অতি দূর থেকে দেখা একজন হুমায়ুন আহমেদ

অতি দূর থেকে দেখা একজন হুমায়ুন আহমেদ
——————————————— ডঃ রমিত আজাদ

হুমায়ুন আহমেদ নামটার সাথে প্রথম পরিচয় ঘটে আমাদের পারিবারিক লাইব্রেরীতে। তিন জেনারেশন ধরে গড়ে তোলা মোটামুটি বড়সড় একটা লাইব্রেরী ছিলো আমাদের বাড়ীতে। ছোটবেলা থেকেই এই লাইব্রেরীটি ছিলো আমার জ্ঞান আহরণ ও বই পড়ে আনন্দ পাওয়ার একটা ভালো যায়গা। প্রায়ই অবসর সময়ে ওখান থেকে কোন একটা বই টেনে নিয়ে পড়তাম। একদিন সেখান থেকে টেনে নিলাম একটা বই, যার উপরে বইয়ের নাম লেখা ছিলো ‘নন্দিত নরকে’, আর তার পাশাপাশি লেখা ছিলো আরেকটি নাম, ‘হুমায়ুন আহমেদ’। তখন বছর বারো বয়স হবে আমার, ঐ বয়সেই বইটি পড়ে আমি অভিভুত হয়েছিলাম। বই পড়া শেষ হলে আরেকবার লেখকের নাম পড়লাম, ‘হুমায়ুন আহমেদ’। নামটি তখনও খুব বেশী পরিচিত হয়ে ওঠেনি।

তার কিছুকাল পরে আরেকটি উপন্যাস পড়লাম কোন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায়, ‘সবাই গেছে বনে’। পুরো উপন্যাসটা শেষ করে আমার মন আবেগ আপ্লুত হয়েছিলো (আমার জীবনে এই উপন্যাসটির প্রভাব রয়েছে)। নির্ঝন্ঝাট ভদ্র বাঙালী ছেলেটি কেমন প্রেমে পড়ে গেলো মালিশা নামের স্ট্রেন্জ এ্যামেরিকান মেয়েটির। ফার্গো শহরটি বরফে ঢেকে কেমন সাদা হয়ে উঠতো। আমেরিকার কালচারে বড় হয়ে ওঠা এ্যামেরিকান বর্ন বাঙালী মেয়েটি হোয়াইট যুবকটিকে ভালোবেসে কেমন ঘর ছেড়েছিলো! তরুণ-তরুণীদের মনে কি এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগে, তখন তাদের আর ভালো লাগেনা এই বাধা ধরা গতানুগতিক জীবন। তাদের বনে যেতে ইচ্ছে করে। সব কিছুই মনে দাগ কাটার মতো! পাতা উল্টে পিছনে ফিরে লেখকের নাম পড়লাম, ‘হুমায়ুন আহমেদ’। সেই থেকে উনার ভক্ত হয়ে গেলাম।

ক্যাডেট কলেজে পড়ার কারণে উইক এন্ড ছাড়া টেলিভিশন দেখার সৌভাগ্য হতোনা। একবার ছুটিতে বাড়ী ফিরে শুনলাম একটি ধারাবাহিক নাটক খুব হিট করেছে। কি নাম নাটকের? সবাই বললো, ‘এই সব দিনরাত্রী’। নির্দিষ্ট দিনে বসে গেলাম টিভি সেটের সামনে, নাটকের শেষে বললো, ‘ —– আশা আনন্দ দুঃখ বেদনা এই সবকিছু নিয়ে আমাদের এই সব দিনরাত্রী’। নাটক দেখা শেষ হলে আপন মনেই বললাম, “বাহ্‌ বেশতো!”। পাশাপাশি এই মনে করেও মন খারাপ হয়ে গেলো, ভ্যাকেশন শেষ হলে তো আর নাটকটি দেখা হবে না। আদর্শবান অধ্যাপকের দুই ছেলে এক মেয়ে, টুনি, যাদুকর, ফানি সাদেক আলী, আবুল খায়েরের ‘সুখী নীলগন্জ’। সবকিছু মিলিয়ে দারুণ লেগেছিলো নাটকটি। আমাদের বাংলার অধ্যাপক প্রিন্সিপাল বলেছিলেন, ” এই নাটকে কাহীনি কিছু আছে কিনা আমি জানিনা, তবে দেখলে মনে হয় অবিকল আমার ঘরের ভিতর সবকিছু ঘটছে!”

