ আছে। ভেন্টিলেটরে একটা গ্লাস শুধু। ওটা কোনো ভাবে সরিয়ে দিতে পারলে সম্ভব।
শফিক ভেন্টিলেটর বিষয়ে মন দেয়।
জহির চুপ।
আমি সন্দিহান।
শফিক বলে, যাই হোক এখন কিছু করার দরকার নেই। লোকটি আবার আসবে। রাতে ভালো মানুষের মতো তার সঙ্গে খাব যাতে ন্যূনতম সন্দেহ না করে। তারপর সে ঘুমিয়ে গেলে তখন থেকে শুরু করতে হবে। মনে রাখিস এ কিন্তু আন্তর্জাতিক মাপের। ইরফানের মতো ছিঁচকে না ! কাজেই কাজটা অনেক কঠিন হবে।
লোকটি কিন্তু রাতে খেতে এল না। আমরা অপেক্ষা করতেই থাকি। কারণ সে না এলে, এসে না ঘুমালে তো কিছু করা যাবে না।
কিন্তু সে আর আসে না।
শফিক বলে, শালা মনে হয় রাতের মধ্যেই আমাদের পাচার করে দিতে চায়। আর ১৫ মিনিট দেখে তারপর উদ্যোগ নিতে হবে। আসুক না আসুক।
সেই ১৫ মিনিট শেষ হওয়ার আগেই লোকটি এল।
একা নয়। সঙ্গে ইরফান। এবং তার সঙ্গে ভুঁড়িওয়ালাসহ আরো দুজন।
পুরো চক্রই একসঙ্গে।
ঠিক কী হচ্ছে বুঝতে না পেরে হা করে রইলাম।
না বোঝার মতো কিছু ঘটলে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আমরা চোখে চোখে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করি।
কিন্তু এই প্রথমবারের মতো একে অন্যের দিকে তাকাতেও ভুলে গেলাম।
বিস্ময়ের একটা সীমা থাকে। সীমা ছাড়িয়ে গেলে কী রকম বোধ হয় সেটা বুঝলাম না। কিন্তু কোনো ভাবেই বুঝলাম না ঠিক কী করা উচিত।
আমি না।
মাস্তান রাজিবও না।
এমনকি আমাদের উদ্যোগী এবং উদ্যমী নেতা শফিকও না।

জহির
রাজিব বলল, মিষ্টি খাবে ?
ভুঁড়িওয়ালা এমন লাফ দিয়ে উঠল যেন আজ পর্যন্ত দুনিয়ায় কেউ কখনো মিষ্টি খায়নি।
শফিক বলে, খাবে নাকি আরেকটা ?
ভুঁড়িওয়ালা আরেকটা লাফ দেয়। আরেকটু পেছনে সরে।
শফিক মন দেয় ইরফানের দিকে। বলে, কান ধরো।
ইরফান ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে।
শফিক বলল, কান ধরো।
আমি বললাম ওঠবোস করো।
এবং ইরফান আমাদের অবাক করে দিয়ে উঠবোস শুরু করল।
উপায় নেই। সামনে-পেছনে পুলিশ এবং তারা ইতিমধ্যে তাদেরকে যথেষ্ট পুলিশীয় আদর যতœ করেছে বলেই মনে হচ্ছে, তার তুলনায় কান ধরে ওঠবোস করা এমন কিছু কঠিন শাস্তি না।
রাজিব বলল, গুনে গুনে একশোবার।
শফিক ভুঁড়িওয়ালাকে বলে দেখছ কী ! তোমার গুরু যা কান ধরে ওঠবোস করছে আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছ ! ওঠবোস করো। নইলে কিন্তু মিষ্টি !
