স্যালুট তোমাদের! তোমরা জানো তোমরা কারা

এক.
২৫ ফেব্রুয়ারী ২০০৯। অন্ধকার সে অধ্যায়ের পর চার বছর পেরোলো। তদন্ত হল, বহু মানুষের বিচার হল, শাস্তি হল। আমরা কি এখনো জানি পর্দার আড়ালের মূল অপরাধীদের শাস্তি হয়েছে কি না?

দুই.
পিলখানা থেকে গোলাগুলির আওয়াজের খবর ব্লগে এসে আছড়ে পড়েছে ততক্ষণে। আকিরা কুরোসাওয়ার রশোমনের মতো একেক জন একেক দৃষ্টিকোণ থেকে বয়ান দিচ্ছে ঘটনার। খবর মানে বিচ্ছিন্ন তথ্য, ছুটন্ত মানুষের অস্ফুট উক্তি, খবর মানে টিভি চ্যানেলগুলোর ব্রেকিং নিউজ, খবর মানে মুন্নী সাহাদের অনুভুতি বিশ্লেষণ, খবর মানে ডাল-ভাত আর এক শ্রেনীর বুদ্ধিজীবির বিপ্লব তত্ত্বের রঙীন ফানুস। সব কিছুর অন্তরালে তখন ঘটে চলেছে স্বাধীন বাংলাদেশেরই মাটিতে এক গভীর মানব ট্র্যাজেডি।

তিন.
যার যার অবস্থান থেকে প্রত্যেকেই ঘটনা প্রবাহ বুঝবার চেষ্টা করছে। নিজের কিছু করার থাকলে সেটা করার চেষ্টা করছে। সবাই কম বেশী ভূমিকা রেখেছেন ঘটনার নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু আজকে একটি প্লাটফর্মের কথাই বিশেষভাবে স্মরণ করছি। যেটা অনেকেই হয়তো জানেন না, সামান্য একটি ব্লগ প্লাটফর্ম হয়েও সেই ক্রান্তিকালে অসামান্য এক ভূমিকা রেখেছিল ক্যাডেট কলেজ ব্লগ এর তরুণ ছেলেমেয়েরা। পরে আরও স্পষ্টভাবে জানা গেছে – নিহত এবং নির্যাতিতদের তালিকায় সে ব্লগেরই কয়েকজন নিয়মিত প্রিয় ব্লগার, কিংবা তাদেরই অতি আপন বন্ধু কিংবা আত্মীয় জন। কিন্তু এতো কিছুর পরও সেদিন এই ব্লগের ছেলেমেয়েরা পরিচয় দিয়েছিল অসীম ধৈর্য্যের। প্রতি মিনিটের সত্য ঘটনা তুলে ধরছিল, প্রতিটি উত্তেজক প্রচারের সত্যাসত্য যাচাই করছিল তাৎক্ষণিকভাবে, প্রতিটি অপ-প্রচার রুখে দিচ্ছিল সেগুলোকে কোনভাবে দানা বাঁধবার সুযোগ না দিয়েই। এর সবটাই ওরা যান্ত্রিক নিষ্ঠার সাথে করে যাচ্ছিল বিভিন্ন সংস্থায় সে মুহুর্তে নিয়োজিত বন্ধু এবং বড় ভাইবোনদের সাহায্য নিয়ে। নিজের ব্যক্তিগত আবেগ, ক্ষোভ, হারানোর যন্ত্রণা সবকিছু চেপে রেখে, প্রবল দায়িত্ববোধ থেকে আর গভীর দেশপ্রেম থেকে ওরা ওদের কাজ করে যাচ্ছিল – আভ্যন্তরীন এবং উম্মুক্ত সবগুলো প্লাটফর্মেই।

গত চার বছর ধরে লক্ষ করছি। ফেব্রুয়ারীর এই সময়টা এলেই কেমন এক ধরণের নিরবতা যেন নেমে আসে এই ব্লগটিতে। না, পিলখানা নিয়ে সেখানে পোস্ট আসে না, আলোচনা হয় না, তেমন কিন্তু না। কিন্তু কোথায় যেন এক ধরণের নিরবতাও কাজ করে। কেমন যেন প্রার্থনার আবহ নেমে আসে সেখানে। সম্ভবত আমিও এক ধরণের অলিখিত নিরবতার নীতি থেকে কোনদিন বলে উঠতে পারিনি।

আজকে নিরবতা ভঙ্গ করে বলছি – অন্তরের গভীর থেকে স্যালুট তোমাদের, তোমরা জানো তোমরা কারা।

চার.
উত্তাল সে শুরুর প্রহরগুলোতে অত্যন্ত তাড়াহুড়োয় অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে কিছু জরুরী ব্লগ-পোস্ট লিখেছিলাম। কথা দিয়েছিলাম পরের পর্বগুলোও লিখবো, কিন্তু কথা রাখতে পারিনি। চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কেন যেন কখনো পিলখানা নিয়ে আর কিছু লিখতে গেলেই হাত থমকে যেতো। এই পুরোনো পোস্টগুলো পিলখানার সকল শহীদ এবং নির্যাতিতের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি। আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই – তাঁদের রক্ত, ত্যাগ এবং হাহাকারের উপর দাঁড়িয়েই সেদিন রক্ষা পেয়েছিল আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের ভবিষ্যত। গভীর অন্ধকার খাদে নিমজ্জিত হওয়া সেদিন খুব দূরবর্তী কোন সম্ভাবনা ছিল না। আমরা যেন কখনো সে কথা ভুলে না যাই।

– পিলখানা চিন্তাঝড় ৩: http://bit.ly/1hbQ0wy
– পিলখানা চিন্তাঝড় ২: http://bit.ly/1k7qXxN
– পিলখানা চিন্তাঝড় ১: http://bit.ly/1kb0lIR

সেদিন নিজের শ্রেষ্ঠতম সন্তানদের আত্মাহুতির বিনিময়ে বেঁচেছিল বাংলাদেশ। বেঁচেছিল কি? আসলে বেঁচেছি কি আমরা? জানি না।

৬ টি মন্তব্য : “স্যালুট তোমাদের! তোমরা জানো তোমরা কারা”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    রায়হান ভাই ধন্যবাদ।
    ভেবেছিলাম সিসিবি কে ভুলে গেছেন।
    :hatsoff:

    গত কিছুদিন ধরে ভাবছি নওরীন ভাবীকে বলবো সিসিবি তে লিখতে।
    আপনি গ্রীণ সিগন্যাল দিলে ভাবীকে তেল দেয়া শুরু করি।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : মোস্তাফিজ (১৯৮৩-১৯৮৯)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।