তোরা…

বৃহস্পতিবার রাত।

দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের কাছে এটা “চাঁদরাত” বলে খ্যাত।আকাশে চাঁদ থাকুক আর নাই থাকুক,এটা চাঁদ রাত।সারা সপ্তাহের ক্লান্তিকর ল্যাব, ক্লাস, ক্লাসটেস্ট, অ্যাসাইনমেন্টের বোঝা থেকে দিন দুয়েকের জন্য মুক্তির সুবার্তা নিয়ে আসা মহিমান্বিত বৃহস্পতিবার রাত।ক্ষেত্রবিশেষে চাঁদরাত থেকেও আনন্দপূর্ণ।

আজ সেই বৃহস্পতিবার রাত।

রাশা আধশোয়া হয়ে আছে তার বিছানায়।অলস চোখজোড়া ল্যাপটপের স্ক্রীনের উপর বুলিয়ে যাচ্ছে।ফেসবুক ট্যাব ওপেন করা।শতশত নিউজ ফিড।তার প্রায় পাঁচশ ফেসবুক বন্ধুর কেউ না কেউ প্রতি মুহূর্তে কিছু না কিছু করছে।জাকারবার্গের সদ্য পরিবর্তিত ফেসবুক সিস্টেম সেটা তড়িৎবেগে স্ক্রীনের ডানদিকের কোনায় দেখিয়ে দিচ্ছে।ফেসবুকপাগল রাশা অন্য যে কোন দিন হলে চরম আগ্রহভরে প্রতিটা নিউজ দেখত।কিন্তু আজ সে কোন আগ্রহ পাচ্ছে না।নিতান্ত অভ্যাসবশত চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু চোখ থেকে তথ্য নিয়ে নিউরোন সেলগুলো মস্তিষ্কে বার্তা পাঠাচ্ছে না।তাই ব্রাউজার ক্লোজ করে ড্রাইভগুলোতে ঢুঁ মারতে থাকে রাশা।একটা মুভি দেখা যায়।হয়তোবা তাতে মানসিক অবস্থা একটু পরিবর্তন হবে।

“DHAMAAL” দেখা যায়।৭-৮ বছরের পুরনো একটা হিন্দী কমেডি মুভি।রাশার যখনই মন খারাপ থাকে,সে এই মুভিটা দেখে।প্রচন্ড হাসির মুভি।মন ভালো হয়ে যায়।কিন্তু খুঁজে দেখা গেল মুভিটা নেই।মনে পড়লো।“TWILIGHT” সিরিজের লেটেস্ট মুভিটা ডাউনলোড করার আগে হার্ডডিস্কে জায়গা ছিল না।তখন DHAMAAL ডিলিট করা হয়েছিল।

ল্যাপটপটা ক্লোজ করে উঠে পড়ে রাশা।কিছুই ভালো লাগছেনা আজ।রাত সাড়ে দশটা বাজে কেবল।অন্যান্য বৃহস্পতিবারের সাথে তুলনা করলে “সন্ধ্যা” বলা চলে।কিন্তু আজ গভীর রাত মনে হচ্ছে।

কারণটা অবশ্য স্পষ্ট…এই ভার্সিটিতে অফিসিয়ালি আজ রাশার শেষ দিন।রাশার এবং তার ব্যাচের সবার।অন্য যেকোন বৃহস্পতিবার এ সময়ে হলের প্রতিটি সাউন্ডবক্স হাইয়েস্ট ভলিউমে থাকে।কেউ রক,কেউ মেটাল, কেউ থ্র্যাশ মেটাল,কেউ র‌্যাপ, কেউ হিন্দী,কেউ বাংলা এমনকি অনেকে বাংলা সিনেমার গানও সর্বোচ্চ ভলিউমে বাজাতে থাকে।শব্দের তীব্র কম্পন হলের প্রতিটা ছেলের মনে “ডিফিউশান” প্রক্রিয়ায় ঢুকে যায়।কেউ সারা সপ্তাহে কালেকশান করা মুভিগুলো নিয়ে সারারাত দেখার প্ল্যান করে।আবার অনেকে LAN কানেক্ট করে FIFA,COUNTER STRIKE কিংবা CALL OF DUTY খেলার প্ল্যান করে।কখনোবা রাতটা কার্ড খেলার মধ্য দিয়েই কেটে যায়।

