নাইরোগংগো

শেষ বিকেলের সূর্য তখন দূর পাহাড়ের কোণে হেলে পড়েছে। দুরন্ত বালকের দল ঘরে ফেরার আগে গোধূলির কমলা রঙে নেয়ে আরো খানিকটা বেলা শেষের খেলা খেলে নিচ্ছিল। ইব্রাহিম সাসা তার কাঠের চকোডুটা* ঠেলে ঠেলে ঘরে ফেরার পথের শেষ চড়াইটা পার হচ্ছিল। পেশল কালো দেহ ঘামে নেয়ে গেছে। বুকটা ওঠানামা করছে হাপরের মতো। ভেতরটা যেন নাইরোগংগোর** জ্বালামুখ। আর একটু উঠলেই বামে বাঁক নিয়ে পথটা নীচে নেমে শেষ হয়ে যাবে। বড় ভাল লাগে এই শেষ পথটুকু। এতক্ষণ চকোডুটা একেবারেই চলতেই চাচ্ছিল না। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে সেরেঙ্গাতির গোঁ ধরা বুড়ো মোষের ফোঁস ফোঁস। শেষ পথটুকুতে সেটাতেই যেন চ্যারিয়টের গতি। দু’চাকার কাঠের সাইকেল, এতক্ষণ টেনে টেনে তুলেছিল, এবার সেটাতেই চেপে বসে ইব্রাহিম। সোঁ করে নেমে আসে এক্কেবারে দোরগোড়ায়।

গোলপাতার ছাউনি দেয়া মাটির কুটির। বুড়ো মা ও জোয়ান ছেলের ছোট সংসার। গেল বার নাইরোগংগো যখন ফুঁসে উঠে আগুন-গরম লাভা উগরে দিলো, হাবিয়ার তরল স্রোতে সয়লাব চারদিক, বাপটা যুঝেছিল বটে! সাসা তখন কিশোর। লেক পারের শেল্টারে ওকে আর মাকে রেখে ফিরে গিয়েছিল বাপটা, যদি কিছু নিয়ে ফিরতে পারে। নেবার কীইবা ছিল এমন, মায়াটুকু ছাড়া। ফিরতে পারলো না। নাকি ফিরে এলো চিরতরে, স্মৃতি হয়ে।

বামের টিলার উপর অবজারভেটরিটা নতুন হয়েছে। তিনটে উঁচু টাওয়ার আর নানা রকম যন্ত্রপাতি সেখানে। পাশেই সবুজ টালি ছাওয়া মেটে রংয়ের বাংলো। সাদা সাহেবগুলো থাকে সেখানে। সেবার তাঁদেরই একজনের বাক্স পেটরা বয়ে এনেছিল সাসা। এই চকোডুটাতেই। টাওয়ারের মতোই ছিপছিপে লম্বা এঞ্জিনিয়র টমাস, ভারী খুশী হয়ে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল বিশ ডলারের চকচকে একটি নোট। কোন মতেই মাকে বিশ্বাস করানো গেল না সেটা। মায়ের কাছে শোনা কলোনি যুগের তিরিক্ষি মেজাজের বেলজিয়ান প্রভুদের গল্পের সাথেও মেলানো গেল না।

সেবারই অবজারভেটরিটা কাছে থেকে প্রথম দেখে সাসা। তার কিছুদিন পর ও যখন পানি তুলে দেবার কাজটা পেল, তখন থেকে একটু একটু করে দ্বিধা গেল কেটে। এক পা দু’পা এগিয়ে আরো দু’জনের সাথে জানাশোনা হলো সাসার। টাওয়ারের ঠিক নীচের ঘরটাতে টেলিভিশনের মতো চার পাঁচটা যন্ত্রের সামনে বসে এক মনে ওরা কি যেন দেখে সারাদিন। মাঝে মাঝে পাশে রাখা আরেকটি মেশিনের মুখ দিয়ে হিজিবিজি আঁকা কিছু ফিতের মতো লম্বা কাগজ বেরিয়ে আসে। এক টানে সেটা ছিঁড়ে এনে দু’জনে মিলে গম্ভীর আলোচনায় বুঁদ হয়ে থাকে। কেমন পাগল পাগল ঠেকে রে বাবা!