এরপর থেকে ‘হুমায়ুন আহমেদ’-এর যেকোন বই হাতে এলেই পড়তাম, বাদ দিতাম না। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ উপন্যাসটিও মনে দাগ কেটেছিলো ভীষণ। আরো ভালো লেগেছিলো যখন জানলাম, উপন্যাসটির নাম ‘হুমায়ুন আহমেদ’-এর দেয়া না, নামটি দিয়েছিলেন আমার প্রিয় শিক্ষক রফিক কায়সার – বাংলা সাহিত্যের জগতে আরেকটি নক্ষত্র।

গোগ্রাসে গিলেছিলাম ‘হুমায়ুন আহমেদ’-এর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনিগুলো। এর আগে পড়তাম সত্যজিৎ রায়ের প্রফেসর শঙ্কুর কাহীনি। পরে বুঝতে পেরেছিলাম, ঐ লেখাগুলো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ছিলো না, ছিলো রূপকথা। এছাড়া রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনিরও আমি একান্ত ভক্ত ছিলাম। এগুলোই ছিলো সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনি। বাংলা ভাষায় প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনি লেখেন ‘হুমায়ুন আহমেদ’। অবশ্য তিনি নিজে স্বীকার করেছিলেন যে, রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনি পড়েই তিনি অনুপ্রানিত হয়ে বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনি লিখতে শুরু করেন। ‘হুমায়ুন আহমেদ’-এর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনি ‘ইরিনা’ ও ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’-র প্রতিটি পংক্তি আমার এখনো মনে আছে। আমার অনেক বিদেশী বন্ধুদের আমি শুনিয়েছিলাম এই গল্পদুটো। তারাও প্রশংসা করেছিলো। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কোন এক ক্রিস্টালোগ্রাফীর ক্লাসে, লেকচার শোনা শিকেয় তুলে দিয়ে, আমার পাশে বসে থাকা ইউক্রেণীয় সহপাঠিনীকে শুনিয়েছিলাম ‘ইরিনা’ গল্পটি। সেও প্রবল আগ্রহ নিয়ে পুরো গল্পটা শুনেছিলো।

মহান মুক্তিযু্দ্ধ নিয়ে তাঁর লেখা যেই গল্পটি আমার সবচাইতে বেশী ভালো লেগেছিলো সেটি হলো, ‘সৌরভ’। স্বাধীনতার চমৎকার একটি সংজ্ঞা সেখানে দেয়া ছিলো। আমার বড় বোন রেডিও বাংলাদেশে প্রচারিত ‘সৌরভ’ নাটকটিতে অভিনয় করেছিলেন। আমার বড় বোনকে হুমায়ুন আহমেদ বলেছিলেন তার নিজের লেখা উপন্যাসগুলোর মধ্যে তার সবচাইতে প্রিয় ‘সৌরভ’।

