২০ বছর আগের দুটি ডায়েরি, কয়েকটা কবিতা, কিছু স্মৃতি

পুরানো বুকসেল্ফটা পাল্টাতেই হলো। পোকা এখন সেল্ফ শেষ করে বই-এ আক্রমন করতে শুরু করেছে। মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে বইটাই সবচেয়ে উপাদেয় বলে মনে হলো পোকাদের কাছে। বইটা ধরতেই পৃষ্ঠাগুলো ঝুর ঝুর করে পরলো আমার হাতের মুঠোয়। তাই নতুন একটা বইয়ের সেল্ফ কিনতেই হলো।
আমার বই রাখার সেল্ফ চারটা। পাল্টালাম সবচেয়ে পুরোনোটা। এটার বয়স কম করে হলেও ২৫ বছর। বা তারও বেশি। প্রথম যখন সেল্ফটা কিনি তখন তিন তাকের এক তাক মাত্র ভরতে পেরেছিলাম জমানো বই দিয়ে। সেই এক তাক ভর্তি বইয়ের সামনে বসে আছি এরকম একট ছবি এখনো আমার কাছে আছে। তারপর বইয়ের পর বই জমেছে। একটার জায়গায় চারটা সেল্ফ।
11072009223
নতুন সেল্ফে বই সরাতে গিয়ে আবিস্কার করলাম দুটা ডায়েরি। একটা ১৯৮৭ সালের, আরেকটা ১৯৯০ সালের। ৮৭ সালে আমি অনার্সে ২য় বর্ষের ছাত্র। তখন একটা কবিতা আবৃত্তির সংগঠন করতাম, স্বনন। এই ডায়েরিতে তোলা আছে অনেকগুলো কবিতা। যে কবিতা ভাললাগতো তুলে রাখতাম। দ্বিতীয় ডায়েরি মূলত বই কেন্দ্রীক।
সাধারণত আমি বই তেমন কাউকে দিতাম না। কে যেন বলেছিল বই, কলম আর বউ অন্যের কাছে দিতে হয় না। তাহলে আর ফেরত পাওয়া যায় না। আমার তখন বই ছিল কেবল। লিখতাম ৩টাকা দামের ইকোনো কলম দিয়ে। তাই অনায়াসে কলম দিয়ে দিতাম। বই দিতে মনই চাইতো না। তারপরেও কাউকে কাউকে দিতে হতো। যাকে দিতাম তার নামটা টুকে রাখতাম এই ডায়েরিতে। বই যত্ন না নিয়ে পড়লে পাশে লিখে রাখতাম আর পাবে না। এতদিন পর মজাই পেলাম ডায়েরি দুটো পেয়ে।

শুরুর কবিতা-
‘যখন তোমার সঙ্গে আমার হলো দেখা
লেকের ধারে সঙ্গোপনে
বিশ্বে তখন মন্দা ভীষণ রাজায় রাজায়
চলছে লড়াই উলুর বনে।’……….(শামসুর রাহমান)

এরপরের কবিতাটা সুনীলের কেউ কথা রাখেনি। এটা সাথে হৃদয়ের উত্থান-পতনের কোনো সম্পর্ক নাই সম্ভবত। ভাল লেগেছিল বলেই হয়তো লেখা। বয়স ৩৩ বছরের বেশি হয়ে গেছে। কেউ কেউ যেমন আমার সাথে কথা রাখেনি, তেমনি আমিও তো কারো কারো সাথে কথা রাখিনি। তাই এটা নিয়ে ভাবি না।

‘আমার বুকে অনেক ক্ষত
তবুও আমি বিক্ষত নাই
ভর দুপুরে একলা কত
খুঁজে বেড়াই হৃদয়টা কই।’
এটা কার কবিতা মনে নেই। সাময়িক মন খারাপের কারণে হয়তো কবিতাটা টুকে রেখেছিলাম। হৃদয় নিয়ে বেশি নাড়াচারা করলে মন খারাপ তো হবেই। তারপর আছে রবীন্দ্রনাথের কৃঞ্চকলি আমি তারেই বলি। সেই বালিকা মোটেই কৃঞ্চকলি ছিল না। তবে এটাও ভাল লাগার কবিতা।

