শূণ্যে ভাসায়া দিলাম তিন ভাগ জীবন

১.
সিটিব্যাংকের মামুন ভাই গত শুক্রবার তাঁর বাসায় সব ক্যাডেটদের নিয়ে এক পার্টি দিয়েছিলেন। একজন সাবেক ক্যাডেট ড. আতিউর রহমান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্ণর হয়েছেন এটাই উপলক্ষ্য তিনিও ছিলেন। পরিচয় হল রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের একজনের সঙ্গে, তিনি দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরেছেন।
-কেন ফিরলেন? বললেন অদ্ভুত এক কথা। ‘সেই ক্লাস সেভেনে থাকতে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। তারপর আর ঘরে ফেরা হয়নি। আমি আসলে এখন ঘরে ফিরতে চাই। সে কারণেই দেশে এসেছি।’
কথাটা মাথার মধ্যে ঢুকে গেল। তাহলে কি সব এক্স ক্যাডেটদের এই অবস্থা। যে বয়সে বুজতে শিখি, পারিবারিক বন্ধন অনুভব করি, ঠিক তখনই ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। আমারও আর সেই ঘরে ফেরা হয়নি। বাড়ির বড় ছেলে হয়েও এখনও কেমন জানি নিজেকে আউটসাইডার মনে হয়।
আমার ছোট ভাই বা বড় বোনকে দেখি এখনও আম্মাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। আমি পারি না। আমার কেন জানি লজ্জা লজ্জা লাগে। মনে হয় আর কখনো আমার ঘরে ফেরা হবে না।
২.
ছুটিতে আসলে কিছুদিন মহা আদর যত্নে থাকতাম। বকাও যে খাইনি তা নয়। বকা খেলে বা কোনো কারণে মন খারাপ হলে মনে হত চলে যাবো কলেজে। এর পর ছুটিতেও আসবো না। আবার কলেজে চলে গেলে মনে হতো কবে যে বাসায় যাবো।
তাহলে আমার নিজের জায়গা কোনটা ছিল? আমার বাসা না কলেজ হোস্টেল। এই প্রশ্নের উত্তর আমার আজও জানা হল না।
৩.

ঘোরতর সংসারী জীবন। খাই, ঘুমাই, কাজ করি, বেতন পাই, সংসার চলে। মাঝে মাঝে বউকে নিয়ে সিনেমা দেখা, সবাইকে নিয়ে বাইরে খাওয়া, একটু বেড়াতে যাওয়া, গান শোনা, বই দেখা-এই তো। আরেকটু কিভাবে ভাল থাকা যায়, আর্থিক নিশ্চয়তা আরও কিভাবে বাড়ানো যায়, ছেলে মেয়েকে একটু ভাল স্কুলে দেওয়া-এসব পরিকল্পনায়ই দিন চলে যায়।
বাড়ির বড় ছেলে-অনেক দায়িত্ব। দুই ছেলে-মেয়ের বাবা-অনেক দায়িত্ব। অতঃপর আবার অফিসে যাওয়া, কাজ করা, বছর শেষে বেতন কত বাড়লো তার হিসেব কষা।
‘শূণ্যে ভাসায়া দিলাম তিন ভাগ জীবন
বাকি এক ভাগ তাহার জন্য….’
৫.
বাকি এক ভাগ জীবন কখনো কখনো উঁকি মারে। জীবন তো এরকমই। এক হাত দিয়ে সেই একভাগ জীবনকে সরিয়ে দেই। পেছনে পরে থাকে একভাগ জীবন। তিন ভাগ জীবন নিয়ে আবার ঘরে ফিরি, অফিস যাই, আবার ঘরে ফিরি আবার অফিস যাই।
তারপরেও….
‘চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
বুকের ভিতর থিকা পিরীতের পুন্নিমার চান,
নিজেই তাজ্জব তুমি—একদিকে যাইবার চাও
অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান।’

৮,৮৫১ বার দেখা হয়েছে

৭৫ টি মন্তব্য : “শূণ্যে ভাসায়া দিলাম তিন ভাগ জীবন”