আজ ব্যতিক্রম।

তার ভার্সিটি জীবনের শেষ রাত আজ।মূলতঃ শেষ রাতটা গতকাল হবার কথা ছিল।তার সব বন্ধুরা আজ সকালে কিংবা বিকালে চলে গেছে।তার ক্লিয়ারেন্স নিয়ে শিক্ষাশাখায় একটু সমস্যা হওয়ায় তাকে একদিন বেশি থেকে যাওয়া লাগলো।এই একটা রাতই যে এতোটা একাকীত্বপূর্ণ হয়ে যাবে বুঝতে পারেনি সে।ভার্সিটিও আজ পূজার ছুটি দিয়েছে।তাই জুনিয়রগুলোও চলে গেছে বাসায়।

রুমের বাইরে লনে গিয়ে দাঁড়ালো রাশা।পুরো হলে সুনশান নিরবতা।সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিরুমের তালাবদ্ধ দরজাগুলো সেই নীরবতাকে আরো প্রবলভাবে জানান দিচ্ছে।দূরে শেষেরদিকের দুইটা রুমের দরজা একটু খোলা।দরজার ফাঁক দিয়ে আলো এসে লনে পড়ছে।আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে সেদিকে এগুলো রাশা।হয়তোবা কোন জুনিয়র বাড়ি যায়নি এখনো।একটু এগোতেই ২-৩ জনের দুর্বোধ্য ভাষার কথপোকথন শুনতে পেল।মনে পড়লো ওদিকে নেপালি ব্লক।রুম থেকে ভেসে আসা ক্ষীণ প্রাচীন হিন্দী সিনেমার একটা গানের সুর শুনে রাশা নিশ্চিত হলো যে ওরা নেপালি।

ওদিকে গিয়ে লাভ নেই। উল্টোপথে ফিরে এসে তার রুমে আবার ঢুকে পড়লো রাশা। দুপুরের পর থেকে রুমে যতবারই এসে ঢুকেছে সে,কেমন যেন একটা বিষন্ন শুন্যতা পেয়ে বসেছে তাকে।২ টা তোষকহীন খালি বেড। একটা পিয়াসের,আরেকটা কৌশিকের।তিন রুমমেট ছিল তারা।এই ভার্সিটি জীবনের সাড়ে চার বছর একসাথে এক রুমে থেকেছে তারা।আজ দুপুরে তল্পিতল্পা গুছিয়ে দু’জনই চলে গেছে। পিয়াসের চাকরিতে জয়েনিং আগামী সোমবার,আর কৌশিকের রবিবার।দুজনেরই  শুরুতেই স্যালারি বিশ হাজারের উপর।রাশা অবশ্য এখনো কোন জব পায়নি।

ভোর সাড়ে ছয়টায় তার বাস।রাতের ভিতর ব্যাগ প্যাকিং করে ফেলা লাগবে।রুমের ভিতর বেশ এলোমেলো হয়ে আছে জিনিসপত্র।বইখাতা,কাপড়চোপড় সবকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এখানে ওখানে।রাশা আর পিয়াস বরাবরই অগোছালো।আর কৌশিক ঠিক উল্টো।ক্লাস থেকে এসেই রাশা আর পিয়াসের স্বভাব ছিল ব্যাগটা ছুড়ে টেবিলের উপর ফেলা।কাপড় পালটে কোথায় ফেলল তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই।বেশিরভাগ সময়ই কৌশিকের বিছানার উপর ফেলে রাখতো।আর কৌশিক এসে সব দেখে কিছুক্ষণ রাগে গজরাতো।অতঃপর গলা ফাটিয়ে গালিগালাজ করে নিজেই সবকিছু গোছানো শুরু করতো।রাশা আর পিয়াস সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে নিজ নিজ বেডে নিশ্চিন্ত মনে ঘুম দিত।

