এগারো থেকে পনেরো


ওলগা সেগান্সকাইয়া’র প্রেমে আমি পরি গত ২২ শে এপ্রিল সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায়।

ডেন্টিস্ট্রি’র ছাত্রী সেগান্সকাইয়া সেখানে ভায়োলিন বাজাচ্ছিল, বরং বলা উচিত ভায়োলিনের ছড়ে ছড়ে আমাকে মিশিয়ে কয়েক মিনিট ধরে ছুঁড়ে ফেলেছে জর্জিয়ার কোন গ্রামে, কোন রেল স্টেশনের পিচ গাছের তলায়, ধোয়া ওঠা এক রসুনের স্যুপের বাটিতে।

সেগান্সকাইয়া’র নীল রঙের নেইল পলিশ আর লাল রঙের ভায়োলিন আমাকে হ্যালুসিনেশন দেখিয়েছে কয়েক দফা, সেগান্সকাইয়ার ভায়োলিনের ছড়ে ছড়ে কাঁপা আঙ্গুল আমাকে পার্কিনসনিজমের মধ্যেও ফেলেছে, ডান হাতের কনুইয়ের ওঠা নামা আমাকে উরাল পর্বত শ্রেনীর হতচ্ছাড়া সী গালের পাখায় ভর দিয়ে ওড়াঊড়ির প্রদর্শনীর কথা মনে করিয়েছে, বাম পা থেকে ডান পায়ের উপর শরীরের ভর নেয়াটা রিকি পন্টিংয়ের পুল শটের দৃশ্য মনে করিয়েছি।

আমি প্রথম দেখেই সেগান্সকাইয়ার প্রেমে পরেছি। অনুষ্ঠানের পরে তার সাথে পরিচয়টা সময়ের ব্যপার ছিল, সময়ের ব্যপার ছিল না ইন্টারনেটে তাকে খুঁজে বের করে যোগাযোগ করাটা, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের দেখা গেছে প্যাথোলজি ল্যাবের নীচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বেবুনের মতো মার্শম্যালো চাবাতে।

অথচ সেগান্সকাইয়ার সাথে আমি দুই তিন মিনিটের বেশি কথা বলতে পারিনি, হাজারটা কথা গলার কাছে রেখেও বের করতে পারিনি কিছুই, শনিবার রাতে সারারাত ফোনে কথা বলার প্রস্তুতি নিয়েও ৪-৫ মিনিটের বেশি কথা বলতে পারিনি, হয়েছে শুধুই সসেজ ভাজি আর পপ কর্ন খাওয়া, কথা ফুরিয়ে যায়, সেগান্সকাইয়ার নিঃস্পৃহ কণ্ঠ আমার সব কথামালার গলা টিপে মেরে ফেলে, সে বড় ভয়াবহ অস্বস্তিকর অপেরা।

আমি সেগান্সকাইয়া’র দিকে কয়েক ঘন্টা অপলক মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতে পারলেও, কয়েক মিনিটের বেশি কথা বলতে পারিনি, কথা না বলতে পারা আমাকে তিস্তা নদীর মতো শুকিয়ে ফেলেছে। ভাত আর বিরিয়ানীর পার্থক্য জীবনে বুঝতে পারতে হয়, যার সাথে কথা বলা দুষ্কর, তার প্রতি কয়েক পিপে মুগ্ধতা থাকলেও বা কি লাভ?

ঝাড়খন্ডের জঙ্গল ভেঙ্গে ঝড়ের বেগে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির ঘোড়ার মতো আমার প্রেম এসেছিল, আর পেট-মোটা অলস রাজা লক্ষন সেনের মতো প্রাসাদের পিছনের দরজা দিয়ে নদী পথে পালিয়ে গেছে।

গত ২৯ এপ্রিল আমার সেগান্সকাইয়া’র প্রেমে পরা শেষ হয়েছে।


(আট মার্চ ২০১৩, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে লেখা)