১৯৮৮ বিটিভিতে শুরু হলো একটি ধারাবাহিক নাটক, ‘বহুব্রীহি’। একথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, সেই সময় এই নাটকটিই ছিলো সেরা। নির্দিষ্ট দিনে টিভি সেটের সামনে বসতো পুরো বাংলাদেশ। হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে আমাদের সমাজের অনেক বাস্তব চিত্র তিনি সেখানে তুলে ধরেছিলেন। নাটকটির অনেক ডায়লগ এখনো আমাদের জেনারেশনের মুখে মুখে ফেরে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যখন কোচিং-এ ভর্তি হয়েছি। সেখানে কেমিস্ট্রির ক্লাস নিতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের একজন সিনিয়ার ছাত্র। তিনি একদিন বললেন, ” হুমায়ুন আহমেদ আমাদের শিক্ষক তোমরা জানোতো? তো একদিন একটা অনুষ্ঠানে আমরা উনাকে রিকোয়েস্ট করেছিলাম, আমাদেরকে উনার জীবনের দুয়েকটা মজার ঘটনা বলতে ও তারপর উনার নাটকের দুয়েকটা ডায়লগ বলতে। তা উনি উনার জীবনের দুয়েকটা মজার ঘটনা যা বললেন তাতে আর নাটকের ডায়লগের প্রয়োজন হলোনা।” আমরা প্রশ্ন করলাম, “কি বললেন তিনি?” সিনিয়র ছাত্রটি বললেন, ” হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন যে, তার সময়ে ভালো ছাত্ররা ভর্তি হতো ইকোনমিক্সে। তিনি নিজেকে ভালো ছাত্র মনে করতেন, এবং তিনিও প্রথমে ইকোনমিক্সেই ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর একদিন তিনি বেড়াতে এলেন কার্জন হলে। আর সেখানে হঠাৎ দেখলেন একজন অধ্যাপককে। অপূর্ব সুন্দর দেখতে সেই অধ্যাপক একেবারে প্রিন্সের মতো! সেই দেখেই তিনি ইকোনমিক্স ছেড়ে কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়ে গেলেন। তারপরে ডিপার্টমেন্টে বায়োডাটা ফিল আপ করার সময় সখের জায়গায় তিনি চট করে লিখে দিলেন যে, তিনি ম্যাজিক জানেন। নিছক কৌতুক করেই লিখেছিলেন। বুঝতে পারেননি কি অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। কিছুদিন পরে তিনি ডিপার্টমেন্ট থেকে একটা চিঠি পেলেন যে, টিএসসি-র এক অনুষ্ঠানে তাঁকে ম্যাজিক দেখাতে হবে। এবার ফাঁপরে পড়লেন তিনি। ম্যাজিক তো আসলে তিনি জানেন না, কি রে দেখাবেন? আবার স্যারের কাছে গিয়ে তা বললে উল্টা ধমক খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কি করা যায়, কি করা যায়? ব্যাস ঘুরতে শুরু করলেন ম্যাজিশিয়ানদের পিছনে পিছনে। বেশ কিছু খরচ করার পর এক ম্যাজিশিয়ান তাঁকে তিনটি ম্যাজিক শেখালো। এখন পর্যন্ত ঐ তিনটি ম্যাজিকই তিনি জানেন।

কয়েকদিন পরে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট-এর অধ্যাপক ছিলেন তিনি। আমরা বন্ধুরা মনে মনে খুব চাইছিলাম হুমায়ুন আহমেদ-কে এক নজর দেখতে। সৌভাগ্য হলো, কার্জন হলের বারান্দায় দূর থেকে দেখলাম কিংবদন্তির লেখক হুমায়ুন আহমেদ-কে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বলতে দেবতাতুল্য কিছু একটা মনে করতাম তখন, তার উপর খ্যাতিমান লেখক! ঐ কাঁচা বয়সের সংকোচের কারণে কাছে গিয়ে কথা বলা আর হয়নি। অতি দূর থেকেই দেখা হলো কেবল।