রাশা কাবার্ডটা খুলে একে একে জিনিসপত্র বের করে ব্যাগে ঢুকাতে শুরু করলো।হঠাৎ ফাইলটাতে হাত পড়ে।ফাইলটার ভিতর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র রাখে সে।ফাইলের স্বছ প্লাস্টিকের ভিতর দিয়ে একটা ছবি উঁকি দিচ্ছে।ফাইলটা খুলে ছবিটা বের করে হাতে নেয় সে।ভার্সিটি জীবনের প্রথম দিনের ছবি।অডিটরিয়ামে নবীন বরণের সময় তোলা।মনে পড়ে যায় সেদিনকার কথা।ভর্তি হবার আগে ভার্সিটি জীবন সম্পর্কে অনেক লোভনীয় কথা শুনেছিল সে।শুরুটা হয়েছিল অনেক আশা,আর কিছুটা অনিশ্চয়তা নিয়ে।উঠতি বয়সটা বয়েজ স্কুল,বয়েজ কলেজে পার করেছে রাশা।তাই ভার্সিটি জীবনের প্রথম দিন,প্রথম ক্লাস সবই অনেক উত্তেজনপূর্ন ছিল রাশার জন্য।প্রথম দিনই অন্তত দশটা মেয়ের প্রেমে পড়েছিল সে।ভাবতে ভাবতে একা একাই হেসে দিল রাশা।ছবিটা আবার যত্ন করে ফাইলে ঢুকিয়ে ফাইলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলো।

মিনিট বিশেক লাগলো ব্যাগ গোছাতে।

গোছানো শেষ করে সিগারেটের নেশা উঠলো রাশার।সিগারেটের প্যাকেটটা খুললো সে।ছয়টা সিগারেট রয়েছে।এতগুলা লাগেনা তার।স্বভাববশত কিনে ফেলেছে।প্রতিদিন রাতে খাবার আগে ছয়টা সিগারেট কিনতো রাশা আর পিয়াস।কৌশিক স্মোক করতো না।কিন্তু ২-১ out numbered হবার কারণে কৌশিককে সহ্য করতে হতো।রাতে খাবার পর রাশা আর কৌশিক দুজন দু’টা সিগারেট খেত।আর বাকি চারটা সিগারেটের প্রতিটা বাকি রাত অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করে খেত তারা।

সিগারেটটা অর্ধেক টেনে ফেলে দেয় রাশা।ফোনে রিং বাজছে।শাম্মী কলিং…

শাম্মী রাশার সারা জীবনের একমাত্র মেয়ে বন্ধু।এই মহিয়সীর নারীর বাসা আর রাশার বাসা একই জায়গায়।তাই তারা গত সাড়ে চারবছর একসাথে যাওয়া আসা করে।শাম্মী প্রচণ্ড অস্থির একটা মেয়ে।প্রতিবার যাবার আগের রাতে এই মেয়ে প্রতি ঘণ্টায় একবার ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করবে “বাস কয়টায়?”

প্রতিবার বাসে উঠবে এবং বর্ণনা করা শুরু করবে এই বাসটার সার্ভিস কতটা ফালতু।কোনবারই সিটের পজিশান তার পছন্দ হবেনা।যে সিটই তাকে দেওয়া হোক না কেন,তার কাছে মনে হবে চাকার উপর সীট পড়েছে।অবশেষে সে ঘোষণা করবে রাশার সাথে যাতায়াতের কারণেই তার এ দুর্ভোগ।অতএব রাশার সাথে আর যাতায়াত করা যাবেনা…… একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে গত সাড়ে চার বছর ধরে।

আর হবেনা…এটাই শেষ। ফোন রিসিভ করলো সে।ওপাশ থেকে শোনা গেল…

-হ্যালো…

-হ্যাঁ,শাম্মী বল…

-কি বলব?

-কি বলবি মানে?ফোন দিছিস কেন?

-ও ফোন দিছি তাই ডিস্টার্ব হইছে?আচ্ছা বাই।তুই শান্তি করে ঘুমা।বখাল…

-বখাল কি?

-তুই…

-মানে?

-রাশা ইজ ইকুয়াল টু বখাল…

-শব্দার্থ কি?

-কিসের শব্দার্থ?

-বখালের শব্দার্থ…

-বখালের শব্দার্থ হল রাশা।

-ধুর প্যাঁচাল বন্ধ করে বল কি বলবি?

-কিছু বলবো না…ভুল করে আমার বয়ফ্রেন্ডরে কল দিতে গিয়ে তোরে দিয়ে ফেলছি।এখন রাখি…সে কান্নাকাটি করতেছে মনে হয়।

-তোর বয়ফ্রেন্ডটা আবার কে?তোর ডিকশনারি তে তো এই ওয়ার্ড নতুন দেখতেছি।

-সেইটা আমার ব্যাপার।

-আচ্ছা বাদ দে।খাইছিস?

-নাআআ…

-খাসনাই কেন?

