গ্র্যান্ড বিচ

এই বালুচরের নাম গ্র্যান্ডবিচ

এই বালুচরের নাম গ্র্যান্ডবিচ

গ্র্যন্ড মারাইস শহরের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে ছোট ছোট বালিয়াড়ি, প্রায় তিন কিলোমিটার ধনুকের মত বেকে এসে শহরকে লেক উইনিপেগ থেকে আগলে রেখেছে। সেই বালির প্রাচীরের ওপারে এক চিলতে বালুচর,বালিয়াড়ির প্রায় সমান্তরাল ভাবে দুইদিকে বিস্তৃত। বালুচরের এই বিস্তার নিরবচ্ছিন্ন নয়। মাঝে মধ্যে অনিয়মিত ভাবে উইনিপেগ লেকের পানি বালি সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এই বালুচরের নাম গ্র্যান্ড বিচ! বছরের পর বছর কক্সবাজারে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে পদ্মলোচন শব্দটা মুখে এসে গিয়েছিলো।

এদেশিদেরতো আর তা বলা যায়না, বিশেষত এই বালুচরকে যারা সেরা বিচগুলোর একটি মনে করেন! তাই এডুইনের সাথে আলাপ করতে করতে অন্যান্য অনুষঙ্গগুলি বোঝার চেষ্টা করছিলাম যাতে ওর মত আমিও চোখে মুখে উচ্ছ্বাস ফুটিয়ে বলতে পারি, ওয়ান অব দ্য এক্সাইটিং সামার ডেস্টিনেশনস সিন্স নাইন্টিন টোয়েনি।
সপ্তাহ দুই আগে ডফিনে ওর সাথে দেখা হয়েছিলো। এখানে এসে আমাকে চিনতে পারবে ভাবিনি। পুরনো বন্ধুর মত যখন সে দেখা হতেই হাই ফাইভের জন্য হাত তুলে বলল, বলেছিলাম না, উইদিন নেক্সট টেন ইয়ারস আমি পুরো কানাডার যা কিছু দেখার দেখে ফেলবো! কখন এলে? ইজ’ন্ট ইট অসাম? আমি তখন ওর চোখে মুখে মুগ্ধতার কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।
ওবলল, ওয়েলকাম টু দ্য ব্লু ফ্ল্যাগ ডেস্টিনেশন।

আমার চোখে প্রশ্ন দেখে বলল, শোন সেইফটি,পরিচ্ছন্নতার আর সেবার কথা বিবেচনা করে একেকটি বিচকে ব্লু ফ্ল্যাগ স্ট্যাটাস দেওয়া হয়। ম্যনিটোবা সরকার গ্রান্ডবিচকে নব্বই এর দশকে ব্লু ফ্ল্যাগ স্ট্যাটাস দিয়েছে। এখানকার বালি দেখ কেমন সাদা পাউডারের মত। গায়ে লাগলে অস্বস্তি লাগেনা। বিচের পানিটাও টলটলে। স্পেশাস কার পার্ক, পরিষ্কার শৌচাগার, চমতকার সব গাছ পালা আর পিপিং প্লভারদের জন্যে ভালো বাসা এই বিচকে ব্লু ফ্ল্যাগের গৌরব এনে দিয়েছে।
আমি বললাম শেষেরটা কি বললে?
– কোনটা?ও পিপিং প্লভার? ওটা স্প্যারোর মত এক ধরণের পাখি। এখন বড় জোড় জোড়া পঞ্চাশেক আছে এ জগতে। এই প্রজাতি বাঁচানোর জন্যে এখানে প্রজেক্ট আছে। অনেকে আসেন প্লভার দেখতে।
– ও তাই নাকি!

এসব বলতে বলতে আমি পানিতে নামলাম।
আমার দুই কন্যা তাদের মামাতো বোন শানার সাথে অনেক আগেই অনেক দূর নেমে গিয়েছে। আমাকে দেখেই শ্রেয়া বলল, দ্যাখো বাবা একটু ঢেউও নেই। সারাহ বলল, যে টুকু ঢেউ দেখছো তাহলো মানুষের দাপাদাপির কারণে। বললাম, এটাতো সমুদ্র নয়। স্বাদু পানির লেক।কানাডার বড় লেকগুলির একটি। শানা বলল, ইন কক্সেজবাজার দ্য এয়ার ও’জ সল্টি। ওরা অনেক আগে একবার কক্সেজবাজার গিয়েছিলো। আমি বললাম সে তো কবেকার কথা, তোমার মনে আছে? উত্তরে সে আমার গায়ে পানি ছিটিয়ে বোনদের দিকে ভেসে যেতে থাকলো। সারাহ বলল, একটা ব্যপার ভালো, গায়ে লবন জমেনা। পানিতে হাটতে হাটতে লেকের আরেকটি দিক পছন্দ হলো, পায়ের নিচে কাদা নেই। সাগরের মত অনেক দূর পর্যন্ত হাটা যায়। পানির গভীরতা বাড়েনা। এক পাশে সীট্রাক কিম্বা স্পিড বোট হাকাচ্ছে কিছু কিছু মানুষ। সার্ফিং, ওয়াটার স্কিও চলছে পাশাপাশি।

