বার্থডে উইশ

রাত ১২ টা বাজার মাত্র ১৫ মিনিট বাকি। মাত্র ১৫ মিনিট পরেই সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি শুরু হবে। ২রা জুলাই, প্রিয়তির জন্মদিন।কিন্তু প্রিয়তির মনটা খুব অস্থির হয়ে আছে। ঘনঘন মোবাইলে টাইম দেখছে সে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আচ্ছা, এবার সবার আগে প্রত্যয় উইশ করতে পারবে তো? ওর খুব ইচ্ছা জন্মদিনের প্রথম উইশটা ওর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাই করুক। এর জন্য ফেসবুকে বার্থডে রিমুভ করে রেখেছে সে।জিনিসটা হয়ত অনেকের কাছে ছেলেমানুষি মনে হবে,কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে অনেক সময় এইসব তুচ্ছ জিনিসও অনেক বেশি আকাঙ্খিত হয়ে যায়। ফেসবুকের হোমপেজ ও ওপেন। যদিও অফলাইনে আছে সে। আচ্ছা, এবার কিভাবে উইশ করবে প্রত্যয়? ওর যা অদ্ভুত স্বভাব। এই ছেলেটা যে কিভাবে আমার কপালে জুটল আল্লাহই ভালো জানে, মনে মনে ভাবছিল প্রিয়তি।

ইশশ!আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি আছে। ও আসলেই উইশ করবে তো? নাকি ভুলে যাবে? ভুলে গেলে ওর আজকে খবর আছে,কথাই বলব না আমি। মাথায় চাটি খেয়ে ঘুরে তাকালো প্রিয়তি। পিছনে ওর দুই রুমমেট রুমা ও দিতি দাঁড়ানো।
-কিরে? ট্রিট দেয়ার ভয়ে বার্থডে হাইড করে রাখছিস? তুই তো খুব খারাপ। আমরা কিন্তু করমু না তোরে উইশ। আগে খাওয়া, পরে উইশ দেয়া।
– নারে, এমনি। এফবিতে সস্তা উইশ পাইতে ভাল্লাগে না। ট্রিট পাবি চিন্তা করিস না।
– তাতো বুঝলাম,কিন্তু মুখ এমন গোমড়া করে রাখছিস কেন? কাল যে কিছু খসবে এই ভয়ে?
কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল প্রিয়তি, কিন্তু ফোন বাজার সাথে সাথে চমকে উঠল সে। পাজিটা বোধহয় কল দিয়েছে। কিন্তু ফোনের দিকে তাকিয়ে হতাশ হতে হল। বৃষ্টি ফোন দিয়েছে। নাহ, এবারও হল না।কেমন যেন যন্ত্রের ভঙ্গিমায় কল রিসিভ করলো সে।
-হ্যালো দোস্ত বল।
-হ্যাপি বার্থডে দোস্ত।
-থাঙ্কু দোস্ত।
-তোর ভয়েস টা এরকম মরা মরা লাগছে ক্যানো? ঝগড়া হইছে নাকি??
– নারে, মাথা ধরছে প্রচণ্ড।
-ওকে তাইলে রেস্ট নে।পরে কথা হবে। বাই
– ওকে দোস্ত, বাই।
২০ মিনিট হয়ে গেল। ও এখনো ফোন করলো না, প্রচণ্ড রাগ লাগতেছে এখন। পিসির মনিটরের দিকে তাকিয়ে আরেকবার হতাশ হল সে। বার্থডে হাইড করে কোন লাভ হয় নাই, ফ্রেন্ডরা অলরেডি উইশ করা শুরু করে দিয়েছে,অথচ যার উইশের জন্য অপেক্ষা করতেছে তার কোন খবর নাই। কাউকে রিপ্লাই দিতে ইচ্ছে করতেছে না, বিরক্ত লাগতেছে খুব,এইটা কোন কথা হল? দুনিয়ার সবাই উইশ করে ফেলল অথচ উনার কোন খবর নাই। একি!স্টুপিডটা তো দেখি সারা ফেসবুক চষে বেড়াচ্ছে। দুনিয়ার সব মেয়েদের স্ট্যাটাসে লাইক মারতে পারে অথচ আমার ওয়ালে একবার ফিরেও তাকাল না? কান্না পাচ্ছে এখন প্রিয়তির।কত প্লান ছিলো! সারাদিন গাধাটাকে নিয়ে ঘুরব, গাধাটাকে খাওয়াব। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে ও এসবের প্রাপ্য না, ওকে তুলে যদি একবার আছাড় দেয়া যেত অনেক শান্তি লাগত আমার। নিজেকে শোনাল সে।

