আমার ডাক্তার হওয়ার গল্প

আসলে সিসিবিতে অনেকেই খুব ভাল লিখেন । মাহমুদ ভাইয়ের ব্লগ পড়লে তো আমার লিখতেই ইচ্ছে করে না । আর আমি পিচ্চি তো । তবুও কিছু কিছু ঘটনা প্রায়ই মনের মধ্যে উকিঝুকি দেয় ।

কলেজে থাকাকালীন সময়ে দেখতাম সবাই ক্যারিয়ার নিয়ে বেশ ব্যস্ত ।
আমি আবার অংকে একটু দূ্র্বল আর তাই ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিং করার চিন্তা মাথা থেকে তাড়ালাম ।
মেডিকেল কোচিং করার জন্য ভর্তি হলাম রেটিনাতে ।
ইচ্ছে ডাক্তার হওয়া আর এখন সেই গল্পই বলব…

১৫ জুলাই ২০০৮
সব মায়া উপেক্ষা করে কলেজ থেকে চলে আসতে হল ।
ছয় বছরের চেয়েও বেশি । অনেক প্রাপ্তি, অনেক পিছুটান এই সময়কে ঘিরে ।
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এবং মজার মূহুর্তগুলো দারুণভাবে উপভোগ করেছি এখানে ।
অনেক কিছু পেয়েছি এবং শিখেছি । কিভাবে যে সময়টা কেটে গেছে টের পাই নি ।
তবে অদ্ভূত কিছু বন্ধু পেয়েছিলাম যাদের সাথে চমৎকার কিছু সময় কাটিয়েছি ।

শেষ হয়ে গেছে একটি অধ্যায়, একটি বন্ধন, একটি সময়, একটি ঝগড়া, একটি অভিমান, একটি গল্প, একটি অনুভূতি, একটি বাস্তবতা, একটি বন্ধুত্ব, একটি পথচলা, একটি স্বপ্নদেখা, একটি ব্যস্ততা, একটি দুশ্চিন্তা, একটি হাসি, একটি মৌনতা, একটি আনন্দ এবং একটি জীবন ।

এখানে সময়টা কিঞ্চিত দ্রুতই কেটেছে ।
ঢাকায় চলে এলাম জুলাই এর শেষের দিকে । প্রথমে থাকলাম খিলক্ষেত ।
তারপর কল্যাণপুর, শাহীনবাগ, নাখালপাড়া এবং পরিশেষে কাফরুল ।
২৫-২৮ আগস্ট ২০০৮ আমার আইএসএসবি হল আর্মিতে চান্স পেলাম না । ভাল কথা !
আসলে আমার প্রচন্ড ইচ্ছা ছিল মেডিকেলে পড়ার এবং আমি ভাবতাম এতগুলো সিট, চান্স পাবো না ?
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ এর ফর্ম কিনলাম ফার্মগেট থেকে । খুব যত্ন করে ফর্মটি পূ্রণ করে জমা দিলাম ।
প্রবেশ পত্র আনার জন্য ময়মনসিংহ যেতে হল । পুরোদমে প্রস্তুতি নিতে থাকলাম পরীক্ষার জন্য । আর এভাবেই সময় বয়ে চলল ।