ইন্টার পাশ করেই এসে পরলাম বিদেশ বিভুয়ে, লোকে লোকারন্য ট্রেন স্টেশনে একটা ট্রেনের সামনে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রানালয়ের মহিলা বিদায় নিলেন। পেটের মধ্যে কয়েক হাজার প্রজাপতি নিয়ে আমি বগিতে উঠলাম। এরপর পরিচয় হল লাল চুলো এক বুড়ো ভদ্রমহিলার সাথে। কয়েক মিনিটের মাথায় আমাকে পানি, আপেল আর সূর্যমুখী ফুলের আঁটি খাইয়ে তিনি শান্ত করে ফেললেন। বললেন দীর্ঘদিন কাজ করেছেন একটা চিড়িয়াখানায় বেঙ্গল টাইগারের সাথে। এই ভদ্রমহিলাকে ভোলা আমার পক্ষে ভোলা সম্ভব হবে না, এত চমৎকার, বিদূষী, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মহিলার সাথে আমার খুব কম পরিচয় হয়েছে।

কৃষ্ণ সাগরের পার থেকে ফেরার সময়ে পরিচয় হয়েছে আরেক ভদ্রমহিলার সাথে, অল্প সময়ের মধ্যে তার ছোট বাচ্চা মেয়েটাকে আমি আমার ঘাড়ে আবিস্কার করলাম। তিনি ধরিয়ে দিলেন গাছের পিচ ফল, আপেলের জ্যাম, মুরগির মাংশ দিয়ে ঘরে বানানো পেটিস। এত অল্প সময়ের মধ্যে কাউকে আপন করে নিতে পারাটা হয়ত শুধু মায়াবতী নারীকেই মানায়।

দু-দুবার করে আটকা পরেছি একই নারী পুলিশ অফিসারের কাছে, জুড়ে দিয়েছি গল্প, উপহার দিয়ে দোয়েল পাখি আঁকা দু-টাকার নোট। আমার খুব কাছের এক বান্ধবী আমাকে ডেকে নিয়ে এইটা অইটা খেতে দেয়, ফেরার সময়ে একটু কেক, মাংসের টুকরো এলুমিনিয়ামের ফয়েলে পেঁচিয়ে সাথে দিয়ে দেয়। মানা করলে বলে- তোর দেশী বান্ধবি ধরিয়ে দিলে মানা করতি?

যে ভদ্রমহিলা আমাকে রাশান ভাষা শিখিয়েছেন তার প্রতি আমি প্রতি মুহূর্তে কৃতজ্ঞতা বোধ করি। হাতে ধরে আমাকে জীবন দেখতে শিখিয়েছেন, কাঁদা -পানির জায়গা বাঁচিয়ে কিভাবে হাঁটতে হয় তাই শিখিয়েছেন। দলামুচি হয়ে পরে গিয়েও কিভাবে উঠে দাঁড়াতে হয় তাই দেখিয়েছেন।

যত সময় যায় স্মৃতি নাকি তত ফিকে হয়ে আসে, এইসব নারীদের সাথে আমার স্মৃতিগুলো শুধু তীক্ষ্ণ হচ্ছে। আপনারা আশে পাশে না থাকলে হয়ত জীবনকে জানাই হত না। শাদা চামড়ার মহিলার সস্তা পদার্থ বিশেষ ধারনা নিয়েই কাটিয়ে দিতাম জীবনখানা।
মনে তো প্রতিদিনই করি, আজ দিবস উপলক্ষ্যে লিখে ফেললাম।
জগতের সকল নারী সুখী হউক।


জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ, সাইবেরিয়া অঞ্চলে শীত এখন তুঙ্গে। বরফের কারনে দৃষ্টি সীমার মধ্যে কিছুই দেখা যায় না। সরকারী ভাবে সাইবেরিয়াতে বিভিন্ন বাড়ির বাইরে বিভিন্ন রঙ করা হয়, সবুজ, গোলাপি লাল ইত্যাদি। রঙের বিচিত্রতা আনতে এবং আশে পাশে বরফের সাদা দেখতে দেখতে ক্লান্ত চোখের আরামের জন্য এমনটা করা হয়।
কয়েক পুরুত কাপড় আর জ্যাকেট পরেও শীত মানানো যায় না, প্রচন্ড ঠাণ্ডায় আপনার কান এবং নাক জমে জেতে পারে এবং টোকা দিলে খুলে পরে যেতে পারে। সাইবেরিয়ার মানুষ শীতে তাই অনেকেই শহর গ্রাম ছেড়ে উষ্ণ অঞ্চলে চলে আসে।

