ছন্দে আনন্দভ্রমণ ২

ছন্দে আনন্দভ্রমণ ১ (ভূমিকা ও মাত্রাবৃত্তের আলোচনা)

ছেলেবেলায় সারাক্ষণ আমার মুগ্ধতাকে ছুঁয়ে ছিল দুটি বই, ‘নন্দিত নরকে’ আর ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। যখন রূম ইন্সপেকশন হতো আমার সেলফে রাখা পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি শোভা পেত ওই বই দু’খানাও। সে বয়সে ‘নন্দিত নরকে’-র প্রচ্ছদ আমার চিত্তে কিছুটা কিশোরসুলভ লজ্জ্বার লাল ছিটিয়ে দিত বলেই হয়তো সেটিকে ঢেকে রাখতাম ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’-র খোলসে। আমার মতে, ওই দুই গুণীজন শেষাবধি যত লেখা লিখে গেছেন সেগুলোর শ্রেষ্ঠের আশ্রয় এই দুটি বই। যাহোক সে বিবেচনা অন্যদিনের জন্য তোলা রইল।

তারুণ্যে কিম্বা তারুণ্য পেরিয়ে একটা কিছু আবিষ্কারের নেশায় শামসুর রাহমানের ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ নিয়ে আমার আরো বহুবার বসা হয়েছিল। সেইসব নিভৃত পাঠের সূত্র ধরে একবার অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, কবিতাগ্রন্থটির মোট ৩৯ টি কবিতার মধ্যে অক্ষরবৃত্তে ২৬ টি, মাত্রাবৃত্তে ১০ টি আর গদ্যরীতিতে ৩ টি কবিতা লেখা। বহুদিন আমি এইসব কবিতাকে শুধুই মুক্তছন্দের গদ্যকবিতা ভেবে ভ্রমের ভেতরে বিচরণ করেছি। হঠাৎ যেন আমার চোখ খুলে গেল, দৃষ্টি হলো সম্প্রসারিত। আপাত গদ্য কবিতার শরীর জুড়ে বিস্ময়াভিভূত হয়ে মাত্রাবৃত্তের মোহিনী নাচের মুদ্রা আবিষ্কার করলাম। আসুন তার কিছুটা নমুনা দেখি,


শুধু দু’ টুকরো/ শুকনো রুটির/ নিরিবিলি ভোজ/৬+৬+৬
অথবা প্রখর/ ধু-ধু পিপাসার/ আঁজলা ভরানো/ পানীয়ের খোঁজ/৬+৬+৬+৬
শান্ত সোনালি/ আল্পনাময়/ অপরাহ্ণের/ কাছে এসে রোজ/৬+৬+৬+৬
চাইনি তো আমি ৷/ দৈনন্দিন/ পৃথিবীর পথে/ চাইনি শুধুই/৬+৬+৬+৬
শুকনো রুটির/ টক স্বাদ আর/ তৃষ্ণার জল৷/৬+৬+৬
(শামসুর রাহমান, ‘রূপালি স্নান’, প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

পূর্ণ পর্বের ৬ চালের মাত্রাবৃত্ত।


জানি না কী করে/ কার মমতার/ মতো/৬+৬+২
শান্ত শুভ্র/ ভোর এসে ঝরে/৬+৬
জানি না কী করে/ এত নীল হয়/ রোজ/৬+৬+২
ধ্রুপদী আকাশ।/ ঘাসে এত রঙ,/ রোদে/৬+৬+২
জীবনের সাড়া,/ বিকেল হাওয়ায়/ এত নির্জন/ ভাষা/৬+৬+৬+২
জানলো না কেউ/ তবু কি করে যে/ বেঁচে আছে তারা!/ ৬+৬+৬
(শামসুর রাহমান, ‘মনে মনে’, প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

লক্ষ্য করুন, মাত্রাবৃত্তের ছয়ের চাল, তবে ভেতরে ভেতরে সুবিধে মত জিরিয়ে নেবার জন্যে ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ২ মাত্রার অতি-পর্ব (অসম্পূর্ণ পর্ব)। চালটা এরকম, ৬+৬+২, ৬+৬, ৬+৬+২, ৬+৬+২, ৬+৬+৬+২, ৬+৬+৬


বারো মাস তুমি/ ক্ষ’য়ে গ’লে ঝরে/৬+৬
যা কিছু পেয়েছ/ বর্ষার মেঘে/ বাতাসের স্বরে/৬+৬+৬
দিগন্ত কাঁপা/ রোদের সাড়ায়/৬+৬
শত বছরের/ কবির চোখের,/ প্রাণের তারায়/৬+৬+৬
নিত্য নিজেকে/ বলি বারবার/৬+৬
বিনিময়ে তার/৬+৬
দু’দিনের যত/ সাধারণ সুখ/৬+৬
ছাড়ো হেসে খেলে,/ শুধু এক বুক/৬+৬
বেদনার রেণু/ ছড়িয়ে তোমার/ গানের ভাষায়/৬+৬+৬
প্রগাঢ় অনেক/ অজানা আশায়/৬+৬
ভুলে নিয়ে ছেঁড়া/ হৃদয়ের ক্ষত/৬+৬
যেই ঝড় আজো/ না চাইতে আসে/৬+৬
মুছে ফেলে তাকে/ মেনে নাও এই/ বন্ধ্যা আকাশে/৬+৬+৬
তারা ফোটানোর/ ব্রত।/৬+২
(শামসুর রাহমান, ‘যুদ্ধ’, প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