৭ নভেম্বর ২০০৮ সকাল ১০ টায় পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ।
আমি তখন শাহেদের বাসায় । আমাদের যে প্রাইভেট কারে যাওয়ার কথা ছিল সেটা আসতে একটু দেরী করল । সকাল সাতটায় রওনা হলাম ।
বাসা থেকে নিচে নামার পর শাহেদের হাত থেকে কলম পড়ে গেল ।
প্রথমেই বাধা পড়ল একটা ।
আমাদের হাতে কলম আর প্রবেশ পত্র ছাড়া কিছুই ছিল না ।
সারা রাত ঘুম হয় নি তাই চোখ ভারী হয়ে আসছিল । কারের খোলা জানালা দিয়ে সকাল বেলার ঠান্ডা বাতাস আসছিল । কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম টের পাই নি ।
হঠাৎ চোখ খুলে দেখি যে ফাইল কীপারের ভিতরে প্রবেশ পত্র ছিল সেটা কারের জানালার পাশে আর সেটার মধ্যে শাহেদের প্রবেশ পত্র নেই ।
সাথে সাথে ড্রাইভারকে কার থামাতে বললাম । অনেক খোঁজাখুঁজির পর সেটা আবিস্কার করলাম কারের ভিতরেই। আবার যাত্রা শুরু হল ।
কার হঠাৎ থেমে গিয়ে আবারো ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ।
আমিঃ “কি ব্যাপার ড্রাইভার ?”
ড্রাইভারঃ “বুঝতে পারছি না, আপনারা নামুন”
“পেছনের চাকা” :gulli2:
যেটা দিয়ে ঠিক করা হবে সেটা নাকি ভুলে আনা হয় নি ।
ঘড়িতে তখন সময় সোয়া নয়টা । আশেপাশে কোন গ্যারেজ ছিল না ।
হাইওয়ের পাশে অঘটনটা ঘটল এবং অনেক চেষ্টা করেও কোন গাড়ী থামাতে পারলাম না ।
মনে হল সবারই যেন কিসের একটা তাড়া !

কিছুদূ্র এগিয়ে একটি পেট্রোল পাম্প পেলাম । ভেবেছিলাম যদি কোন ঢাকা-ময়মনসিংহ বাস পাওয়া যায় ।
বাস একটি পেলাম কিন্তু সেটা ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা যাচ্ছে । একটি মাইক্রোবাসের ড্রাইভারকে বললাম যাওয়া যাবে কিনা । তিনি বললেন যে সেটা গফরগাঁও যাচ্ছে ।
বলে রাখা ভাল, পাম্প থেকে কিছুদূ্র এগুলেই রাস্তাটি দুই ভাগ হয়ে গিয়েছে ।
একটি গিয়েছে ময়মনসিংহ অন্যটি গফরগাঁও ।
আরেকটি প্রাইভেটকারের ড্রাইভারকে ব্যাপারটি বললাম । তিনি তার বসকে বলতে বললেন । উনি রাজী হলেন যখন জানতে পারলেন আমরা এক্স-ক্যাডেট ।
কারণ তিনিও পাবনার এক্স-ক্যাডেট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করেছেন ।
আমি আর শাহেদ গাড়ীতে উঠে বসলাম ।

এসি চালানো ছিল তবুও ঘামছিলাম । ঘড়ির কাঁটার গতি যেন হঠাৎ বেড়ে গেল ।
অবশেষে আমরা যখন ময়মনসিংহ পৌছলাম তখন বাজে দশটা চল্লিশ ।
পরীক্ষা শেষ হবার আর মাত্র বিশ মিনিট বাকী । মেডিকেল কলেজের বন্ধ গেটের দিকে তাকাতেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসলো । বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কি ঘটে যাচ্ছে । প্রতিদিন অনেক কষ্ট করে পড়া তৈরী করে রেটিনাতে ক্লাস করতাম, পরীক্ষা দিতাম । অনেক স্বপ্ন ছিল আমার চোখে । নিজের চোখের সামনে সেই স্বপ্নকে ভেঙ্গে যেতে দেখলাম ।
সবকিছুই একের পর এক ঘটে গেল, আমি কিছুই করতে পারলাম না ।
সাক্ষী গোপালের মত শুধু তাকিয়ে দেখলাম । এত কষ্ট কখনো পাই নি ।
মিটে গেল আমার ডাক্তার হওয়ার সাধ ।
গল্পটা সুন্দর, তাই না ?
আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের গল্প . . .

যাই হোক কষ্টের পরেই নাকি সুখ আসে ।
আসছে জুলাই মাসে আমি বিএমএ তে যাচ্ছি । দেখা যাক :salute:

১৫ টি মন্তব্য : “আমার ডাক্তার হওয়ার গল্প”

মওন্তব্য করুন : রাশেদ (৯৯-০৫)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।