মানুষের যদি হয় এই অবস্থা, ছোট ছোট পাখিগুলোর কথা ভাবতেই ভয় লাগে। সেদিন দেখলাম সার্জারির করিডোরে মটকা মেরে বসে আছে বরফে প্রায় জমে যাওয়া এক কাক, বিভিন্ন ক্লিনিকের ঘুলঘুলি, চিমনি, রান্নাঘরের ভেন্টিলেটর দিয়ে ঢুকে পরেছে অনেক কবুতর।

ঠিক এইসময়ে সাইবেরিয়া থেকে প্রচুর অতিথি পাখি উড়ে যাচ্ছে আমাদের ট্রপিকাল অঞ্চলে, উষ্ণতার খোঁজে। দুটো মাস থাকবে এরপর আবার ফিরে আসবে।
কোথাও বেড়াতে গিয়ে যদি লাশ হয়ে যাই এরথেকে দুঃখজনক আর কিছুই হতে পারে না, অথচ ঠিক সেই ব্যাপারটিই ঘটছে এই পাখিদের সাথে। বিভিন্ন বিলে জালে আটকে, চরে ছরড়া গুলির আঘাতে মারা মরছে হাজার হাজার পাখি। বেড়াতে আসার প্রতিদান দিতে হচ্ছে জীবন দিয়ে।

শিকারীদের থামানোর জন্য আসলে চাহিদা কমিয়ে দেয়ার থেকে আর কোন ভালো উপায় নেই, এলিফ্যান্ট রোডের সুবাস্তু আর্কেডের পাশের গলিতে এক ব্যাটা প্রায় বিলুপ্ত সোনামুখী সারস বিক্রি করে, পায়ে দড়ি বেঁধে উলটো করে ঝুলিয়ে। আমার কাছে বিক্রি করতে এসেছিল, আমি বলেছিলাম- আমার কাছে টাকা থাকলে আমি সব কয়টা সারস কিনে এখান থেকে ঊড়িয়ে দিতাম।

দয়া করে জালে ধরা পরা শীতের পাখি কিনবেন না, দয়া করে চাহিদা বাড়াবেন না, আপনার পরিচিত কেউ শীতের পাখি শিকার করতে চাইলে দয়া করে নিরুৎসাহিত করবেন।
ওরা দল বেঁধে আসবে, আমরা দেখবো, কিচিরমিচির শুনবো, ছবি তুলবো। অতিথিদের আমরা যেন বধ না করি। পাখিরা শুধু আকাশেই সুন্দর, শুধু আকাশে।


আমাকে মোটামুটি হাত-ঘড়ি ফ্রিক বলা যেতে পারে, মেন’স ফ্যাশনের দুটো জিনিসের প্রতি আমার অসীম আগ্রহ, এক ঘড়ি দুই সানগ্লাস, আমার সংগ্রহে রোলেক্স, টিসট, কিউম্যাক্স ইত্যাদি ক্লাসিক ঘড়ি যেমন আছে তেমন রয়েছে সানলাইট, মরজ এবং কম বিখ্যাত ব্রান্ডের স্পোর্টস ঘড়িও, এমনকি রাশিয়ান নেভী কালেকশনের সাবমেরিন জাহাজের সৈন্যদের ব্যবহিত ঘড়িও আমার সংগ্রহে আছে। ঘড়ি কিনতে অনেক যায়গায় যেতে হয়, অনেক দোকানে ঘুরতে হয়, ইন্টারনেটে ডিস্কাউন্ট ধরতে তক্কে তক্কে থাকতে হয়। শহরের বেশ কয়েকটা দোকানের ডিসকাউন্ট কার্ড আমার কাছে রয়েছে। গত গ্রীষ্মের ছুটির পর এক বড় ভাই’র সাথে গল্প করছিলাম এই নিয়ে।

মাসখানেক পরে উনি খুব ভোরে ফোন করলেন, আমার একটা ডিসকাউন্ট কার্ড দিয়ে কিছু কিনতে চাচ্ছেন, মোট ক্রীত মূল্যের উপর আমি ১০ পার্সেন্ট বোনাস পাই, তাই বিকালে তার সাথে দেখা করতে গেলাম। উনি বান্ধবী নিয়ে এসেছেন, বান্ধবী আংটি কিনবে। আমি খুব খুশী, রাশিয়াতে পুরুষরা মেয়েদের আংটি কিনে দেয়া মানে প্রায় বিয়ের সিদ্ধান্ত পাকাপাকি হয়ে যাওয়া। আমি বিয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই তার মুখ কালো হয়ে গেলো, দুঃখ করে বললেন কাহিনী।