গুরুপ্রীতি থাকুক না থাকুক তার মিষ্টিভীতি এখনো আছে।
সেও কান ধরে ওঠবোস করছে।
বাকি দুজনের সঙ্গে আমাদের প্রকাশ্য শত্র“তা নেই, ওদের শাস্তির ভারটা পুলিশ একা করলেই হবে বলে আমাদের মনে হয়।
এই বাসার মালিক, যিনি আমাদের কাছে নিজেকে পুলিশ বলে দাবি করছিলেন এবং আমরা মনে করছিলাম দ্বিতীয় চক্রের নেতা, তিনি এতক্ষণ আমাদের কাণ্ড দেখছিলেন। যথেষ্ট মজাও পাচ্ছিলেন মনে হয়। কারণ একবার একজন পুলিশ খানিকটা বাধা দিতে এলে তিনি হাত তুলে থামালেন।
এতক্ষণ মজা দেখার পর তার মনে হল আমাদের সঙ্গে একটু মজা করা দরকার। তার আগে এদের সবাইকে বিদায় করে বললেন, তোমাদের বিশ্বাস করাতে এনেছিলাম যে দেখো আমি পুলিশ। পাজামা পরেও পুলিশ হওয়া যায়।
তারপর পুলিশদের উদ্দেশ করে বললেন, যাও। এদেরকে আজ রাতে আমাদের হাজতের মেহমান করে রাখো। কাল সকালে দেখি কী ব্যবস্থা করা যায়।
উৎসাহী একজন পুলিশ তাদেরকে চল শালারা বলে নিয়ে থানার দিকে নিয়ে গেল। ওরা চলে গেলে তিনি আমাদের দিকে ঘুরে বললেন, এবার বিশ্বাস হল তো পাজামা পরেও পুলিশ হওয়া যায়।
যার কথায় পোশাক পরা এবং অস্ত্রধারী চার পুলিশ বাধ্য ছাত্রের মতো চলছে তিনি তো পুলিশ না মহাপুলিশ।
আমরা লজ্জার সঙ্গে মাথা নাড়ি।
শফিক ফিসফিস করে বলে, সরি। আমাদের ভুল হয়ে গেছে। বিশ্বাসটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই হারামজাদার জন্য। কিন্তু আপনি তো আমাদের বুঝিয়ে বললে পারতেন !
তা পারতাম, কিন্তু সব মজা শুধু তোমরা করবে সেটা তো হয় না নাকি !
বুঝলে ইমরান বলে অধীনস্ত একজন পুলিশের উদ্দেশে তিনি বলেন, ওরা ভাবল আমিও ছিনতাইকারী চক্রের নেতা। তখন মনে হল একদিনের জন্য ছিনতাইকারী হয়ে যেতে অসুবিধা কী ! সত্যি বললে কৈশোরের কথাও মনে পড়ল। গল্প পড়ে পড়ে আমাদের এমন কত স্বপ্ন তৈরি হত। তা মনে হল ওদের সঙ্গে একটু মজা করলে মন্দ হয় না।
ইমরান নামের লোকটি বলল, এখনো নিশ্চয়ই জান না উনি কে ? ঠিক আছে আমি জানিয়ে দিচ্ছিÑউনি এই জিআরপি মানে রেলের থানার ওসি। মানে তোমরা যে পুলিশদের খোঁজ করছিলে উনি সেই পুলিশদের স্যার। শরীফ স্যার।
শফিক বলল, কিন্তু কীভাবে আপনি এতকিছু করলেন ! আমরা তো ঠিক করেছিলাম আপনি আসতে আর ১৫ মিনিট দেরি হলে জানালার ভেন্টিলেটর ভেঙে বেরিয়ে যাব। তারপর দুই পক্ষকেই পাকড়াও করব।
লোকটি হাসেন। বলেন, তাহলে তো আমাকেও কি এর মতো মিষ্টি খাওয়াতে নাকি !
রাজিব বলে, আমার কিন্তু মনে হচ্ছিল আপনি অত খারাপ লোক নন।
শফিক বলে, আমিও তো তাই বলছিলাম। এজন্যই না অত দেরি। আর না হয় তো দুপুরেই পালাতে পারতাম। আসলে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।
আসল কথাটা কিন্তু আমিই জিজ্ঞেস করি, কিন্তু কীভাবে কী করলেন !
লোকটি হেসে বলেন, আগে তুমি বলো তো তুমি একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করলে কেন ?
গোপন করেছি ? কী ?
