অচেনা চীনে-সদাই পাতি ২

অচেনা চীনে-সদাই পাতি ১

একদিন ভেনকে বলে আগেই চলে এসেছিলাম হোটেলে, আসলে ডাইজেষ্টার খোলা জোড়া করতে করতে এক ঘেয়েমিতে পেয়ে বসেছিল। কিন্ত হোটেল রুমে পৌছাতে না পৌছাতেই কারেন্ট চলে গেল। কারেন্ট না থাকলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে থাকার মত বিড়ম্বনা আর নেই। সকালে অনেক জ্ঞান দিয়েছে ভেন। ‘চীন এখন বিদ্যুতে স্বয়ং সম্পূর্ণ। বাংলাদেশের মত আর যে সব দেশে বিদ্যুৎ সমস্যা প্রকট তাদের জন্যেই পুক্সিন কোম্পানী তৈরি করছে বায়োডাইজেষ্টার’। চীনে এখন বিদ্যুৎ বিভ্রাট নেই বললেই চলে।তার পরে ঘরে ফিরেই গরমে দম আটকে আসার জোগাড়। রিসেপশনে ফোন দিয়ে লাভ নেই জেনেও ফোন করলাম। তারা যথারীতি আমার কথার উত্তর দিতে গলদঘর্ম হয়ে গেল ইংরেজি জড়তার কারনে। সব রাগ গিয়ে পড়লো ভেনের উপর। তাকে ফোন করে দুরবস্থার কথা জানালাম। ভেন কিছুক্ষণ পর জানালো, ‘এটি তেমন কিছু নয় পিংডি ষ্ট্রীটের লাইনে আজকে মেইন্টেনেন্স হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর কারেন্ট চলে আসবে’। আরও আধা ঘণ্টা রুমে সিদ্ধ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম রুম থেকে। লিফটও বন্ধ কাজেই নামতে হল সিড়ি দিয়ে।

হোটেলের কাছে হকারস মার্কেটের মত একটা মার্কেট আছে ফুটপাতে। ফুটপাত ঠিক নয়, দুই সারি দালানের মাঝখানে এক ফালি লম্বা মাঠের মত একটি জায়গায় পাশাপাশি প্রায় পচিশটি চালাঘর। সেখানে পশরা সাজিয়ে বসে জনা পচিশেক দোকানি। চুলের ফিতে, মানিব্যাগ থেকে শুরু করে জুতা, জামা খাতা পেন্সিল সবই পাওয়া যায় এখানে। দিনের বেলায় দোকান গুলি প্রায় ফাঁকা থাকে। ভীড় বাড়তে থাকে বিকেলে। এখানে একটি জুতো পছন্দ হয়ে গেল। সব জুতোর প্রাইস ট্যাগ আছে শুধু ওই জুতোরই গা খালি। মানে প্রাইস ট্যাগ নেই। অনেক রকম চেষ্টা করেও যখন দাম জানতে পারলাম না। দোকানের ক্যাল্কুলেটার নিয়ে ইশারায় দাম জানাতে বললাম। দোকানি জানালো ২০ ইউয়ান মানে ২৪০ টাকা। এরকম চাইনিজ জুতো বাংলাদেশে আটশো টাকার কম নয়। গোল বাঁধলো সাইজ নিয়ে। অনেক কসরত করেও বুঝাতে পারলাম না মাপের ব্যপারটা। ইতমধ্যে আরও দুতিন দোকানের বিক্রেতারা হাজির হয়েছে। তারা প্রথমে আমাকে বুঝাতে চাইল জুতোটি মেয়েদের। আমি তখন ইংরেজি বলা বাদ দিয়ে দিয়েছি। এদের সাথে ইংরেজি বলা আর না বলা সমান। স্পষ্ট বাংলায় বললাম, ‘তোমাদের এখানে বাজার সদাই আমার কম্ম নয়’। ইতমধ্যে সন্ধ্যা নেমে গিয়েছে। আসে পাশে স্ট্রীট ল্যাম্প গুলো জ্বলতে শুরু করেছে। এতক্ষণে কারেন্ট এসে গিয়েছে ভেবে হোটেলে ফিরে দেখি কারন্ট এখনও আসেনি। অন্ধকারের মধ্যে লাল পোষাক পরা দুই রিসেপশনিস্ট মহিলা ফুটে আছে ইমারজন্সি লাইটের আলোয়। গায়ে ঘাম নিয়ে নিচেয় দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে হলনা। সিড়ি বেয়ে আট তলায় ঊঠতে থাকলাম।