সন্ধ্যা থেকে বন্ধুবান্ধবের সাথে বসে মদ্য পান করেছেন, শেষ পর্যন্ত মাঝ রাতের দিকে নিজের বাড়ির ঠিকানা ভুলে গেছেন, ট্যাক্সিআলা আউটগোয়িং কলের প্রথম নাম্বারে ফোন করে তার বান্ধবীকে পেল, বান্ধবীর বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসলো।
এরপর বান্ধবীর সাথে বিছানায় খুব অন্তরঙ্গ মুহূর্তের সময় বড়ভাই তাকে অতি আবেগে আংটি, গাড়ি, বাড়ি, তাজমহল ইত্যাদি কিনে দেবার কথা বলেন,

পরদিন সন্ধ্যা থেকে বান্ধবী আংটির জন্য তাকে বলছে, আসলে মেয়ের দোষ নয়। আমাদের দেশে আমরা বলি ভুলি, ভুলি বলি, এটাই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ইউরোপে ব্যপারগুলো খুব সিরিয়াসলি নেয়া হয়, একজন পুরুষ তার মুখের কথা না রাখলে সারা জীবনের জন্য নারীর কাছে তার সম্মান হারায়। আপনি যদি বলে থাকেন শুক্রবার দুপুরে আপনি কিচেন পরিস্কার করবেন, একজন পুরুষ হিসাবে শুক্রবার দুপুরের আপনাকে কিচেন পরিস্কার করতেই হবে, যদি আপনি কোন এক্সকিউজ দিয়ে সরে আসতে চান আসতে পারেন, কিন্তু সেই ক্ষেত্রে আপনার স্ত্রীর অথবা বান্ধবীর চোখে পুরুষ হিসাবে পূর্ন মর্যাদা আপনি অচিরেই হারাবেন।

তাই বাধ্য হয়ে বড় ভাই তাকে নিয়ে আংটি কিনতে এসেছেন, আমি বললাম- গাড়ি-বাড়ির কথাও কি রাখতে হবে? উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন- ভাই কোনদিন অন্তরঙ্গ মুহুর্তে কাউকে কোন আশা দিয়েন না ভুলেও।


ক্রিমিয়া বরাবরই রাশিয়ার অংশ ছিল, সেখানকার ৯৬ ভাগ মানুষ রাশান, নিকিতা ক্রুশ্চেভ ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তার চেয়ার নিয়ে টান বাধে, চেয়ারের জন্য ভোট দরকার, শক্তিশালী ইউক্রেন কমিউনিস্ট পার্টির ভোট, নিকিতা ক্রুশ্চেভের স্ত্রীও ছিলেন ইউক্রেনিয়ান, তাই নিকিতা ক্রুশ্চেভ ইউক্রেনকে ক্রিমিয়া শহর উপহার দেন, ক্রিমিয়ার মানুষের মতামতের তোয়াক্কা না করেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তেমন কোন কথা তখন ওঠেনি, কারন সোভিয়েত রাশিয়ার পাসপোর্ট ছিল এক, ভাষা রাশান, অর্থ রুবল, সবার জন্যই এক রকম।
কিন্তু গর্বাচেভ সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে দেবার পর শুরু হয় আসল সমস্যা, ক্রিমিয়াবাসী নিজেদের ইউক্রেনে আবিস্কার করেন, নতুন কাগজ, নতুন টাকা, নতুন সরকার।

তাই ভোটাভুটিতে ৯৪ ভাগ মানুষ রাশিয়ার শাসনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, ভোটের পরে শহর জুড়ে উৎসব হয়েছে, আনন্দ মিছিল হয়েছে, প্রতিটি ঘরের মাথায় এখনও উড়ছে রাশান পতাকা।
বাকি ছয় ভাগ ভোট কারা দিয়েছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে? দিয়েছে ক্রিমিয়ার তাতারেরা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’র সময়ে ক্রিমিয়ার মুসলমান তাতাররা হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে সাহায্য করে, তাদের অবস্থান ছিল বাংলাদেশের রাজাকার বাহিনীর মতোই, যুদ্ধ শেষ হয়, রুশ বিপ্লব হয়, স্টালিন ক্ষমতায় আসেন, তাতারদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমান মেলে। স্টালিন ১৯০ হাজার তাতারকে ক্রিমিয়া থেকে উচ্ছেদ করেন, তাদের যায়গা হয় উজবেকিস্তান এবং তাতারস্তানে। কিছু রাজাকার তাতারের জন্য সমস্ত তাতার জাতিকে উচ্ছেদ করা যুক্তিযুক্ত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে স্টালিন বলেন- ডিম না ভাঙ্গলে, অমলেট আসবে কোথা থেকে?
ক্রিমিয়ার ওয়াইন, ভুট্টো, সাবানের খ্যাতি রয়েছে, একবার যারা তাতারদের চিবুরিকি আর প্লোভ মুখে তুলেছে তারা বারবার তাতার রেস্তোরায় খেতে এসেছে।কৃষ্ণসাগরের পারের শহর ক্রিমিয়াকে সত্য ভালোবেসে ফেলেছি।

