‘ওম মনিপদ্মে হুম’ – পর্ব ৩

‘ওম মনিপদ্মে হুম’ – পর্ব ৩

ড. রমিত আজাদ

 

(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে)

তিব্বতে অবস্থানকালীন প্রথম বছরটি অতীশ দিপংকরের জন্য ছিলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মহাযান বৌদ্ধ দর্শনের প্রকৃত ডকট্রাইনগুলো প্রচার পূর্বক তার ভিত্তি স্থাপনে আত্মনিয়োগ করলেন। উনার প্রথম তিন বছরের কাজগুলোকে নিম্নরূপে সংকলিত করা যায়।

 

১। পশ্চিম তিব্বতের শাসক কর্তৃক উনাকে জানানো সাদর অভ্যর্থনা এবং উনার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ। বায়ন-চুব-ওদ (Byan chub-od )/বুধিপ্রভা কর্তৃক উনার প্রতি প্রদর্শিত একনিষ্ঠতা।

২। তিব্বতের মহাপন্ডিত ৮৫ বছর বয়স্ক রিন-চেন-বজান-পো (Rin-chen-bzan-po) বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করেন ও রত্নভদ্র নাম গ্রহন করেন।

৩। তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বোধি-পথ-প্রদীপ’, এবং এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি গৌতম বুদ্ধের ডকট্রাইন অনুযায়ী মানবের নৈতিক চরিত্রের উন্নয়ন সাধনে সফলকাম হন।

 

৪। অতীশ দীপংকর পরিচিত হন ব্রোম-স্টোন-পা-রগিয়াল-বাই-বিয়ান-গ্না (Brom-ston-pa-rgyal-bai-byun-gna)-র সাথে, যিনি অতীশের প্রধান তিব্বতী অনুসারীতে পরিণত হন এবং সমগ্র তিব্বত ব্যাপি বৌদ্ধ ধর্মের সংস্কার আন্দোলনে অতীশকে সফলভাবে সহযোগিতা করেন।

 

তিন বছরের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর অতীশ দিপংকর জন্মভূমিতে ফিরে এসে বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য মহাবিহারগুলোর দায়িত্বভার পুণঃগ্রহন করার জন্যে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন, কেননা এমনটিই তিনি কথা দিয়েছিলেন তাঁর স্বদেশী শিষ্যদের। কিন্তু তিব্বতে ধম্ম প্রচার করার তাঁর নিবিষ্টচিত্ততার সাথে যুক্ত হয় ফিরে যাবার যাত্রা পথের বাধা। কারণ নেপালে তখন উদ্ভুত হয়েছিলো গুরুতর রাজনৈতিক সমস্যা, ফলে তিব্বত থেকে দেশে ফেরার যে নেপালী রুটটি ব্যবহার করা হতো, তা ব্যবহার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

এই পর্যায়ে অতীশের প্রধান শিষ্য ব্রম তাঁকে প্রণোদিত করেন মধ্য তিব্বত সফর করতে, যেখানে লাসা সহ অনেক নগরীতে অজস্র মঠে হাজার হাজার সন্যাসীরা রয়েছেন অতীশের দীক্ষার অপেক্ষায়। অক্লান্ত ধর্ম প্রচারক অতীশ তৎকালীন তিব্বতে ধর্মের নামে প্রচলিত বিবিধ কুসংস্কার ও বিভিন্ন ভ্রান্ত আচার-যজ্ঞের বিরূদ্ধে সংগ্রাম করতে শুরু করেন, এবং শুভ ও নৈতিক জীবন যাপনের ডকট্রাইন প্রচার করতে থাকেন। অতীশের মোহনীয় ব্যাক্তিত্ব ও যাদুকরী প্রচারনার প্রভাবে পুরো মধ্য তিব্বতে ক্ষয়িষ্ণু বৌদ্ধ দর্শন ও ধর্ম নতুন জীবন ফিরে পায়। তিনি জনগণকে বুদ্ধের নৈতিক শিক্ষা দান করেন ও মহাযান দর্শনের সারগর্ভ অনুধাবন করান। জগৎ-সংসারের অনিত্যতা (anicca) প্রচার করে তিনি এই বোঝান যে তন্ত্রের মূল চর্চা যজ্ঞের মধ্যে নিহিত নাই, বরং তা আছে মনকে ধ্যানে নিমগ্ন করার মধ্যে। তিনি দুঃখভোগের জিঞ্জির থেকে মুক্তির নিমিত্তে নৈতিক শুদ্ধতা এবং ধ্যান-এর গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্ধেশ্য তন্ত্রের অপকৃষ্ট চর্চার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। উনার রচিত গ্রন্থ ‘বোধি-পথ-প্রদীপ’ বুদ্ধের শিক্ষাকে বিশদভাবে তুলে ধরেছে, এই শিক্ষা বলে উচ্চ নৈতিক জীবনের কথা, অস্তিত্বের নম্রতা ও বিশুদ্ধতার কথা, বিশ্বজনীন ভালোবাসার কথা, অহিংসা ও সৌহার্দের কথা, এবং বোধিসত্ত্ব (Bodhicitta) অর্জনের জন্য ধ্যানের প্রয়োজনীয়তার কথা। ছিষট্টিটি শ্লোকের এই ছোট্ট গ্রন্থটি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বুদ্ধের শিক্ষার মূলনীতিগুলি তুলে ধরেছে। মহাযান দর্শনের অনুসারী অতীশের উত্থান হয়েছিলো সীমাহীন দুঃখভোগের জিঞ্জির থেকে মানজাতির মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসাবে। তিব্বতের ধর্মীয় ইতিহাসে তিনিই ছিলেন সবচাইতে বেশি প্রভাববিস্তারকারী মহামানব, যিনি সমগ্র জাতিকে জাগ্রত করে ধম্মের পথে নিয়ে এসেছিলেন।