-টমাস, বুঝবে নাকি নাইরোর জারিজুরি?
-না বাপু, আমার বুঝে কাজ নেই! তোমরাই বোঝো! সেই কবে থেকে তো বসে আছে সুবোধ বালক হয়ে। বমি টমি করার নাম নেই। ডগমগে বউটাকে ফেলে শুধু শুধু পড়ে আছি এখানে। আমি বরং ওদিকটা দেখি।
-সাসার তো আর কিছুক্ষণ পড়েই আসার কথা, তাইনা? একটু এদিকে পাঠিও তো।
-কেন, কি হবে? ওকে আবার মেটেরোলজির পাঠ শেখাবে নাকি?
-আরে না, গণ্ডমূর্খ যে ওটা! বুদ্ধি-শুদ্ধি থাকলে শিখিয়ে হয়ত কিছুটা লাভ হতো। কিভু মার্কেট থেকে একটা এবোনি কাঠের মূর্তি আনাবো ওকে দিয়ে। জেনিফারের জন্য। ওর আবার এন্টিক্স কালেকশনের শখ।
-সেটা আবার কি করে এন্টিক্স হলো? গিয়েছিলে দোকানটায়? সেখানে একটা এন্টিক্স আছে বটে! লোলচর্ম বৃদ্ধ ভাস্কর। বসে বসে কাঠের উপর দুঃখ খোদাই করেই চলেছে। নিজের কালো কুচকুচে মুখের সবকটি রেখা কাঠের গায়ে খোদাই করে দেবেই দেবে যেন। এবনি কাঠ তো, অমনই তো রঙ, হয়তো ওটিকেই নিজের মুখ ভেবে বসে আছে।
-তোমার কাছে কথা তোলা ভুলই হয়েছে হে। কে জানতো আগে, পেশায় এঞ্জিনিয়র হলেও তোমার মাঝে কাব্যি থইথই করছে! কাব্যি টাব্যি যাই করো, সাসাকে দিয়ে এবার লেক কিভূর মলা মাছ আনতে ভুলো না কিন্তু! যা টেষ্টি! গেলবারের স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে।

টমাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নাইরোগংগোর নিঠুর খেলায় হাত মিলিয়েছে লেক কিভুর সুবিশাল জলরাশি। তলপেট জুড়ে বিছিয়ে দিয়েছে বিষাক্ত মিথেনের আস্তরণ। বিষাক্ত সেই পৃথিবীতে বেড়ে উঠতে না পেরে খর্বাকৃতি হয়েছে মাছগুলি, মলা নয় মোটেও। ওদের দুজনের কারুর সেটা অজানা নয়। লেক কিভূর উপরে গড়ে উঠা ফ্যাক্টরির প্রিমাস বীয়র খেতে খেতে কতবার সেই গল্প করেছে ওরা।

প্রথম যে বার এলো আন্তনভে চড়ে, রেকি মিশন ছিলো সেটা। টমাসের পষ্ট মনে আছে রাশিয়ান পাইলট ভ্লাদিমিরের পাগলামো। পুরো পথটা কি স্মুথ চালিয়ে এলো এয়ার পকেটের ভেতর দিয়েও। কাছটায় এসে এমন এক গোত্তা দিয়ে নামিয়ে আনলো, যেন একেবারে সেঁধিয়ে দেবে নাইরোর জ্বালামুখ দিয়ে ভেতরের টগবগে উষ্ণ লাল যোনীতে। সেই কবে থেকে টমাসের মতোই আকাঙ্ক্ষাকে নিবৃত্ত রেখেছে নাইরোগংগো।

