“পুরাতন ইঞ্জিনে নতুন বগি”

কেউ বলেন, “রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া নাকি মানুষ হয় না, এমনকি পাগলেরও নাকি রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন থাকে”। আরেকটু টেনে বললেও ভুল হবে না, হয়তোবা এদেশে কেবল একমাত্র পাগলেরই রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন থাকে!  কোনো একটি বিশেষ দলের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন থাকাটা অনেকের ক্ষেত্রেই আবশ্যক নাও হতে পারে, তবে রাজনৈতিক দর্শন হয়তো সবার একটা থাকা ভালো। আমারও একটা রাজনৈতিক দর্শন থাকতেই পারে যা আমাকে দেশ নিয়ে স্বপ্নবাজ করে তুলতেই পারে বা আমার ভেতর একটা ভিন্ন রাষ্ট্রকাঠামোর আকাঙ্ক্ষা তৈরী করতেই পারে। হয়তো আর সব নানান কারনেই আমি ব্যক্তিগত ভাবে বাংলাদেশের চলমান কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক নই। এতে অবশ্য অসুবিধার চেয়ে আমার সুবিধাটাই অনেক বেশি। আমাকে অন্ততঃ কাউকে সন্তুষ্ট কোরবার দায়ভার নিতে হয়না, কারোর গোলামী কোরবার দরকার পড়ে না। যখন লিখতে বসি, তখন কলম চলে সমান তালে। কে সরকারে বসে আছে, আর কেইবা বিরোধী চত্বরে, সেটাও দেখবার দরকার পড়ে না। আমি বা আমরা যারা সেই অর্থে ‘সংখ্যালঘু’ তারা যা বলছি বা বলবার চেষ্টা করছি বা আমাদের লেখায় যা আছে, তার সাথে অন্য কেউ যা বলছেন বা লিখছেন তার অমিল থাকলেই যে অন্যরা মেধাহীন আর আমি বা আমরা একাই মেধাবী, সে ধরনের কোনো দাবীও কখনো করিনা। তবে যে কোনো খাপছাড়া বা যুক্তিহীন বক্তব্যের সাথে মেধাহীনতার একটা সম্পর্ক বা যোগাযোগ যেমন থাকতেই পারে, তেমনি আবার কখনো কখনো কেবলই মোসাহেবী বা গদগদ আচরণ দ্বারা প্রভাবিত বা প্রণোদিত হয়েও অনেকে অনেকটা নিরুপায় হয়েই হয়তো নির্বোধের মতই মেধাকে সুকৌশলে নির্বাসনে পাঠান! আকাশে চাঁদ উঠুক না কেন, আর সবার মত আমিও তা দেখি। ঠিক একইভাবে আকাশ থেকে কখন, কতটা তারা খসে পড়লো, কতটা ধুমকেতুর পতন হলো, সেটিরও তো হিসাব রাখা চাই। যারাই যখন যতটুকু দেশের উন্নয়নের সঙ্গে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছে, হাত তুলে তাদেরকে সাধুবাদ জানাতে যেমন কুণ্ঠিত হওয়া উচিত নয়, তেমনি পালাক্রমে যারা দেশটাকে ‘খোকলা’ বানাচ্ছে ৪২ বছর ধরে, তারা যেই হোক না কেন, যে মতেরই বা যে দলেরই সমর্থক হোক না কেন – তাদের কাউকেই ছেড়ে কথা না বলবার মতো সাহসী লোকও আজ আমাদের দরকার অনেক বেশি। বাংলাদেশে জামাত শিবির ছাড়াও আরো দুটি শীর্ষ শিবির রয়েছে। এরাও অনেকটা স্বেচ্ছা-শিবির! দেশের সকল রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবি, সাংস্কৃতিক-পেশাজীবি-আমলা, পুলিশ-র‌্যাব-সেনাবাহিনী সহ সকল ছাত্র-শিক্ষক, সাধারণ জনতা আজ অসহায়ভাবেই এই দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে আছে! আমাদের সমস্যাটা আসলে অন্য এক জায়গায়। আমাদের শত বছরের ইতিহাস তো দাসত্ব্যের ইতিহাস, গোলামীর রক্ত তাই আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে! আমরা ভুলেই যাই, কোনো দলকে সমর্থন করার মানেই এই নয় যে, তার দাসত্ব্য করতে হবে। একশো ভাগ প্রভুভক্তি কেবল একটি বিশেষ চতুষ্পদ জন্তুকেই মানায়, মানুষকে নয়। কেননা মানুষ আর কুকুরে পার্থক্য হচ্ছে মনুষ্যত্বে – বিবেক আর বিবেচনায়। আর সে কারনেই হয়তো মানুষকে বলা হয়ে থাকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব – হোক না সে যে কোনো ধর্ম, যে কোনো মত বা পথের অনুসারী।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও একথা তো ঠিক, আজ মনুষ্যত্ব আর বিবেক বেচাকেনার মহাকাল মহাসমারোহেই উপস্থিত। রাজনীতির ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের মহা উৎসব চারিদিকে। আদর্শ নিয়ে রাজনীতি আজ আর ক’জনই বা করে। একটা সময় ছিলো যখন মানুষ রাজনীতি করতো দর্শন ভালবেসে, কেউবা বিজ্ঞান-সমাজবিজ্ঞান ভালবেসে, কেউবা রাজনীতিতে আসতো ইতিহাস ভালবেসে। আজ হয়তো অধিকাংশই রাজনীতি করে পাটীগণিত ভালবেসে! টিকেট-রাজনীতির কষা নির্বাচনী-অংকের দুর্বোধ্য মারপ্যাঁচে বিভ্রান্ত, প্রলুব্ধ বা আকৃষ্ট হয়ে! দেশ আর দেশবাসীর মঙ্গলটা ক’জনের মাথার মধ্যে কতটা গভীরভাবে প্রোথিত, সেটা বোঝা খুবই মুশকিল।