তোমরা যে ইরফানের মোবাইলটা নিয়ে এসেছ সেটা তো বলনি।
লজ্জায় মাথা নিচু করি।
লোকটি বলেন, এই ব্যাটা তো বলছে ঐ মোবাইলেই তোমাদের বাবা-মায়ের নাম্বার আছে। মোবাইলটা আনো তো দেখি।
মোবাইলটা রাখা ছিল শফিকের তত্ত্বাবধানে। শফিক মোবাইলটা আনতে যায়।
রাজিব বলে, কিন্তু কীভাবে পেলেন ওর আস্তানা।
তোমরাই না বলেছিলে ওরা গভীর রাতে সবাই একসঙ্গে মিলিত হয়। আর বাসার যে নাম্বারটা বলেছিলে একেবারে সঠিক। একটা বাসার নাম্বার বলবে, যেখানে বদমাশরা সব মিলিত হয় সেই বাসাটা পুলিশ খুঁজে পাবে না।
শফিক মোবাইল নিয়ে আসে। কিন্তু মোবাইলটা বন্ধ।
তিনি টিপে মোবাইল অন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হয় না। শফিক বলে, চার্জ নেই সম্ভবত। আমরা যখন নিয়েছিলাম তখন থেকেই বন্ধ। ভেবেছিলাম সুযোগ মতো চার্জ দেব। কিন্তু এখানে আপনার পাল্লায় পড়ে….
লোকটি মোবাইলটা ইমরানের হাতে দিয়ে বলেন, এই দেখো তো কী সমস্যা !
ইমরানের কারিগরি জ্ঞান বোধহয় তুলনামূলক বেশি। সে কিছুক্ষণ দেখে বলল, চার্জ নেই বোধহয়। তারপর মোবাইল থেকে ভেতরের একটা ছোটো জিনিস বের করে তার মোবাইলে ভরল। কিছুক্ষণ টেপাটেপি করে বলল, ওসি স্যার অদ্ভুত একটা জিনিস দেখেন। কোনো মোবাইল নাম্বার নাম দিয়ে সেভ করা নেই। সব অক্ষর দিয়ে। কোনো কোনোটাতে বিচিত্র নাম।
শরীফ সাহেব বললেন, দেখেছ কী বদমাশ ! যাক অসুবিধা নেই, পত্রিকায় তোমাদের ছবি ছাপা হয়ে গেছে। তোমাদের বাবা-মা সকালেই খবর পেয়ে যাবেন। আমাদের থানার ফোন নাম্বার আর আমার নাম্বার দেয়া আছে। সকালেই যোগাযোগ করবেন। আর না হলে শালাকে দুই ঘা লাগিয়ে নাম্বারটা বের করে নেয়া যাবে।
এখনই কী যাব নাকি ? ইমরান জিজ্ঞেস করে। শরীফ সাহেব একটু ভেবে বলেন, না। যাও। এখন ঘুমাও গিয়ে। সারাদিন অনেক খাটুনি গেছে। বুঝলে ছেলেরা এই ইমরান সাহেব হচ্ছেন আমাদের থানার সেকেন্ড অফিসার। এই পুরো কাজটা প্রায় তিনিই করেছেন। কাল সকালে বিস্তারিত গল্প শুনে নিয়ো। এখন ঘুমাও।
আমরাও ঘুমাতে গেলাম। বেশ অনেকদিন পর শান্তির ঘুম। সেই শান্তির ঘুমটা ভাঙল সকালে এক মহিলার কান্নার শব্দে।
আগের দিন অনেক ঘুমিয়েছি। তাছাড়া অচেনা জায়গায় আমার খুব ভালো ঘুমও হয় না। সকালেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কান্নার শব্দ শুনে মনে হল দেখি গিয়ে।
বেরিয়েছি কি বেরোইনি. মহিলাটি আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
এই মহিলা আমার মা।
হ্যাঁ। সেই মা যাকে পাওয়ার জন্য আমি বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম।
সে-ই মা যিনি ৫ বছর বয়সে আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলেন বলে আমার বাবা দাবি করেন।
সে-ই মা

রাজিব
স্বপ্নের মতো বললেও কম বলা হয়। এ কী সম্ভব ! হতে পারে ! কিন্তু হয়ে তো গেল !