এরপর বিদেশে চলে যাই। উনার নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’ সেখানে বসে ভিডিওতে দেখেছিলাম। বই-পত্র হাতে এলে পড়তাম। উনার একটা বই সবসময় আমার সাথেই রাখতাম, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনি -১। মন খারাপ লাগলে ঐ বইটা পড়ে মনটা হাল্কা করতাম। বিদেশে থাকতেই মিসির আলী সংক্রান্ত বইগুলো হাতে এসেছিলো। বিদেশে থাকার কারণে ওখানকার ফিল্ম ও লেখার কল্যাণে ঐ জাতীয় কাহিনীর সাথে আগে থেকেই পরিচিত ছিলাম, তবে বাংলা সাহিত্যে মিসির আলী টাইপ চরিত্র হুমায়ুন আহমেদই প্রথম ইনট্রোডিউস করেছিলেন। তাছাড়া ছিলো হিমু। মিসির আলী-র একেবারেই বিপরীত। খুব সম্ভবতঃ ফিলোসফি অফ একসিসটেনসিয়ালিজম-এর প্রতিগলন রয়েছে সেখানে। কেবল লেখকই নয়, তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার। একসাথে এতগুলো গুনের সমন্বয় বাংলা সাহিত্যে খুব কম লেখকেরই ছিলো। আবার হুমায়ুন আহমেদ পাশাপাশি একজন বিজ্ঞানীও ছিলেন ।

হুমায়ুন আহমেদ উদ্ভট জিনিস পছন্দ করতেন তাই অতিবাস্তব ঘটনাবলী নিয়ে তিনি অনেক লিখেছিলেন। তাঁর এই লেখাগুলো আমি বেশ উপভোগ করেছি (দেবী, নিশিথিনী, ইত্যাদি) ।

হুমায়ুন আহমেদ পরিচালিত ছায়াছবি ‘আগুনের পরশমনি’ আমার এতো ভালো লেগেছিলো যে আমি নিজ উদ্যোগ নিয়ে মস্কোতে ছবিটি আমাদের বিজয় দিবসে বড় পর্দায় দেখিয়েছিলাম। বিদেশী বন্ধুরাও প্রশংসা করেছিলো ছবিটির।

ভ্যাকেশনে একবার দেশে এসে শুনলাম আমার বড় ভাই উনার ‘নক্ষত্রের রাত’ ধারাবাহিক নাটকটিতে অভিনয় করেছেন। ভাইকে বললাম, “আপনার সাথে তো হুমায়ুন আহমেদ-এর খুব ভালো সম্পর্ক, আমার সাথে একবার পরিচয় করিয়ে দেবেন?” “দেবো অবশ্যই, একটু সময় করে নেই, তারপর তোকে বলবো”, বললেন বড় ভাই। অপেক্ষায় রইলাম, কিন্তু নানা কারণে আর হলোনা।

একবারে যখন দেশে ফিরলাম, তখন নিজের অধ্যাপনা নিয়েই ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম। মনের অনেক ছোট ছোট ইচ্ছাই আর ব্যাস্ততার কারণে পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এমন একটি ইচ্ছা ছিলো কিংবদন্তির লেখক হুমায়ুন আহমেদ-এর সাথে সাক্ষাৎ। দেখা হলে বলতাম, “আপনার অনেক লেখার প্রভাব আমার জীবনে রয়েছে।”

তারপর গত বৎসর ১৯শে জুলাই তিনি হঠাৎ করেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন অজানার দেশে। কাছ থেকে তাঁকে আমার আর দেখা হলোনা। অতি দূর থেকে দেখা হুমায়ুন আহমেদ দূরেই রয়ে গেলেন। তিনি কোথায় গেলেন? বহুব্রীহি নাটকের একটি সংলাপ আছে, “কোথায় যে গেলেন, এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে পৃথিবীতে যে নেই এটা বেশ বুঝতে পারছি।”

৯৩৮ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “অতি দূর থেকে দেখা একজন হুমায়ুন আহমেদ”

  1. সামিউল(২০০৪-১০)