দেয়াল বেয়ে উঠে জানালের পাশে আঙুরলতা ঝুলবে এমনটা অনেক অনেক ছোটবেলা থেকে কল্পনা করে আসছি, জানালার কাঁচে আঙুর থোকা মাঝারি মানের বাড়ি খাবে,এক দুটো আঙুর ছিটকে পরবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
ক্রিমিয়া গিয়ে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, লাল আর সাদা আঙুরের থোক সব যায়গায়, জানালায়, দেয়ালে, মাথার উপরে মাচায়, রেস্টুরেন্টে তাতার খাবার চিবুরিকি আর মাচা থেকে হাতে পারা আঙুর নিয়ে সেভাস্তোপোল থেকে ইয়াল্টা শহরের দিকে যাত্রা শুরু করলাম।

ইয়াল্টা শেষ চার রাশিয়ান জার সম্রাটের শহর, এখান থেকেই জার যুগের অবসান হয়। জারদের প্যালেস সরকারী কাজে ব্যবহার করা হয়, ইয়াল্টার জার প্যালেসেই স্বাক্ষরিত হয় ইয়াল্টা ট্রিটি, যার মূল কথা ছিল- মিত্রবাহিনীর কাছে হিটলারের শর্তবিহীন আত্মসমর্পন।

তিন কান্ডারী স্টালিন, রুজভেল্ট এবং চার্চিল ইয়াল্টা ট্রিটি স্বাক্ষর করেন। স্বাক্ষর করার আগে রুজভেল্ট চার্চিলকে একটা ছোট চিরকুট দেন, চিরকুট পড়ে চার্চিল সেটাকে ফায়ারপ্লেসে ফেলে দেন, এবং রুমের বাইরে গিয়ে মিনিটখানেক পরে আবার রুমে ঢোকেন।
স্টালিন ব্যপারটা লক্ষ্য করেন, টেবিলের নীচে কার্বনের স্তর ছিল, টেবিলে যা লেখা হত, পরে সব উদ্ধার করবার জন্য। স্টালিন জানতে পারেন চিরকুটে লেখা ছিল- The old Eagle is falling off the nest.
স্টালিন ভীষণ চিন্তিত হয়ে পরেন, কারন তখনকার সময়ে সবাই কোড ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করতো- যেমন ধরুন শাশুড়ি মানে শত্রু, স্ত্রী মানে বিপদ, প্রেমিকা মানে সামনে বাঁধা এইরকম।
তিন কান্ডারীর মধ্যে স্টালিনের বয়স ছিল সবচেয়ে বেশি, আর রাশিয়ান জাতীয় সিম্বলে দুই মাথাআলা ঈগল আছে, স্টালিন তখন চার্চিল এবং রুজভেল্টকে চেপে ধরেন এবং বলেন- চিরকুটের অর্থ না বলা পর্যন্ত কোন ট্রিটি স্বাক্ষর স্টালিন করবেন না।

নিরুপায় হয়ে রুজভেল্ট বলতে বাধ্য হন যে চিরকুটের মানে ছিল- চার্চিলের প্যান্টের জিপার খোলা ছিল।