  1. রবিন (৯৪-০০/ককক)
    যে বয়সে বুজতে শিখি, পারিবারিক বন্ধন অনুভব করি, ঠিক তখনই ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। আমারও আর সেই ঘরে ফেরা হয়নি। বাড়ির বড় ছেলে হয়েও এখনও কেমন জানি নিজেকে আউটসাইডার মনে হয়।

    অনেকদিন ধরেই এটা ফিল করছি

    জবাব দিন
  2. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    শেষে সৈয়দ হকের কবিতাটা দিয়া মনটাই খারাপ কইরা দিলেন।
    আফসোস 'হায়, জীবন এতো ছোটো কেনে, এই ভুবনে।'

    মাসুম ভাই, আপনার লেখা বারবার পড়তে ইচ্ছে করে। আর এটা সিসিবিতে আপনার সেরা লেখাগুলির একটা।

    অসম্ভব সুন্দর। :boss:


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  3. মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

    অপূর্ব সুন্দর লেখা। :thumbup: :thumbup:

    আমার ছোট ভাই বা বড় বোনকে দেখি এখনও আম্মাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। আমি পারি না। আমার কেন জানি লজ্জা লজ্জা লাগে।

    :just: একমত...

    জবাব দিন
  4. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    আমার এমনটা কখনোই মনে হয়নি। কারণ আমি কলেজের সময়টা বাদ দিলে ঘরেই ছিলাম। এখনও যেমন যুক্ত পরিবারে থাকি। মা, নানী, ভাই-তাদের সংসার, ছেলে-মেয়ে সব মিলিয়ে আমার ঘর ভর্তি মানুষ। '৯২ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে বড় ছেলে হিসাবে যা করার নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করেছি। সবাই সন্তুষ্ট নয় এটাও বুঝি।

    এক সময় নিজের জন্য সময় ছিল। অল্প বয়সে বিয়ে করে সেই স্বাধীনতাও হারিয়েছি। তাতে অবশ্য অপ্রাপ্তির কোনো ক্ষোভ নেই। কিন্তু ভবঘুরের জীবনটা মাঝে মধ্যে টানে। কিন্তু এটাও বুঝি ওটা আমার জন্য নয়।

    মাসুম : ভালো লাগলো লেখাটা। মনটা ছুঁয়ে গেল। তুমি আজকাল সিসিবিতে কম সময় দাও।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  5. মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)
    যে বয়সে বুজতে শিখি, পারিবারিক বন্ধন অনুভব করি, ঠিক তখনই ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। আমারও আর সেই ঘরে ফেরা হয়নি। বাড়ির বড় ছেলে হয়েও এখনও কেমন জানি নিজেকে আউটসাইডার মনে হয়।

    চরম বাস্তব একটা কথা। ছয় বছর ক্যাডেট কলেজের পরে আরও পাঁচ বছর হলে। তিন চার বছর কোন রকম থাকার পরে এইবার একেবারে দেশের বাইরে। ঠিকভাবে ঘরে ফেরা হলোনা বস।

    তারপরেও অনেক কিছু না চাইতেই পেয়ে গেছি, আবার অনেক কিছু চেয়েও পাইনি ......

    আর যথারীতি দারুন লেখা।

    জবাব দিন
  6. রাশেদ (৯৯-০৫)

    মাসুম ভাই আপনে তো পুরা 😀
    আপনের লেখা কেমন তা আগেই অনেকবার বলছি তাই এইবার আর বলব না 😀 জানতে ইচ্ছে করলে আগের ব্লগ গুলা দেখেন :hatsoff:


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
  7. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    সিসিবিতে মাসুম ভাইয়ের বেস্ট লেখাগুলার একটা :hatsoff:
    একেবারে মনের ভেতরে হানা দেয়া লেখা :salute:

    বাড়ির বড় ছেলে হয়েও এখনও কেমন জানি নিজেকে আউটসাইডার মনে হয়।

    ১ আর ২ পুরা লাইনে লাইনে নিজের কাহিনি মনে হল 🙂 ৩ আর ৪ এ ধরা পড়িনাই 😀 ৫ এ আইসা আবার ধরা 🙁
    মাসুম ভাইকে আবারো :salute:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  8. সিরাজ (৯৪-০০)