‘বলো আমাকে রহস্যময় মানুষ, কাকে তুমি
সবচেয়ে ভালবাসো?
তোমার পিতা, মাতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নীকে?
পিতা, মাতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নী-কিছুই নেই আমার।
তোমার বন্ধুরা?
ঐ শব্দের অর্থ আমি কখনোই জানিনি।
তোমার দেশ?
জানি না কোন দ্রাঘিমায় তার অবস্থান।
সৌন্দর্য?
পারতাম বটে তাকে ভালবাসতে-দেবী তিনি অমরা।
কাঞ্চন?
ঘৃণা করি কাঞ্চন, যেমন তোমরা ঘৃণা করো ভগবানরে।
বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ, কী ভালবাসো তুমি?
আমি ভালবাসি মেঘ,…..চলিঞ্চু মেঘ…….ঐ
উঁচুতে……..ঐ উঁচুতে……..
আমি ভালবাসি আশ্চর্য মেঘদল।
(অচেনা মানুষ, শার্ল বোদলেয়ার, অনুবাদ-বুদ্ধদেব বসু।)
এই কবিতার প্রেমে পড়েছিলাম সেই কবে………আজও সেই প্রেম গেলনা।

তখন মুগ্ধ ছিলাম আবুল হাসানে। সেই মুগ্ধতা আজও আছে। কত যে কবিতা প্রিয়র তালিকায় আছে তা হিসেবের মধ্যে নাই। যুগলসন্ধি নামে তাঁর দুটা কবিতা আছে। আমরা আবৃত্তি করতাম। খুবই আবৃত্তিযোগ্য কবিতা দুটো।

‘ছেলেটি খোঁড়েনি মাটিতে মধুর জল,
মেয়েটি কখনো পরে নাই নাকছাবি।
ছেলেটি তবুও গায় জীবনের গান
মেয়েটিকে দেখি একাকী আত্মহারা।’

কিংবা

‘আমাদের প্রেম না পেল কবির ভাষা
কাব্যচুড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা।’

হাওয়াখানা চুপচাপ ছিল চমৎকার আবৃত্তিযোগ্য একটা কবিতা। এর কবি দিনেশ দাশ। শেষ তিনটা লাইন এরকম…
‘রাতের শিশির কাঁদে টুপটাপ
হাওয়াখানা চুপচাপ
হওয়াখানা চুপচাপ।’

গভীর রাতে এই কবিতাটা কী যে ভাল লাগে।

১৯৮৭ এর সেই সময়টায় ডায়েরী রুদ্র থাকবে না তাই কী হয়।
‘খুব গভীরে সাঁশের মতো
হাড়ের ভেতর মাসের মতো
সুরক্ষিত স্বপ্ন থাকে।
আকাল-তবু স্বপ্ন থাকে
বিরোধ-তবু স্বপ্ন থাকে
ভাঙ্গন-তবু স্বপ্ন থাকে
স্নায়ুর সে কোন জটিল কার্যকলাপ জুড়ে
হৃদয় থাকে, সেই গোপনে স্বপ্ন থাকে।’

আল মাহমুদ এখন যেমনই থাকুন, কবি হিসেবে তিনি অসাধারণ। সোনালী কাবিন যারা পড়েননি তারা জানেন না কী পড়েননি। তবে এই সহজ কবিতাটা আমার খুবই প্রিয়।
‘ফেব্রুয়ারীর ২১ তারিখ দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে বৃষ্টি কোথায় বরকতেরই রক্ত।
হাজার যুগের সূর্যতাপে জ্বলবে এমন লাল যে
সেই লোহিতে লাল হয়েছে কৃঞ্চচূড়ার ডাল যে।
……..
প্রভাত ফেরী প্রভাত ফেরী
আমায় নিবে সঙ্গে।
বাংলা আমার বচন
আমি জন্মেছি এই বঙ্গে।’

