আমি গুগলকে কেন ভয় পাই?

জিন্নাত উল হাসান ব্লগ

গুগল একদিন পুরো বিশ্ব শাসন করবে – এই কথাটি কি বিশ্বাস করেন? তাহলে আশা করি এই পোষ্টটি আপনাকে নতুন করে ভাবতে শিখাবে।

সম্প্রতি গুগলের প্রধান এরিখ স্মিড্থ এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, অর্থনৈতিক মন্দাকে মোকাবেলা করতে তারা তাদের আয়ের পথ প্রশস্ত করতে প্রতিমাসে অন্তত একটি উদীয়মান কোম্পানীকে কিনে নিতে চান। ফলে নতুন কোম্পানীর সাথে সাথে তাদের সাথে যোগ দেবে কোম্পানিগুলোর চৌকস প্রোগ্রামাররা।

ভেবে দেখেছেন এই ছোট্ট কথাটিই কত ভয়ংকর হতে পারে? যারাই বড় হয়ে উঠতে চেষ্টা করবে, তাদেরকেই গুগল কিনে নেবে। ঠিক তেমনটিই হয়েছে গুগলের অতীতে কেনা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে – গুগল ১.৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে ছিল ইউটিউবকে, কারন তারা গুগল ভিডিওকে ছাপিয়ে অধিক জনপ্রিয় পেয়ে গিয়েছিল। ৩.১ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনেছিল ডাবলক্লিককে – কারন ডাবলক্লিক Adwords এর প্রতিদ্বন্দী হয়ে উঠছিল। তারা এন্ড্রয়েডকে কিনে নিয়েছে, কারণ তারা দেখেছে মোবাইলই একদিন কম্পিউটারের প্রতিদ্বন্দী হবে – আর তাই মোবাইলের রাজত্বকে জয় করতে তাদের একটি অপারেটিং সিস্টেম দরকার আর এন্ড্রয়েড তখন উঠতি অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল, বেশ গুগল তাদেরকেও কিনে নিল। এভাবে করে গুগল হরেক ধরনের প্রচুর কোম্পানিকে কিনে নিয়েছে, তাদের তালিকা পাবেন এখানে – http://www.meettheboss.com/google-acquisitions-and-investments.html

আমি গুগলের একনিষ্ট ফান কিন্তু মাঝে মাঝে গুগলের বেড়ে ওঠার হার দেখলে শিউরে উঠি। Gmail এখন সারা বিশ্বে ইমেইলের তালিকায় তৃতীয়, আজকাল প্রায়ই জিমেইলে সমস্যা দেখা যাচ্ছে। ফলে পুরো বিশ্ব থেমে যাচ্ছে। কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাইক্রোসফট আমাদের যা শুধু স্বপ্নই দেখিয়েছে যে তারা আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কম্পিউটার এনে দেবে। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারেনি। আর গুগল তা কাজে পরিনত করে দেখাচ্ছে। এখনই দিনের অনেকগুলো কাজের জন্য আমরা গুগলের উপর ভর করছি। ধীরে ধীরে গুগল আমাদের পুরোপুরি গ্রাস করবে।

আপনারা হয়তো জানেন না, এন্ড্রয়েড শুধু কম্পিউটারই নয়, বরং এয়ার কন্ডিশনার থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রায় প্রতিটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রন করতে পারবে। গুগল সম্প্রতি গৃহস্তালির বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের উপর একটি প্রোগ্রাম তৈরি করেছে যাতে আমরা ইন্টারনেটে বসেই পরীক্ষা করতে পারব ঘরের কোনো যন্ত্রটি চলছে কিংবা কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। প্রাথমিকভাবে সফটওয়ারটি কাজের মনে হতে পারে কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখুন যদি কোনো কারনে সফটওয়ারটি কাজ করা বন্ধ করে দেয় তবে কি সর্বনাশ হতে পারে। দেখা গেল আপনি কম্পিউটারই চালাতে পারছেন না, তখন কি হবে?

