ঈশ্বরের লীলাখেলা বোঝা বড় দায়

ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ” (Dr. Strangelove or: How I Learned to Stop Worrying and Love the Bomb) আমার জীবনে দেখা সেরা কমেডি সিনেমা। মাঝে মাঝে মনে হয়, এটাই বোধহয় জীবনে দেখা সেরা সিনেমা। কোন সিনেমা দেখে এতোটা মুগ্ধ হইনি, কোন সিনেমাই এতো বার দেখিনি। অবসর পেলেই স্ট্রেঞ্জলাভ দেখতে বসে যাই। বেশ কিছুদিন আগে ইউটিউবে স্ট্রেঞ্জলাভ নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে একটা ট্রেলার পেয়েছিলাম। ট্রেলারটাও খুব মজার। কোন ধরণের মজার কথা বলতে চাচ্ছি সেটা তো ভেঙে বলার প্রয়োজন নেই, শুধু বলছি এটা রঙ্গ-রসিকতা না, এটা ব্ল্যাক কমেডি। ট্রেলারের ইউটিউব লিংকটা দিচ্ছি:

ট্রেলারে দেখলাম ৭টি প্রশ্ন করা হয়েছে। আসলে এই সাতটা প্রশ্নই যেন ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভের বডি ওয়ার্ককে আমাদের সাথে তুলে ধরে। প্রশ্নগুলো মনে রেখে মুভি দেখতে বসার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। তবে প্রশ্নগুলো নিঃসন্দেহে মুভি দেখায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। প্রশ্নগুলো মাথায় রেখে আমি আবার মুভিটা দেখলাম। তারপর প্রশ্নগুলো সম্পর্কে এরকম অনুভূতি হল:

Why did U.S. bombers attack Russia?

মানসিকভাবে বিকৃত এক জেনারেল went a little funny in the head, a little funny. এই একটু ফানি হয়ে সে “প্ল্যান আর” ইস্যু করেছে। এজন্যই মার্কিন বম্বার অ্যাটাক করছে রাশিয়া। ৩৪টি প্লেন রাশিয়ায় তাদের ৬৮টি অ্যাটাক টার্গেটের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছে। হাতে সময় মাত্র এক ঘণ্টা, এই এক ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধানের জন্য মিটিং চলছে অ্যামেরিকার ওয়ার রুমে। তার মানে বিংশ শতকের জ্যাক দ্য রিপার মানবতা ধ্বংসের বদলে এবার পৃথিবী ধ্বংসের খেলায় মেতেছে। প্রতিটি যুদ্ধ ও সহিংসতাই যেন এরকম খানিকটা ফানি হয়ে যাওয়ার ফল। একটু ফানি… ট্রেলারে আবার Why did U.S. bombers লেখাটুকু দেখানোর পর, পরের শব্দ দুটো দুজনকে দিয়ে বলিয়ে নেয়া হয়েছে, মুভিরই কাটা অংশের মাধ্যমে। attack বলেছে জেনারেল বাক টার্জিডসনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ও গার্লফ্রেন্ড, আর Russia বলেছে স্বয়ং জেনারেল টার্জিডসন।

What was the first word said on the hot line?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট মার্কিন মাফলি। মাফলি চায় না যুদ্ধ বেধে যাক। কারণ খুব স্বাভাবিক, আমেরিকার নীতি ছিল: পারমাণবিক যুদ্ধ কখনই সে শুরু করবে না। অন্য কেউ শুরু করলে একটু রেসপন্স করবে, এই যা। তাছাড়া ইতিহাসের বইয়ে নিজের ভাবমূর্তি নিয়েও খুব চিন্তিত মাফলি। যদিও টার্জিডসনের মতে ইতিহাসের বইয়ে নিজের ভাবমূর্তির উপর মার্কিন জনগণকে স্থান দেয়া উচিত। জনগণ বলতে যে টার্জিডসন কি বুঝিয়েছেন সেটা সিনেমা দেখলেই বোঝা যায়। সব ভেবে রুশ রাষ্ট্রদূতকে ওয়ার রুমে নিয়ে আসা হয়েছে। আর মাফলি হট লাইনে রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রির সাথে কথা বলে চলেছেন। ট্রেলারে যা দেখানো হয়েছে হট লাইনে বলা প্রথম শব্দ কিন্তু সেটা ছিল না, বরং এটা শেষের দিকের শব্দ। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে- এটা উপলব্ধি করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখভঙ্গি ও বাচনভঙ্গিই এখানে লক্ষ্যনীয়।

Why did U.S. paratroopers invade their own base?