টমাস বেরিয়ে পড়ে সাসাকে নিয়ে। ভোডাকম স্কয়ারের পাশে জাতিসংঘের হাসপাতাল। সাদা সাদা এম্বুলেন্সগুলো বয়ে আনে কত রকমের রোগী। কারুর হাত, কান বা পা কেটে ফেলা হয়েছে। কারুর সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া। সমানে রক্ত চোষে মশা ও মানুষ। শাদা শাদা দাঁতের কুটিল হিংস্রতায় সৃষ্ট ক্ষতে শান্তির প্রলেপ বুলোয় জাতিসংঘের হাসপাতালের সাদা এপ্রনের ডাক্তার-নার্সেরা। পাশেই কুলি-কামিনের দল জঙ্গল থেকে কেটে আনা বাঁশ ও শ্রম বেচতে পসরা মেলেছে। দু’একজন সন্ধ্যার আঁধার নামতে না নামতেই মেলে ধরে দেহের পসরাও। আরো খানিকটা দূরে লেক কিভূর তীর ঘেঁষে গিসেনী কলেজের ক্যাম্পাস পেরিয়ে ডানে কয়েকটা বস্তির ছাপড়া মতো ঘর ফেলে বামে বিলাসবহুল হোটেল সেরেনা। তারপর স্টিপ হোটেল আর সবশেষে হোটেল পীসল্যান্ড। বছর খানেক আগে প্যারিস থেকে সরাসরি উড়ে এসেছিলো গাব্রিয়েলা, পীসল্যান্ডে বেশ ভালোই কেটেছিল উইক এন্ড। সেই উষ্ণতা আজো চনমনে করে রেখেছে টমাসকে।

ঘুরে ঘুরে এক এক করে সপ্তাহের বাজার সেরে ফেলে টমাস। টমেটো, এভোকাডো, মারাক্যুজা, কাসাভা ফ্লাওয়ার, ব্রায়ানের জন্য এবোনি কাঠের মূর্তি, দিমিত্রির পসন্দের মলা মাছ সবকিছু ফর্দ মিলিয়ে মিলিয়ে কেনে। সাসার চকোডুতে সব সদাইপাতি চাপিয়ে ডাউন ট্রিপের বাসে চেপে বসে সে। জানালার ফাঁক দিয়ে মাথাটা বের করে সাসাকে বলে, “সাবধানে আসিস সাসা, দেখিস আবার ফেলে দিস না যেন।”

দেড় ঘণ্টার পথ, ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। এবনি মূর্তিটি সাথে করে নিয়ে এসেছে সে। সুবিশাল ঢাকের উপর বসে পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে দু’হাতে একমনে বাজিয়ে যাচ্ছে ভরা যৌবনা চন্দ্রাহত নিগ্রো যুবতী। জোছনা উপচে পড়ছে তাঁর আবক্ষ নগ্ন সম্ভারে। ব্রায়ানের পসন্দ না হয়েই পারে না, পসন্দ হবে জেনিফারেরও। ব্রায়ানকে যখন জিজ্ঞেস করবে জেনিফার, নিশ্চয়ই টমাসের পসন্দে কেনার কথাই জানাবে ওকে। কেনার পর থেকেই ব্রায়ানের হাতে দেবার জন্য মনটা আঁকুপাঁকু করছে টমাসের। টিলার শরীর পেঁচিয়ে উঠা সর্পিলাকার পথ বেয়ে দ্রুত উঠে আসে সে। আবছা অন্ধকার গায়ে মেখে ঝিঝির সান্ধ্য সংগীত শুনছে পুরো টিলাটা। ব্রায়ান, দিমিত্রি রুমে নেই। অবজারভেটরি রুমে নেই তো? বাংলোটা পাশ কাটিয়ে ওদিকে এগিয়ে যায় টমাস। অবজারভেটরি রুমটাও ফাঁকা। গেল কোথায়? “ব্রা-য়া-ন, দি-মি-ত্রি কোথায় তোমরা?” হাঁক দিয়ে উঠবার ঠিক আগের মুহূর্তে টমাসের চোখ পড়ে ছোট স্টোর রুমটার দরজায়। তালাটা খোলা, দরজা আলতো করে ভেজানো। সন্তর্পণে পেছন দিকটার জানালার কাছে গিয়ে ভেতরে উঁকি দেয় টমাস। গাদা গাদা কাগজের স্তূপ। পুরনো ডাটা প্রিজার্ভ করে রাখা। তার ফাঁক দিয়ে ব্রায়ানের উলঙ্গ পিঠটা দেখা যাচ্ছে। কোমর আছড়ে আছড়ে যেন দেহ থেকে হাজারটা বিষ-পিঁপড়ের বিষ ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। নীচে একটি ভরন্ত দেহাতী নারী শরীর, এবোনি কাঠের মতো কালো কুচকুচে। পাথর চোখদুটি স্থির হয়ে আছে সিলিংয়ের কোন একটি বিন্দুতে। শুধু নিষ্প্রাণ অপেক্ষা, উদগীরণ শেষ হলেই নিষ্কৃতি। আরেকটু দূরে ডান পাশের দেয়ালটায় ঠেস দিয়ে আছে দিমিত্রি। বেহেড মাতাল হয়ে বিড় বিড় করে কিসব আউরিয়েই যাচ্ছে।