পিকাশার সর্বশেষ ভার্সনটি Face Detection করতে পারে এবং প্রতিটি ছবি সম্বন্ধে তারা নিজেদের ডেটাবেজে তথ্য রেখে দেবে। ফলে আপনি না চাইলেও আপনার কোনো আপন জনের ছবির সাথে সাথে আপনার তথ্যও গুগলের হাতে চলে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার আর কিছুই রইল না।

সার্চ ইঞ্জিন থেকে শুরু করে গুগল আজ আমাদের মোবাইলের Contact Lists এ চলে এসেছে। গুগল এখন আপনার প্রতিদিনের ডায়রী নিয়ন্ত্রন করে।গুগল জানে কে আপনার বন্ধু আর কাকে আপনি কি লিখে পাঠান। যদি আপনি গুগল ল্যাটিটিয়ুড ব্যবহার করেন তো গুগল আপনার অবস্থান সম্বন্ধেও নিশ্চিত। গুগল সৌর শক্তিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালছে, যদিও তারা বলছে নিজেদের বিদ্যুৎ করতেই এত বিনিয়োগ – কে জানে ভবিষ্যতে কি হবে? কিছুদিন পরে আসছে গুগল wave যা ইন্টারনেটের ব্যবহারকেই পাল্টে দেবে। এমনকি ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার মৃত্যুর ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছে। গুগল wave ব্যবহার করতে হলে হয় গুগল ক্রোম ব্যবহার করতে হবে নয়তো গুগলকে তৈরি আরেকটি সফটওয়ার ইনস্টল করে নিতে হবে। আর গুগল ভয়েস শুরু হলে আপনার আলাদা কোনো ফোন নম্বরের প্রয়োজন হবে না। গুগলই হবে আপনার ফোন নম্বর।

গুগলের সামনে আর কেউ নেই। মাইক্রোসফট তো এখন অস্তিত্ব বাঁচাতেই ব্যস্ত। চারিদিক থেকে গুগল মাইক্রোসফটকে চেপে ধরেছে। ইয়াহু আগেই শেষ। বই স্ক্যানের অনুমতি পেয়ে গেলে আমাজন শেষ। কেবল পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে ফেসবুক। ‌টুইটার দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে ঠিকই কিন্তু এটা কতটুকু আয় করতে পারবে কিংবা আদৌও টিকে থাকতে পারবে কিনা – এত তাড়াতাড়ি কেউই ভবিষ্যতবানী করতে পারবে না। গুগলের সামনে কেউই দাঁড়াতে পারবে না।

গুগলের মূলমন্ত্র হল Dont’ be evil। অথচ আমরা ধীরে ধীরে গুগলের খাঁচাতেই বন্দি হয়ে যাচ্ছি। আজকের বন্ধু একদিন শত্রু হয়ে যাবে নাতো?

কিছু কথা

লেখাটি প্রথমে প্রকাশিত হয়েছে আমার ব্যক্তিগত ব্লগে। আমি মূলত ব্লগিং, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, ইন্টারনেটে আয়ের কৌশল, ওর্য়াডপ্রেস ইত্যাদি নিয়ে ব্লগ লিখি আর মাঝে মাঝে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে জ্ঞান বিতরণ করে চলি।

সবার জন্য রইল শুভ কামনা।

৩৬ টি মন্তব্য : “আমি গুগলকে কেন ভয় পাই?”

  1. আপনের ব্লগে গিয়া পইড়া আসছিলাম।
    আমার তো ভালই লাগতেছে, গুগল মামা এত সুবিধা দিবো মাগনা মাগনা।

    আজকের বন্ধু একদিন শত্রু হবে কি না? হইতারে।
    মাগার্বেল্পাক্লেকাকের্কি? :grr:

    জবাব দিন
  2. মরতুজা (৯১-৯৭)

    স্বাভাবিকভাবেই তোমার সব কথার সাথে একমত নই 🙂 । তুমি ব্যাপারগুলোকে অনেক সহজ করে ফেলেছ। সব কিছু গ্রাস করে নেয়া এত সহজ নয়। তোমার কথা মতই মাইক্রোসফট এখনো পারেনি। আর এসব কম্পানি তো বাংলাদেশের নয় যে ব্যাবহারকারীদের তথ্য নিয়ে যা ইচ্ছা তা করতে পারবে। তবে হ্যাঁ, টেকনোলজির উপর আমাদের অতি নির্ভরশীলতা আমাদের সমস্যায় ফেলতে পারে যদি তা কাজ না করে। তবে তা যেকোন ক্ষেত্রেই সত্য।