    হুমায়ুন আহমেদ এর সাথে পরিচয় আমার বাবার কাছে। তার প্রিয় নাট্যকার ছিলেন হুমায়ুন আহমেদ।
    টিভিতে উনার পরিচালিত কোন নাটক হলেই বাসার সবাই মিলে বসে দেখা হত।
    এরপর ক্লাস সেভেনে কলেজের হাউজ লাইব্রেরীর জন্য বই আনতে বলেন ভাইয়ারা। আমার জন্য ছিল "যদিও সন্ধ্যা" -হুমায়ুন আহমেদ। ওটাই তাঁর লেখা আমার প্রথম বই।

    এরপর কতদিন গেছে, তাঁর লেখা প্রায় সবগুলো না হলেও অন্তত ৭০% বইই পড়েছি।
    কৈশোরের সময়গুলো অনেক ভাল কেটেছে তাঁর জন্য। (সম্পাদিত)


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন
  2. হারুন (৮৫-৯১)

    রমিত ভাই, বিড়াল বুড়ো হলেও নাকি ইঁদুর ধরার স্বভাব যায় না।

    “ও একটা নিকৃষ্ট শ্রেণীর লেখক। সেভেন এইটে পড়া মেয়েদের আবেগ হচ্ছে ওর পুঁজি। এই নিয়ে সে ব্যবসা করে। ছবি বানায়। ডঃ আহমদ শরীফের একটা সার্টিফিকেট নিয়ে সে লেখক বনে গেছে। সাংবাদিকরা তাকে নিয়ে মাতামাতি করায় তার সুবিধা হয়েছে। এধরনের লেখকদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি পাবার পথ হচ্ছে এদের এড়িয়ে চলা। এদের সম্পর্কে মন্তব্য না করা। ওর লেখার সাহিত্য মান নিয়ে আলোচনার প্রশ্নই উঠেনা”- হুমায়ুন আজাদ

    “আমি সব কথা খোলাখুলি বলব না। আমি একজন শিল্পী। শিল্পীরা সব কথা খোলাখুলি বলেনা। তারা কভার ব্যবহার করেন। বিবাহিত জীবনের বাইরে আমার কারো সাথে প্লেটোনিক লাভ থাকতে পারে। তার বয়স আমার থেকে ৩০ বছর কম হতে পারে। প্লেটোনিক লাভে তো দোষের কিছু নেই”- হুমায়ূন আহমেদ


    শুধু যাওয়া আসা শুধু স্রোতে ভাসা..

    জবাব দিন
    • রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

      হারুন ভাই এইটা আপনার জন্য দিলাম যদি কোন কারণে মিস করে থাকেন।
      রায়হান রশিদ ভাই (এফ সি সি ৮৬-৯০) এর ফেবু নোট থেকে
      লিঙ্ক
      লেখক আর তার পাঠকের মধ্যকার সম্পর্কের রসায়নকে আমার সবসময়ই কেমন যেন এক প্রহেলিকা মনে হয়। ঠিক বুঝতে পারি না। কোনো লেখকের রাজনৈতিক-সামাজিক মানস যদি ইতিহাসের উল্টো পথের হয়, তারপরও কি সে লেখককে শুধু তার লেখা দিয়েই বিচার করা উচিত? আবার একেবারে অখাদ্য লেখাকেও কি স্রেফ আমার পছন্দের রাজনীতির লেখকের হাত দিয়ে আসার সুবাদে মাথায় তুলে নাচতে হবে? ম্যানিফেস্টো সামনে রেখে যে লেখক লিখতে বসেন, তিনি ঠিক কেমন লেখক? আবার যে লেখক সযত্নে তার যাপিত সময়ের যন্ত্রণাকে আড়াল করে শুধু মন ভোলানো নরোম নরোম কথাগুলোই লিখে রেখে যেতে চান তাকেই বা আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করবো? জানি 'কালজয়ী লেখা' হল কালকে অতিক্রম করা লেখা। কিন্তু সময়কে যে লেখক কোনদিন ধারণই করেননি, বরং দরজা জানালা বন্ধ করে তার থেকে নিজেকে আড়াল করেছেন, তিনি কিভাবে শুধু লেখনী দিয়ে সময়কে অতিক্রম করেন? সেটা কি আদৌ সম্ভব? জানি, এমন অনেকেই আছেন যারা 'কালের যাত্রার ধ্বনি' শুনতে পান। তারা সাহিত্য থেকে শুরু করে সব কিছুর মধ্যে 'সাধারণ তুচ্ছ বিষয়গুলো' কোনো এক বিশেষ ক্ষমতাবলে অগ্রাহ্য করতে পারেন, পারেন সবকিছুকে 'অসীম ক্ষমায়' দেখতে। কারণ, সম্ভবত, তারা মহাকালের অমোঘ পদধ্বনি শোনার জন্য মস্তিষ্ক এবং কর্ণদ্বয়কে সেভাবে প্রশিক্ষিত করতে পেরেছেন।