২য় বিশ্বযুদ্ধের আরেকটি স্মৃতি বিজড়িত যায়গা ৩৫ ন্যাভাল ব্যাটারি, মাটির নীচের টানেল থেকে তারা জর্মনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, জর্মন বোমারু পাইলটদের কাছে হেরে ৩৫ ব্যাটারী অবরুদ্ধ হয়, এবং ৩৫ ব্যাটারীর সাথে সাথে সেভাস্তোপোল শহরের পতন হয়, ব্যাটারীর যোদ্ধাদের মেরে ফেলা হয় এবং শহরের ৩০০০০ মানুষকে যুদ্ধবন্দী করা হয়।
অথচ পরদিক সকালে মস্কো থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র “প্রাভদা”তে লেখা হয় ব্যাটারীর পতন হলেও ৩০০০০ সিভিলিয়ানকে অন্যত্র নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
রুশ সেনাবাহিনীর মনোবল যাতে ভেঙে না পরে তাই এই প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছিল, এমনটা বলেন ইতিহাসবিদ এবং লোকাল গাইডেরা, কেউ বলেন জর্মন বাহিনীর চরেরা অনেক আগেই অনেক গুরুত্বপূর্ন যায়গায় ঢুকে বসে আছে।

আসলে সত্যটা কি ছিল, আজও জানা যায়নি।

(এই ব্লগটাকে অনেকটা সংগৃহীত ব্লগগুচ্ছ বলা চলে, বিভিন্ন সময়ে কিছু লেখা তুলে একত্র করা। সামনের দিনগুলতে একটা ছোট গল্পসমগ্র প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে, সেখানের “রুশ দেশীয় কলাম” বলে একটা অধ্যায় মাথায় রেখে এই ছোট লেখাগুলো লেখা)

১,২১৫ বার দেখা হয়েছে

৭ টি মন্তব্য : “এগারো থেকে পনেরো”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    একের পর এক লেখা আসছে।
    এই সময়ে হামীমের কলম থেকেও কিছু আসতে হবেই।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  2. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    টুকরো টুকরো কথকতাগুলি ভাল লেগেছে।
    শুধু সুখপাঠ্যই না অনেক অজানা বিষয় জানা হলো এটা পড়ার মধ্য দিয়ে।
    চালিয়ে যাও, অপেক্ষায় থাকলাম.........


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  3. ইফতেখার (৯৫-০১)

    মনে মনে কত কনভার্সেশনই তো চালালাম ... যুক্তি, প্রসঙ্গ, আলোচনা, রোমান্টিসিজম সবকিছুই ঢের ... খালি কাজের সময়, বাস্তবিকে কোনোটাই খুজে পাওয়া যায় না।

    অনেকেই বেআইনী জেনেও কেনে বা কিছু করে এইটা চিন্তা করে যে আমি না কিনলে তো অন্য কেউ কিনবে। এর প্রতিকারে দরকার কঠোর আইন, আর তার প্রয়োগ। ধুমপান তো অনেক জায়গাতেই বেআইনী - আইনের প্রয়োগ না থাকলে বন্ধ হবে কিভাবে? সচেতনতা দরকার সবচেয়ে বেশী। সচেতনতা জাগাতে পারলে চাহিদাই কমবে। উল্টোভাবে প্ল্যান হয়ত ততটা ফলপ্রসু হবে না।

    হাতঘড়ির ফেটিশাক্রান্ত আরেকজনকে তাইলে পাওয়া গেলো। ভেবেছিলাম আমি নিজে 'এ্যাবনরম্যাল'। সময় ও সুযোগ পেলে কখনো আমাদের কালেকশন নিয়া কথা বলতে হবে।

    ক্রাইমিয়ার পার্টটা ইন্টেরেস্টিং লাগলো। জানতাম না। আমরা পশ্চিমে শুধু শুনি ক্রাইমিয়া 'দখল' করা হয়েছে, রাশিয়া কত না খারাপ। ইচ্ছা করে একটা সার্বভৌম দেশের অংশে নাক গলানো হয়েছে। সেভাস্টোপোল, দনেস্ক, ডেবাল্টসেভ এইসবে প্রো-রাশান বাহিনীর আক্রমন আর দখলদারিত্ব - এইসব খবরই দেখি/শুনি/পড়ি মিডিয়াতে। দেয়ার ইজ অলওয়েস এ্যানদার সাইড অফ স্টোরি।

    জবাব দিন
  4. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    চার্চিল এর এই জিপার নিয়া সমস্যা আরো হয়েছে।
    আরেকবার পার্লামেন্টে এক যুবক এমপি তাকে জিপার খোলা দেখে জানায়।
    চার্চিল জিপার ঠিক করে এমপি কে বলে, জনগণের পয়সায় পোষা পাহাড়াদার কি ঘুমিয়ে ছিলো না জেগে ছিলো?


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।