বাজার

বাজার

আলো না থাকায়, ঘামে ভেজা শরীরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাংলো মোবাইলের শব্দে। ওপারে ভেন। ঘুম জড়ানো কন্ঠ শুনেই বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়েছিলে? ডিস্টার্ব করলাম?’ বললাম, ‘না কারেন্ট ছিল না। অন্ধকারে বসে থাকতে ভাল লাগছিলনা, আর আবার যে সিড়ি ভেঙ্গে নামবো সে সাহস ও পাচ্ছিলাম না।প্রায় ৫ ঘন্টা কারেন্ট বিহীন থকার কথা ঢাকায়ও চিন্তা করা যায় না’। এরপর তাকে জানালাম জুতোর দোকানের বিড়ম্বনার কথা। গভীর মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনলো ভেন। তার পর বললো, ‘রাত এখনও তেমন কিছু হয়নি। দোকান পাট খোলা আছে। তুমি চাইলে সঙ্গ দিতে পারি শপিংএ’। সেই রাতে আর দোকানে যাবার ইচ্ছে হলনা । পরদিন অফিসে ভেনের কাছে জেনে নিলাম দরদাম করার পদ্ধতি।ভেন একটা কাগজে কিছু দরকারি কথা বার্তা ইংরেজি উচ্চারণে লিখে দিল।

ওঃ মানে আমি, তাঃ সে। নিঃ তুমি।ঈ দে এনঃ অল্প স্বল্প।
আমি বললাম, ‘একদিনে তুমি আমাকে পুরো চাইনিজ শেখাতে পারবেনা। বরং হাট বাজারে যা লাগবে সে গুলো লিখ’।
আচ্ছা বলে আবার লিখতে শুরু করলো সে। এবারের লেখা দেখে মনে হল দরাদরিতে কাজে লাগতেও পারে।
যেগে তোশাওচেন =দাম কত?
টাই ডো = অনেক বেশি
যায় বিয়ান দিইনার বা= ডিস কাউন্ট?
হাঊ= ওকে
যু শি শা মা = এইটা কি?
শান মা= কী
ও শিং শি ফন= আমি ভাত খেতে চাই।
ইয়াওঃ= চাই
বু ইয়াও= চাই না
সি সে বু ইয়াও= ধন্যবাদ, চাই না।
মাইঃ কিনবো
নেই গা= ওই টা
যো গা = এই টা
ও ছিং বু দং =আমি বুঝি না,
দুই বো কি =আমি দুঃখিত

এত গুলি বাক্য থেকে বেছে বেছে দুটি নাত্র মুখস্ত করলাম। ‘তো শাওচেন’ (দাম কত?) আর টাই ডো (অনেক বেশি)। ‘যায় বিয়ান দিনার’ বা ডিস কাঊন্ট টা মনে রাখা অনেক কঠিন হয়ে গেল। তারপরও রুমে ফিরে গিয়ে আঊড়াতে থাকলাম বাক্য গুলি। নিজের কানেই উচ্চারণ গুলো জুতসই মনে হল না। কৈশোরে আমার এক বন্ধু এক স্প্যানিস মহিলাকে প্রেম নিবেদনের জন্যে আমি তোমাকে ভাল বাসির স্প্যানিস শিখেছিল (জো তে কিয়েরো)। যার জন্যে শিখেছিল তাকে আর বলা হয় নি। উচ্চারণের আড়ষ্টতায় তার কনফিডেন্স লেভেল এত নিচে কমে গিয়েছিল যে ‘জো তে কিয়েরো’ বলে জুতো খাবার অবস্থা।

সে যাই হোক প্রায় সারা বিকেল তো শাও চেন মুখস্ত করার পর দোকানে গিয়ে জিয়ে যখন বললাম সেলস গার্ল নির্বাক হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ততক্ষণে আমি ঘামতে শুরু করেছি। না জেনে আবার ঊল্টা পাল্টা কিছু বলে ফেললাম না কী। পকেট থেকে কাগজ বের করে যখন দেখলাম, না অভব্য কিছু বলিনি তখন সমস্ত আত্মবিশ্বাস জড় করে আবার বললাম তোশাওচেন?

ফুটপাথেও প্রাইসট্যাগ

ফুটপাথেও প্রাইসট্যাগ

এবার মেয়েটি হাসতে হাসতে জিগ্যেস করল ‘শান মা?’ আবার বিপদে পড়লাম। কাগজ খুলে দেখলাম শান মা মানে কী। বুঝলাম কিসের দাম জিগ্যেস করছি সেটাই বলা হয়নি। বাংলাদেশের পটভূমিতে একটি মেয়েকে শুধু শুধু দাম কত জিজ্ঞাস করার ভাবার্থ ভেবে ঘাম আরও বেড়ে গেল। অনেক গুলি ঘড়ি ছিল মেয়েটার পাশের একটা শোকেসে কোন মতে সেদিকে দেখিয়ে বললাম নেই গা (ওইটা)। সেলস গার্ল নিসন্দেহে মহিয়সী বালিকা। আমার ভাসা ভাসা ভাষাজ্ঞানের বিষয়টি তার কাছে আর অকপট রইল না।আমার ঘর্মাক্ত কলেবর দেখে দোকানের ছোট্ট টেবিল ফ্যানটি সে আমার দিকে ঘুরিয়ে দিল। তার পর একটি টিস্যু দিয়ে আমার কপালের ঘাম মুছিয়ে দিতে দিতে বলল ‘আই নো ইংরিশ। ইউ মে সে ইন ইংরিশ’।

