বাংলা গু ফে

লাইবেরিয়ার জনগনের ভাষা ইংরেজি। কবে কিভাবে এখানের ছোট বড় অনেকগুলো গোত্রের ভিতর ইংরেজি স্থান করে নিয়েছে তা জানতে হলে বিস্তর ঐতিহাসিক ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে। তবে সাধারণ হিসেবে যেটা বলা যায় সেটা হলো, তুলা চাষের জন্য এখান থেকে যাদেরকে দাস হিসেবে অ্যামেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর তাদের পুনর্বাসনের মাধ্যমেই বোধকরি ইংরেজির আধিপত্য।

আমরা যারা বাংলাদেশ থেকে এসেছি তাদের জন্য এটা একটা আশির্বাদ। আমাদের আলাদা করে কোন ভাষা আয়ত্ত করতে হয়নি। আমাদের সাথে করে কোন ইন্টারপ্রেটর আনতে হয়নি। অতীতে কুয়েত, সুদানসহ অনেক স্থানেই আমাদের সাথে স্থানীয় ভাষাভাষী ইন্টারপ্রেটর গিয়েছিলেন, এখনও যাচ্ছেন। এমন কি আমাদের পাশের দেশ আইভোরী কোস্টেও ভাষা হলো ফ্রেঞ্চ। সেখানেও কমিউনিকেশন করতে বহুত হ্যাপা পোহাতে হয়।

কিন্তু ইংরেজি হয়েও পুরোপুরি হ্যাপা কি এড়ানো গেছে? এখানের ইংরেজিতে আঞ্চলিকতা যুক্ত হয়ে, গ্রামারকে বহুত দূরে ঠেলে দিয়ে এমন একটা জগাখিচুড়ি তৈরী হয়েছে যে তা আর কহতব্য নয়। ওদের নিজেদের মধ্যে কথোপকথন শুনলে অবধারিতভাবে অপরিচিত কোন ভাষা এক্সপেরিয়েন্স করছি বলে মনে হয়। আমরা আমাদের শেখা ইংরেজি এখানে ভালো করে কাজে লাগাতেই পারছিলাম না। শেষতক বডি ল্যাংগুয়েজের সাথে ওরা যেভাবে বলে সেভাবেই বলা শুরু করলাম। এইবার কাজেকর্মে খানিকটা সুবিধা হল।

ওরা বলার সময় পুরো বাক্যকে অন্যায্যভাবে ছোট করে ফেলে। শব্দগুলোও প্রথম সিলেবল বলে আর বাকিটুকু পেটের ভিতরেই রেখে দেয়। কয়েকটা উদাহরণ মনে হয় মন্দ হবে না:

১. বি ব = বিগ বস – অফিসার র‌্যাঙ্কের সবাইকে ওরা ‘বি ব’ বলে।
২. গু ফে = গুড ফ্রেন্ড – ওদের কাছে সব বাংলাদেশীই ‘গু ফে’ – “বাংলা গু ফে”।
৩. মি সি = আমাকে দেখতে দাও – যে কোন অর্গানাইজেশনের গেটে আইডি দেখানোর সময় প্রহরীর মুখে এই কথা শোনা যায়।
৪. মিনোসি = আমি দেখতে পাচ্ছি না।
৫. মি নলেজ = আমি বুঝতে পেরেছি।
৬. সিসি = সিজন। রয়্যাল এয়ার মরক্কোর অফিসে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল যে এটা ট্যুরিস্ট সিজন, তাই প্লেনের ভাড়া বেশি। কাগজে বানান করে না লেখা পর্যন্ত এটা যে ‘সিজন’ তা আমি বুঝতেই পারিনি।
৭. বাহার ব্লক ক্যারি = বাহার ইটের ব্লকটা এখানে নিয়ে আস।
৮. আলীবাবা = চোর। আরব্য রজনীখ্যাত এই শব্দটা কিভাবে যে এদের কথ্য ভাষায় ঢুকল তা আমার কাছে রহস্যময়। ‘থিফ’ শব্দটা এরা বেমালুম হাপিস করে দিয়েছে।
৯. অফোফা = ওয়ান ফর ফাইভ – বাজারে একটা জিনিস পাঁচ ডলারে বিক্রি হচ্ছিল।
১০. চাকো = চার কোল – দৈনন্দিন কাজে বহুল ব্যবহৃত গৃহস্থালী জিনিস।
১১. প্লেন্টি প্লেন্টি = প্রচুর, স্মল স্মল = অল্প। আধিক্য ও স্বল্পতা বোঝাতে সর্বক্ষেত্রে ওরা এই দুটো শব্দই ব্যবহার করে – তা সে মানুষ, গাড়ী, বাড়ি, টাকা, খাবার, গাছ, পাখি, পোকা, রড, সিমেন্ট, বালি, পানি, জাহাজ, উড়োজাহাজ যাই হোক না কেন। অন্য কোন প্রতিশব্দ আমার কানে আসেনি।
১২. হুজদা?= হু ইজ দ্যাট? মোবাইলে অসংখ্য রং নাম্বার কল রিসিভ করে প্রথম কথা যেটা শুনেছি।
১৩. কম কম ইউ কম = তুমি এদিকে আস।
১৪. নো গু নো গু = ঠিক না ঠিক না।
১৫. ক্যাপ্তেন সীইইড (Sayed) = কোথায় যাই? পিতৃপ্রদত্ত আমার নাম নাকি খাঁটি আফ্রিকান নাম 😮 !!

