সিডনীর ইফতারের গল্প

এক

গেল বছরের মত এবারও আমেরিকাতে খুব কড়া রোজা চলছে। সতের ঘণ্টার দীর্ঘ দিনে বিকাল চারটার পর মানুষের মুখে আর কথা সরেনা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়িতে বসে, খেজুর খুরমা রুহ আফজার রোশনাইতে নিমগ্ন মানুষেরা কী করে দরিদ্র মানুষের দুঃখ কষ্ট বুঝবে সেটি অবশ্য আমার মাথায় ঢোকেনা। সিডনীতে এখন শীতকাল; দিনগুলিও ছোট। বাংলাদেশের আষাঢ় মাসের মত দেখি ঝুম বৃষ্টি হলো এই শীতে। আমেরিকার রোজাটা যদি হয় লাল আটার লোফের সাথে শুকনো মোৎসারেলা তবে সিডনীর রোজাটা হবে নিতান্তই ডাল ভাত! বিকেল পাঁচটার আগেই আমাদের ইফতার শুরু হয়ে যায়।

দুই

সিডনীর অঘোষিত মিনি বাংলাদেশ হলো লাকেম্বা। লাকেম্বায় দেশের সবকিছুই নাকি পাওয়া যায়; এখানে সবাই লাকেম্বার ইফতারের গল্প বলে হামেশাই। এর মাঝে কয়েকবার ওদের জিলাপী খেয়েছিলাম কিন্তু আতিক ওদের ইফতারের পুরো আয়োজনটি দেখাতে চাইলো। আমাদের বাড়ি থেকে লাকেম্বা প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিটের ড্রাইভ, শনিবারের বিকেলবেলা আমরা যাত্রা শুরু করি। ভেন্যুতে পৌঁছুতে না পৌঁছুতেই এসসিসির শাহেদের চিল চিৎকার…এমজিসিসিও চইলা আসছে দেখি! গাড়ি থেকে নামতে না নামতেই একঝাঁক এক্স ক্যাডেটদের সাথে দেখা হয়ে গেল। নওশীন এসে জড়িয়ে ধরলো আদর করে। আরসিসির রাসেল, বিসিসির শিবলী, এমজিসিসির শায়লাসহ আরো কয়েকজনের সাথে দেখা হলো। হাতে সময় নেই আড্ডাবাজি করার তাই প্রাথমিক কুশল বিনিময় করেই আহারের সন্ধানে বেড়িয়ে পরি।

লাকেম্বার ইফতার

লাকেম্বার ইফতার

লাকেম্বার ইফতার

লাকেম্বার ইফতার

তিন

মাথায় গোল একখানা টুপি লাগিয়ে গ্যাসচুল্লিতে জিলাপী ভাজছিল বছর পঁচিশের একটি ছেলে। আধা মিনিট অন্তর অন্তর সে জিলাপীইইই গরমাগরম জিলাপীইইই বলে হাঁক পাড়ছিল। অনেক আন্টি আর ভাবীগোত্রীয়া মেয়েরাও দেখি পিছিয়ে নেই সেখানে; তাদের কেউ কেউ আলুর চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু অথবা ডালপুরি বিক্রি করছিল। লাকেম্বার পুরো বাংগালী পাড়া জুড়েই দেশী খাবারের দোকানপাট। বাংগালী চাঁদের দেশে গেলেও তার নিজের দেশের কলাটা মূলোটার পাত্তা লাগায়। হিজাবওয়ালি এক খালাম্মাকে দেখি ছোটখাট একটা গ্রোসারী চালাচ্ছেন। তাঁকে সালাম দিয়ে বলি, খালাম্মা টিস্যুর বাকসো আছে নাকি? পথে যেতে যেতে ইফতার খেতে হবে! দেশে থাকলে হয়তো খালাম্মা এই বয়েসে ফুলতোলা দস্তরখান বিছিয়ে ছেলের বৌয়ের হাতে মাগুর মাছের ঝোলভাত খেতেন অথচ এখানে তিনি একাই দাপটের সাথে কাজ করছেন। ডিগনিটি বলে যে ব্যাপারটি আছে সেটির সাথে আমাদের অনেকের পরিচয় নাই। আত্মনির্ভরশীলতার শিক্ষা থেকেই ডিগনিটির ব্যাপারটি চলে আসে। আমরা এদিক ওদিক ঘুরেফিরে সনাতন ইফতারি কিনি। বিশাল হাঁড়িতে হালিম আর তেহারি নিয়ে যে ছেলেটি পসরা সাজিয়েছিল তার টেবিলের চারপাশে মানুষের ভীড়ে সামনে আগানো দায়! আমাদের হাতে সময় ছিল কম তাই ঝটিতি কাজ সেরে নিই। ডাউনটাউন সিডনীতে যাবো আজ আলোর ঝর্ণাধারা দেখতে!