    আর তুমি যেভাবে বললে, গুগল ছাড়া বাকি সবার মৃত্যুঘন্টা বেজে গেছে তা বোধকরি ঠিক নয়। গুগলের ~৭০% সার্চ মার্কেট শেয়ার কমানো বিং এর পক্ষে যেমন সোজা নয়, ঠিক তেমনি তোমরা যেমন ভাবছ গুগল ক্রোম আসলেই উইন্ডোজের ~৯০% শেয়ারের বারোটা বেজে যাবে সেটাও ঠিক নয়।

    জবাব দিন
    • জিন্নাত উল হাসান (৯৩-৯৯)

      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ

      আমি আসলে আমার শংকার কথা বলেছি, শংকা আর বাস্তবতা অবশ্যই যোজন দূরে।

      দেখুন, আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলব না যে গুগল পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলবে, তবে তাদের পরিকল্পনা মাইক্রোসফটের চেয়ে অনেক বেশি কাযর্করী। মাইক্রোসফট যেখানে পিসিকে আকড়ে ধরে থাকতে চেয়েছিল - সেখানে কিন্তু গুগল সার্চ ইঞ্জিনকে আকড়ে ধরে নেই। সার্চ ইঞ্জিনকে মূল ধরে তারা কি না খাওয়াচ্ছে আমাদের।

      আমার শুধু একটাই ভয় যে আমরা খুব বেশি গুগলের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি, অন্তত আমার ক্ষেত্রে ১০০% সত্য। গুগল অল্প অল্প করে হলেও সবদিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

      জবাব দিন
  3. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    দেখতে দেখতে গুগল কত বড় হয়ে গেল...এই তো সেদিনও...এইটুকু ছিল...কি কান্না...

    Jokes apart...বস, আমগো মতন নন্টেকিদের এইসব বিষয়ে আরো জানান...


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  4. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    জোর যার মুল্লুক তার... গুগলের জোর বেশি হলে মুল্লুকও তার হবে... স্বাভাবিক :-B


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  5. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    আমি অবশ্য ভয়ের কিছু দেখছি না। কারণ এ ধরণের কোম্পানির যত বিকাশ হবে তার সাথে তাল মিলিয়ে আইন শাস্ত্রেরও প্রভূত উন্নতি ঘটবে। এক সময় তো সফ্টওয়ার পাইরেসি বা জেনেটিক্স নিয়ে আইন করার কোন প্রয়োজন ছিল না। আর বর্তমানে এসব নিয়ে আলাদা পড়াশোনাই আছে।
    ডিজিটাল স্রোতে আমাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা যত কমে যাচ্ছে আমরা নিজেদের ব্যক্তি স্বাধীনতা সম্পর্কে ততই সচেতন হচ্ছি। আর ভোক্তারাই তো কোম্পানির ডাল-ভাতের যোগান দাতা, তাই না?

    জবাব দিন
    • জিন্নাত উল হাসান (৯৩-৯৯)

      গ্রামীন ফোনের কথাই ধরেন, ওরা এত বড় হয়ে গিয়েছে যে আমাদের মতো ছোটখাট কাষ্টমারদের কথা পাত্তাই দেয় না। এমনকি সরকারও কিছু করতে পারবে না।

      ঠিক তেমনই।

      ওবামার নির্বাচনে গুগলের কর্মচারিরা প্রচুর অর্থ চাঁদা দিয়েছে। আমেরিকার রাজনীতিতে বড় বড় কর্পোরেট জায়ান্টরা প্রচুর হস্তক্ষেপ করে। তাই বেশি বড় হয়ে গেলে লাগামছাড়াও হতে পারে।

      আশা করি এমনটি কখনই ঘটবে না।

      জবাব দিন
  6. ভাবতে ভালই লাগে গুগল এত আগাইয়া যাচ্ছে......
    সেই সাথে দেখতে ও ভাল লাগে সিসিবি তে আমার কলেজের এত ব্লগার....

    আমাদের জ্ঞান বহুত কম 🙁 🙁 আশা করি ভাইয়েরা আপনাদের অমূল্য জ্ঞান আমাদের ROCA 'র ব্লগেও দান করবেন...
    লিঙ্কটা জানার কথা তবুও বলি.......

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।