-তোরে বলতে হবে নাকি?আমার ইচ্ছা আমি খাইনাই।

-আচ্ছা ঠিক আছে রে বাবা।এখন শোন…কাল সাড়ে ছয়টায় বাস।ছ’টার দিকেই চলে যাবি।বাস কিন্তু অনটাইম ছাড়বে।

-এহহ…বাস অনটাইম ছাড়বে !! বাসের সুপারভাইসার নাকি তুই?বাসের অ্যাড দিতেছিস।তোর ঐ ফালতু বাস কমপক্ষে একঘণ্টা লেট করবে আমি জানি।

-তাই না?আমিই তো যত ফালতু।তুই একবার টিকিট করছিলি সেবার কি হইছিল ভুলে গেছিস?

-ফালতু কথা বলবিনা রাশা…

-বলবোনা কেন?শোন একটু…নিজের সাফল্যগাঁথা শোন একটু…

-ধুউউর…বলে ঠাস করে ফোনটা কেটে দিল শাম্মী।

কয়েকবার রিং ব্যাক করলো রাশা।প্রতিবারই শাম্মী কেটে দিল।এই মেয়ের কুলিং পিরিয়ডের কোন ঠিক-ঠিকানা নাই।কখনো সিরিয়াস রাগ ২০ মিনিটেই ঠিক হয়ে যায়।আবার কখনো সিলি ব্যাপার নিয়ে রাগ সপ্তাহখানেক থাকে।আজ সম্ভবত তাড়াতাড়িই ঠিক হয়ে যাবে।শেষ দিন তো…

এই অস্থির,বাচ্চাসুলভ জেদি মেয়েটাকে প্রচন্ড মিস করবে রাশা।

রুমের মোটামুটি সবকিছু গোছানো শেষ।অনেক জিনিসপত্র পড়ে আছে মেঝের উপর,টেবিলের উপর।

টুথপেস্টের খালি টিউব।এই টুথপেস্ট নিয়ে কত স্মৃতি।দুই দিন পরপর টুথপেস্ট শেষ হয়ে যেত।তখন রাশা বলতো, “এইটা আমি কিনছিলাম।এখন তোরা একজন কেউ কিন”। ওদিকে পিয়াস আবার বলে “ শালা পাঞ্চ দিয়ে তোমার নাকের হাড্ডি ছুটায়া দিমু।গতবারেরটা কত কাহিনী কইরা আমারে দিয়ে কিনাইলা মনে নাই?”

রাশা বলে “আন্দাজে কথা কইস না ব্যাটা।গতবার আমি কিনছিলাম মনে করে দেখ”।তারপর মনগড়া একটা কাহিনী ফেঁদে বসবে এই মর্মে যে সে কখন,কিভাবে,কোন দোকান থেকে পেস্টটা কিনেছিল।এত খুঁটিনাটি সহ গল্পতা বলতো যে পিয়াস আর কৌশিককে শেষ পর্যন্ত মেনে নেওয়া লাগতো যে রাশাই শেষবার কিনেছিল টুথপেস্ট।

পরে থাকা পানির বোতলটা নিয়েও অনেক কাহিনী।রুম থেকে ২০০-৩০০ মিটার দূরে ছিল ডাইনিং হল।সেখানে ফিল্টার থেকে পানি আনা লাগতো।পানি আনা নিয়েও গ্যাঞ্জাম।

রাশা বলবে… “গতকাল আমি আনছিলাম পানি।আজকে তোরা কেউ আন যা”।

ওরা বলবে… “গতকাল তুই আনছিলি মানে?মনে নাই গতকাল বার্সেলোনার খেলা ছিল?আমরা দেখতে গেছিলাম।খেলা শেষ করে আসার সময় আনছি।”

-তো?বার্সেলোনার খেলা ছিল রিয়াল মাদ্রিদের সাথে।আমিও গেছিলাম মনে নাই?তোরা চলে আসলি…আমি পানি আনলাম।

-হে হে…তুই তো আনবিই।তোর রিয়াল মাদ্রিদ ৫-০ তে হারছে।তুই টানা ৫ দিন পানি আনবি”।বলে কৌশিক আর

-শিয়ালের মত খ্যাক খ্যাক করতেছিস কেন?২টা গোলই তো দিছে অফসাইডে।আর শালা রেফারি ২টা পেনাল্টি দেয়নাই।ঐ ২ টা গোল বাদ দিলে,আর এই ২টা গোল ধরলে ৩-২।একদিনের পানি আমি