    মাসুম ভাই আমরা যারা ডিফেন্সে আছি তাদের কথা চিন্তা করেন সেই যে বাহির হইলাম ঘর ছেরে আর খবর নাই.........কবে যে বড়ী যাবো আর আপন জন দের সাথে সময় কাটাবো আপন করে কে জানে......।।
    আমাদের এই পথ চলা কি কখোনো শেষ হবে......।কে যানে...।
    লেখাটা একদম মন ছুয়ে গেল ভাইয়া......।
    মাসুম ভাইকে ......।হাজার :salute: :salute:

    জবাব দিন
  9. সামীউর (৯৭-০৩)

    আপনার আর একটা অদ্ভুত সুন্দর লেখা। বলতে দ্বিধা নাই সিসিবিতে আমি যাদের লেখা পড়ার জন্য সব সময় উদগ্রীব থাকি আপনি তাদের একজন। আপনার লেখার ভক্ত হয়ে আমি সামুতে আপনার লেখা পুরোনো ব্লগ গুলা খুঁজে খুঁজে পড়ি। :boss:

    জবাব দিন
  10. আদনান (১৯৯৪-২০০০)

    আমিও তো ঘর ছাড়া সেই সেভেন থেকে, এখন আবার দেশ ছাড়া, ২৭ বছরের জীবনে ১৪ বছর মনে হয় ঘরে ছিলাম, একদিন আমিও ঘরে ফিরব ।
    মাসুম ভাই লেখাটা খুব ভাল লেগেছে :boss: ।

    জবাব দিন
  11. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    ১.

    আম্মা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করে গেছেন, আমি নাকি তাকে যথেষ্ট সময় দেই না, এমনকি বুঝার চেষ্টাও করিনা। অথচ আমার এই অল্প সময়ের জীবনে আমি যাদের কথা সবথেকে গুরুত্ব দিয়ে শুনেছি তার মধ্যে মা দুই-নম্বরে, এক নম্বরে বাবা।

    কত কাছাকাছি ছিলাম আমরা, অথচ কতদূর-দূর আমাদের অনুভূতিরা।

    ২।

    আমার মতে আমাদের আসলে কোন জায়গা নেই। আমরা এক জায়গায় যাই, অন্য জায়গায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য।

    যাযাবর।

    ৩।

    আপনাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখেছি। "নীল হয়ে আছি"। কিংবা হয়ত এটা আপনাকে নিয়ে নয়, আমাকে নিয়েই লেখা।

    ৪।

    খেরোখাতার হিসাব। জীবন টা এমনি। চলে গেলে মৃত্যুর পরের ব্যালান্স শীট মিলানো। তাও নিজের নয়, ওয়ারিসদের।

    ৫।

    আমি তো ঘুমাই ডেইলি আটঘন্টা। জীবনের তিনভাগের একভাগ চোখ বন্ধ।

    ভাইয়া খুব খুব ভালো লাগলো লেখাটা। একদম মনের মধ্যে "হান্দায়" গেল


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  12. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)
    এক মেয়েকে বলেছিলাম তোমার জন্য আমি সব করতে পারি। সেই মেয়ে আমার থাকেনি। এক মেয়ে আমাকে বলেছিল আমার জন্য সে সব কিছু করতে পারে। তাকে কখনো ডাকতে ইচ্ছা হয়নি।

    আহা!

