গ্রিসের সাত প্রাজ্ঞ ব্যক্তি

গ্রিসের সাত প্রাজ্ঞ ব্যক্তি (Seven Sages of Greece)
———————————– ড. রমিত আজাদ (Dr. Ramit Azad)

গ্রিসের সাত প্রাজ্ঞ ব্যক্তি (Greek: οἱ ἑπτὰ σοφοί, hoi hepta sophoi; c. 620 – 550 BC) খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গ্রিসের সাতজন প্রাজ্ঞ-কে এই উপাধী দেয়া হয়েছিলো। তাদের কেউ ছিলেন দার্শনিক, কেউ রাষ্ট্রনায়ক আবার কেউ ছিলেন আইন-প্রণেতা। স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা প্রদর্শন করার জন্য তাঁরা এই খেতাব পেয়েছিলেন।
প্রথাগতভাবে, সাত ঋষির প্রত্যেকে পার্থিব জ্ঞানের কোন একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিনিধিত্ব করেন যা আবার সারসংক্ষেপ করা হয়েছে কিছু নীতিবচন (aphorism) দ্বারা। এই তালিকার কিছু হেরফের থাকলেও বহুল প্রচলিতদের তালিকাটিই নিচে দেয়া হলো।

ক্লিওবুলাস (লিন্ডোস-এর ক্লিওবুলাস (/ˌklioʊˈbjuːləs, kliˈɒbjələs/; Greek: Κλεόβουλος, Kleoboulos; খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক): স্বেচ্ছাচারী শাসক (Tyrant) হিসাবে তিনি গ্রিসের রোডস দ্বীপ শাসন করেছিলেন। তিনি দৃশ্যত গীতধর্মী কবিতা লিখেছেন পাশাপাশি হেঁয়ালি-ও লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নীতিবচন হলো – “সংযম (মিতাচার) অবলম্বন করাই সর্বত্তোম পন্থা” “শোনা প্রয়োজন, কিন্তু আড়ি পাতা ঠিক না”, “বলপ্রয়োগ করে কিছু করা ঠিক নয়”, “নিজ স্ত্রীকে অন্যের সম্মুখে ভর্ৎসনা (অবমাননা) করনা অথবা আদর করোনা: প্রথমটি অভদ্রতা আর দ্বিতীয়টি অপরের মনে ক্রোধের সঞ্চার করতে পারে”, “দরিদ্র বা এই জাতীয় কাউকে অবজ্ঞা করোনা”, “বলা অপেক্ষা শোনা উত্তম”, “বিবাদের পরে পুনর্মিলনের জন্য প্রস্তুত হন”, “অস্থির অথবা অকৃতজ্ঞ হবেন না”।

সোলোন (এথেন্সের সোলোন; /ˈsoʊlɒn, ˈsoʊlən/; Greek: Σόλων, জন্ম ৬৩৮ খ্রীষ্টপূর্বে আর মৃত্যু ৫৫৮ খ্রীষ্টপূর্বে): এথেন্স-এর একজন খ্যাতিমান সমাজ সংস্কারক ছিলেন, তিনিই প্রথম এথেন্সের গণতন্ত্রের রূপদান করেছিলেন। সেই সময়টাতে গ্রীকদের বুদ্ধিবৃত্তিক চমৎকারিত্বের শুরু হয়ে গেছে। আর সে কারণেই হয়ত তিনি পুরাতন ধ্যান-ধারনাকে চ্যালেঞ্জ করতে পিছপা ছিলেন না । সোলনের নীতিবচন-এর মধ্যে একটি হলো “Meden Agan” বা “কোনকিছুরই অতিরিক্ত নয়” (“সবকিছুই পরিমিতাচার-এর মধ্যে রাখুন” )। সোলোন একজন কবি ছিলেন, তার রচিত কবিতাগুলো বর্তমানকাল পর্যন্ত সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন কবি আরেকদিকে ছিলেন আইন-প্রনেতা। তাই আবেগ ও যুক্তির এক অদ্ভুত সমন্বয় ছিলো তার মধ্যে। এথেন্সের সবচাইতে সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলির একটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কিন্তু তার বাবা পারিবারিক সম্পত্তির পুরোটাই নষ্ট করে ফেলেন। ফলে বিত্ত বৈভব আগের মত না থাকলেও তিনি ছোটখাটো একজন জাহাজ মালিক হতে পেরেছিলেন। তখনকার গ্রীসের সাতজন জ্ঞানী মানুষের একজন হিসাবে সোলোন পরিচিতি লাভ করেন।