“প্ল্যান আর” ইস্যু হয়েছে। তাই বার্পেলসন এয়ার ফোর্স বেজ সিল করে দেয়া হয়েছে। ২০০ মিটারের মধ্যে কোন কাক-পক্ষীকেও ঢুকতে দেয়া হবে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট চিত্তবিকারগ্রস্ত জেনারেল রিপারের সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন, প্লেনগুলোর রিকল কোড জানার জন্য। তাই কাছাকাছি অবস্থিত আর্মি বেজ থেকে ফোর্স এসেছে বার্পেলসনে অনুপ্রবেশ করে জেনারেল রিপারকে ফোনে প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলিয়ে দেয়ার জন্য। এতেই শুরু হয়েছে সম্মুখ যুদ্ধ। Peace is our profession লেখা সাইনবোর্ডের সামনে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মেতেছে সৈনিকেরা। তবে এই যুদ্ধের ফলাফলই নিণর্য় করবে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ।

Why does Dr. Strange Love want ten females to each male?

আমেরিকা-রাশিয়া স্নায়ু যুদ্ধের সময় দুই দেশই চাইতো কোন কিছুতে যাতে দুজনার মধ্যে কোন গ্যাপ না হয়ে যায়। এক দেশ যখন একটা করবে সাথে সাথে আরেক দেশকেও সেটা করে দেখাতে হবে। একটু পরেই আমরা সিনেমাতে মাইন শ্যাফ্ট গ্যাপের কথা শুনতে পারব। তার আগে স্ট্রেঞ্জলাভ মাইন শ্যাফ্ট পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করছেন। যদি পৃথিবী আসলেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং কোবাল্ট থোরিয়াম জি-র অর্ধায়ু তথা ৯৩ বছর পৃথিবী-পৃষ্ঠে মানুষ থাকতে না পারে তাহলে একমাত্র উপায় হাজার হাজার ফুট নিচের মাইন শ্যাফটগুলোতে আলাদা আবাসস্থল নির্মাণ করা। এই আবাসস্থলে প্রতি ১০ জন নারীর জন্য একজন করে পুরুষ থাকতে হবে। কারণ স্ট্রেঞ্জলাভের মতে fertile নারী আর নারীদের যথেষ্ট প্রশান্তি দানে সক্ষম পুরুষেরাই কেবল সেখানে থাকতে পারবে। এতে মানুষের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। মানুষের ভবিষ্যৎ যেন নির্ভর করে sexual fertility-র উপর। এই থিমই ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভের সবচেয়ে জলজ্যান্ত কমেডি। রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো পৃথিবীতে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যে মানুষের ভবিষ্যৎ আবার সেই সেক্সুয়াল ফার্টিলিটির উপর গিয়ে পড়েছে। আজ থেকে দেড় লাখ বছর আগেও সেই ফার্টিলিটিই ছিল মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চাবিকাঠি। তার মানে আমরা দেড় লাখ বছর পিছিয়ে পড়তে চলেছি…

How does the fate of the world hang on a Coca-Cola machine?

আরেককটা গ্রেট চরিত্র জেনারেল রিপারের একজিকিউটিভ অফিসার রয়েল এয়ার ফোর্সের কর্মকর্তা গ্রুপ ক্যাপ্টেন লায়োনেল ম্যানড্রেক। আমি বোধহয় ম্যানড্রেক আর রিপারের কথোপকথনেই সবচেয়ে বেশী মজা পেয়েছি। বার্পেলসনে দুই মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধের উপর বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছিল। সেই যুদ্ধ শেষ হয়েছে, জেনারেল রিপারের ছেলেরা আত্মসমর্পণ করেছে। রিকল কোড ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় জ্যাক রিপার করেছে আত্মহত্যা। কিন্তু তার দেয়া ক্লুর ভিত্তিতে রিকল কোড POE পেয়ে গেছে ম্যানড্রেক। কিন্তু হায়রে কমেডিক বিশ্ব, হাঁটুতে বুদ্ধিওয়ালা আর্মি অফিসার কর্নেল ব্যাট গুয়ানোর কারণে সেই রিকল কোড প্রেসিডেন্টকে জানাতে বিলম্ব হচ্ছে। এই বিলম্বটুকু কোন দর্শক সহ্য করতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না। দেরী হতে হতে অবশেষে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ এসে বর্তায় এক কোকা কোলা মেশিনের উপর। এই মেশিনে গুলি করে পয়সা বের করে সেটা দিয়ে প্রেসিডেন্টের সাথে টেলিফোনে কথা বলতে হবে। তার আগে আবার ব্যাট গুয়ানো সতর্ক করে দিয়েছে: প্রেসিডেন্টকে ফোনে না পেলে ম্যানড্রেককে কোকা কোলা কোম্পানির কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