বাক-বিতণ্ড একসময় পানি আনা থেকে বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ,সেখান থেকে মেসি-রোনালদো,সেখান থেকে পেলে না ম্যারাডোনা ভালো,অবশেষে “তুই নাকি আমি ভালো?” এই সাবজেক্টে চলে আসে।

এই এক সপ্তাহ আগেও এসব নিয়ে ঝগড়া করেছে তারা।আর কখনো হবেনা।

রাশা তাকিয়ে দেখে ফ্লোরে পড়ে থাকা টুথপেস্টের খালি টিউব,খালি বোতল,পেন্সিলের টুকরো,ছেঁড়া স্যান্ডেল জোড়া,সিগারেটের উচ্ছিষ্ট ফিল্টার…রুমের দেয়াল,প্রতিটা ইটে মেখে আছে কত স্মৃতি,অনেক অনেক গল্প।

শুধু এই রুমে না।খেলার মাঠ,ক্লাসরুমে পড়ে থাকা চকের টুকরা,হলের সামনের গোলচত্বর,রফিক ভাইয়ের চায়ের দোকান,ক্যাফেটেরিয়ার শেষ টেবিলটা,অডিটোরিয়ামের সামনের সিঁড়ি…সবকিছুতে মিশে আছে অনেক অনেক স্মৃতি।বন্ধুত্বের স্মৃতি,সোনালি দিনগুলোর স্মৃতি।

রাশা শুয়ে পড়েছিল।আবার ভোর পাঁচটায় উঠতে হবে।হঠাৎ রিং বেজে উঠলো সেল ফোনে।মনে হয় শাম্মী ফোন করেছে।তাছাড়া আর কে করবে?কিন্তু এই মেয়ের রাগ তো এত কম না যে প্রথম কলটা নিজেই দিবে।ফোনের স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে দেখে UNKNOWN নাম্বার।

-হ্যালো…আসসালামুয়ালাইকুম।

-ওয়ালাইকুম আসসালাম…তুই কই?

-কে?

-ধুর ব্যাটা চিনতে পারতেছস না?আমি তিহান…

-ও…কিরে।কি খবর?

-তুই কই?

-আমি তো মামা এখনো ভার্সিটিতে।তোর খবর কি?

-হালা তুমি ভার্সিটিতে হেইডা তো জানি।হলে কই আছো হেইডা কউ।

-আমার রুমে…কেন?

-কমনরুমে আয়…চ্যাম্পিয়ন্স লিগের খেলা হয় টিভিতে।একা দেখতে ভালো লাগতেছে না।চলে আয়…একসাথে দেখি।

-দোস্ত কাল সকাল সাড়ে ছয়টায় বাস।উঠতে পারুম না ঘুম থেকে।

-ধুরো ব্যাটা…আর কোনদিন একসাথে খেলা দেখা হইব?আয় একসাথে খেলা দেখি।

-ঠিক আছে।আমি আসতেছি।

তিহান রাশার কোন ঘনিষ্ট বন্ধু না।তিহান যে এখনো যায়নি রাশা তাই জানতো না।কি আর করা…রাশা রুম লক করে আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে কমনরুমের দিকে গেল।

রুম পুরো অন্ধকার।টিভি বন্ধ বোঝাই যাচ্ছে।কমনরুমে কেউ নেই।তিহানের উপর মেজাজ খারাপ হলো।ব্যাটা প্র্যাক্টিকাল জোক করতেছে এই রাত দুপুরে।ফোনটাও রুমে রেখে এসেছে।কি আর করা…টিভিটা ছেড়ে দেখা যাক চ্যাম্পিয়ন্স লিগের খেলা আছে কিনা।

রাশা দরজা ঠেলে কমনরুমে ঢুকলো।সাথে সাথে সব লাইট একা একাই জ্বলে উঠলো।

“সারপ্রাইজ!!!”

রাশা ভাবলো ভূত।উল্টো ঘুরে দরজা দিয়ে দৌড়ে পালাতে যাচ্ছিল।৩-৪ জন পিছন থেকে ওকে জাপটে ধরলো।“ঐ ব্যাটা কই যাস???”