আমার মনে হল আমি স্বপ্ন দেখছি। ঘুম থেকে উঠেই দেখব সব স্বপ্ন। গায়ে চিমটি কাটি। দেখি চিমটি লাগছে। তার মানে স্বপ্ন নয়। সামনে অপরাধী চেহারার যে লোকটি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি আমার বাবা। তার জন্যই আমার এতদিনের অপেক্ষা। তার অভাবেই আমি লোকের কাছে মাস্তান।
আমার ওপর তার দাবির জায়গায় জোর নেই। যতদুর জানি দ্বিতীয় বিয়ে করে এবং সেই বিয়ের শর্ত অনুযায়ী তিনি আমাকে ত্যাগ করেছেন।
কাজেই তিনি অপরাধী। সেই ভঙ্গি।
আমি বলি, বাবা তুমি দূরে সরে আছ কেন ?
বাবা যার পরনে দামি স্যুট, গলায় টাই, পেছনে তার পিএস, তিনি বলেন, না। ঠিক আছে।
পিএস কেন যেন জিজ্ঞেস করে, স্যার পানি খাবেন !
বাবা মাথা নাড়েন। হ্যাঁ না না সেটা বোঝা যায় না।
হঠাৎ শিশুর মতো কেঁদে ওঠে বলেন, খোকা আমাকে কখনো ক্ষমা করিস না। কখনো না !
সঙ্গে যিনি পিএস নিয়ে বেড়ান এবং যাকে সবসময় বহন করে একটা গাড়ি তিনি তো ক্ষমতাধর লোক নিশ্চয়। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হয় পৃথিবীতে তার চেয়ে অসহায় লোক আর নেই।
আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরি। বলি, বাবা কাঁদবে না। একটুও কাঁদবে না।
বাবা আরো কাঁদেন।
শরীফ সাহেব বলেন, এত অদ্ভুত কাণ্ড। আমরা পত্রিকায় ছবিটা ছাপলাম এক বাবা-মায়ের জন্য। এলেন অন্য বাবা-মা। যাক ছেলেদের স্বপ্ন-পূরণ হয়ে গেল। মাঝখান দিয়ে বোনাস হিসেবে এত বড়ো একটা চক্র ধরা পড়ে গেল। ওদের ছবি কাল শুধু পত্রিকায় দিয়েছি। আজ টিভিতেও যাবে। আমি অন্য পক্ষকে আনার ব্যবস্থা করি।
তিনি ইরফানের মোবাইলটা নিয়ে বেরিয়ে যান।
ঘটনাটার শুরু সকালে। হৈ-চৈ তে ঘুম ভেঙে দেখি এক মহিলা জহিরকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছেন।
আমি অবাক। জহির বাকরুদ্ধ। শফিক বলে, কেসটা কী !
শরীফ সাহেব বলেন, ওর মা।
মা ! শফিক আর আমি একসঙ্গে বলে উঠি।
শরীফ সাহেব বলেন, হ্যাঁ ওর মা। তোমার বাবাও আশা করি চলে আসবেন।
বাবা চলে আসবেন !
আসবেন না। পত্রিকায় খবর ছাপা হয়ে গেছে। স্থানীয় থানাতেও ইনফর্মেশন পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
আমার বাবাকে থানা খুঁজে পাবে ?
পাবে না কেন ?
আমার বাবা কোথায় সেটা তো আমিই জানি না।
তোমরা যে বললে কুলাউড়ায় তোমাদের বাড়ি। সেখানে তো তথ্য পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
হ্যাঁ। কিন্তু আমার বাবা তো ওখানে থাকেন না। থাকেন আমার মা আর জহিরের বাবা।
তাই নাকি ! তাহলে ইনি হারিয়ে যাওয়া মা।
হ্যাঁ।
কিন্তু…
শরীফ সাহেব অবাক হয়ে জহিরের দিকে ফিরেন। জহিরের মায়ের সঙ্গে এসেছে এক তরুণ। সে বলে, জি। এ হচ্ছে আমার বড়ো আপার ছেলে। একটা ফ্যামিলি মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে আপার সঙ্গে দুলাভাইয়ের…। তারপর থেকে আমরা ঠিক জানতামই না ওরা কোথায় থাকে। আজ সকালে পত্রিকায় আপা ছেলের ছবি দেখে। আমাদের বাসা খিলগাঁও। তাই সেখান থেকে থানায় আসতে যতটুকু সময়। থানা থেকে বলল, এখানে !