বাংলাদেশের এই ঘোলা রাজনীতির বহুবিধ কদাকার দিক রয়েছে। সেগুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা-সমালোচনা রাতদিন তো চলছেই। কিচ্ছু লাভ কী হচ্ছে তাতে? হচ্ছেনা। আমার বিবেচনায় এর একটি বড় কারণ হলো, আমরা আমাদের মগজকে স্থানান্তরিত করেছি মুন্ডু থেকে অন্যত্র। বিভক্ত হয়ে যাই সহসাই, সুবিধা ও স্বার্থমত কোনো একটা দলে ভিড়ে যাই। হয়ে পড়ি বিবেকহীন এক একটা দেহ (Just bodies without conscience)। “পরমতসহিষ্ণুতার” বদলে পরনিন্দা, পরচর্চা, কুৎসিত কাদাছোড়াছুড়ি “পরমতসহিংসতায়” অনায়াসেই রুপ নেয়। এই একটি বিষয়ে উপুর্যুপরি আলোকপাতওহয়েছে অনেক।পরনিন্দা আর পরচর্চার একটি অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে আমাদের জাতীয় সংসদ। খুবই দুঃখজনক হলেও এটা বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, সেখানে চলছে সব জঙ্গলের আইনকানুন (Laws of the Jungles)।