    শওকত ভাই, আমি ত পুরা দৌড়ের উপরে। আমার একজন বিসিএস এডমিন, আরেকজন নাকি পুলিশ :(( । দেশে যাইতে ডর লাগতাছে।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  13. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    অসাধারণ লেখা। অন্তর থেকে বললাম।
    আমার কাছে জীবনটাকে সম্পূর্ণ অর্থহীন, নিকষ কালো, বয়ে বেড়ানোর অতীত কষ্টকর মনে হয়। কারণ জানি না। আমি বাসা থেকে বের হয়েছিলাম আরও আগে, ক্লাস ফোরে। আর ফেরা হয়নি। কখনও ফেরা হবেও না।

    আবারও বলি, লেখাটা খুব ভাল লাগল।

    জবাব দিন
  14. তাহলে আমার নিজের জায়গা কোনটা ছিল? আমার বাসা না কলেজ হোস্টেল। এই প্রশ্নের উত্তর আমার আজও জানা হল না।

    ভাইয়া,
    আপনার জীবনবোধ চমৎকার। অনুভূতিগুলোকে এত সুন্দর করে প্রকাশ করতে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি দক্ষতার প্রয়োজন হয়। আপনার এই লেখাটার প্রায় সব কথাই আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
    অসংখ্য ধন্যবাদ এই অসাধারণ লেখাটার জন্য।
    :hatsoff: :hatsoff:

    জবাব দিন
  15. হায়দার (৯২-৯৮)

    মাসুম ভাইয়ের লেখা ভালো লাগলো।
    ফয়েজ ভাইয়ের কমেন্ট ও দারুন লাগছে।

    "আমার মতে আমাদের আসলে কোন জায়গা নেই। আমরা এক জায়গায় যাই, অন্য জায়গায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য। যাযাবর।"

    আমি বোধহয় এখনো যাযাবর আছি।
    এক জায়গায় বেশি দিন ভালো লাগেনা।
    নতুন কোনো কিছু করতে, নতুন কোথাও যেতে ইচ্ছে করে।

    জবাব দিন
  16. আহ্সান (৮৮-৯৪)

    মাসুম ভাই,
    আমি বরাবরই আপনার শক্তিশালী লেখার ভক্ত। লেখাটি বেশ কয়েকবার পড়লাম। চাপা কষ্ট, নাকি হাহাকার কোনটা আমাকে নাড়া দিয়েছে তা না বুঝতে পারলেও, ঘরে ফেরার অনিশ্চয়তা আমাকে দিশেহারা করেছে। অর্থনীতির সাথে সংগ্রাম করা বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের চার ভাই-বোনকে লেখা পড়া করিয়েছেন। আমার দুঃখী মা নানা কৌশলে সংসারের চাকা সচল রেখেছেন। আমাদের মানুষ করতে গিয়ে বাবা-মা তাদের জীবনের সব সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ছেন। অথচ বাসায় এখন আমা্র বৃদ্ধ বাব-মা'র নিঃসঙ্গ জীবন যাপন।দুই বুড়ো-বুড়ি কি করেন, কি খান কিছুই বলতে পারিনা। শিকড়ের টানে বাবা মা তাদের ভিটে ছেড়ে আসতে নারাজ।
    আর কবে ঘড়ে ফিরব মাসুম ভাই বলেনতো? কবে? কবে নিঃসঙ্গ বাবা মা'কে জীবনের অন্তিম লগ্নে একটু শান্তির নির্মল পরশ ছুঁইয়ে দিতে পারবো? আমার হিসেব মেলেনা... মেলাতে পারিনা... মুঠোফোন বেজে উঠলেই বুকটা ভয়ে কেঁপে ওঠে.. কেউকি আমার বাবা/মা'র চির বিদায়ের খবর নিয়ে ফোন করলো? এভাবে ভয় তাড়িত হয়ে দিনে দিনে যেন নিজের কাছেই নিজে পরাজিত হয়ে যাচ্ছি।
    মাথার ভিতর কয়েকটা লাইন বারবার ঘুর-পাক খাচ্ছে..

    সেই ক্লাস সেভেনে থাকতে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। তারপর আর ঘরে ফেরা হয়নি।
    বাড়ির বড় ছেলে হয়েও এখনও কেমন জানি নিজেকে আউটসাইডার মনে হয়। মনে হয় আর কখনো আমার ঘরে ফেরা হবে না।
    ‘চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
    বুকের ভিতর থিকা পিরীতের পুন্নিমার চান,
    নিজেই তাজ্জব তুমি—একদিকে যাইবার চাও
    অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান।’
    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : আদনান (১৯৯৪-২০০০)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।