তথাকথিত নেতৃত্ব ও গুণাবলী

ক্যাডেট কলেজের লিডারশীপ বিষয়টা একটি জমজমাট আলোচনা। অনেক দিন ধরেই ভাবছি লিখব,লেখা হয়ে ওঠে না।দেখা যাক সত্যকারের লিডারশীপ বিষয় টা কি??
আমি মনে করি, নেতা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি এমন কিছু ঘটান যা সাধারণভাবে ঘটার কথা নয়। বস্তুত যা স্বাভাবিকভাবে ঘটবে, তার জন্য নেতার প্রয়োজন হয় না_ যে কোনো ব্যক্তিই তা করতে পারেন। সত্যিকারের নেতা অনন্য, অসাধারণ, অতুলনীয়, অভাবনীয় কিছু সৃষ্টি করেন। নেতা বড় কাজ করেন। অর্থাৎ ‘ইনক্রিমেন্টাল চেঞ্জে’র বা ক্ষুদ্র পরিবর্তনের জন্য নয়, উল্লল্ফম্ফনের জন্য নেতৃত্বের প্রয়োজন পড়ে। তাই নেতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘আনরিজনেবলনেস’ বা দুঃসাহসিকতা।
এটা মোটামুটি একটা গাইড লাইন। অন্য সংজ্ঞা বা বিশ্লেষণে জাব না।

ক্যাডেট কলেজের অন্যতম একটা মোটো হল “উই মেক লিডারস”।
এখন কথা হল এই লক্ষ্য ও বাছাই এর ক্ষেত্রে কলেজ প্রশাসন কতটা সাবলীল ও সফল।আমার কলেজ জীবনে অনেক লিডার দেখেছি, বলব না সবাই অযোগ্য ছিল। আবার বলব না সবাই যোগ্যতার মাপকাঠি তে পাশ করবেন।
ক্যাডেট কলেজ এ যাবার পর থেকেই কয়েকটা গ্রুপ বা মহল তৈরি হয়, একদল যারা শুধুই পড়াশুনা করবে,অন্য একটি দল মাঝারি মানের পড়াশুনা ও গোবেচারা, একটি দল টয়লেটে বিড়ি ফুকবে, আর একটি দল খেলাধুলা, ইতাদিতে খুব উজ্জ্বল হয়।
১১ শ ক্লাস এ লিডার এর যে বাছাই পক্রিয়া হয়,আমার সে বিষয় এ যথেষ্ট দ্বিমত রয়েছে।
মোটামুটি সিংহ ভাগ সময় এ দেখে এসেছি গোবেচারা মাঝারিমানের ক্যাডেটদের লিডার করা হচ্ছে,যাদের কে ম্যাননিপুলেট করা আমার কাছে ১০০ তে ২৩ পাওয়ার মতই সহজ মনে হত। কিছু কিছু গোবেচারা আবার নিজের খোলস পাল্টে বর্বর হবার চেষ্টা করতেন। কেউ কেউ সব ভুলে অই সময়ে শিক্ষকদের তেল মর্দন এ বিজি থাকতেন।
আমার কলেজ জীবনে আমি ছিলাম এই সব লিডারদের সুখাদ্য স্বরূপ। হামিম নামক ক্যাডেটকে একবার পাঙ্গাতে না পারলে তাদের লিডারশিপ পাওয়াই যেন বৃথা। আমি আসলে একটু বিবেচনা করতাম,মাঝে মাঝে এদের উপর পরীক্ষা চালাতাম,মানসিক ভাবে এরা কতটা শক্ত দেখতাম। আমি অনেক ভাই কে দেখছি বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করতে,আর অনেককে দেখেছি রমণীর মত ভেঙে পড়তে।
আমি তখন ৯ ক্লাস এ পড়ি। এক ভাই কোন এক কারনে আমাকে বললেন করিডোরে গিয়ে কান ধরে দাড়িয়ে থাক্তে,আমি তাঁকে বুঝিয়ে বললাম যেহেতু আমার জুনিওর রয়েছে অনেক,আমাকে অন্য শাস্তি দেয়া হক,উনি এক প্রস্থ খেপে গিয়ে বললেন তাহলে আমি তোমাকে ক্লাস ৭ করিডোরে নিয়ে গিয়ে ফ্রন্ট রোল দেয়াব। আমি তখন দেখতে চাইলাম উনি মানসিক ভাবে কতটা স্ত্রং, আমি বললাম আমি যদি এই দুটোর একটাও না করি,আপনি কি করবেন? উনি রেগে গেলেন এবং হারলেন, উড়ে রুমে চলে গেলেন। মিনিট দশেক পর আমি গেলাম সরি বলতে, রুমের সামনে দাড়াতেই শুনি ওনার ভাঙ্গা কণ্ঠস্বর, উনি ওনার কয়েকজন বন্ধুকে বলছেন “আমরা সবাই মিলে হামিম কে দেখে নেব, তোরা কেউ ওকে ছাড়বি না”।
আমি চলে এসেছিলাম,সরি আর বলা হয় নি। ক্যাডেট কলেজে জুনিওররা হল ব্যাটারি চালিত খেলনা,তাদের এক জন কে সামলাতে যদি আপনাদের দল বাধতে হয়,তাহলে আপনি আর কিসের নেতা???
এখানে একটা বুদ্ধিহীনতার উধাহরন দিলাম।উনি ইচ্ছে করলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করতে পারতেন অতি সহজে।