      আমি পারিনি। এই যেমন - জামাতি কবি আল মাহমুদ যত বড়ো প্রতিভাধর কবিই হোন না কেন, আমার আর তাকে আগ্রহ নিয়ে পড়া হয় না। একে আমার মননের সীমাবদ্ধতা বলবেন কেউ কেউ, কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাটুকু নিয়েই বাঁচতে চাই। মাঝে মাঝে ভাবি, জাতি হিসেবে আমাদের ভুলে যাওয়ার ক্ষমতার সাথে বুঝি আর কোনো কিছুর তুলনা নেই। আমাদের মুগ্ধতা প্রায়ই সময়কেও কাঁচকলা দেখিয়ে যায়। যাই হোক, আমি নিজেও ভুলে যাওয়ার আগেই নন্দিত এই লেখকের সাক্ষাৎকারটি আরেকবার সবার সাথে পড়ে নিতে চাই। নিচের এই সাক্ষাতকারটি ২০০৮ সালের ১৮ জুলাই দৈনিক সমকাল পত্রিকার উপসম্পাদকীয় পাতায় ছাপা হয়েছিল। আবার এই একই লেখকের কলম দিয়ে অতীতে বেরিয়েছে 'আগুনের পরশমণি', '১৯৭১', 'অনীল বাগচীর একদিন', 'জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প', 'সূর্যের দিন', 'শ্যামল ছায়া'র মতো লেখা। সেই লেখাগুলোর সাথে সাক্ষাৎকারের মানুষটিকে (কিংবা 'দেয়াল' উপন্যাসের লেখককে) মেলাতে পারি না কোনোভাবেই। এখানে কে কাকে গ্রাস করেছে বোঝা মুশকিল। সারা জাতি মিলে যে মানুষটিকে বিদায় জানালো, সে ছিল আসলে কোন্ জন? কারও জানা থাকলে জানিয়ে যাবেন আশা করি।

      অনেকেরই ভাল লাগবে না এই মনে করিয়ে দেয়া। অনেকেই হয়তো প্রয়াত মানুষকে নিয়ে টানাটানির মধ্যে এক ধরণের নিষ্ঠুরতা খুঁজে পাবেন। কিন্তু প্রয়াত হয়ে যাওয়ার পরও এক বিন্দু ছাড় পান না, এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে নেহায়েত কম না। নন্দিত এই লেখকের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই, তাকে শুধু তার লেখা দিয়েই হয়তো বিচার করতাম। কিন্তু তার নিজেরই সময়ের অন্যান্য লেখকদের এবং তাদের ব্যক্তি-রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে করা মন্তব্যগুলো যখন পড়ি - তখন নন্দিত সেই লেখকের পুরো কাজকেই নতুন চোখে বিচার করাটা প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। সে প্রসঙ্গ থেকে গা বাঁচিয়ে চলার কোনো সুযোগ নেই মনে হয়।

      . . .