জানালার পাশ থেকে সরে আসে টমাস। সারাটা দিন ঘুরে ঘুরে গায়ে অনেক ধুলো জমে গেছে। গিজারটা অন করে। গরম জলে আরাম করে একটা শাওয়ার নিতে হবে। ওদিকে অবজারভেটরি রুমে প্রাণপণ চেঁচিয়ে যায় দুটো যন্ত্র, কম্পিউটার আর প্লটার। উদগীরণের পূর্বাভাস, ওদের কারুরই সেটা চোখে পড়ে না।

*চকোডু : কাঠের তৈরি দু’চাকার বাইসাইকেল, চাকাগুলিও কাঠের, মূলত ভার বহনের কাজে ব্যবহার করা হয়।

**নাইরোগংগো : কঙ্গোর গোমা শহরের উপকণ্ঠে আফ্রিকার সবচেয়ে বিপদজনক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি।

১,৬৬৭ বার দেখা হয়েছে

২০ টি মন্তব্য : “নাইরোগংগো”

    • মোস্তফা (১৯৮০-১৯৮৬)

      ধন্যবাদ লুৎফুল ভাই। আমার গদ্য লেখা এগোয় না। গদ্যকে খুব ওজনদার বলে মনে হয়। বুঝি, চরিত্রগুলি ঠিক ফুটছে না। যতটুকু ব্যাপ্তি চাইছে, তা দিচ্ছি না। ঘটনাপ্রবাহ ধরে রাখবার চাইতে শব্দকে শীলিত করবার অভীপ্সা মুখ্য আমার ভেতর লতিয়ে-ফেনিয়ে উঠছে বেশি।

      তবু যে আপনারা মন লাগিয়ে পড়েন, তাতে কৃতার্থ হই।


      দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হতেছে হলুদ

      জবাব দিন
    • মোস্তফা (১৯৮০-১৯৮৬)

      সত্যি কথা বলতে কি, গল্পটা লিখবার পর ওটা আমারই মনে ধরেনি। ঊনতাগুলি উপরে লুৎফুল ভাইয়ের মন্তব্যের জবাবে তুলে ধরেছি। ওই জীবনটা যেহেতু আপনার পরিচিত, তাই আপনার চোখ লেখাটিকে ছাপিয়েও আরো অনেক গভীরে পৌঁছাতে পারছিল। আপনার লেখা পড়ে পড়ে সাবলীল গদ্য লেখা শিখব। ঠিকই শিখে নেব।


      দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হতেছে হলুদ

      জবাব দিন
    • মোস্তফা (১৯৮০-১৯৮৬)

      ধন্যবাদ নূপুর! মাউন্ট নাইরোগংগো'র সাথে অনেকেই পরিচিত নয়। সেই সাথে পরিচিত নয় বেলজিয়ান কলোনি যুগের কঙ্গোর বুকফাটা কান্নার সাথে। উভয়ের ইতিহাসসিঞ্চিত কান্না, ভয়াবহতা, সৌন্দর্য, ও নিপীড়নকে তুলে আনতে হলে দীর্ঘ উপন্যাসের কলেবর প্রয়োজন। এই গল্পেটি পাখির চঞ্চুতে করে শুধু তার চিলতেটুকু তুলে আনার প্রচেষ্টা। গোমা শহরটি যে এক আনবিক বোমার উপর বসে আছে - তা কি উপলব্ধি করা যায়?


      দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হতেছে হলুদ

      জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : লুৎফুল (৭৮-৮৪)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।