অনেক বছর আগে একদিন সুন্দর বনে শিবসা নদীর পাড়ে সারা দুপুর ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। হিরন পয়েন্টের কাছে সেই নদী ছিলো সমুদ্রের মত বিশাল। এপার থেকে ওপার দেখা যেতনা। পানিতে দাঁড়িয়ে দূরে পানিতে মিশে যাওয়া আকাশ দেখতে দেখতে সে কথা মনে পড়ে গেল। উইনিপেগ লেকও কম বড় নয়। তুষারযুগের শেষদিকে ৪০০ কিমি দীর্ঘ এই লেকের উৎপত্তি হয়েছিলো প্রাগৈতিহাসিক গ্লেসিয়াল লেক এঘাসিজ থেকে। বাংলাদেশের ছয় ভাগের এক ভাগ আয়তনের এই লেকে সমর্পিত হয়েছে প্রায় আধা ডজন নদী, আর এই লেক থেকে জন্ম নিয়ে একটিমাত্র নদী সাড়ে ছয়শ’ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে পতিত হয়েছে হাডসন বে’তে।

বালির ঢিবির উপর চাদর বিছিয়ে, চেয়ার পেতে দীপারা খাবার দাবার রেডি করে ফেলেছিল। ওখান থেকে বালুচর, লেক, বালিয়াড়ির উপর ঝুলে থাকা গাছের ডাল পালা আর দূরের পানিতে ঝুঁকে পড়া মেঘ অপার্থিব মনে হচ্ছিল। এখানে বসেই গ্র্যান্ড বিচকে ভালো লেগে গেল।

শুনলাম ১৯২০ সালে রেল লাইন বসার আগ পর্যন্ত এদিকে মানুষের খুব একটা আনাগোনা ছিলোনা, এখনও যে খুব বেশি আছে তা নয়। (গ্র্যান্ডম্যারাইসের স্থায়ী জনসংখ্যা আড়াইশ’র কাছাকাছি)। রেল লাইন বসার পর এর পরিচিতি বেড়েছে। দুই দু’টি প্রভিন্সিয়াল পার্ক হয়েছে এখানে। মাত্র ৪ ডলার পার্কিং ফি দিয়ে এখানে দিন কাটিয়ে যান রোদ পিপাসুরা।শীতের দিনেও ভীড় কমেনা। স্কির মৌসুম শুরু হতেই দূর দূরান্ত থেকে স্কি করতে ছুটে আসে কয়েক হাজার মানুষ।

বিকেল হতে না হতেই বাচ্চারা পানিতে ভিজে, বালিতে দৌড়িয়ে, স্যন্ড ক্যসেল বানিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ফিরে আসার সময় মনে হল প্রকৃতি তার নিজস্ব বিবেচনায় উপহার বিলি বন্টন করে। সেই দান যত সামান্যই হোক সঠিক পরিকল্পনা, প্রচেষ্টা আর নিষ্ঠায় মানুষ তাকে অসামান্য করে তুলতে পারে।

৩,০৮০ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “গ্র্যান্ড বিচ”

  1. মোস্তফা (১৯৮০-১৯৮৬)

    ফেসবুকে আগেই পড়েছিলাম, তখন ভিডিওটি দেখা হয় নি। এখানে ভিডিও দেখা হল।

    প্রকৃতি তার নিজস্ব বিবেচনায় উপহার বিলি বন্টন করে। সেই দান যত সামান্যই হোক সঠিক পরিকল্পনা, প্রচেষ্টা আর নিষ্ঠায় মানুষ তাকে অসামান্য করে তুলতে পারে।

    তবে প্রকৃতি আবার বেজায় স্বাধীনচেতা ও গোঁয়ার। দুঃশাসনের শোধ নিতে কুণ্ঠিত হয় না কখনও।


    দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হতেছে হলুদ

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : সাইদুল (৭৬-৮২)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।