আমার খুব আনন্দ লাগে। আবার কষ্টও।
জহির তার মাকে পেয়ে গেল। কিন্তু আমার বাবা। তিনি তো আর নিশ্চয়ই খিলগাঁও থাকেন না। পত্রিকা হয়ত পড়াই হয় না। হয়ত…
মন খারাপ করে বসে থাকি। শফিক সান্ত্বনা দেয়, আরে পত্রিকায় ছবি ছাপা হলে না দেখে যাবে কোথায়। আর শুনলি না টেলিভিশনেও দেখাবে। টেলিভিশন দেখে না এমন লোক এখন বাংলাদেশে আছে ?
টেলিভিশন লাগল না। পত্রিকাতেই হয়ে গেল। বাবা নাকি থাকেন উত্তরা নামের একটা জায়গায়, যে পেপারে আমাদের খবরটা ছাপা হয়েছে সে পেপারটা বাসায় রাখেন না, অফিসে এসে পেপার উল্টে দেখে তারপর একেবারে উড়ে এসেছেন। তার ড্রাইভার সেরকম্ই বলছে।
সাত বছর ধরে স্যারের গাড়ি চালাচ্ছি। কিন্তু জীবনে স্যারকে এত ব্যস্ত দেখিনি। সে বলে, আসার পথে জিজ্ঞেস করলাম স্যার কোথায় যাবেন। দেখি স্যার কাঁদছেন।
পিএস বলে, আজ না কাঁদলে কাঁদবে কখন ! কাঁদেন স্যার কাঁদেন। পানি খাবেন স্যার !
বাবা যা শুনেন তাতেই যেন লজ্জা পান। তার লজ্জা আর কাটছে না।
আমি জিজ্ঞেস করি, বাবা তুমি আমাকে চিনলে কী করে ! আমার চেহারা তো অনেক বদলে গেছে। তুমি ৫ বছর বয়সে শেষ দেখেছিলে।
বাবা মাথা নিচু করে বলেন, বাবা হলে বুঝবি বাবারা কখনো ছেলেদের চেহারা ভোলে না। আর আমি গত বছরও তোকে দেখেছি।
গত বছর ! কীভাবে !
লুকিয়ে তোর স্কুলে গিয়ে।
স্কুলে গিয়েছিলে ?
হ্যাঁ।
তাহলে আমার সঙ্গে দেখা করলে না !
কী করব তোর মায়ের যে নিষেধ ছিল। সকালে গিয়েই দুপুরে চলে এসেছি।
শরীফ সাহেব ফিরে এসেছেন। ইরফানকে দু-ঘা লাগিয়ে কোনটা আমার মায়ের এবং কোনটা জহিরের বাবার সেটা উদ্ধার করে নিয়ে এসেছেন।
হাসতে হাসতে বললেন, একটা চড় আর একটা ঘুসি মারতে হয়েছে। কথা বলে দেখো তো এটা তোমার মায়ের নাম্বার কিনা !
তিনি একটা নাম্বারে রিং করেন।
আমার হাতে ফোনটা দিতেই বাবা ফোনটা নিয়ে বলেন, আমাকে দে খোকা।
আমি দিয়ে দেই।
বাবা একটু সরে গিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন।
বড়ো সুন্দর সেই দৃশ্য।
জহিরের মা-ও কথা বলেন তার বাবার সঙ্গে।
পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্য।

জহির
আমাদের শহরে এখন আমরা মোটামুটি তারকা। আমাদের বীরত্ব নিয়ে একটা কবিতাও লিখে ফেলেছে ফার্স্ট বয় ইমরান। সে কবিতাটা আবার সে স্কুলের বার্ষিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করে শোনাল।
ইংরেজি স্যার বললেন, অসাধারণ কবিতা ! অসাধারণ।
অংক স্যার পাশ থেকে আপত্তি করেন, কবিতাটার অসাধারণত্বই আপনি দেখলেন। যারা এমন বীরের মতো কাজ করল তাদের কীর্তিটা কিছু না।
তাদের তর্ক লেগে যায়।
তর্ক দেখতে মজা লাগছিল। বিশেষ করে অংক স্যার যেখানে আমাদের পক্ষে তর্ক করছেন।
কিন্তু মঞ্চে ডাক পড়ে। সেখানে আমাদের মাল্যভূষিত করা হয়। একটা মানপত্রও পাঠ করা হয়। হে অমুক। হে তমুক। তোমাদের পেয়ে আজ আমরা…. জাতীয় !