টানা পূর্ণ পর্বের ৬ মাত্রা, শুধু স্তবকের শেষে এসে ২ মাত্রার অতি-পর্ব। অন্তঃমিলও আছে দেখুন।


গলায় রক্ত/ তুলেও তোমার/ মুক্তি নেই/ ৬+৬+৫
হঠাৎ-আলোয়/ শিরায় যাদের/ আবির্ভাব/৬+৬+৫
আসবেই ওরা/ ঝড়ের পরের/ পাখির ঢেউ/৬+৬+৫
(শামসুর রাহমান, ‘আত্মজীবনীর খসড়া’, প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

৬ চালের মাত্রাবৃত্ত আর অতি-পর্বটি ৫ মাত্রার।


জেনেছি কাকে চাই,/ কে এলে চোখে ফোটে/৭+৭
নিমেষে শরতের/ খুশির জ্যোতিকণা;/৭+৭
কাঁপি না ভয়ে আর/ দ্বিধার নেই দোলা-/৭+৭
এবার তবে রাতে/ হাজার দ্বীপ জ্বেলে/৭+৭
সাজাব তার পথ,/ যদি সে হেঁটে আসে/৭+৭
(শামসুর রাহমান, ‘পূর্বরাগ’, প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

মাত্রাবৃত্তের সবচেয়ে বড় অর্থাৎ সাতের চাল।


মানিনি জীবন/ সমুদ্র সন্ধানে/৬+৬+২
চোরাবালিতেই/ পরম শরণ/ নেবে।/৬+৬+২
আশার পণ্যে/ পূর্ণ জাহাজ/ সে-ও/৬+৬+২
ডোবা পাহাড়ের/ হঠকারিতায়/ ঠেকে/৬+৬+২
হবে অপহৃত—/ ভাবিনি কখনো/ আগে।/৬+৬+২
(শামসুর রাহমান, ‘নির্জন দুর্গের গাঁথা’, প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

৬ চালের মাত্রাবৃত্ত আর অতি-পর্বটি ২ মাত্রার।


অ্যাপোলো তোমার/ মেধাবী হাসির/ সোনালি ঝরনা/৬+৬+৬
শিশু পৃথিবীর/ ধুসর পাহাড়ে/ এখনও কি র’বে/ লুপ্ত?৬+৬+৬+৩
আমরা এখানে/ পাইনি কখনো/ বন্ধু তোমার/৬+৬+৬
সোনালি রুপালি/ গানের গভীর/ ঝঙ্কার,/৬+৬+৪
শাণিত নদীর/ নিবিড় বাতাস/ মানবীর মতো/ ডাকে চেতনার/ রাত্রে,৬+৬+৬+৬+৩
তবুও এখানে/ আমরা সবাই/ বিবর্ণ রোগী/ পৃথিবীর পথে,/৬+৬+৬+৬
হৃদয়ের রঙ/ মনের তীক্ষ্ণ/ ক্ষমতা ফেলেছি/ হারিয়ে।/৬+৬+৬+৩
(শামসুর রাহমান, ‘অ্যাপোলোর জন্যে’, প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

৬ চালের মাত্রাবৃত্ত আর অতি-পর্ব ৩ মাত্রার। শুধু চতুর্থ চরণের অতি-পর্বটি ৪ মাত্রার। উল্লেখ্য যে, অতি-পর্বে মাত্রাফের করা রীতিসিদ্ধ।


মদের নেশা খাটি/সারা জাহানে/৭+৫
বাকি যা থাকে তার/ বেবাক ঝুট।/৭+৫
বাঘিনী যেন সেই/ মেয়েমানুষ/৭+৫
যার আঁধারে কাল/ কেটেছে রাত/৭+৫
(শামসুর রাহমান, ‘কবর খোঁড়ার গান’, প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

৭ চালের মাত্রাবৃত্ত আর অতি-পর্ব ৫ মাত্রার। সাত-পাঁচ, ভাবছেন কি? এগুলো গদ্য কবিতা নয়, আলবৎ মাত্রাবৃত্ত।

৯ টি মন্তব্য : “ছন্দে আনন্দভ্রমণ ২”

  1. সাইদুল (৭৬-৮২)

    বরাবরের মত সুখ পাঠ্য।
    স্বর বৃত্ত, অক্ষর বৃত্ত আরেকটু পরিষ্কার করলে ভালো হয়।
    প্রথম পর্বে জেনেছি ছন্দ তিন প্রকার। মাত্রাবৃত্ত পরিষ্কার বুঝতে পেরেছি। স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত সে ভাবে আলোচনা হয়নি। আশা করি সামনে আসবে সে সব আলোচনা।

    এই মাতোয়ালা রাইত কবিতাটি কী প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগের কবিতা? আমার খুব পছন্দের কবিতা এটি।


    যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

    জবাব দিন
    • মোস্তফা (১৯৮০-১৯৮৬)

      এরপর স্বরবৃত্ত আসবে। টগবগিয়ে, রাঙা ঘোড়ায় চেপে। সবশেষে অক্ষরবৃত্ত, একটু রয়ে-সয়ে। ফিলিপস বাতি জ্বালাবার চেষ্টা থাকবে।

      এই মাতোয়ালা রাইত কবিতাটি কী প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগের কবিতা?