চিলোন (স্পার্টার চিলোন, /ˈkaɪlən, ˈkaɪlɒn/; Χίλων or Χείλων; খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক): তিনি স্পার্টার রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি স্পার্টার সমাজকে সামরিকীকরণ করেছিলেন। তাঁর নীতিবচনগুলো হলো, “অসাধ্য কোন কিছুর আকাঙ্খা করবেন না”, “মৃত মানুষের নিন্দা করবেন না”, “বয়োজেষ্ঠ্যদের সম্মান করুন”, “দুর্ভাগা মানুষকে উপহাস করবেন না”, “আপনি শক্তিশালী ব্যক্তি হলে ক্ষমাশীল হন, তাহলে আপনার প্রতিবেশী আপনাকে ভয় না করে সম্মান করবে”, “ক্রোধকে অবদমন করুন”, “আইন মেনে চলুন”।

বিয়াস (প্রিয়েনের বিয়াস, /ˈbaɪəs/; Greek: Βίας ὁ Πριηνεύς; ষষ্ঠ শতক): তিনি রাজনীতিবিদ ও আইন-প্রণেতা ছিলেন। তিনি তার সততার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তার নীতিবচন গুলো হলো – “সর্বত্রই দুষ্ট মানুষের সংখ্যাই বেশি”, “সহজ-সরল মানুষ সহজেই প্রতারিত হয়”, “সব মানুষই পাপী”, “দূরদর্শিতা-কে ভালোবাসুন”, “একজন ধনী ব্যাক্তি যদি অযোগ্য হয়, কেবলমাত্র ধনসম্পদ আছে এই কারণে তার প্রশংসা করবেন না”, “যৌবনকাল থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত জ্ঞান-কে লালন করুন কারণ এইটিই একমাত্র সম্পদ যা চিরকাল থাকবে”, “তাড়াহুড়ো করে কথা বলবেন না, এটা মুর্খতা”, “জোর করে কিছু নেবেন না, অনুনয় করে নিন”, “শুনবেন বেশি, বলবেন সময় ও সুযোগ মতো”, “আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখুন, যদি সেখানে নিজেকে সুন্দর দেখেন তাহলে সুন্দর সুন্দর কাজ করতে থাকেন, আর যদি সেখানে নিজেকে অসুন্দর দেখেন তাহলে নিজেকে শুদ্ধ করুন”, “যা কিছু মঙ্গলময় আপনি পেলেন, বুঝে নেবেন যে তা দৈব থেকে পেয়েছেন”।

থেলিস (মিলেটাসের থালেস, Thales of Miletus (/ˈθeɪliːz/; Greek : Θαλῆς (ὁ Μιλήσιος) ; খ্রীষ্টপূর্ব ৬২৪ – খ্রীষ্টপূর্ব ৫৪৬) : তাঁকেই গ্রিসের প্রথম দার্শনিক ধরা হয়। সেই হিসাবে তিনিই পাশ্চাত্য দর্শনের জনক। তিনি পিথাগোরাসের শিক্ষক ছিলেন। থেলিসের উপদেশ ‘নিজেকে জানো’ (Know thyself), ডেলফি-র এ্যাপোলোর মন্দিরের সদরের বহির্ভাগে খোদাই করা আছে।

পিটাকাস (মিটিলেনের পিটাকাস,ˈpɪtəkəs/; Greek: Πιττακός; খ্রীষ্টপূর্ব ৬৪০ থেকে খ্রীষ্টপূর্ব ৫৬৮): তিনি মিরসিলাস-এর সাথে একত্রে মিটিলেন পরিচালনা করতেন। তিনি রাষ্ট্রে অভিজাতদের ক্ষমতা হ্রাস করার চেষ্টা করেন। তিনি সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তার জনপ্রিয় নীতিবচনগুলো হলো, “আপনাকে বুঝতে হবে, কোন সুযোগটি গ্রহন করতে হবে”, “প্রতিশোধের চাইতে ক্ষমাই উত্তম”, “আপনি যাই করুন না কেন, সেটা ভালোভাবে করুন”, “ক্ষমতা মানুষকে চিনিয়ে দেয়”, “সবার প্রিয় হবার চেষ্টা করুন”, “কোন কাজ করার আগে কারো কাছে প্রকাশ করবেন না, কারণ যদি আপনি ব্যর্থ হন তাহলে লোকে উপহাস করবে”, “শুধু আপনাদের বন্ধুদের ক্ষেত্রে নয়, শত্রুদের নিন্দা থেকেও বিরত থাকুন”, “সত্য, সরল বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা, বুদ্ধিমত্তা, সামাজিকতা ও পরিশ্রমের চর্চা করুন”।