রাশা কিছুক্ষন হাঁসফাঁস করে বাঁচার আশা ছেড়ে দিল।সে আগেই শুনেছিল যখন হলে কেউ থাকেনা, তখন নাকি এখানে ভূত থাকে।

আস্তে আস্তে শুনতে পেল কন্ঠস্বরগুলো সেই চিরপরিচিত কন্ঠস্বর।একসাথে সুর করে বলছে… “হ্যাপি বার্থডে টু ইউ…”

রাশার চোখ বড়বড় হয়ে গেল।ঝামেলার মধ্য দিয়ে তার জন্মদিনের কথা মনেই ছিল না।কিন্তু সবাই তো চলে গিয়েছিল…এখানে কিভাবে আসলো সবাই?

-দোস্ত তোরা…রক্তিম,আবির তোরা না চলে গেছিলি সকালে?আর পিয়াস তোরে তো আমি নিজে বাসে তুলে দিয়ে আসলাম দুপুরে।খানে কিভাবে আসলি?

-Fast and Furious 5 স্টাইলে পলায়ন করছি। ভ্রু উঁচিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে বলে পিয়াস।

মাঝে টেবিলে মাঝারি সাইজের একটা কেক।তাতে লেখা… “

HAPPY BIRTHDAY TO *****”

শেষে রাশার নিকনেম লেখা।কিঞ্চিত অশ্লীল।কেক কেটে বার্থডে সেলিব্রেট করা হল।রাশা বেশ আবেগপ্রবন হয়ে গেল।সবকিছুর ব্যবস্থা করেছে রক্তিম আর পিয়াস।ওদেরকে জড়িয়ে ধরে কম্পিত কন্ঠে বললো “দোস্ত তোরা এত ভাল…এইটা আমার লাইফের বেস্ট বার্থডে উইশ”।

রক্তিম বলে “হ দোস্ত ওয়েলকাম।অহন টাকা বাইর করো”।

সদ্য বেড়ে ওঠা আবেগ অঙ্কুরে বিনষ্ট হলো।

-কিসের টাকা?

-শালা তোমার কেকের পিছনে যা গেছে আমার পকেট থেইক্যা।পিয়াস শালা জব পাইছে তাও কিছু দেয়নাই।

-আচ্ছা দিমুনে যা…অহন বাইর কর।

-কি বাইর করুম?

-কি বাইর করুম মানে?আনছ নাই?

-কি আনুম ব্যাটা কইবি তো…

-ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক…আনছ নাই?

-ও…ভুইলা গেছিলাম দোস্ত…

-চুরুট আনছোস তাইলে?

-না রে দোস্ত মনে নাই…

-গুদাম গরম তো আনছোস at least?

-না রে দোস্ত…বেনসন আনছি।

-শালা এই বন্ধু হইছ?ফ্রেন্ডের বার্থডে তে বেনসন আনো।আর বেনসন খাওয়াইয়া তুমি আমার কাছে কেকের টাকা চাও…?

-না,টাকা তো দিবিই…

-আচ্ছা যা দিমু…তাইলে তুই আগে তোর রিলেশানশিপ স্ট্যাটাস চেঞ্জ করবি।

-করমু তো…পরে।

-শালা করমু মানে?আড়াই বছর ধইরা একই কথা কইয়া যাইতেছ।আজকে করবি…নাইলে সিগারেট পাবিনা যা। রাশা বলে।

-না পাইলে না পামু…রিলেশানশিপ স্ট্যাটাস চেঞ্জ করতে পারুম না।

রাশা চিৎকার করে বলে “ঐ পোলাপান শোন…রক্তিমের রিলেশানশিপ স্ট্যাটাস কি যেন?”

সবাই একসাথে বলে… “In a friendship with samia zaman.” বলে চিরাচরিত আওয়াজে খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল সবাই।

কার্ড খেলা হল।রাতুল বরাবরের মত তার কার্ড চুরি করার অলৌকিক ক্ষমতা বলে বারবার জিততে লাগলো।তারপর অনেক গল্প হয়…সাড়ে চার বছরের স্মৃতিচারন হয়…।প্রত্যেককে পঁচানো হয় একবার করে।কেক নিয়ে কাড়াকাড়ি হয়…সিগারেটের শেষ টানটা কে দিবে তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি হয়।সেই চিরাচরিত দলটি তাদের।শেষ রাতের দিকে সবাই আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে পড়ে।কেউ মুভি দেখে,কেউ ঝিমাতে থাকে।

কতবার তারা রাতের ঘুম ঘুমাতে গিয়েছে সূর্যোদয়ে দেখে তার ঠিক নেই।আজকের সূর্যোদয় তাদের একসাথে দেখা শেষ সূর্যোদয়।