শেষের দিকে পাওয়া এই কবিতাটা কার আমি জানি না। ভয়াবহ প্রেমের কবিতা। একটা নাটকে সেই সময়ে ব্যবহার হয়েছিল। খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।
‘একবার
আমার দিকে তাকাও নন্দিনী
দেখো-
কেমন করে দুঃখের লতাগুল্ম
ক্রমশ নিঃশব্দে গ্রাস করছে চৈতন্যের বেদীমূল।
যেমন করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত লাশের শিয়রে,
থরে থরে জমে ওঠে
হাজার বছরের শোক।
আভাজন আমি।
………..
অন্ততঃ একবার এদিকে দৃষ্টি ফেরাও নন্দিনী
দেখো-
কেমন করে একটি নক্ষত্রবিদ্ধ নীলিমাকে,
পলকে রূপান্তরিত করে,
রাসয়নিক দৃষ্টির মৃত হলুদে।
একজন হৃদয়বান কবিকে নৃশংস ঘাতকে।
এবং একটি গোলককে পারমানবিক অস্ত্রে।

একবার ভালবাসো নন্দিনী।
পৃথিবী বেঁচে যাক।
আর একটি বিশ্বযুদ্ধ থেকে।’

সবশেষ কবিতাটি আমার এক বন্ধুর। আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধু, জহিরের। ২২ বছর পর সেই কবিতাটিই যেন আমার এখনকার কবিতা হয়ে উঠলো।
‘জীবন থেকে
ফিরিয়ে নিলে
দশটি বছর
চিন্তা মুক্ত হব আবার
বনবাদাড়ে ফিরব ঘুরে
লাটিম লাটাই সঙ্গী হবে
নগেন বাবুর আমবাগানে,
জীবন থেকে সরিয়ে নিলে
জীবিকাকে।’

৬,৭৫০ বার দেখা হয়েছে

৪৮ টি মন্তব্য : “২০ বছর আগের দুটি ডায়েরি, কয়েকটা কবিতা, কিছু স্মৃতি”

  1. মহিব (৯৯-০৫)

    অসাধারণ পোস্ট শওকত ভাই। পঞ্চতারকা।
    কবিতার সাথে আপনার যত স্মৃতি- কিছুটা অনুভব করতে পারলাম। আফসোস- আশেপাশে কোন বালিকা নাই। কবিতা পড়লে আমার বালিকা সংগ পাইতে মঞ্চায়। এটা কোন রোগ হইতে পারে। আর বাড়ায় তৃষ্ণা। একটা জীবন পাইতাম- শুধু কবিতা পইড়া কাটায়া দিতাম।

    আর- আপনার লাইব্রেরিতে একবার ঢুঁ মারতে ইচ্ছে করে।

    জবাব দিন
  2. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    যাক, রেটিংটা ফিরা আইছে! মাসুম তুমি যে ডুবে ডুবে পানি খাও, তা তো জানতাম না! কত অজানারে........... :hatsoff:

    বালিকার প্রেমে পড়লে কি জানি কয়, ইন্টারপোলে খবর লইতে হইবো!! ;;;


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  3. আন্দালিব (৯৬-০২)

    কবিতা নিয়ে অতি চমৎকার পোস্ট! পাঁচাইলাম।

    শেষের কবিতাটা নাম-না জানার কারণে বেশি চমৎকার লাগছে, কৌতূহলীও হচ্ছি। হেলাল হাফিজ বা নির্মলেন্দু নাকি? ভাষাভঙ্গি অনেকটা তেমনই।

    বোদলেয়ার আমার কৈশোরপ্রেম। ক্লেদজ কুসুম বইটা লাইব্রেরি থেকে নিয়েছিলাম ক্লাস টেন-এ। ফেরত দেয়া হয়নি কারণ এস.এস.সি'র সময়ে কলেজ বন্ধ ছিল বলে ফেরত নেয়ার কেউ ছিল না। পরে ইলেভেনে এসেও বইটা আমার কাছেই রয়ে গেল!