চার

সিডনীর মিঠেমিঠে ঠান্ডায় পুরো শহর যখন ঝিমোতে থাকে তখন সুর আর আলোর ঝর্ণাধারায় নগরবাসীকে সুরভিত করে ভিভিড সিডনী। ভিভিড সিডনী বলতে আমি বুঝতাম রংবাহারী অপেরা হাউসের আলোর মিছিল কিন্তু আলো ছাড়াও ভিভিড সিডনীর কত যে রূপ আছে! ভিভিড সিডনীর তিনটে ভাগ; রংবাহারী আলোকসজ্জা, রূপময়ী সংগীত আর রকমারি ভাবনার সম্মিলন (ভিভিড লাইট, ভিভিড মিউজিক, ভিভিড আইডিয়া)! আতিক কয়েকদিন ধরেই লাইট শো দেখতে যাবার জন্য ঝুলোঝুলি করছিল। রোজার সন্ধ্যায় আমার কোথাও যেতে মন চায় না; ইফতারের পর কফির পেয়ালা হাতে আলসেমিতে পেয়ে বসে। আজ যুতসই কোন অজুহাত খুঁজে পাওয়া যায়নি তাই শুকনো মুখেই রওনা করেছি অবশেষে। শহরে পৌঁছুতেই নজরকাড়া উৎসবমুখরতা দেখে মন ভাল হয়ে যায়। গাড়ি থেকে নামতেই ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা লাগে চোখে মুখে। চেনা অপেরা হাউসকে পুরো অচেনা মনেহয়! এটি কোন সিনেমার দৃশ্যকাব্য নয়তো? আমি মুগ্ধ বিষ্ময়ে আলো আর শব্দের যৌথ কারিগরি দেখি। প্রায় সবার হাতের ক্যামেরা ঝলকায় ক্রমাগত।

ভিভিড সিডনী

ভিভিড সিডনী


ভিভিড আইডিয়া

ভিভিড আইডিয়া

ডার্লিং হারবারে এসে দেখি ফায়ারওয়ার্ক শুরু হয়ে গেছে। কুড়ি মিনিট পর পর এক একটা শো। আমরা হট কোকো হাতে এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে আলোর খেলা দেখি। ওয়াটার ট্যাক্সি নিয়ে কেউ কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে। চারদিকে সুখী সুখী সব মানুষের মৃদু কোলাহল।

ভিভিড সিডনী

ভিভিড সিডনী

পাঁচ

প্রতি বছর ফেরদৌস ভাইয়া তাঁর মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে সবাইকে ইফতারের নেমন্তন্ন করেন। মা যেদিন মারা যান সেদিন ভাইয়ার একমাত্র কন্যার জন্ম হয়। এক মায়ের তিরোধানের পর ঘর আলো করে নতুন মা আসে; মায়ের নামে কন্যার নামকরণ হয় রুবি। ভাইয়ার বাড়ি গেলে রুবি এসে ভাব করবে পাশে বসে; ডু ইউ নো হাউ টু মেক এন এয়ারপ্লেন আন্টি বলে নিজেই কাগজের উড়োজাহাজ বানিয়ে নিয়ে আসে। আমরা দুজন মিলে ছুটোছুটি করে প্লেন উড়াই লিভিং রুমে বসে।