আমাদের লজ্জা লাগে। শফিক কিন্তু খুব সুন্দর রাজনৈতিক নেতাদের মতো হাত তুলে অভিনন্দনের জবাব দেয়।
সেদিন মা আমাদের সঙ্গে এসেছিলেন। রাজিবেরও। কিন্তু কেউই থেকে যেতে পারেননি। পারা যায় না আসলে !
বাস্তবতা বলে একটা জিনিস আছে, সেই জিনিস কাছের জিনিসকে দূরে সরিয়ে রাখে। তার তৈরি করা দেয়ালটা সিমেন্টের দেয়ালের চেয়েও শক্ত। সিমেন্টের দেয়াল ভাঙা যায়। কিন্তু এই দেয়াল ভাঙার নয়।
তবু একটা কিছু হয়েছে। এখন মায়ের সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগ আছে। আমি তাকে চিঠি লিখতে পারি। ফোন করতে পারি।
জহিরের বাবা তো তার জন্য একটা আলাদা মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছেন।
শরীফ সাহেবের উপস্থিতিতেই সবাই একমত হয়েছেন, আমরা যখনই চাইব তখনই আমাদের অনুপস্থিত বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারব।
পাজামা পরলেও তিনি খুব ভালো পুলিশ। তার সিদ্ধান্ত সম্ভবত কেউই অমান্য করবেন না।
সবচেয়ে মজা হচ্ছে শফিককে নিয়ে। সে যখন ঘটনাটা বলে তখন ভাবটা এমন থাকে যে সবকিছুই সে একা করেছে। আমরা ছিলামই না।
শিলাকেও সে চুপি চুপি গিয়ে পুরো কাহিনীকে বিকৃত করে নিজের বীরত্বের কথাই বলে এসেছে শুধু।
ও। হ্যাঁ। শিলা হচ্ছে আমাদের ক্লাসে নতুন ভর্তি হওয়া একটা মেয়ে। সে স্কুলে ভর্তি হয়েছে গত মাসে এবং তারপর থেকেই শফিক একটু কেমন যেন।
শোনা যায় তার বাসার সামনে শফিককে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে।
বিষয়টা কী একদিন জানতে চেয়েছিলাম। শফিক ক্ষেপে গিয়ে বলল, গাধার মতো কথা বলিস না। ।বললাম, আমি তো গাধাই।
রাজিব বলল, আর আমি মাস্তান। আমাকে কিছু লুকালে কিন্তু একেবারে….
শফিক রাগ করে কিংবা লজ্জা পেয়ে চলে যায়।
দূরে গিয়ে বলে, না। তোদের দিয়ে হবে না। তোরা যে কী করে আমার বন্ধু !
রাজিব চিৎকার করে বলে, শফিক মিষ্টি খাবি। মিষ্টি !
শফিক বলে, আমার অত সময় নেই। তোরা খা।
আমি আর রাজিব মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে হাসি।
কেন শফিকের আজকাল সময় এত কম সেটা বোধহয় আমরা বুঝতে পারি।

******** ********** *********** ********** **********

৮৩১ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “গাধা জহির, মাস্তান রাজিব- শেষ পর্ব”

  1. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    দুর্দান্ত একটা লেখা মামুন ভাই। এক কথায় চমৎকার..... আমরা সিসিবি বাসী এরকম আরো লেখা চাই আপনার কাছ থেকে সাথে সাথে কলেজের অভিজ্ঞতাগুলোও যদি শেয়ার করতেন তাহলেতো কথাই নাই :boss: :boss:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।