এর পরেই আসে সঠিক সময়ে সঠিক ও শক্ত মত প্রকাশ করা। লিডাররা তাদের অন্য সকল বন্ধুদের বিপদ থেকে বাচিয়ে নিয়ে আসবেন, এটাই কাম্য, তবে তেমন নেতা খুব বেশি দেখিনি। সকলেই নিজের পীঠ বাচিয়ে চলার চেষ্টা করেন,খুজে দেখুন নিজের বন্ধুদের মদ্ধে এমন উদাহরন পাবেন অনেক। এক একটা ইনটেক এর অনেক সময় অনেক কঠিন ও নীতিগত এবং সাহসী সিদ্ধান্তে আসতে হয়। আমি দেখেছি তার অধিকাংশ সিদ্ধান্ত গুলোই আসে এই বিড়িখোর দলটার কাছ থেকে, বলছি না এই জন্য সবাইকে বিড়ি খেতে নামতে হবে।তবে বেক্তিগত ভাবে আমার কাছে মনে হয় এই দলটা এবং যারা সাহসী ও বুদ্ধিমান তারাই সঠিক নেতা, আর তথাকথিত নেতাদের কাজ হল,সেই সিধান্ত প্রশাসন এর কাছে পৌঁছে দেয়া। অনেক্তা মেসেঞ্জার এর মত।

আমার মনে হয় প্রশাসনের আর বেশি সাংগঠনিক হওয়া উচিত,শুধুমাত্র ভাল ছাত্র কিম্বা গোবেচারা টাইপ মানুষদের নেতা বানিয়ে এই নেতাপ্রথার ধর্ষণ করা ঠিক নয়, অনেক সাহসি এবং বুদ্ধিমান ক্যাডেট আছে। যারা যোগ্য। শুধু সামরিক অনুশাসন আর বাদ্ধতা নিয়ে নেতা বাছাই করলে বড় জোর কর্নেল,মেজর বের হবে, সত্যিকারের নেতা পাবার স্বপ্ন,সপ্নই থেকে যাবে।
দুঃসাহসিকতা একটি বড় গুন, এই গুন সবার মদ্ধে থাকে না।শুধু তেল মর্দন যদি নেতা হবার মূল যোগ্যতা হয়,সেই নেতার দরকার নাই। তাদের নাম স্তাবক হোক।

৩,৬২০ বার দেখা হয়েছে

১৬ টি মন্তব্য : “তথাকথিত নেতৃত্ব ও গুণাবলী”

  1. রকিব (০১-০৭)

    পোষ্টের অনেকগুলোই পয়েন্টের সাথে দ্বিমত পোষন করছি।
    তুমি বলেছো, "আমি মনে করি, নেতা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি এমন কিছু ঘটান যা সাধারণভাবে ঘটার কথা নয়। বস্তুত যা স্বাভাবিকভাবে ঘটবে, তার জন্য নেতার প্রয়োজন হয় না_ যে কোনো ব্যক্তিই তা করতে পারেন।" মূল সুরের সাথেই আপত্তি জানাচ্ছি।
    জন বুকানের একটা কথা আছে- "The task of leadership is not to put greatness into people, but to elicit it, for the greatness is there already." নেতা পথ দেখাবেন, তার দলকে সুষম ব্যবস্থাপনার দিকেই নিয়ে যাবেন। একটা দলের একটা মৌলিক আদর্শ কিংবা উদ্দেশ্য থাকে, নেতার কাজ হলো সে দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া; নতুন কোন পথ তৈরি করে সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যেও যদি নেতা নিয়ে যান, তবে তার সাথে তার দলের চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটবে কীভাবে?