সবাই ছড়িয়ে পড়বে।ব্যস্ত হয়ে যাবে নিজ নিজ কর্মস্থলে।হঠাৎ করেই তারা খেয়াল করে, যে জীবনটাকে তারা ঘৃণা করে এসেছে,সেই চার-পাঁচ বছর বয়স থেকে শুরু করে প্রতিটা মুহূর্ত,প্রতিটা পরিক্ষার আগের রাতে যে দিনটা ত্বরান্বিত করার জন্য প্রার্থনা করেছে,সেই দিনটি আজ উপস্থিত।জীবনের এ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে তারা পিছন ফিরে বুঝতে পারে জীবনের সবচেয়ে রঙ্গীন সময়টার ফিনিশিং লাইনে দাঁড়িয়ে আছে তারা।খুব ইচ্ছা করে ফিরে যেতে।কিন্তু জীবন একমুখী।

ভোরবেলা রাশাকে বাসস্ট্যান্ডে বিদায় দিয়ে আসে ওরা।পিয়াস,কৌশিক,রক্তিম,আবির,শুভ্র…সবাই।২২-২৩ বছরের গোটা দশেক যুবক।নিজেকে অনেক শক্ত বলে দাবী করলেও শেষ মুহূর্তে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা কেউই।সাড়ে চারটা বছর নিজেদের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেছে তারা।ছেড়ে যাওয়া এত সহজ না।বাসস্ট্যান্ডের লোকগুলো অবাক হয়ে লক্ষ্য করে অনেকগুলো তরুন যুবক,যাদের বয়সীদেরকে একসাথে থাকলে কখনো নোংরা জোকস,সিগারেট,চিল্লাপাল্লা এগুলো ছাড়া দেখা যায় না,তারা একজন আরেকজঙ্কে জড়িয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে কাঁদছে।

সবাই চলে যায় আস্তে আস্তে।রাশা আর শাম্মী দাঁড়িয়ে থাকে শুধু।বাসের অপেক্ষায়,যে বাস তাদের নিয়ে যাবে অনিশ্চিত আগামীর পথে।

————————–

**কলেজে ছয় বছরে ইচ্ছা থাকুক না থাকুক,প্রতিটা মুহূর্তের সুখ-দুঃখ ৪৭ জন বন্ধুর সাথে ভাগাভাগি করেছি।কলেজ জীবন শেষ করে যেদিন চলে আসলাম সেদিন বিশ্বাস হচ্ছিল না যে আমরা ৪৭ জন আর একসাথে নেই।সকালে ঘুম ভেঙ্গে যখন রুমমেটের বেসুরো গান শুনিনি,মনটা কেঁদে উঠেছে।পরে যখন দেখেছি আমার বন্ধুরা বুয়েটে কিংবা মেডিকেলে কিংবা ঢাকা ভার্সিটিতে টপ লিস্টে আছে,পেপারে ছবি দেখেছি।আর আপন মনে গর্ব বোধ করেছি।এগুলো আমার বন্ধু।

এখন ভার্সিটিতে পড়ছি।৩ বছর পর এখান থেকেও চলে যাওয়া লাগবে।আবারো সবাইকে ছেড়ে।মেনে নিয়েছি এটাই জীবনের নিয়ম।তবুও যখন পেপারে দেখবো NASA তে আমারই কোন বন্ধু,অথবা নোবেলবিজয়ী কেউ…অথবা কোন সৎ মন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি,যার দিকনির্দেশনায় পাল্টে যাবে জাতির ভবিষ্যৎ।তখন হয়তো বৃদ্ধ হয়ে যাবো…ফোঁকলা দাঁতে নাতি-নাতনীদেরকে ছবি দেখিয়ে বলবো… “এই যে, আমার বন্ধু”।**

৯০৩ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “তোরা…”

  1. নাজমুস সাকিব অনিক (০৩-০৯)

    ধন্যবাদ ভাই...

    জ্বী ফেসবুকেই পড়েছিলেন...একটা পেইজে পোস্ট হয়েছিল। ব্লগে কেবল জয়েন করলাম...তাই ভাবলাম একটা লেখা দেই। হাতে যেটা ছিল সেটাই দিয়ে দিয়েছি।

    🙂

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : আদনান (১৯৯৭-২০০৩)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।