পেরিয়ান্ডার (করিন্থের পেরিয়ান্ডার, /ˌpɛriˈændər/; Greek: Περίανδρος; খ্রীষ্টপূর্ব ৫৮৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন): তিনি করিন্থের স্বেচ্ছাচারী শাসক (Tyrant) ছিলেন। তাঁর শাসনামলে করিন্থে স্বর্ণযুগ ছিলো, ছিলো অভূতপূর্ব স্থিতিশিলতা। তার জনপ্রিয় নীতিবচনগুলো হলো – “সবকিছুতেই দূরদর্শিতা থাকা উচিৎ”, “টাকার জন্য কখনো কিছু করবেন না, লাভের দিকে লাভই খেয়াল রাখুক”, “যিনি শান্তিতে রাষ্ট্র শাসন করতে চান, তার উচিৎ হবে অস্ত্রের জোরে নয় বরং জনতার ভালোবাসার জোরে নিজেকে রক্ষা করা”,
“স্বৈরাচারের চাইতে জনতার ক্ষমতা অনেক বেশী মজবুত”,”হঠকারিতার পরিনতিতে বিপদ আছে”, “স্বৈরাচারের চাইতে গণতন্ত্র ভালো”, “ভোগসুখ ক্ষণস্থায়ী, সম্মান চিরস্থায়ী”, “সমৃদ্ধিতে হন পরিমিত, আর অবনতিতে হন দুরদর্শী”, “আপনার বন্ধুর সুসময় ও দুঃসময় উভয় সময়েই তার প্রতি সম আচরণ করুন”, “যেই চুক্তিই করুন না কেন, তার হেরফের করবেন না”, “গোপনীয়তা প্রকাশ করবেন না”, “শুধু অপরাধীকেই নয়, অপরাধ মনস্থকারীকেও শুধরে দিন”, “অনুশীলন নিখুঁত করে তোলে”, “অধ্যবসায় করলে সবকিছুই সম্ভব”, “আয় বুঝে ব্যায় করুন”, “যা পায়নি তার জন্য মন সবসময়ই পোড়ে, এবং মন সবসময়ই অতীতে হারিয়ে যায়”, “পাপিষ্ঠকে যে সহযোগিতা করেছে একসময় তার অনুতাপ হবে”, “একবার যে অসৎ ও অনৈতিক কাজ করেছে, পরবর্তিতে সৎ কাজ করলেও টার কোন সুনাম হবেনা”, “আপনার অবস্থান যত সুউচ্চই হোক না কেন, দীন-হীনের ক্ষমতাকে কখনোই অবজ্ঞার চোখে দেখবেন না”, “একটি গাছকে তার ফল দিয়ে বিচার করুন, তার পাতা দিয়ে নয়”, “মিথ্যাবাদীরা তাদের অপকর্মের দন্ড দিয়ে থাকে”, “সাফল্য অনেকের জীবনেই ধ্বংস ডেকে আনে”, “দুষ্ট লোকের মিস্ট কথা শঠতায় ভরপুর”, “অসৎ লোকের সাফল্য অনেককেই পাপকার্যের দিকে আকৃষ্ট করে”, “যারা অন্যের সর্বনাশ করার পরিকল্পনা করে, প্রায়শঃই তারা প্রচেষ্টার শুরুতেই ধ্বংস হয়ে যায়”, “বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য ভালো যদি তা সময়মতো বলা হয়, অসময়ে বা অজায়গায় বললে তা আক্রমণাত্মক হয়ে যেতে পারে”, “হিতকর ও সুন্দর এই দুইকে পরস্পর থেকে পৃথক করা যায় না”।

৫৯৪ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “গ্রিসের সাত প্রাজ্ঞ ব্যক্তি”

মওন্তব্য করুন : নাফিস (২০০৪-১০)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।