Why was General Jack D. Ripper obsessed by fluids?

আম্রিকায় নির্মীত রুশ পৌরাণিক কাহিনী: রুশ কমিরা নাকি সমগ্র পৃথিবীর মানুষের দেহ দূষিত ও কমিপন্থী করে দেয়ার ষড়যন্ত্র এঁটেছে। মানব দেহের ৭০% তরল- রিপারের কাছে এটা শোনার পর ম্যানড্রেক বলেছে: Good Lord. আর রিপার বাকিটা ব্যাখ্যা করেছে: fluoridation এর মাধ্যমে কমিরা এই তরল নষ্ট করার ফন্দী করেছে। এটা বাকি মানুষের purity of essence নষ্ট করে দিচ্ছে। ভালবাসার ফিজিক্যাল অ্যাক্ট তথা রতিক্রিয়ার সময় হঠাৎ fatigue নেমে আসে রিপারের মধ্যে- ঠিক তখনই সে এই কালজয়ী আবিষ্কারটি করে। তাই কমি ধ্বংসের মিশনে নেমেছে সে। এজন্যই সে distilled water, raiwater এবং pure grain alcohol ছাড়া কিছু পান করে না।

What is the Doomsday machine?

সিনেমার সমাপ্তি নির্মাণ করেছে এই ডুমসডে মেশিন। রুশ রাষ্ট্রদূত আমাদেরকে এই যন্ত্র সম্পর্কে জানায়। এটা কোবাল্ট থোরিয়াম জি দিয়ে তৈরী। বোম ফাটার পর ৯৩ বছর পৃথিবীতে সূর্যালোক ঢুকতে পারবে না এবং পুরোটা তেজস্ক্রিয় হয়ে যাবে। পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মার্কিন প্লেনগুলো রাশিয়ার যে স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করেছে তার যেকোন একটা আক্রান্ত হলেই এই ডুমসডে মেশিন অটোমেটিক ট্রিগার্ড হয়ে যাবে। আবার এই মেশিনকে আন-ট্রিগার করা যাবে না, আন-ট্রিগার করতে গেলেও অটোমেটিক ট্রিগার্ড হয়ে যাবে। কোকা কোলা মেশিন বোধহয় পুরো কাজে দেয়নি, তাই এবার পৃথিবী নিয়ে খেলছে ডুমসডে মেশিন। মেজর টি জে কং penis সদৃশ এটম বোমায় চড়ে রুশ টার্গেটে অবতরণ করেছে। তারপর… মেজর কং এর কাউবয় ক্যাপ এর কি হল???

BE026029

প্রশ্ন শেষ। এর পর সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্ট্রেঞ্জলাভের স্রষ্টা স্ট্যানলি কুবরিকের ছবি। ট্রেলারে একটা ছবি আছে: কুবরিক শ্যুটিং এর সময় স্টার্লিং হেইডেনকে দেখিয়ে দিচ্ছেন কিভাবে সিগার মুখে ধরতে হবে। সিগারটাও penis এর মত করে কাটা হয়েছে। তারপর এক স্পেশাল ভঙ্গিতে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে রিপারের মুখে। এক পাগলের মুখে। উপরের ছবিতে, বামে জেনারেল জ্যাক রিপার চরিত্রে স্টার্লিং হেইডেন আর ডানে স্বয়ং কুবরিক দ্য গ্রেট।