রাত দেড়টা বাজে। বুঝতে পারছি এই ছেলের জন্য অপেক্ষা করে কোন লাভ নেই। এর চেয়ে ঘুমানোই ভালো। কালকে সকাল ৮ টায় ক্লাস। কালকে যতই সরি সরি বলুক কোনই লাভ নাই। বড় রকমের একটা ঝাড়ি ইতিমধ্যে তার পাওনা হয়ে গেছে। তা না হলে মানুষ হবে না সে।ধুর, আমার জন্মদিনটাই আসলে একটা কুফা।রাগে গজগজ করতে করতে বিছানায় শুয়ে পড়লো প্রিয়তি।

পরদিন ভোরবেলায় ঘুম ভেঙ্গে প্রিয়তি দেখে অনেকগুলা মিসকল,সাথে একটা এসএমএস।তুমি কোথায়?ফোন ধরনা কেন? প্রত্যয়ের নাম্বার।দেখে অভিমানে ফেটে পড়লো সে, অবশ্য একটু খুশিও হল। যাক ছাগলটা মনে হয় ভুল বুঝতে পারছে। কিন্তু একদম পাত্তা দেয়া যাবে না তাকে। একদমই না। নো কল ব্যাক, নো রিপ্লাই। ওকে একটু শাস্তি দেয়া দরকার। ফাজিলটা বুঝুক কেমন লাগে।আমার এখন প্রধান কাজ ক্লাসের জন্য রেডি হওয়া। কে উইশ করলো না করলো এসব ভেবে সময় নষ্ট করে কোন লাভ নাই।