      না। এটি বোধকরি কবির আরো পরের দিককার রচনা।

      চোস্ত ঢাকাইয়া ভাষায় খিস্তি-খেউরে ভরা সেই কবিতায় এক মাতালের জবানিতে শামসুর রাহমান পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন জীবনের এক অসামান্য ব্যাখ্যা। নেশাখোর এই লোকটি 'নিশিখোর'ও বটে! তাই সে বলে, ‘রাইতের লগে দোস্তি আমার পুরানা'। রাতের কী আশ্চর্য বর্ণনা উঠে এসেছে তার জবানিতে! ‘কান্দুপট্টির খানকি মাগীর চক্ষের কাজলের টান এই মাতোয়ালা রাইতের তামাম গতরে!’ রাতের শরীরে ‘কান্দুপট্টির খানকি মাগীর চক্ষুর কাজলের টান!’ কী অসাধারণ রূপক!

      কিন্তু এসব ছাপিয়ে কবিতাটি আমাদের ভাবাতে শুরু করে তখনই, যখন হালকা চাল ছেড়ে কবি আমাদের প্রবেশ করান এক গভীর দার্শনিক জগতে! দেখি, মাতাল ব্যক্তিটিও কেমন দার্শনিক হয়ে উঠছেন। নিজেকে প্রশ্ন করছেন- কে আমি, কোত্থেকে এসেছি এই ‘দাগাবাজ দুনিয়ায়?’ শেষ পর্যন্ত কোথায়ই বা যাব? যেখানেই যাক, সে তো সে-ই একই মানুষ- ‘গোলগাল মাথায় বাবরি; থুতনিতে ফুদ্দি দাড়ি, গালে দাগ!’ এবং নিজেকে তার মনে হচ্ছে- খুব দূর অতীতের ‘আধলি একখান!’ মানুষের অস্তিত্ব অনুসন্ধানের এইসব প্রাচীন প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে কবিতা এগুতে থাকে এবং আমাদের মুখোমুখি করে আরো গভীর থেকে গভীরতর প্রশ্নের।

      তবু বেঁচে আছি বলেই তো এখনো গোলাপ ফুলের সুবাস পাই, চাঁদনি রাত ‘দিলে ঝিলিক মারে’, আর আমরা জীবনের নানা আয়োজনের মধ্যে ফিরে ফিরে যাই! আর তাই-

      মৌতের হোগায় লাথথি দিয়া মৌততক সহিসালামতে জিন্দা থাকবার চাই!

      কী অসাধারণ পঙক্তি! কিন্তু এখানে এসেও কবিতাটি থামে না। আত্ম অনুসন্ধানের পরিক্রমা শেষে কোনো প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক মতো না পেয়েও যখন মাতাল দার্শনিকটি জীবনের পক্ষে দাঁড়ায়, বেঁচে থাকার আনন্দে মুখর হয়, তখন আবার ফিরে আসে সেই ভাবনা! অস্তিত্বের অর্থ কী?

      তামাম দালানকোঠা, রাস্তার কিনার, মসজিদের
      মিনার, কলের মুখ, বেগানা মৈয়ত, ফজরের
      পৈখের আওয়াজ, আন্ধা ফকিরের লাঠির জিকির-
      হগলই খোওয়াব লাগে আর এই বান্দাবি খোওয়াব!

      সবই স্বপ্ন তাহলে? এমনকি এই আমিও? আমার অস্তিত্বও? খুব ধাঁধায় ফেলে দেয় এই শেষ পঙক্তি। আমার অস্তিত্ব কি তাহলে অন্য কারো স্বপ্নের ভেতরে প্রোথিত? তার স্বপ্নটি ভেঙে গেলে আমার অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাবে? জীবন-জগত-অস্তিত্ব সবই যেন এক বিপুল রহস্যময়তার চাদরে ঢাকা পড়ে, প্রশ্ন জাগে একের পর এক! উত্তর মেলে না। (সম্পাদিত)


      দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হতেছে হলুদ

      জবাব দিন
  2. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    আহা "এই বান্দাবি খোওয়াব"
    লা জওয়াব লাইন, লা জওয়াব ।
    ...
    রাহমান ভাইকে নিয়ে আমার একটা লেখা ছিলো ।
    তাঁর মৃত্যু নিয়ে একটা ম্যাগসংখ্যায় ছাপানো ।
    অনেক দিন ভেবেছি দেবো সিসিবিতে ।
    তোমার লেখা পড়ে এবার চিন্তায় পড়তে হচ্ছে ...

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : সাইদুল (৭৬-৮২)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।