    এটা ঠিক যে কলেজ কর্তৃপক্ষের মনোনয়ন সবসময় যোগ্য লিডার খুঁজে বের করে আনতে পারে না; কিন্তু এটাও খেয়াল রাখতে হবে, Our college leaders are selected, not elected. এবং এজন্যই হয়তো কর্তৃপক্ষ চাইবেন নিজেদের মন মতো নেতা। তবে আমার কলেজ লাইফে যতদূর দেখেছি, শীর্ষস্থানীয় লিডারদের বেশির ভাগই মোটামুটি ভাবে ক্যাডেট নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা সম্পন্নই ছিলেন।

    শুধু সামরিক অনুশাসন আর বাদ্ধতা নিয়ে নেতা বাছাই করলে

    ক্যাডেট কলেজ কিন্তু মূলত সামরিক বাহিনীর প্রি-ট্রেইনিং গ্রাউন্ড হিসেবেই গণ্য হতো, এখন আগের সেই অবস্থা নেই যদিও। ফলে, মূলত কমান্ড ফলো করবে এমন চিন্তাধারা থেকেই নেতা নির্বাচন খুব একটা অস্বাভাবিক না।

    তবে বেক্তিগত ভাবে আমার কাছে মনে হয় এই দলটা এবং যারা সাহসী ও বুদ্ধিমান তারাই সঠিক নেতা, আর তথাকথিত নেতাদের কাজ হল,সেই সিধান্ত প্রশাসন এর কাছে পৌঁছে দেয়া। অনেক্তা মেসেঞ্জার এর মত।

    এই জায়গাটার সাথেও খানিকটা আপত্তি রেখে যাচ্ছি। আমি অনেক ক্ষেত্রে তোমার উল্টাটাই দেখেছি (মাঝে মধ্যেও নিজের কিছু কাজ থেকেই বিচার করে বললাম; এবং আগে পরের ব্যাচেও যা দেখেছি তাই বলছি)।

    আপাতত ভাগতেছি, পরে আবার একটু কথা হবে এ টপিকে।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
    • তাওসীফ হামীম (০২-০৬)

      আপনার সাথে আমার চিন্তা ধারা ডিফার করবে এই টপিকে। কারন আমি বাছাই তে বিশ্বাসী নই,আমি বিশ্বাসী গুনাবলিতে। নেতার কাজ হল একটি দলকে সামনে এগিয়ে নেয়া কারো নির্দেশ ফলো করা নয়।


      চাঁদ ও আকাশের মতো আমরাও মিশে গিয়েছিলাম সবুজ গহীন অরণ্যে।

      জবাব দিন
      • রকিব (০১-০৭)

        তুমি আমার মূল পয়েন্ট বোধহয় ধরতে পারো নাই। আমি বাছাই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছি না; কিন্তু কলেজ কেন বাছাই প্রক্রিয়ার বাইরে যেতে চায় না সেটা বললাম। আর গুণাবলী বলতে যা বললা এটা কিন্তু কলেজও খুব একটা এঁড়িয়ে যায় না।

        আর একটা ব্যাপার খেয়াল করলে দেখতে পাবো, সব সময় সব ব্যাচেই কিছু লিডার থাকে যারা বাইরে এসে বা লাইম লাইটে এসে কাজ করতে অনাগ্রহী থাকে। এরা কাজ করে ভেতরে থেকে।


        আমি তবু বলি:
        এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

        জবাব দিন
  2. জাহিদ (২০০০-২০০৬)