প্রিয়তি হলের গেট দিয়ে বের হয়েই দেখল প্রত্যয় দাড়িয়ে আছে।কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মত দেখাচ্ছে তাকে, চোখ লাল লাল,উস্কখুস্ক চুল। মাথার চুলগুলো জীবনে আঁচড়ায় নাকি কোনদিন সন্দেহ। আর কি একটা বিচ্ছিরি সার্ট পরে আসছে, দেখতেই কেমন লাগে। গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে হইলে কিভাবে আসতে হয় মনে হয় সেটাও জানে না ছেলেটা। নাহ, একে দিয়ে কিছু হবে না।
-তুমি এতক্ষণে আসলা? আমি তোমার জন্য কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতেছি জানো? আর তুমি ফোন ধরনা কেন? কি হইছে তোমার?
-কি বলবা বল, আমার একদম সময় নাই। ক্লাস শুরু হবে একটু পরে। তাড়াতাড়ি কথা শেষ কর।
একটু ভাব নেয় প্রিয়তি, যদিও সে মোটামুটি নিশ্চিত কি বলবে সে। উত্তরও সে মনে মনে রেডি করে রেখেছে।
-তোমার একটা পেন ড্রাইভ নিছিলাম না ওইটা ফেরত দিতে আসছি, এই নাও।আর তুমি ক্লাস শেষ হইলে আমারে একটা কল দিয়ো। আমি যাই এখন।তোমার তাড়া আছে তাই আর কথা বাড়াইলাম না। আমি গেলাম।
সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল প্রত্যয়। ওর চলার পথের দিকে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল প্রিয়তি।কি কথা শোনার আশায় এসে কি শুনল সে। এইটা কোন বয়ফ্রেন্ডের কথা বলার ধরন!কি সুন্দর এসে উইশ করার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে পেন ড্রাইভ দিয়ে সোজা চলে গেল। ইচ্ছা করতেছে পেন ড্রাইভ টা আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেলতে। নাহ রাগ করে আর কি হবে? ওই গরুটা তো এখন বুঝবেও না আমার অবস্থা। ডিসিশন ফাইনাল, ওর সাথে আর রিলেশন রাখব না। এর চেয়ে একটা গাছের সাথেও প্রেম করা ভালো।
আজ আর ক্লাসে যাওয়া হল না প্রিয়তির।আবার নিজের রুমে ফিরে গেল।ব্যাগটা বেডে ঢিল দিয়ে ফেলে পিসির সামনে বসলো। মন খারাপ থাকলে সে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনে। এখন এই বুড়ো লোকটাই পারে মন ভালো করতে। কি মনে করে সে পেন ড্রাইভ টা পোর্টে ঢোকাল। পেন ড্রাইভে অনেকগুলা অডিও ফাইল।একটা ফাইল ওপেন করলো সে। সাথে সাথে একটা কবিতা শুরু হল,প্রিয়তির অসম্ভব প্রিয় একটা কবিতা,
“শুনেছি আমারে ভালই লাগে না,
নাই বা লাগিল তোর,
কঠিন বাঁধনে চড়ন বেড়িয়া
চিরকাল তোরে রব আঁকড়িয়া
লোহার শিকল ডোর।
তুই তো আমার বন্দী অভাগিনী
বাঁধিয়াছি কারাগারে,
প্রাণের শৃঙ্খল দিয়েছি প্রাণেতে
দেখি কে খুলিতে পারে”। …………..
কবিতা টা শুনতে শুনতে কিছুটা শান্ত হল প্রিয়তি। কণ্ঠটা প্রত্যয়ের,চমৎকার আবৃত্তি করে ছেলেটা। এই একটা গুণই আছে বদটার। অথচ ওকে দেখে বা ওর কথা শুনে কারো মনেই হবে না যে নিতান্ত গোবেচারা চেহারার এই ছেলেটা এত সুন্দর আবৃত্তি করতে পারে।গরুটার আবৃত্তি শুনেই প্রথম মুগ্ধ হয়েছিল প্রিয়তি।রাগ পরতে শুরু করেছে ওর , শান্তভাবে প্রথম ফাইলটা ওপেন করলো সে, এইখানে ওর জন্য বড়সড় একটা চমক অপেক্ষা করছিলো, আবারো ভেসে এলো প্রত্যয়ের কণ্ঠ, তবে এবার কবিতা নয়,

“ মাই ডিয়ারেস্ট সুইটেস্ট ময়না পাখি, শুরুতেই আপনার কাছে আমি আপনার কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আপনাকে সময়মত উইশ না করার জন্য। আমি বেশ ভালভাবেই বুঝতে পারছি আপনি আমার ওপর খুব রেগে আছেন। জাস্ট আপনাকে একটা সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য এই নাটকটা করলাম। আপনার জন্য গতকাল সারারাত জেগে আপনার প্রিয় প্রিয় সব কবিতাগুলো আবৃত্তি করে রেকর্ড করেছি। আশা করি এতে আপনার রাগ কমবে,রাগ কমলে ঠিক দুপুর দুইটায় আমার সাথে দেখা করবেন। আপনার জন্য আরও বড় সারপ্রাইজ আছে”।
প্রিয়তির রাগ ততক্ষনে পানি। সে অনুভব করলো তার চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু পানি জমে উঠেছে।ঠোঁটে ফুটল এক চিলতে হাসির রেখা। আপনমনেই বলে উঠল,ভালোই খেলা দেখাইতে পারে এই আধপাগলাটা।

২,১০৩ বার দেখা হয়েছে

৯ টি মন্তব্য : “বার্থডে উইশ”

মওন্তব্য করুন : মঞ্জুর (২০০২-২০০৮)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।