মুন্না আপনিই এক নম্বর

‘আচ্ছা, ছোট ক্লাবগুলো, যেমন_ওয়ারী-আরামবাগ ওরা কত খেলোয়াড় তৈরি করে, অথচ আবাহনী-মোহামেডানের মতো ক্লাবগুলো সেভাবে খেলোয়াড় তৈরি করে না। ওরা তাদের কিনে নেয়। এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?’
‘তুমি কিভাবে দেখো?’
‘মানে আমি জানতে চাইছিলাম, ছোট ক্লাবগুলো খেলোয়াড় তৈরি করে আর বড় ক্লাবগুলো…’
‘ওয়ারী-আরামবাগ কি কারখানা যে ওখানে শুধু খেলোয়াড় তৈরি হবে!’
এরপর ঠিক কী প্রশ্ন করা যায় বুঝতে পারছিলাম না। সামলে তারপর আরো যে কয়েকটা প্রশ্ন করলাম, তার প্রতিটাতেই মুন্নার এমন আঁকা-বাঁকা উত্তর যে রীতিমতো অসহায় বোধ করতে লাগলাম। এমন সময় তৃতীয় কেউ একজনের উপস্থিতি কাজে দেয়। তা আমাকে রক্ষা করার মতো এমন একজনও চলে এল! আবাহনী ক্লাবের প্রহরীদের চোখ এড়িয়ে ভেতরে ঢুকে যাওয়া মলিন চেহারার এক প্রৌঢ়, যে মেয়ের বিয়ের জন্য অর্থ সাহায্যপ্রত্যাশী। আমি সব ভুলে খুব কৌতূহল নিয়ে দেখতে শুরু করলাম, এখন মুন্না কী করেন। যা করলেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। কথাটা শুনেই গেটম্যানকে ডেকে বললেন, একে সোজা বাইরে নিয়ে যাও। নিয়ে ওখানে দাঁড় করিয়ে রাখো।
তারপর আমার দিকে ঘুরলেন, তুমি যেন কী বলছিলে?
আমি আসলে তখন আর কিছু বলতে চাই না। কারণ, কে জানে, হয়তো কিছুক্ষণ পর আমাকেই আবাহনী ক্লাবের গেট দিয়ে…
সেটা ‘৯৬-‘৯৭ সালের কথা। আজ এত বছর পর যখন ঘটনাটা পেছন ফিরে দেখি, তখন কিন্তু নবীন সাংবাদিককে নিয়ে খেলতে থাকা মুন্নাকে দেখি না। দেখি এক মুন্নাকে, যাঁর ব্যক্তিত্ব বহুমাত্রিক। যাঁর চরিত্র ধরা অত সহজ নয়, কিন্তু ধরতে পারলে বোঝা যায়, তিনি অনন্য।
সাক্ষাৎকার পর্বটা কোনোভাবে শেষ করে বেরোচ্ছি, হঠাৎ দেখি সঙ্গে সঙ্গে ক্লাবের গেটম্যানও বেরিয়ে এসেছে। এসে ধরে নিয়ে যাচ্ছে সেই লোকটাকে, যাঁকে মুন্না গেটের বাইরে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাংবাদিকের কৌতূহল থেকে পিছু নিলাম। মুন্না তাঁর সঙ্গে যদি কোনো বাজে ঘটনা ঘটান, তাহলে সেটা তো দারুণ একটা স্টোরি হবে। পিছু নিয়ে ভেতরে গিয়ে দেখি, মুন্না বলছেন, তোমার কত টাকা লাগবে?
এই পাঁচ হাজার টাকা হলেই হবে!
মাত্র পাঁচ হাজার টাকা?
তারপর পকেটে চলে গেল হাত। বেরিয়ে এল টাকা।
আমি থ! একি! মোগল সম্রাটদের অনেককে ঐতিহাসিকরা বলতেন, মিক্সচার অব অপোসিটস, তেমন একজন সম্রাটই তো আজ আমার সামনে আবাহনী ক্লাবে। শুধু এই জায়গায়ই নয়, মুন্না আসলে সম্রাটসুলভ ছিলেন অনেক জায়গায়_মাঠে, মাঠের বাইরে, চরিত্রে, আচরণে, ধরনে, বিশ্বাসে।
পরে যখন ঘনিষ্ঠতা হয়ে গিয়েছিল, তখন প্রথম দিনের স্মৃতি মনে করিয়ে তাঁকে লজ্জা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। এসব ক্ষেত্রে লজ্জা পাওয়ারই কথা। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, মুন্না বললেন, আগে তোমাকে আমার বুঝতে হবে না! আমি প্রথম সাংবাদিকদের চেনার চেষ্টা করি। তারপর দেখি, যে আমার সঙ্গে টক্কর দিতে পারে, তার সঙ্গেই আমার জমে, ঘনিষ্ঠতা হয়।