2

সিনেমার এই তিনটি চরিত্রে পিটার সেলার্স একাই অভিনয় করেছে। আমি পুরো সিনেমা দুই বার দেখার পরও এটা টের পাইনি। তারপর নেট ঘাটতে গিয়ে এই অবিশ্বাস্য তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ম্যানড্রেক, মাফলি আর স্ট্রেঞ্জলাভ- এই তিন চরিত্রেই পিটার সেলার্স অভিনয় করেছে। এই অসাধারণ অভিনয় দেখার পর সেলার্সের উপর আমার সব ক্ষোভ দূর হয়ে গেছে। এর আগে তার উপর রেগে ছিলাম। কারণ “দি এলিয়েন” সিনেমা নিয়ে ঝামেলা হওয়ার পর সে সত্যজিৎ রায়কে ব্য্যঙ্গ করেছিল। তার এক সিনেমায় বানরের নাম রেখেছিল অপু। যাইহোক এখন আমি সেলার্সের ভক্ত:

এরপরই বলতে হয় জেনারেল বাক টার্জিডসন চরিত্রে জর্জ সি স্কট এবং জেনারেল জ্যাক ডি রিপার চরিত্রে স্টার্লিং হেইডেন এর কথা। সিনেমার প্রতিটা চরিত্র ছিল অনন্যসাধারণ। অভিনয় নিয়েও নতুন করে কিছু বলার নেই। কুবরিকের মত পারফেকশনস্ট আর এদের মত দক্ষ অভিনেতা একসাথে হলে কি অ্যাকমপ্লিশ করা সম্ভব সেটা মানুষ মাত্রই বুঝতে পারে। ট্রেলারের শেষটা সবচয়ে আকর্ষণীয়। জেনারেল রিপার ম্যানড্রেকের কাছে ব্যাখ্যা করছে কিভাবে সে প্রথম fluoridation তথা communist infiltration সম্পর্কে সচেতন হয়েছিল:

I firstly came aware of that Mandrake, during the physical act of love.

তার আগে ছিল ট্রেসি রিডের কণ্ঠে প্রচণ্ড সেক্সি-ভাবে বলা love the bomb বাক্যটি। বিকিনি পরা ট্রেসি রিড সিনেমার যৌন লক্ষ্যবস্তুটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। প্লেনে এয়ার ফোর্স এর সৈন্যরা যে প্লেবয় ম্যাগাজিন পড়ছিল তাতেও ট্রেসি রিড এর ছবি দেখা যায়।

এই আমাদের ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ, ডুমসডে মেশিনের মাধ্যমে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও যে সিনেমা পৃথিবীর বুকে টিকে থাকবে। আমার মতে সর্বকালের সেরা তিনটি সিনেমার একটি হচ্ছে “ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ”। এটি একে তো সর্বোচ্চ শৈল্পিক মানের পরিচয় দিয়েছে তার ওপর সৃষ্টি করেছে সর্বকালের সেরা পলিটিক্যাল স্যাটায়ার এর। আমার মনে হয় না ভলতেয়ার মারা যাওয়ার পর ধরার বুকে স্ট্রেঞ্জলাভ এর চেয়ে শক্তিশালী কোন স্যাটায়ার নির্মীত হয়েছে। স্ট্যানলি কুবরিকের জীবনে করা সেরা দুটি সিনেমার একটি হচ্ছে ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ, “২০০১: আ স্পেস অডিসি”-র পরই। মূলত স্ট্রেঞ্জলাভ দেখার পরই আমি কুবরিকের পগলা ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সেই ভক্তি দিনকে দিন আরও বেড়েছে। বিংশ শতকে জন্ম নিয়ে কুবরিক আমাদের গ্রিক আর্ট এর স্বাদ দিয়েছেন, সভ্যতার অবক্ষয় কে এতো তীক্ষ্ণভাবে অন্য কোন শিল্পী ব্যঙ্গ করতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয় না।

স্ট্রেঞ্জলাভ এ বারবার সেক্স এর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ইরটিক দৃশ্য হচ্ছে ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ এর স্টার্টিং দৃশ্য-

দুটো প্লেন আকাশে উড়ছে। প্রত্যেকটিতে দুটো করে নিউক্লিয়ার বোমা আছে। অতি শর্ট নোটিশে রাশিয়া উড়িয়ে দেয়ার জন্য সদা প্রস্তুত তারা। এক প্লেন থেকে আরেক প্লেন এ জ্বালানী ভরা হচ্ছে। উপরের প্লেন থেকে পেনিস এর মত দেখতে একটি ডাণ্ডা নেমে এসেছে। ঢুকেছে গিয়ে নিচের প্লেনের একটি ছিদ্রে, যে ছিদ্রটিকে ভ্যাজাইনা মনে না করার কোনই কারণ নেই। অনেক সময় ধরে এই রিফিলিং চলে। রিফিল করছে একটি প্লেন আরেকটি প্লেন কে, পুনরায় চাঙ্গা হয়ে রাশিয়া ধ্বংসের দিকে মনোনিবেশ করতে। ক্রেডিট দেখানোর পুরোটা সময়ই এই দৃশ্য চলে। এক দৃশ্যেই আমাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়, দেখতে চলেছি অনন্যসাধারণ এবং অতিমাত্রায় ডিস্টার্বিং কিছু।

