ডাকঘরে বৃষ্টি আর অভিমানী গল্প

সেদিন তার চিঠির উত্তরটা দিতে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। তুমি জানতে চেয়েছিলে এই পুজোর ছুটিতে আমি ঢাকায় আসব কিনা। ২দিনের জন্য এইবার আর সময় হয়ে উঠেনি। মা বলেছিল একবার সেজোমামার বাসায় ঘুরে আসতে। যাব যাব করে আর যাওয়া হলনা। কাজের ব্যস্ততায় তখন অনেক কিছুই যেন মিলাতে পারছিলাম না। তবুও তোমার মনরক্ষায় খানিকটা সময়ের জন্য আসব বলে মনস্থির করেছিলাম। তোমার ভেতরের উদাসীনতা আমাকে একপা একপা করে পিছনে টেনে রাখে। তুমি ইশারাতে আমার অপেক্ষায় থাকবে তা মেপে নেবার মত ঋনী আদৌ হয়নি আমি। দুরুত্ব বেড়ে গেলে আমাদের স্বপ্নগুলো আস্তে আস্তে ঘোলা হয়ে যায়। চিন্তা করছিলাম ফিরে এসে নিজের ভুলটা স্বীকার করব। বড় ছুটির আশায় একটা সপ্তাহ কেটে যাবে।
দুপুর বেলায় অফিসের বারান্দায় পায়চারা করছিলাম। আজকে কাজের চাপও বেশি। এক কাপ চা খাব বলে মাসুদকে প্রায় আধ ঘন্টার জন্য খুজছি। সে দুটো ফাইল নিয়ে যে কোথায় হারাল আর দেখা পেলামনা। তোমার চিঠিটা বার বার পড়তে ইচ্ছে করছে, কোন এক আলসেমি নিয়ে পকেট থেকে আর বের করা হয়নি। বাইরে আকাশটা একটু কালো দেখা যাচ্ছে, দুপুরের খড়া রোদটাও নাই। বৃষ্টি আসবে আসবে ভাব। মন খারাপ করার মত একটা দিন। তোমার কথা ভেবে কাল কয়েকটা লাইন লিখেছিলাম। এইবার দেখা হবে কিনা এই দ্বিধাবোধে আংশিক থেকে যায় যুক্তবর্ণ আর শব্দগুচ্ছ। ডাকঘরের সামনে দিয়ে আসার সময় এই কথাটা দুইদিন মনে হল।
আজকে হাতে তেমন কাজ নেই। সন্ধ্যে হলেই বাড়ি ফিরার একটা সু্যোগ করছিলাম। শরীফ সাহেব তার মেয়ের জন্য কি গিফট কিনলেন তা নিয়ে গোটা কয়েক মিনিট তার সাথে নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল, আমি আজও ছাতা আনতে ভুলে গেছি। কামাল ভাই গাড়িতে লিফট দিতে চাইল। কিন্তু যাবার পথে চিঠিটা পোষ্ট করে যাব বলে আর আগে বাড়লাম না। এইদিকে আবার বৃষ্টি থামার কোন নামগন্ধ দেখছিনা। একসাথে আমাদের বৃষ্টিবিলাস হবে- কতটুকু সত্য হবে তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে বোধহয় বর্ষাটাই শেষ হয়ে যাবে।
দোকানগুলোর গা ঘেষে ঘেষে খানিকটা এগুতে থাকলাম। ঝমঝম করে শব্দ হচ্ছে বৃষ্টির। বাহিরে তেমন মানুষ নেই; গোটা শহর তখন হ্যালোজেন আলোয় সিক্ত। পোষ্টবক্সটার কাছে যেতে যেতে আমি প্রায় কাকভেজা ভিজেছি।
-যাহ! আজকে বড় ঠান্ডা লেগে যাবে।
পরের দিন আবার অফিসে আসার চিন্তায় আমার ভেজা পকেটের খেয়াল নেই। কাগজটা পুরো দুমড়ে গেছে, লিখাগুলোও প্রায় উঠে গেছে। এইবার আর পোষ্ট করা হলনা। বাসায় গিয়ে আরেকবার লিখার কথা তখন ভাবছি।
অধিকাংশ সময় বাসার দরজা খুলতে দারোয়ান দেরি করে, আজকে যাক সে আগে ভাগে খুলে দিল। করুণ একটা চেহারা নিয়ে বলল: “স্যার বেশি ভিজে গেছেন”। আমি তখন কেঁচি গেটটার কাছে চলে আসছি।
-মোখলেছ চাচা আপনি কালকে একটু সময় করতে পারবেন? আমার একটা চিঠি পোষ্ট করতে হবে। বক্সে দিলে একটু বেশি সময় লাগবে। খুব আর্জেন্ট তো। পোস্টঅফিসে অমিতবাবু আছেন, তাকে বুঝায় দিলেই হবে। কুড়ি-বিশেক টাকা নিবে।
-আপনি স্যার অপিসে যাবেন না কাইল?