 

ডকট্রাইন প্রচার করার সময় তিনি তার শিষ্য ও অনুবাদক ব্রমের সাথে পুরো তিব্বত চষে বেড়ান। বহু গুনে গুনান্বিত, জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় বিচরণকারী একজন সাধু, দার্শনিক ও পন্ডিত অতীশ দীপংকর তিব্বতে মহাযান বৌদ্ধ দর্শন প্রতিষ্ঠা করত ব্যাপক সামাজিক সংস্কার সাধন করেছিলেন। তিনি কুসংস্কারাচ্ছন্ন তৎকালীন তিব্বতীদের পথপ্রদর্শন করে তাদের ভুত-প্রেত ও গুণিনতন্ত্রে বিশ্বাস, হত্যাযজ্ঞ, ব্যভিচার এবং আরো অনেক অসামাজিক কাজের মত অন্ধকার থেকে বের করে আলোয় নিয়ে আসেন। তিনি বুদ্ধের শিক্ষাদানের ভিতর দিয়ে তাদের মধ্যে নতুন মূল্যবোধের সৃষ্টি করেন।

তিব্বতের থোল নামক একটি জায়গায় প্রবল বন্যায় স্থানীয় জনগণ খুব কষ্ট করতো। নানা জ্ঞানে পন্ডিত অতীশ দীপংকর তাঁর প্রকৌশল জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সেখানে একটি বাঁধ নির্মান করে বন্যা প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা করেন। খাল খনন করে কৃষিতে সেচের ব্যবস্থা করেন, এবং এর ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। তিনি জনস্বার্থে চিকিৎসা শাস্ত্রের উপরও কিছু গ্রন্থ (treatises) রচনা করেন। এভাবে তিব্বতের সমাজে এক নবযুগের সূচনা হয়।

 

বাংলার সাধুদের মত শ্রীজ্ঞান অতীশ বিস্তৃত প্রত্যন্ত অঞ্চলে গীত ও পদের মাধ্যমে ধর্ম প্রচার করে তিব্বতের মানুষদের হৃদয় জয় করে নেন। অতীশ রচিত পদাবলী ‘বজ্রাসনা বজ্রগীতি (‘Vajrasana Vajragiti’), ‘চর্যাগীতি (‘Charyagiti’)’ এবং বজ্রযোগিনী স্তোত্র (‘Vajrayogini Stotra’) তিনি উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর প্রিয় জন্মভূমি বাংলার স্মৃতির প্রতি। আধ্যাত্মিক এই গীতিগুলি ছিলো নির্মল বাংলা ভাষায় রচিত। তবে বাংলা রূপগুলো হারিয়ে গিয়েছে শুধু এগুলির তিব্বতী অনুবাদগুলো টিকে আছে তানজুর (Tanjur) নামক গ্রন্থে। এই পদগুলিতে রয়েছে গৌতম বুদ্ধের বাণী। কোপ্পেন (Koppen) নামক একজন জার্মান পন্ডিত ১৮৫৯ সালে প্রকাশ করেন  অগণ্য-সংস্কারমুক্ত অতীশ দীপংকরের মহত্বকে, যিনি তাঁর গীত ও পদকে তাঁর দার্শনিক চিন্তাধারার যান হিসাবে ব্যবহার করে তিব্বতের মানুষের নৈতিক উন্নয়ন সাধন করেছিলেন।

 

অতীশের ধর্মপ্রচার তিব্বতের মানুষদের আবিষ্ট করে এমনভাবে অনুপ্রানিত করেছিলো যে তারা পেয়েছিলো বৌদ্ধ দর্শন থেকে নিঃসৃত নৈতিকতা ও ধর্মের এক নতুন ধারনা। সেক্ট উপদল নির্বিশেষে হাজার হাজার সন্যাসী অতীশের শিক্ষাকে গ্রহন করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে যে মালভূমির এক সাধারণ রাখালও অতীশের বই সাথে রাখতো। একজন পন্ডিত বলেছেন, “সন্যাসী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, পন্ডিত থেকে শুরু করে সামান্য ব্যাক্তি, এককথায় সকল তিব্বতীর জন্য অতীশ নিয়ে এসেছিলেন নৈতিক বিশুদ্ধতা এবং অপরের জন্য নিস্বার্থ ত্যাগ, পবিত্র জীবন এবং মহাযান শিক্ষার মহান বাণী।” জনতা পেয়েছিলো একজন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মহৎকে যার কথা ও কাজে কোন অমিল ছিলনা।