স্ট্রেঞ্জলাভ আমাদের আঘাত করে। আঘাত করে সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে। একে অপরকে খুন করতে ইতস্তত করলেও আমরা কত সহজে আরেকটি জাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারি এটা শেখানো হয়েছে স্ট্রেঞ্জলাভে। ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ মানবতার জন্য বানানো হয়েছে। কোনদিন যদি আমরা নিজেদের ধ্বংস করার খেলায় মেতে উঠি তবে কুবরিক ই আমাদের পুনরায় স্বপ্ন দেখাতে শেখাবেন, কুবরিক ই বলে দেবেন কে কাকে ধ্বংস করছে। ইতিমধ্যেই ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ নিয়ে স্কলারলি গবেষণা শুরু হয়ে গেছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক” ও “যুদ্ধের নৈতিকতা” পড়ানোর সময় অনেক অধ্যাপকই এই সিনেমাটি ব্যবহার করেন। অনেকে এই সিনেমা দেখানোর মাধ্যমে তাদের কোর্স শুরু করেন। বিজ্ঞান গবেষণায় যেমন আমাদের অনেক সময় সিম্যুলেশন করতে হয়, সমাজবিজ্ঞান গবেষণায় তেমনি একটি সিম্যুলেশন হচ্ছে ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ। সিম্যুলেশন থেকে কতোটা সাহায্য নিতে হবে এবং কিভাবে সাহায্য নিতে হবে সেটা জানা না থাকলে অবশ্য কোনই লাভ হবে না। মনে রাখতে হবে, এখানে স্ট্যানলি কুবরিক নিজে ঈশ্বর, এবং এই সিনেমাটি তাঁর তৈরি একটি মহাবিশ্ব।

ভিক্টর হুগো বলেছিলেন,

মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ দুজন সেবক ধরার বুকে এসেছেন ১৮০০ বছরের ব্যবধানে। প্রথম জন হলেন যীশু খ্রিস্ট, আর দ্বিতীয় জন হলেন ভলতেয়ার। তবে দুজনের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে- যীশু কেঁদেছিলেন, আর ভলতেয়ার হেসেছেন।

মানবতার দিকে তাকিয়ে ভলতেয়ার এর সেই অট্টহাসি আমি দেখতে পাই নি, শুনতে পাই নি, উপলব্ধি করতে পারি নি, কল্পনা করতে পারি নি। কিন্তু সেই হাসির সিম্যুলেশন করেছেন স্ট্যানলি কুবরিক। কুবরিক এর মাধ্যমেই আমি হেসেছি ভলতেয়ার এর মত করে, কুবরিক হয়তো ঠিক এটাই চাইছিলেন। আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, তুমি কিসে সবচেয়ে বেশী বিশ্বাস কর? আমি উত্তরে বলব, স্ট্যানলি কুবরিক কে, স্ট্যানলি কুবরিক কে আমি ঈশ্বরের চেয়েও বেশী বিশ্বাস করি।

১৫ টি মন্তব্য : “ঈশ্বরের লীলাখেলা বোঝা বড় দায়”

  1. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    দারুণ মুহাম্মদ। তোমার লেখাটা পড়তে পড়তে ছবিটা দেখতে বসলে নিশ্চয়ই আরো বেশি আনন্দ পাবো। ছবিটা দেখতেই হবে। :thumbup:

    অফটপিক : রাতে বাসায় ফিরে আজকাল আমি মুভি চ্যানেলগুলোতেই বেশি চলাচল করি। কাল দেখলাম 'মামা মিয়া'র শেষাংশ।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  2. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    কুবরিক বস। তারে নিয়া নতুন কিছু বলার নাই। মাত্র ১১টা ছবি করছেন সারা জীবনে সবগুলাই চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্যে দারুণ উপভোগ্য।

    'ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ' তার বাকি ছবিগুলার মতোই মাস্টারপিস। দেখছি বেশ কয়েকবার। প্রতিবার নতুন কিছু চোখে পড়ে। বিশেষকরে এই ছবির সংলাপ গুলা মারাত্মক। অনেকদিন মনে রাখার মতো।

    লেখা 'মুহাম্মদীয়' হইছে। 🙂

    :thumbup:


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  3. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    এবিসি'তে আমরা একটা অনুষ্ঠান করি "ডাবল এক্সপোজার"। রেডিও'তে সিনেমা। একটা ফিল্ম দেখতে দেখতে আমাদের দু'জন কথাবন্ধু এ নিয়ে কথার খেলা করে। আগে এটা রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত হতো। এখন সময় বদলিয়েছি। এখন থেকে প্রতি সোমবার রাত ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত হবে।

    এই অনুষ্ঠানে আমি রিসোর্স পারসন হিসাবে সাজ্জাদ শরীফ, শওকত হোসেন মাসুম এবং মুহাম্মদকে রাখার চিন্তা করেছি।

    মুহাম্মদ কি ঢাকায় চলে আসছো? সময় দিতে পারবে। মাসে একটা সপ্তাহে স্টুডিওতে কথাবন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সম্ভব? ছবিটা নিয়ে ওদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দেওয়া যাবে? ভাবো। আর ঢাকায় এসে দ্রুত আমার সঙ্গে যোগাযোগ করো।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
    • রিসোর্স দিয়ে যে কোন সাহায্য করতে প্রস্তুত। রিসোর্স মানে মুভিগুলা সম্পর্কে আমি যা জানি আর কি। কি কি বিষয় নিয়ে আলাপ করলে মুভিগুলার প্রতি সুবিচার করা হবে সেটুকু সম্পর্কে নিজের চিন্তাভাবনা জানাতে পারব।

      জবাব দিন
  4. মুভিটা এতদিন পরে দেখলাম। তারপরে এই পোস্টটা পড়তে আসলাম। মুভি দেইখা মজা পাইছি, হালকা বুঝছি, কিন্তু পুরা না। যেমন:
    মুভির নাম কেন স্ট্রেঞ্জলাভ হইল? এই পাগল তো ছবির লাস্টে অল্প একটু সময় কথা কইছে, তাও পাগলামি। যদি তার পাগলামী দেখানোই মুভির মূল উদ্দেশ্য হয়, তাইলে জ্যাক রিপার তো তার চেয়েও বেশি সিক।

    you cant fight here gentlemen, this is a war room.এই ডায়লগ টা , fight for peace লেখা বিলবোর্ডের সামনে যুদ্ধ, বোম্বের গায়ে hi there , dear john আর পাগলা ষাঁড়ের মত বোম্বের উপরে বইসা কাউবয় স্টাইলে অট্টহাসি এই কয়টা জিনিস দেইখা মজা পাইছি।

    আর দুই প্রেসিডেন্টের কথোপকথন তো হাইফাই।
    ভাল্লাগছে।
    আরেকবার দেখলে হয়তো আরো কিছু বুঝতে পারুম। রাইত জাগাটা সার্থক হইল আমারও।

    ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ, আইসওয়াইড শাট, আর স্ট্রেঞ্জলাভ তিনটা দেখলাম তিনটাই দশে দশ। কুবরিক সাহেবের ভক্ত হয়া যাইতেছি।

    জবাব দিন
  5. আরেকটা প্রশ্ন মাথায় ঢুকছে, এইরকম একটা বিকলাঙ্গ লোক কেমনে ওয়ার রুমে ঢোকার চান্স পাইল? ধরলাম , সে খুব জিনিয়াস বিজ্ঞানী, তাইলে তার হাত পা ছোঁড়াছুড়ির মানে কি? লাস্টে তার i can walk দিয়া কি বুঝানো হইছে?

    উইকিতে দেখলাম লাস্টে একটা মারামারির ছবি আছে যেইটা বাদ দিয়ে দেয়া হইছে জন এফ, কেনেডে অ্যাসাসিনেশন নিয়া কি একটা ঘাপলার কারণে, (ইংলিশ এখন মাথায় ঢুকতেছে না, উইকিতে তাই পড়তে ইচ্ছা করল না) চাইলে পড়ে আসতে পারেন উইকি থেকে

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : কামরুল হাসান (৯৪-০০)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।