মুন্না আগে মানুষকে চিনতেন, ওই ব্যক্তির সীমা বুঝতেন, তারপর শ্রদ্ধা করার গুণ দেখলে তবেই তিনি…। তাই সাংবাদিকদের মুখের ওপর সত্য কথাটা বলতে তাঁর বাধেনি। যুক্তির কথা বলে কর্তাদের সামনে বিরাগভাজন হয়েছেন, সাসপেনশনে পড়েছেন, কিন্তু তাঁর কিছু যায় আসেনি।
২.
এই বাংলাদেশে সালাউদ্দিন নামে একজন ফুটবলার ছিলেন, যিনি জুতার ফিতা বাঁধার সময়ও হাজার-হাজার দর্শক হাততালি দিত। এনায়েত নামে একজন ছিলেন, যাঁর শটের জোর সম্পর্কে অনেক কিংবদন্তি রয়েছে। চুন্নু নামে একজন ছিলেন, যাঁর গতি আর কৌশলে ডিফেন্ডাররা খাবি খেত। ওয়াসিম নামে একজন ছিলেন, প্রাক টিভি যুগে যাঁর ড্রিবলিং দেখার জন্য মানুষ মাঠে ছুটে যেত। ছিলেন আরো অনেক কীর্তিমান, অসাধারণ সব ফুটবলার, তবু মুন্না অনেক দিক দিয়েই এক নম্বর। সবাইকে ছাড়িয়ে অনন্য।
সালাউদ্দিন ক্যারোলিন হিল ক্লাবের হয়ে হংকংয়ে পেশাদার লিগ খেলতে গিয়েছিলেন, খেলেছেনও। আসলাম, রুমীরাও খেলেছেন। কিন্তু তাঁরা কেউ নায়ক হতে পারেননি, পেরেছেন মুন্না। আজও কলকতার মানুষের কাছে বাংলাদেশের ফুটবল মানে মুন্না; দুই মৌসুম ইস্টবেঙ্গলের হয়ে এমনই মাঠ মাতিয়েছিলেন তিনি। বিদেশের মাঠে বাংলাদেশের ফুটবলের এমন গৌরবের ছবি হওয়াতে তিনি একা। যেমন তিনি একা দামের বেলায়ও। সেই ‘৯১ সালে তাঁকে নিয়ে আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্স টানাটানিতে তাঁর দামটা উঠে গিয়েছিল ৩০ লাখে, শেষ পর্যন্ত আবাহনীর প্রতি ভালোবাসার টানে ২০ লাখেই থেকে যান পুরনো দলে। এত টাকা বাংলাদেশের কোনো ফুটবলার পাননি কখনোই, মুন্না পেয়েছিলেন; এখানেও তিনি একা।
১৯৯৪ সালে ঢাকার ফুটবলে একবার বিদ্রোহ হয়েছিল। আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্সের তৈরি করা জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্টের বেড়াজাল ছিঁড়তে জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা সব বিদ্রোহ করে চলে গিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধায়। আবাহনীতে রয়ে গেলেন মুন্না। তাঁর পেছনে চিরবিশ্বস্ত মহসিনের জায়গায় এখন অর্বাচীন সাইদুর। সঙ্গী ডিফেন্ডার সোহেল রেজা, আলী মনসুর কিংবা ইমাদুল। অথচ তাঁদের নিয়েই আবাহনীর ডিফেন্স দুর্ভেদ্য। এবং আবাহনী ওই বছর একঝাঁক নবীনকে নিয়ে চ্যাম্পিয়নও। এর চেয়েও বড় ব্যাপার, ওই মৌসুমে মুন্না আমাদের দেখালেন ক্রিকেটের মতো ফুটবলেও অধিনায়ক প্রভাববিস্তারী হতে পারে। ডিফেন্সে দাঁড়িয়ে মিডফিল্ডারদের নির্দেশনা দিচ্ছেন, আবার তারা যখন ব্যর্থ হচ্ছে, তখন তিনি হাজির। এ যেন ওয়ান ম্যান সকার টিমেরই বাংলাদেশি সংস্করণ! তাও কিনা ডিফেন্ডার! না, এর আগে বাংলাদেশের ফুটবল এমন জিনিস দেখেনি। এখানেও তো মুন্না। একা এবং অনন্য। একা তিনি চলে যাওয়াতেও। এমন কী বয়স হয়েছিল! মাত্র ৩৭। আজ এই পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে লিখতে বসে মনে হচ্ছে, এই চলে যাওয়ার কারণ বোধহয় এখানেও তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। তাই…