    যদিও বলা হয় ক্যাডেট কলেজ সামরিক নিয়মে পরিচালিত কিন্তু আমরা কলেজে যা দেখি তার সাথে সামরিক নেতৃত্বের বিরাট পার্থক্য রয়েছে। সিলেকশন প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিরাট পার্থক্য রয়েছে। যারা সেনাবাহিনীতে এসছেন বা বি এম এ সম্পর্কে ধারনা আছে তারা জানেন যে বি এম এ তে শুধু পরাশুনা বা শুধু ফিজিক্যাল পারফরমেন্স এর উপর ভিত্তি করে প্রিফেক্টশীপ দেওয়া হয় না। বিভিন্নভাবে নেতৃত্বের গুনাবলী দেখা হয়, আর সাথে মেধা এবং শারিরীক সক্ষমতাকেও বিবেচনায় আনা হয়। তাই বি এম এ তে যারা প্রিফেক্ট হয় তারা সত্যিকার অর্থেই যোগ্যতা সম্পন্ন হয়। এমন দেখেছি কলেজে সাধারন ক্যাডেট ছিল কিন্তু বি এম এ তে এসে অনেক ভাল করেছে। সামরিক নেতৃত্বের অন্যতম চ্যালেঞ্জই হচ্ছে উপরস্ত কর্মকর্তা বা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় রেখে কাজ করা। সে ক্ষেত্রে দুদিকেই খেয়াল রাখতে হয়। কলেজে বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় আমি সিনিয়র হিসেবে যেটা করছি না সেটা আমার জুনিয়র কে করতে বলছি যেটা কোন ধরনের লিডারশিপের মধ্যেই পড়ে না। যেমন আমি যদি কাউকে ড্রেস এর জন্য ধরতে চাই তাহলে আমাকে আগে নিজের টার্ন আউট ঠিক করতে হবে, আমি যদি কাউকে লেট এর জন্য ধরতে চাই তাহলে আমাকে আগে পাংচুয়াল হতে হবে, আমি যদি চাই আমার জুনিয়র পি টি-র সময় প্রপার পি টী করবে দৌড়াবে তাহলে আমাকে তার সাথে দৌড়াতে হবে পি টি করতে হবে। এটাই সামরিক নেতৃত্ব। আর নেত্তৃত্ব দিতে গেলে কিছুটা বিচক্ষন হতে হয়। কিন্তু কলেজে আমাদের এভাবে কখনও শেখানো হয় না, আমরাও মানি না। ক্যাডেট কলেজ তার একটা নিজস্ব নিয়মে চলে।

    জবাব দিন
  3. রায়হান

    আমাদের ব্যাচ যখন ক্লাস টুয়েলভে (২০০৬ সাল) তখন হাউস প্রিফেক্ট ছিল একজন কিন্তু আমাদের অঘোষিত লীডার ছিলো ফেরদৌস (খায়বার হাউস) । সে কতৃত্ত্ব চাইতো না কিন্তু বন্ধুরা ভালোবেসে তার আনুগত্য মেনে নিত । নিজের সমকক্ষদের কাছ থেকে আনুগত্য অর্জন করা সহজ নয় । আমরা তাকে সম্মান করতাম তার ক্রীড়ানৈপুণ্য , মেধা , দায়িত্ববোধ , স্থিরপ্রজ্ঞ আচরণ , পরিমিতবোধ ,উদ্ভাবনী শক্তির জন্য ।
    সে পরবর্তী সময়ে বি এম এ থেকে সোর্ড অফ অনার পায় ।
    কিন্তু এমন একজন ছেলেকে একটি সামান্যদরের প্রিফেক্টশীপ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় । :bash:

    শুধু সামরিক অনুশাসন আর বাধ্যতা নিয়ে নেতা বাছাই করলে বড় জোর কর্নেল,মেজর বের হবে, সত্যিকারের নেতা পাবার স্বপ্ন,সপ্নই থেকে যাবে।

    এ কথায় সহমত জানালাম ।

    এক একটা ইনটেক এর অনেক সময় অনেক কঠিন ও নীতিগত এবং সাহসী সিদ্ধান্তে আসতে হয়। আমি দেখেছি তার অধিকাংশ সিদ্ধান্ত গুলোই আসে এই বিড়িখোর দলটার কাছ থেকে

    এ লাইনটা তো পুরাই :awesome:

    রায়হান (২০০০-২০০৬)
    ঝ ক ক. (সম্পাদিত)

    জবাব দিন
  4. ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

    টপিকটা খুব ইন্টারেস্টিং। আমি নিজেও ক্যডেট লাইফে এটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। এখনও কিছুটা ভাবি। ক্যডেট জীবনে আমি কলেজ কালচারাল প্রিফেক্ট ছিলাম। সিলেকটেড লীডার। পরবর্তিকালে ইলেকটেড লীডার হয়েছিলাম বহুবার। নেতৃত্ব দানে কখনো সফল হয়েছি, কখনো হয়েছি ব্যর্থ। তাই বিষয়টা আমার কাছে গভীর ভাবনার। সময় করে আরেকদিন বিস্তারিত লিখব।

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : জাহিদ (২০০০-২০০৬)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।