সংসদে সাংসদদের বে-আদবী আচরণ রুখতে আমাদের প্রাক্তন স্পিকার জনাব আব্দুল হামিদ বর্তমানের মহামান্য রাষ্ট্রপতি একবার কিছুটা ধমকের সুরেই বেশ কিছু সাহসী বক্তব্য দিয়ে সংসদে হৈচৈ তুলে ফেলেছিলেন। তিনি কিছুটা চটে গিয়েইে বলেছিলেন যে, সাংসদরা যদি সংসদের মর্যাদা রক্ষা করতে অপারগ হন, অশোভন আচরণ, অশ্লীল মন্তব্য এবং কাদাছোড়াছুড়ি ইত্যাদি নিয়েই বেশী মাততে চান বা এসব নিয়ে লঙ্কাকাণ্ডও বাঁধাতে চান, তবে তারা যেন তা সংসদের বাইরের খোলা ময়দানে বা উদ্দ্যানে গিয়ে করেন, চাইলে গায়ে তেল মেখে বা পরনে শুধু নেংটি মেরে হলেও তা্রা তা করতে পারেন! কে শোনে কার কথা? আমাদের রাষ্ট্রপতি আজ আর তেমন কোনো উচ্চবাচ্চ করেন না। সম্ভবত বাকশক্তি সংরক্ষনে ব্যস্ত। অনেকটা সেই “কেউ কথা রাখেনি”র বরুণার মতো যেন ‘ডাকাত স্বামীর ঘরে এখন চার সন্তানের জননী’! সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রপতিদের যেমনটা দশা করা হয়! তাতে অবশ্য তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধার এতটুকুও কমতি হয়নি কখনোই। সংসদে এখন যারা বসে আছেন তারাও সবাই যেন এক একজন বিরাট সব ‘নির্বাচিত কুতুব’! জাতীয় সংসদ কি জিনিস?ওখানে সাংসদদের দায়িত্ব-র্কতব্য  কি? কি কারণে তাদেরকে ওখানটায় প্রবেশের ও বক্তব্য দেয়ার অধিকার দেয়া হয়েছে? এইসব তারা কেউই জানেন বলে আমার তো মনে হয় না। সংসদ অবমাননা কাকে বলে সেসবেরও কোনো তোয়াক্কা তারা করেন না। সুযোগ পেলেই যেন সংসদে দাঁড়িয়ে হয় অকথ্য ভাষায় অন্যের চরিত্র-হনন নতুবা শুধুই স্তবগীতি পাঠ করেন। স্তবগীতি তো নয় যেন “দাসত্ব্যের মানপত্র”পাঠ করছেন! আজকাল অশ্লীলতাই সংসদে মতপ্রকাশের আরেকটি অনিবার্য  উপসংগ বা অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে! এই বিষয়ে কিঞ্চিত আরেকটু আলোকপাত না করলেই নয়।

“সংসদে কাল শিরনী আছিলো
অঢেল গোস্ত রুটি
বাচিয়া গিয়াছে
সাংসদ সবে হেসে তাই কুটিকুটি”!!!

“ধর্মের কল বাতাসে নড়ে?”  আর সেজন্যই কী “চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী”? আমার কিন্তু সেরকমটা মনে হয় না। আজকের বাস্তবতা হচ্ছে, ধর্মের যে বাণী মানুষের অন্তরে আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা জাগাতে পারে সেই বাণী থেকে যে-ই মুখ ফিরিয়ে নেবে সে-ই যেন আজ সবচে বড় আধুনিক, সংস্কারহীন, প্রগতিশীল মানুষ!! কোনো একটি ধর্মের কোনো একটি সুবচন বা সদাচারণ সেটাকে Conceive করা,  Perceive করা বা  Consider করার মধ্যে হারাবার তো কিছু নেই? কিসের ভয় তোমার?  ধর্মান্তরের(Conversion)  যুগ নয় এটা। সেই যুগ বা সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে বহু বছর আগে। ধর্মাবতাররাও কাউকে ধর্মান্তরিত করার কোনো ক্ষমতা রাখতেন না। তাদের দায়িত্ব ছিল কেবলমাত্র মেসেজটুকু পৌঁছে দেয়া। বাকী কাজটুকু বিধাতা করতেন তার একচ্ছত্র ক্ষমতাবলে। সঠিক পথের দিশা যেই চেয়েছে সেই পেয়েছে যুগে যুগে। মানুষ স্রস্টার অদ্ভুত এক সৃস্টি! পুরোপুরি স্বাধীন, চিন্তাশীল, বিবেকসম্পন্ন করে মানুষকে বিধাতা তার সৃস্ট  “বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সাপেক্ষে অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র” এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন কোনো একটি বিশেষ কারনে অবশ্যই। সেই কারণটার অনুসন্ধান যে যার মত করে করুক না কেন। স্রস্টা যুগে যুগে অসংখ্য পথপ্রদর্শক পাঠিয়েছেন, ধর্মের শৃংখলা দিয়ে মানুষকে বিপথগামী হতে রক্ষা করবার জন্য। তাঁদের কথা কেউ শুনেছে কেউ শোনেনি। তাদের মধ্যে এমনও কেউ ছিলেন, যার কথা একজন মানুষও শোনেনি! তাতে সমস্যা কোথায়? আবার তাঁদের মধ্যে কাউকে হত্যাও করা হয়েছে!একটু আধটু ইতিহাস পড়লেই এইসব জানা যায়। বস্তুত ধর্মকে যদি একই স্রস্টার বাণী বা যুগোপযোগী জীবনবিধান বলে বিশ্বাস করে নেয়া হয়, তবে তো আমরা সবাই যারা হিন্দু-ইহুদী-খৃস্টান-বৌদ্ধ-মুসলিম, যারা একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করি,তাদের কাছে ধর্ম তো একটা ঐশী-পরম্পরাই। তবে যার যার ধর্মবিশ্বাস তার তার নিজস্ব একটা ব্যাপার এবং তার চর্চার পদ্ধতিও ভিন্ন হতেই পারে – সেটা সঠিক না বেঠিক সেই বিতর্কেও তোজড়াবার কোনো দরকার নেই। তবে ধর্মের যে অমোঘ বাণী, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, সেটাকে অনুসরণ করলে যদি আমি ব্যক্তিগতভাবে, পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে উপকৃত হতে পারি,  তাতে লাভটা তো আমারই।