 

ধর্ম প্রচারের ফাঁকে ফাঁকে তিনি ধ্যেনেও নিমগ্ন হতেন, পাশাপাশি সাহিত্যকর্মও করতেন। তিনি ৭৯টি বই লিখেছেন বলে জানা যায়। তাঁর গ্রন্থগুলোকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে, তন্ত্র (Tantra), প্রাজনাপরমিতা (Prajnaparamita), মাধায়ামিকা (Madhayamika) এবং কমেটারি (cometary)।

 

শ্রীজ্ঞান অতীশ বাংলাদেশ ও প্রাচীন ভারতের সাথে তিব্বত, চীন ও উত্তর এশিয় দেশগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরী করেন। একজন পন্ডিত বলেছেন যে, বৌদ্ধ ধর্ম যে তিব্বতের রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয়েছে এর পিছনে অতীশ দীপংকরের অবদান রয়েছে।

 

 

অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতের বিভিন্ন অংশে ভ্রমণ করেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিনি তিব্বতী বৌদ্ধধর্মে প্রবিষ্ট তান্ত্রিক পন্থার অপসারণের চেষ্টা করে বিশুদ্ধ মহাযান মতবাদের প্রচার করেন। বোধিপথপ্রদীপ রচনাকে ভিত্তি করে তিব্বতে ব্কা’-গ্দাম্স নামে এক ধর্ম সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়।

 

দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা, অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। তিব্বতের ধর্ম, রাজনীতি, জীবনী, স্তোত্রনামাসহ তাঞ্জুর নামে বিশাল এক শাস্ত্রগ্রন্থ সংকলন করেন। বৌদ্ধ শাস্ত্র, চিকিৎসা বিদ্যা এবং কারিগরি বিদ্যা বিষয়ে তিব্বতী ভাষায় অনেক গ্রন্থ রচনা করেন বলে তিব্বতীরা তাকে অতীশ উপাধীতে ভূষিত করে। অতীশ দীপঙ্কর অনেক সংস্কৃত এবং পালি বই তিব্বতী ভাষায় অনুবাদ করেন। দীপঙ্করের রচিত গ্রন্থগলির মধ্যে বোধিপথপ্রদীপ, চর্যাসংগ্রহপ্রদীপ, সত্যদ্বয়াবতার, মধ্যমোপদেশ, সংগ্রহগর্ভ, হৃদয়নিশ্চিন্ত, বোধিসত্ত্বমণ্যাবলী, বোধিসত্ত্বকর্মাদিমার্গাবতার, শরণাগতাদেশ, মহযানপথসাধনবর্ণসংগ্রহ, শুভার্থসমুচ্চয়োপদেশ, দশকুশলকর্মোপদেশ, কর্মবিভঙ্গ, সমাধিসম্ভবপরিবর্ত, লোকোত্তরসপ্তকবিধি, গুহ্যক্রিয়াকর্ম, চিত্তোৎপাদসম্বরবিধিকর্ম, শিক্ষাসমুচ্চয় অভিসময় ও বিমলরত্নলেখনা উল্লেখযোগ্য। বিখ্যাত পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং ইতালির বিখ্যাত গবেষক গ্যুসেপ তুচ্চি দীপঙ্করের অনেকগুলো বই আবিস্কার করেন।

 

তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মে সংস্কারের মতো শ্রমসাধ্য কাজ করতে করতে দীপঙ্করের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে ১০৫৪ খৃস্টাব্দে ৭৩ বছর বয়সে তিব্বতের লাসা নগরের কাছে চে-থঙের দ্রোলমা লাখাং তারা মন্দিরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে পরাশক্তি চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন হলে, জিয়া বাংলার সন্তান অতীশ দীপংকরের দেহভস্ম পাওয়ার জন্য চীন সরকারের কাছে অনুরোধ জানান। নতুন এই সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চীন তা দিতে রাজি হয়। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে শিল্পকলা এ্যাকাডেমীর মহাপরিচালক জনাব আসাফ-উদ-দৌলা-র নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল চীন গমন করেন। সেখানে এক রাজকীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১৬ই জুন তাদের হাতে এই ভস্ম তুলে দেয়া হয়। অবশেষে  ২৮শে  জুন, ১৯৭৮-এ এই ভস্ম নিয়ে প্রতিনিধি দলটি ঢাকায় আসে। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধবিহারে তা সংরক্ষিত আছে।

 

(চলবে)

৮৮৬ বার দেখা হয়েছে

৭ টি মন্তব্য : “‘ওম মনিপদ্মে হুম’ – পর্ব ৩”

  1. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    ভাইয়া,

    বেশ ভালো লাগছে আপনার এই সিরিজটা।

    বেশ দরকারি, কিন্তু উপেক্ষিত একটা দিক। চালিয়ে যান।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।