৩.
আজ সালাউদ্দিন ফুটবল ফেডারেশন চালাচ্ছেন। বাদল রায় এসএ গেমসে বিশাল কর্মকর্তা। সালাম-চুন্নুরা বিরাট ব্যবসায়ী। অথচ আপনি নেই! খেলাটা শেষ করেছিলেন, কিন্তু আরো কিছু কাজ যে বাকি রয়ে গিয়েছিল! রাজনীতির খুব শখ ছিল, নির্বাচন করে এমপি হওয়া। সেটা যে শেষ করে গেলেন না! আফসোস হয় না আপনার!
বাংলাদেশ এখন সোনা জিতছে। মানুষ আবার ফিরছে ফুটবল মাঠে। দেখলে নিশ্চয়ই নারায়ণগঞ্জের আঞ্চলিকতা মেশানো দাপুটে ভাষায় বলতেন, ‘কী মিয়া, দেখলা তো! ফুটবল কিন্তু আবার…’
কথাটা মনে হতেই একটু হাসি পাচ্ছে। আপনি মাঝেমধ্যে আনুষ্ঠানিকতার স্বার্থে গুছিয়ে কথা বলার চেষ্টা করতেন। ঠিক জমত না। আপনার আরো অনেক ঘাটতি ছিল। আপনার দৃঢ়তাকে কেউ কেউ ভুল বুঝে ভাবত আপনি অহঙ্কারী। আপনার ব্যক্তিত্বের অর্থ না ধরতে পেরে আড়ালে অনেকে সমালোচনা করত। একবার একটা টুর্নামেন্টে আবাহনীর হয়ে খেলতে যাননি বলে আপনাকে অপেশাদার বলতেও ছাড়েনি কেউ।
কিন্তু যখন আপনার গায়ে উঠত আবাহনীর দুই নম্বর জার্সি, তখন সব ঘাটতি এর আড়ালে অদৃশ্য। তখন আপনি সেরা, আপনি নেতা, আপনি বলিষ্ঠ, আপনি অনন্য।
আপনার এই অকালে চলে যাওয়ায় তাই আমাদের খুব আফসোস হয়। ফুটবলের সোনালি সাফল্যের সময় আবছামতো ভেসে ওঠে আপনার ছবি। আপনাকে সত্যিই মিস করি।

আপনি করেন? মনে হয় না। সব জায়গায় এগিয়ে থাকবেন বলেই না সবার আগে চলে গেলেন!

—————–
আজ মুন্নার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে কালের কন্ঠ স্পোর্টসে প্রকাশিত।

১,৮৪৯ বার দেখা হয়েছে

১৮ টি মন্তব্য : “মুন্না আপনিই এক নম্বর”

  1. মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

    আমার ছোট্টবেলার ফুটবল হিরো... মৃত্যুবার্ষিকীতে আমি তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি...
    অসাধারন একটা লেখা দিয়ে এই কিংবদন্তিকে আবার সামনে নিয়ে আসলেন, ধন্যবাদ মামুন ভাই...

    জবাব দিন
  2. রকিব (০১-০৭)

    মুন্না যখন মারা যান তখন বেশ ছোটই আমরা; কেন যেন মনে করতাম খেলোয়াড়রা কখনো মারা যান না। একদিন পেপারে হাসপাতালে অসুস্থ্য মুন্না ভাইয়ের ছবি দেখে একটু অবাক হয়েছিলাম।
    ভালো থাকুন মুন্না ভাই।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  3. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    অসাধারণ এক ফুটবল শিল্পীকে নিয়ে অসাধারণ একটি লেখা। মামুন ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ লেখাটি সিসিবি'তেও শেয়ার করার জন্যে। কিডনি জটিলতা পরে বোনের কিডনি নিয়ে মোটামুটি সুস্থ হয়ে ফিরে আসা, আবারও অসুস্থ হয়ে পরে চিরতরেই চলে যাওয়া প্রত্যেকটা ঘটনাই বেশ মনে আছে।
    মুন্নার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।