-আমার শরীরটা ভালো লাগছেনা, কাল বোধহয় ছুটি নিব। অসুবিধে নেই, আমি আপনাকে সকালেই সব বুঝিয়ে দিব।
ভীষন জ্বরে আমি দুইদিন শুয়ে ছিলাম। পাশের ফ্ল্যাটে বন্যাদি খাবার বানায় দিয়ে গেছে। উনি খুব সেবাযত্ন করলেন এইক’টা দিন। সোহেল ভাই খোজখবর নেয়; ওষুধপত্র সব সেই-ই কিনে দিল। এরা আসলে সবসময় বিপদে আপদে সাথে ছিলেন। উত্তরবঙের মানুষ আসলেই অনেক স্নেহপরায়ণ হয়। কবে আমি তাদের সাহায্যে আসব জানিনা। সাধুর মোরে একটা ভালো খাবার দোকান আছে। এই ছুটির প্ল্যানে ভাবছি ওদেরকে একদিন ভালো করে খাইয়ে দিব। তোমার সাথে শহুরে-আইস্ক্রিমের দোকানে যাওয়ার ফয়সালা তাহলে কবে হচ্ছে!
মোখলেছ চাচা চিঠি পোষ্ট করার এক সপ্তাহ হয়ে গেছে। উত্তর আসিনি এখনও। পূজোর ছুটি চলে আসছে। চারিদিকে রঙ আর মন্ডবের সাজসজ্জা, লোকজনের মধ্যে আনন্দের ছরাছুরি। আমি অফিসে মনযোগী হয়ে পড়লাম।
সেদিন শুক্রবার, চিঠির উত্তর না পেয়ে আমি অনেক অবাক হয়েছিলাম। এতটা দেরি হবার কথা না! তুমি হয়ত ভুলে গেছ আমার মত। শহুরে দালান আর অট্টালিকার খাঁচায় তোমার মন আটকে থাকে। সেইদিন রাতের গাড়িতে আমি ঢাকা যাব ঠিক করলাম। রাস্তাঘাট শুনশান নিরবতা। শুধু গাড়ির হর্ন আর ফেলে আসা সারি সারি শাল গাছের সো সো শব্দ। মাইলকে মাইল নির্ঘুম যাত্রা। বিরতিতে শুধু একবার মাথা বের করে দেখবার চেষ্টা করেছি, নামতে ইচ্ছে হয়নি। হাল্কা ক্ষিধে চেপে যাওয়াটা বরং শ্রেয়।
ভোরবেলায় ঢাকা পৌঁছেছি। বড়ই অদ্ভুত এক শহর। ব্যস্ত ট্রাফিক আর কোলাহল স্বরব জীবনযাত্রা এখানে। আধুনিক হয়ে উঠা মানুষের কোনদিক তাকানোর সময় নেই। আমার দৃশ্যপট শুধু কল্পনা আর রূপকথার পত্রলিপির ভাজে। তোমার সাথে আমার ষোলমাস চারদিন পর দেখা হচ্ছে। বদলে যাবার ভয় ক্ষনে ক্ষনে খালি কাছে আসছে।
১৪নং বাড়িটা আজ জনমানবহীন ভাঙা দরজায় শেষ হতে পারে। শেওলা ধরা দেয়ালে তোমার চোখের পানি গড়িয়ে পড়লে হয়ত বিশ্বাস করতাম। আমার চিঠের লাইনগুলো তুমি তালাবদ্ধ করে আটকে রাখতে পারনা। আমি নিজেকে যতটুক শক্ত ভেবেছিলাম, তোমার রেখে যাওয়া স্মৃতি নিয়ে ফিরতে ততটুকু কষ্ট হয়নি।
অনেক দেরি হয়ে গেছে আমার শেষ বাসে চড়তে, এই শহরের ধুলোয় আমার নিঃশ্বাস নিতে। কোন একটা সমাপ্ত টানার মত কলমের কালি ছিল না আমার।
বৃষ্টিবিলাসের সেই চিঠিটাতো পড়েই রইল ডাকঘরে। শুধু দুইটা লাইন যোগ করতে চাই:
“অভিমানী তুমি, লিখবনা আর চিঠি,
আকাশে নেই তারার মিটিমিটি।”
গল্পের প্রত্যেকটি চরিত্র কাল্পনিক এবং কোন সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখা হয়নি। অনেক মানুষেরই প্রিয়জন হারানোর গল্প থাকে, তাদের হার না মানা যুদ্ধকে স্বাগতম জানাই।
২,০৯০ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।