২৬ টি মন্তব্য : “বাংলা গু ফে”

  1. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    লাইবেরিয়ানদের ইংরেজি বলার স্টাইল দেইখা ব্যাপক মজা পাইলাম। আফ্রিকানটা ইংরেজি এতোটা বিকৃত করছে ভাবতেই পারি নাই।
    মনে হইতেছে, প্রথমে আমাদের দেশে অজ্ঞ-মুর্খ মানুষ প্রথম প্রথম ইংরেজি শিখলে যেমনে উচ্চারণ করে ওরাই তেমনে ইংরেজি বলতে শুরু করছিলো। পরে ঐটাই কথ্য ভাষা হয়ে গেছে।
    আরও ছাড়েন।

    জবাব দিন
  2. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    আরে বেটা,কিসু কিসু রেডিও জকিগো বাংলা উচ্চারণ শুনলে মুনে হয় বেসবল ব্যাট দিয়া পিটায় হালুয়া টাইট কইরা দেই আর তুই আইছস ইংলিশ উচ্চারণ নিয়া।খালি নসু না, শালার সব জায়গায় আজকাল এইটা শুরু হইছে-বিকৃত উচ্চারণে বাংলা আর পরতিটা বাক্যে "বাট একচুয়ালি", "ইয়ু নো" , "লাইক অ্যাজ" না কইলে "এস্মার্ট" হওন যায়না এমুন একটা ভাব।অগো কথ্য ভাষা সেই তুলনায় ভাল-অন্তত ওইভাবে "এসমার্ট" হওনের খ্যাতা পুড়েনা-কি কস?

    সায়েদ ভাই এইবার আমি লাইবেরিয়ান কই দেখেন ঠিক হইছে কিনা- "আলাভু" 😀 কন ছাই দেকি এইটার মানে কি,দেখি আন্নে কেমুন লাইবেরিয়ান ভাষা শিকছেন 😀 ভাবতাছি আপ্নের ভাগ্নী-বৌ রে এইটা কমু...আমার ব্যাপক পছন্দ হইছে মামা 😛

    জবাব দিন
  3. তৌফিক (৯৬-০২)

    প্রত্যেক ভাষারই একটা আঞ্চলিকীকরণ করা ভার্সন আছে। আমরা যে ইংরেজি শিখেছি সেইটা হইল গিয়া স্ট্যান্ডার্ড ইংরেজি। আমি যেখানে থাকি, তাদের আঞ্চলিক ইংরেজি আমি কিছুই বুঝি না।

    শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ সায়েদ ভাই।

    জবাব দিন
  4. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)

    @ ছন্নছাড়া, কামরুল, হাসনাইন
    থ্যাংকস সবাইকে।

    @ মুহাম্মদ
    এখানের টুকটাক আরও কিছু বিষয়বস্তু শেয়ার করার ইচ্ছা আছে। দেখি পারি কিনা।

    @ মাসরুফ
    তাড়াতাড়ি "আলাভু" বইলা ফালাও। দেরী করলেই লেট হয়া যাইবো। লাইবেরিয়ানদের ইংরেজির কথা তো শুনলা - দেখি ওদের বলা বাংলা নিয়ে কিছু জানাতে পারি কিনা 😛 ।

    @ তৌফিক,
    তোমাকেও ধন্যবাদ।


    Life is Mad.

    জবাব দিন
  5. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)

    @ ফয়েজ ভাই,
    আমার জন্য খুব অপছন্দনীয় আর কষ্টের একটা ব্যাপার হল ইংরেজিতে বাংলা লেখা :(( । বিজয় কী-বোর্ডে টাইপ শিখে নেয়ার এটা একটা অন্যতম কারণ।

    @ সানাউল্লাহ ভাই,
    আপনার হাসিমুখ আমাকে উৎসাহ দিচ্ছে। থ্যাংকস।

    @ দোস্ত ফৌজিয়ান,
    থ্যাংকস। সিরিজ দিতে পারব কিনা জানি না তবে এখানের ইন্টারেস্টিং ঘটনা আর কাজ কারবারগুলো শেয়ার করার ইচ্ছা আছে 🙂 ।

    @ আহসান ভাই,
    থ্যাংকস। আমার বি ব'কে আপনার সালাম পৌঁছে দিয়েছি 😀 ।


    Life is Mad.

    জবাব দিন
  6. সাবা মিয়া খামসা খামসিন মানে হইল ৭৫৫ …

    ইয়াল্লা, আমি কিন্তু পুরা অন্যটা ভাবছিলাম। 😉 😉 'খামসা খামসি' শুইনাই কিরম উল্টা-পাল্টা দৃশ্য চোখের সামনে ভাইসা উঠসিলো। 😉 😉
    আল্লায় বাছাইছে কাউরে কই নাই। নইলে আমারে সবাই খারাপ ভাবতো। 😉 😉

    জবাব দিন
  7. ইফতেখার (৯৫-০১)

    ভাই, 'ক্যাপ্তেন সীইইড' ... তাও তো ভালো, এইখানে আবার সাইদ (ফার্ষ্ট নেম) রে এই সাদা আর কালা চামড়া গুলা কি যে ডাকে, তারা ই জানে। আমি এস জাতীয় কিছু শুনলেই ঘুরে তাকাতে হয়।

    উধহারন দেই, সাআআ ... দ, সেইড (said) , সাই য়েড, সায়াড, সেয়াড ... (হায় রে, এক sayed এর কতো প্রোনাউনসিয়েশন থাকতে পারে শিখায় দিতেসে।

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।