এত সেবা যত্নের পর ওর দোকান থেকে কিছু কেনা আমার প্রায় অব্লিগেশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘড়ি কেনার আমার ইচ্ছে ছিল না। এক জোড়া জুতো পছন্দ করলাম। ফাপরে পড়তে হল দাম আর মাপ নিয়ে। দামের সমস্যা মিটলো ক্যালকুলেটরে। কিন্ত মাপের ব্যাপারটা বুঝাতে অনেক কাঠ খড় পুড়াতে হল।

৯ টি মন্তব্য : “অচেনা চীনে-সদাই পাতি ২”

  1. মোস্তফা (১৯৮০-১৯৮৬)
    ও শিং শি ফন= আমি ভাত খেতে চাই।

    আমি হলে এটা সবার আগে মুখস্থ করতাম।

    এত গুলি বাক্য থেকে বেছে বেছে দুটি নাত্র মুখস্ত করলাম। ‘তো শাওচেন’ (দাম কত?) আর টাই ডো (অনেক বেশি)।

    এটা পড়ার পর যে দৃশ্যটা মনে এলো, তা হলো, দু'পাশে অসংখ্য পসরা মেলে রাখা সারি সারি দোকানের মাঝ দিয়ে আপনি হন হন করে এগিয়ে যাচ্ছেন ক্রমাগত, একনাগাড়ে ওই বাক্যদুটো উচ্চারণ করতে করতে। একের পর এক পেরিয়ে যাচ্ছেন দৃশ্যপট, আর অতিক্রান্ত দোকানের প্রতিটি থেকে সারি সারি বিস্ময়াভিভূত চোখ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে বিস্ময়াহত হয়ে।

    এবার মেয়েটি হাসতে হাসতে জিগ্যেস করল ‘শান মা?’ আবার বিপদে পড়লাম। কাগজ খুলে দেখলাম শান মা মানে কী। বুঝলাম কিসের দাম জিগ্যেস করছি সেটাই বলা হয়নি।

    একদম কফির চামচে মেপে যথোপযুক্ত পরিমান চিনি মেশানো।

    বাংলাদেশের পটভূমিতে একটি মেয়েকে শুধু শুধু দাম কত জিজ্ঞাস করার ভাবার্থ ভেবে ঘাম আরও বেড়ে গেল।

    রসবোধকে যদি ভুমিকম্পের সাথে তুলনা করি, তবে বোধকরি এটি প্রথম কম্পন অনুসরণ করে আসা দ্বিতীয় কম্পন। কে না জানে, মাত্রার পরিমাপে দ্বিতীয়টিরই কাঁপাবার শক্তি বেশী।

    ‘আই নো ইংরিশ। ইউ মে সে ইন ইংরিশ’।

    এমন নিখুঁত সংলাপ তুলে আনাই আপনার লেখায় স্বকীয়তার একটা বড় দিক। (সম্পাদিত) (সম্পাদিত)


    দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হতেছে হলুদ

    জবাব দিন
  2. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    "এদের সাথে ইংরেজি বলা আর না বলা সমান। স্পষ্ট বাংলায় বললাম..." - এ ধরণের পরিস্থিতিতে সব বাদ দিয়ে নিজ মাতৃভাষায় কথা বলাই শ্রেয়ঃ। এতে অকৃ্ত্রিম ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি অনেক কিছু বুঝে নিতে পারে।
    "অন্ধকারের মধ্যে লাল পোষাক পরা দুই রিসেপশনিস্ট মহিলা ফুটে আছে ইমারজন্সি লাইটের আলোয়" - জ্যোৎস্নালোকে পদ্মফুল ফোটা দেখার মত বর্ণনা, খুবই চমৎকার হয়েছে। জেনুইন রাইটার এর লেখা।
    "পকেট থেকে কাগজ বের করে যখন দেখলাম, না অভব্য কিছু বলিনি তখন সমস্ত আত্মবিশ্বাস জড় করে আবার বললাম তোশাওচেন?" - অবস্থাটা খুব সহজেই কল্পনা করতে পারছি।
    "বাংলাদেশের পটভূমিতে একটি মেয়েকে শুধু শুধু দাম কত জিজ্ঞাস করার ভাবার্থ ভেবে ঘাম আরও বেড়ে গেল" - 😀 😀
    সর্বোপরি, "এত সেবা যত্নের" ব্যবস্থাটা বেশ স্বস্তিকর মনে হলো।
    চমৎকার লেখা। তুমি তোমার দু'চোখ দিয়ে যাই দেখ না কেন, কী বোর্ড দিয়ে তা এক সম্মোহনী যাদু হয়ে বেড়িয়ে আসে। খুবই মনোমুগ্ধকর।

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : লুৎফুল (৭৮-৮৪)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।