একটা ছোট্ট কাহিনী বলি। মহানবী (সঃ) এর পরপরই যে দুইজন মানুষ মুসলিম জাহানের খলিফা বা নেতা মনোনিত হয়েছিলেন তারা হলেন হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ)। মহানবীর জীবদ্দশায় কোনো একটা মিশনে তাঁরা দুজন মক্কার অদূরে অবস্থান করছিলেন। তখনকার আরব দেশের চল অনুযায়ী যথারীতি একজন লোক তাদের সঙ্গে গেছেন তাদেরকে রান্না ও অন্যান্য কাজকর্মে সাহায্য করবার জন্য। একদিন সেই আনসার বেচারা ঘুম থেকেই উঠতেই পারেনি। রান্নাও হয়নি সেদিন। একটা মিশনে এসে সাহাবা দুজনের জন্য রান্না না করে সে যে ঘু্মিয়ে ছিল, সেই ব্যাপারটা নিয়ে তাঁরা দুজন নিজেদের মধ্যে সামান্য বলাবলিও করছিলেন এবং অতঃপর লোকটিকে ঘুম থেকে তুলে তাকে মহানবীর কাছে পাঠালেন, আর অনুরোধ করলেন,  তাঁদের জন্য কিছু খাবার পাঠাতে। মহানবী (সঃ)  লোকটিকে সঙ্গে সঙ্গেই ফেরত পাঠালেন এই বলে যে, “গিয়ে তাঁদের বলো যে তাঁরা খেয়েছেন”। এই কথা শুনে সাহাবা দুজনেই তাজ্জব বনে গেলেন এবং তৎক্ষণাৎ তাঁরা মহানবীর কাছে ছুটে গেলেন এবং তাঁকে শান্তকন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,  মহানবী (সঃ) কেন বললেন যে তাঁরাখেয়েছেন।  মহানবী (সঃ)  উত্তর দিলেন, “তোমরা তোমাদের মৃত ভাইয়ের মাংস খেয়েছো।” তাঁদের ওই সামান্য harmless  সমালোচনাটুকু যদি তাঁদের জন্য তাদের “মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার” সমতূল্য ব্যাপার হয়, তবে আমরা অহরহ, অনবরত,  কারণ-অকারণ, ঘরে-বাইরে যা করি বা করছি সেসবকে কী বলা চলে?  পরনিন্দা বা পরচর্চা জঘন্য একটি কাজ, ইংরেজীতে যাকে বলা হয় ব্যাকবাইটিং (Backbiting)। আরবীতে গীবাহ বা গীবত। সঙ্গা অনুযায়ী,  Anything  we say about someone  behind his  or her back which is true and which he or she would dislike, is called backbiting.   And, if what is said is not true, then that’s even worse form of backbiting (called Slander)!তবে আড়ালে বা প্রকাশ্যে কারো বিরুদ্ধে নিন্দা জানাবার কতগুলি বৈধ উপায় ও ক্ষেত্রও রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে সুনির্দিস্ট নির্দেশনাও রয়েছে। আজকের আলোচনায় সেসব নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই।