রুবির সাথে

রুবির সাথে

ছয়

রাব্বী আর পারভেজ এসেছিল আজ। টুম্পা টাটকা কমলালেবুর কেক বানিয়ে নিয়ে এসেছে আমাদের জন্য। আমার বরটি ক্যাডেটবৎসল মানুষ; ছোট বড় সবার সাথেই তার হৃদ্যতা। উইকেন্ড এলেই একে ওকে ডাকাডাকি করে আতিক। আমারও বেশ লাগে গল্প করতে। ছানাপোনার বয়েসী ক্যাডেটদের ইফতারের নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম আমাদের স্বপ্ন বিলাসে। সবুজ, নাহিদ, তারেক আর তানভিয়া এসেছিল রিভারউড থেকে । এখানে যারা পরিবার পরিজন নিয়ে থাকেন সপ্তাহান্তে তাদের নেমন্তন্ন থাকে এখানে সেখানে। ছাত্ররা পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট টাইম জব করেন বলে অনেক সময়ে তাদের সব বাড়ি যাওয়া হয়না। গতকালের অতিথিরা সবাই ২০০৪ এ বেড়িয়েছে কলেজ থেকে। ইফতারে দেশীয় সব ভাজাভুজি করেছিলাম, পেঁয়াজু, বেগুনি, পাকোরা ইত্যাদি ইত্যাদি। লাকেম্বা থেকে আতিক জিলাপী নিয়ে এলো গরমাগরম। আটচল্লিশ ডিগ্রি ফারেনহাইটেই সে দেখি শীতে জবুথবু হয়ে আছে। ধুমায়িত চায়ের কাপে আমাদের আড্ডা শুরু হলো। হালের ব্রেক্সিট থেকে বৃহষ্পতিবারের স্পেশাল ডিনার, বার্বারকে ঘুষ দিয়ে নিজের মাথাটি বাটিছাঁট হেয়ার ফ্যাশন থেকে বাঁচানো, অথবা কলেজ পালানোর গল্প চললো একটানা। গল্প করতে করতেই আতিক টেবিলে ঝালঝাল গরুর গোস্তের সাথে ভুনা খিচুড়ি সার্ভ করে, সাথে হাঁস, মুরগির ঝোলও। শেষপাতে আমার স্পেশাল ফিরনির সাথে কলেজের পুডিং এর গল্প চলে আসে অবধারিতভাবেই। আঠাস বছর পার হলো কলেজ থেকে বেরিয়েছি অথচ আমাদের ছয় বছরের গল্প ফুরোয় না আর!

তারেক, সবুজ আর আতিকের সাথে

তারেক, সবুজ আর আতিকের সাথে

৪,৩৭৬ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “সিডনীর ইফতারের গল্প”

  1. আসলেই আপা, আমাদের ছয় বছরের গল্প আর ফুরোতেই চায়না। যে কোন একজন ক্যাডেট পাশে থাকলেই সময় টা অন্যরকম হয়ে যায়। নিজেকে ফিরে পাই সেই পুরনো কৈশোরে। বয়সের ভার গুলো কোথা দিয়ে পালায় বুঝতেই পারিনা। এ এক অদ্ভুত বন্ধন। যেই ক্যাডেট ছেলেটির সাথে মাত্রই পরিচয় হল সেও যেন কত কালের চেনা।ওর গল্প গুলোও যে আমারই মত।

    জবাব দিন
  2. রোজা রেখে দারুণ দারুণ সব খাবারের নাম এবং মুগ্ধকর সব দৃশ্যের বর্ণনা নিয়ে লেখাটা এখনই পড়ে খুব লোভ হচ্ছে। অনেক ভালো লেগেছে। লেখকের লেখনী অসাধারণ। মনেহয় লেখকের সংগেই ঘুরে এলাম সিডনি শহর। :boss: :boss:

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।