    জহির ভাইয়ের কবিতাটাও খুব চমৎকার লাগলো।
    নাহ্‌, ব্লগে এখন কবিতা খুবই ভালো লেখা/পড়া/আলোচনা হইতেছে। আমার লেখা শুরু করতে হবে আবার! ;;;

    জবাব দিন
  4. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    আপনার বইয়ের সংগ্রহ দেখে ইর্ষা হচ্ছে।
    আমারও বই আছে ছোট দুইটা সেল্ফে। একটা কুমিল্লার বাসায়, একটা এখানে ঢাকায়। তবে আমার ইচ্ছে আছে কোনদিন যদি আমার কিছু টাকা হয়, তাহলে বই, সিনেমা আর গানের সংগ্রহ দিয়ে বাসা ভরিয়ে ফেলবো।

    কবিতাগুলি মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। 'সোনালী কাবিন' বা 'কালের কলস' পড়ে যখন এখনকার আল মাহমুদরে দেখি তখন তার জন্যে মায়া লাগে জানেন !

    হেলাল হাফিজের 'যে জলে আগুন জ্বলে' সব সময় টেবিলের উপর থাকে। ঘুমোতে যাবার আগে চোখ বুলাই মাঝে মাঝে।

    পরানের পাখি তুমি একবার সেই কথা কও,
    সময় পাবে না বেশি চতুর্দিক বড়ো টলোমলো
    পরানের পাখি তুমি শেষবার শেষ কথা বলো,
    আমার ভেতরে থেকে আমার জীবন খেয়ে কতোটুকু
    যোগ্য হয়েছো, ভূ-ভাগ কাঁপিয়ে বেসামাল
    কবে পাখি দেবেই উড়াল, দাও,–শিখুক মানুষ।

    কিংবা

    আমি না হয় ভালোবেসেই ভুল করেছি ভুল করেছি,
    নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে
    পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন করেছি, কী আসে যায়?

    এক জীবনে কতোটা আর নষ্ট হবে,
    এক মানবী কতোটা আর কষ্ট দেবে!

    বুদ্ধদেব বসু'র করা শার্ল বোদলেয়ারের অনুবাদটা পড়ে হুমায়ুন আজাদের একটা দারুণ কবিতার কথা মনে পড়লো, নাম 'আমাকে ভালোবাসার পর', 'সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে' বইয়ের কবিতা। পড়া না থাকলে পইড়েন, ভালো লাগবে। বইটা আমার কাছে আছে, এখন খুঁজে পাচ্ছিনা। পেলে লিখে দেবো এখানে।

    জহির ভাইয়ের কবিতাটাও সুন্দর।

    বালিকাকে নিয়ে লেখা অর্ধসমাপ্ত গল্পটা শেষ করে ফেলুন, আর নইলে যেভাবে আছে দিয়ে দিন , পড়ি। 😛


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  5. জিহাদ (৯৯-০৫)

    শওকত ভাইয়ের কিছু কিছু পোস্ট পুরা কাপায় দিয়া যায়। মনে হইতেসে দেরিতে হইলেও কবিতা পড়া শুরু করা উচিত। উৎসাহ পাচ্ছি ব্যাপক। প্রেমে পড়ার তো আর কোন বয়স নাই, তাইনা? ;;;


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
  6. আহ্সান (৮৮-৯৪)

    মাসুম ভাই,
    অসাধারণ...। কবিতা আমি তেমন বুঝিনা, তাই পড়িওনা...। কিন্তু আপনার একটা পোস্টে এতগুলো খন্ড খন্ড কবিতা গোগ্রাসে গিলেছি আজ...। সত্যি ভাইয়া, আপনার এই অসাধারণ লেখার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ...।

    পুনশ্চঃ বালিকার পরিচয় ঝানতে ছায় ঝাতি...। এতদসংক্রান্ত একখানা পুস্ট নামাইয়া ফালান।

    জবাব দিন
  7. রাশেদ (৯৯-০৫)

    শওকত ভাই ফরম ইজ টেম্পোরারী বাট ক্লাস ইজ পারমানেন্ট :boss:
    আজকাল কবিতার পোস্ট দেখে মনে হচ্ছে আবার শুরু হবে নাকি সেই পুরাতন ভালবাসা 🙂


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
  8. তৌফিক (৯৬-০২)

    সৈয়দ মুজতবা আলীর সাথে পরিচয় দেশে বিদেশের ছেঁড়াখুঁড়া একটা কপি দিয়া। মানুষটা ভ্রমণ কাহিনী জোশ লিখতো, তবে সমগ্র পড়ার পর কয়েকটা জায়গায় রিপিটেটিভ মনে হইছে। তবু মুজতবা আলী আমার একজন অল টাইম ফেভারিট। 🙂

    জবাব দিন
  9. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    শওকত ভাই সিরাম লিখা সিরাম :salute: :salute: :salute:


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
      • ফয়েজ (৮৭-৯৩)

        এখানেও গ্রুপিং নাকি ভাইয়া?