সে যাই হোক, “সংসদ অধিবেশন” নামে বাংলাদেশে একটা টিভি চ্যানেল রয়েছে। বিরক্তিকর এবং সারাক্ষন কোনো কারণ ছাড়াই বিব্রতকর রকম ভাবেই প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে নির্লজ্জ গুণকীর্তন আর বিরোধীদল বা ব্যক্তিবিশেষের চরিত্রহনন ছাড়া সংসদে যে খুব একটা কিছু হয় না, এই চ্যানেলটি সেইসবের প্রামাণ্য দলিল খব নিষ্ঠার সঙ্গে সরাসরি সম্প্রচার করে বলে, চ্যানেলটার প্রতি মানুষের আগ্রহ অনেক কম। সারাক্ষন সাংসদরা যেন হুমড়ি খেয়ে সেখানে তাদের সেই “মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার” উৎসবেই মেতে আছেন। ২১শে অক্টোবর সন্ধ্যায় হঠাতই চ্যানেলটাতে চোখ আটকে গেল আমার। স্মরণশক্তি যদি আমাকে প্রতারণা না করে তবে “ফরায়েযী” নামের এক সাংসদ একটি অপ্রয়োজনীয় প্রসংগের সূত্র ধরে যা বলে গেলেন,  তাও আবার সেটা “মাননীয় স্পিকার” কে নালিশ দিয়ে যে,  দেশের প্রধানবিরোধীদলীয় নেত্রীর দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম পরিচয় নাকি প্রশ্নবিদ্ধ!এবং তিনি এর সঙ্গে দেশের প্রাক্তন একজন রাষ্ট্রপতিকেজড়িয়েও একটা উত্তেজনাকর ভাষণও দিয়ে ফেললেন!  তিনি আরো বললেন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে প্রয়াত একজন শহীদ রাষ্ট্রপতির হত্যাকান্ডের সাথেও নাকি এই বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং সেই প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিদুজনেই জড়িত ছিলেন!কী সাংঘাতিক অভিযোগ!  তাও আবার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে! বেচারী স্পিকার নিজেও যে বিব্রত বোধ করছিলেন সাংসদের এই আচমকা, অমূলক, অপ্রয়োজনীয় আস্ফালনে, সেটাও বোঝা যাচ্ছিলো তাঁর মুখের অভিব্যক্তিতে। দেশের নীতি নির্ধারনের দায়িত্ব দেশের নির্বোধ জনতা নির্বোধতর যে সমস্ত  জনপ্রতিনিধির হাতে তুলে দেয়, তারা সেইসবের ধার ধারেন না। বরং  সারাক্ষন প্রভুর গুণকীর্তন, নয়তো অহেতুক অন্যের “চরিত্র হনন” (Character Assassination)  অর্থাৎ “মৃত ভাইবোন-আত্মীয়স্বজনের মাংসভক্ষণেই” ব্যস্ত তারা!!!  এইসব রগরগা চটিকাহিনী বয়ান করার জন্য আপনাকে সংসদে পাঠানো হয়নি, মাননীয় সাংসদ। অবশ্য আমরা এও জানিনা যে, আপনি কি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য? নাকি “ভোটারবিহীন” নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্ধন্দিতায় নির্বাচিত একজন অবৈধ সাংসদ?

জাতীয় সংসদের এই চেহারা অবশ্য মোটেই অপরিচিত কোনো কিছু নয়, এ যেন ঠিক সেই “পুরাতন ইঞ্জিনে নতুন বগি” সংযোজন বা “নতুন বোতলে পুরান  মদ” ঢেলে নির্বোধ দেশবাসীকে দূর্দশার মুখে ঠেলে দেয়া বা মাতাল বানিয়ে রাখার ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই সুনিপুণ মঞ্চাভিনয় সংঘটিত হয়ে চলেছে!

এটা কী পার্লামেন্ট? নাকি চারপায়া জন্তুর খামার?

১,০২০ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : ““পুরাতন ইঞ্জিনে নতুন বগি””

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    গীবত ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়ংকর।
    একবার এক আওলিয়ার কাছে এক লোক তার করা ভয়ংকর অপরাধের কথা বলে। অপরাধ শুনে আওলিয়া বলেন, আমি ভেবেছিলাম তুমি গীবত করেছো!


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  2. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)
    হয়তো আর সব নানান কারনেই আমি ব্যক্তিগত ভাবে বাংলাদেশের চলমান কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক নই। এতে অবশ্য অসুবিধার চেয়ে আমার সুবিধাটাই অনেক বেশি।

    ওমর ভাই,
    আশা করি সবসময় এই অবস্থানে থাকতে পারেন।

    পোষ্টের মূল বক্তব্যে সহমত।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।