        রংপুর কারমাইকেলে ছিল "শব্দকন্ঠ", শব্দকন্ঠের সদস্যরা গুরু মানতো "স্বনন" কে। নিজেরা মুক্তিযুদ্ধের ভার্স্কয করবে কলেজে, গ্যাঞ্জাম লাগলো শিবিরের সংগে।

        আমার ভাই তখন শব্দকন্ঠের সাংগঠনিক সম্পাদক, ছুটিতে কারমাইকেলে গিয়ে মিছিল করেছি, মারামারি, কতকিছু।


        পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

        জবাব দিন
  10. আদনান (১৯৯৪-২০০০)

    বলো আমাকে রহস্যময় মানুষ, কাকে তুমি
    সবচেয়ে ভালবাসো?

    বোদলেয়ারের কবিতার অনুবাদ কোথায় যেন পড়ছিলাম । কবিতা বিমুখ আমার কবিতা সংকলন পোস্ট টা ভাল লাগলো :thumbup:

    জবাব দিন
  11. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    আমাকে ভালোবাসার পর
    -হুমায়ুন আজাদ

    আমাকে ভালোবাসার পর আর কিছুই আগের মতো থাকবে না তোমার
    যেমন হিরোশিমার পর আর কিছুই আগের মতো নেই
    উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত।

    যে কলিংবেল বাজেনি তাকেই মুহুর্মুহু শুনবে বজ্রের মতো বেজে উঠতে
    এবং থরথর করে উঠবে দরোজা জানালা আর তোমার হৃৎপিন্ড।
    পরমুহুর্তেই তোমার ঝনঝন ক'রে ওঠা এলমেলো রক্ত
    ঠান্ডা হয়ে যাবে যেমন একাত্তরে দরোজায় বুটের অদ্ভুত শব্দে
    নিথর স্তব্দ হয়ে যেত ঢাকা শহরের জনগন।

    আমাকে ভালোবাসার পর আর কিছুই আগের মতো থাকবে না তোমার
    রাস্তায় নেমেই দেখবে বিপরীত দিক থেকে আসা প্রতিটি রিকশায়
    ছুটে আসছি আমি আর তোমাকে পেরিয়ে চ'লে যাচ্ছি
    এদিকে সেদিকে। তখন তোমার রক্তে আর কালো চশমায় এতো অন্ধকার
    যেন তুমি ওই চোখে কোনদিন কিছুই দ্যাখো নি।

    আমাকে ভালোবাসার পর তুমি ভুলে যাবে বাস্তব আর অবাস্তব,
    বস্তু আর স্বপ্নের পার্থক্য। সিঁড়ি ভেবে পা রাখবে স্বপ্নের চূড়োতে,
    ঘাস ভেবে দু'পা ছড়িয়ে বসবে অবাস্তবে,
    লাল টুকটুকে ফুল ভেবে খোঁপায় গুঁজবে গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্ন।

    না খোলা শাওয়ারের নিচে বারোই ডিসেম্বর থেকে তুমি অনন্তকাল দাঁড়িয়ে
    থাকবে এই ভেবে যে তোমার চুলে ত্বকে ওষ্ঠে গ্রীবায় অজস্র ধারায়
    ঝরছে বোদলেয়ারের আশ্চর্য মেঘদল।

    তোমার যে ঠোঁটে চুমু খেয়েছিলো উদ্যমপরায়ণ এক প্রাক্তন প্রেমিক
    আমাকে ভালোবাসার পর সেই নষ্ট ঠোঁট খসে প'ড়ে
    সেখানে ফুটবে এক অনিন্দ্য গোলাপ।


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : আন্দালিব (৯৬-০২)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।