      প্রশ্ন :আপনি তো মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। আপনার দৃষ্টিতে একাত্তরের মৌলবাদ ও মৌলবাদী এবং বর্তমানের মৌলবাদ ও মৌলবাদীর মধ্যে তফাত কোথায়?

      লেখকের উত্তর : একাত্তরের মৌলবাদ ও মৌলবাদীরা ছিল একটি বিদেশী শক্তি অর্থাৎ পাকিস্তানের অংশ। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের মৌলবাদ ও মৌলবাদীরা কোন বিদেশী শক্তির অংশ নয়। এটাই পার্থক্য। তবে আমাদের এত মৌলবাদী- মৌলবাদী চিৎকার করে কোন লাভ নেই, কারণ বিশ্বের সব দেশেই এখন এসব আছে। ইন্ডিয়ায় আছে বিজেপি, আমেরিকায় আছে ক্লু ক্লাক্স ক্লান – সারা পৃথিবীতেই আছে মৌলবাদী।

      প্রশ্ন : বাংলাদেশে মৌলবাদের সমস্যা কি সমস্যা নয় ? বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়ে বাংলা ভাই,শায়খুল হাদিস, ৬৩টি জেলায় একসঙ্গে বোমাবাজি – এসব কি সমস্যার আওতায় পড়ে না ?

      লেখকের উত্তর : আমি মনে করি না। বাংলাদেশে মৌলবাদের সমস্যা বড় কোন সমস্যা এখনো হয়নি। জনগণ যদি ভোট দিয়ে মৌলবাদীদের নির্বাচন করে, তাহলে গণতান্ত্রিকভাবে তাদের কি বাদ দেয়া যায় ? হোক না তারা মৌলবাদী।

      প্রশ্ন : এ দুর্মূল্যের বাজারে বাংলাদেশের মানুষ এখন কেমন আছে ?

      লেখকের উত্তর: সবাই খুব ভাল আছে। বিশ্বের সব জায়গাতেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। এখনো বাংলাদেশে চালের দাম বিশ্বের যে কোন জায়গার চেয়ে কম।

      প্রশ্ন : বাংলাদেশের বর্তমান সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আপনি কোন্ দৃষ্টিতে দেখেন ?

      লেখকের উত্তর :আমি তাদের খুব ভাল দৃষ্টিতে দেখি। তারা খুব ভাল কাজ করছে।

      প্রশ্ন : বাংলাদেশে জামায়াতের মৌলবাদী রাজনীতি বন্ধ করা উচিত। আপনি কী বলেন ?

      লেখকের উত্তর : আমি কোন রাজনীতি বন্ধ করার পক্ষপাতী নই। সারভাইভ্যাল ফর দ্য ফিটেস্ট। যে ফিটেস্ট সে সারভাইভ করবে। যে আনফিট সে সারভাইভ করবে না।

      প্রশ্ন : বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি সাংবিধানিকভাবে বৈধ ?

      লেখকের উত্তর : তারা যথাসম্ভব সংবিধান মেনে চলেছেন বলে আমার বিশ্বাস।

      প্রশ্ন : কিছুদিন আগে আমেরিকায় একটি অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তসলিমাকে একজন বিতর্কিত লেখিকা বলেছেন। আপনি কি এ ব্যাপারে একমত ?

      লেখকের উত্তর : হ্যাঁ। আমার মনে হয়, উনি একজন বিতর্কিত লেখিকা। কারণ উনার লেখা দিয়ে উনি নিজেই নিজেকে বিতর্কিত করেছেন। তবে তসলিমা নাসরিন যে দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে আছেন, সেজন্য আমি খারাপ বোধ করি। কারণ একজন লেখক তার মাতৃভুমিতে বসবাসের অধিকার রাখে। তসলিমাকে দেশে ফিরতে দেয়া উচিত।

      প্রশ্ন : বাংলাদেশের লেখকরা কি স্বাধীন ?

      লেখকের উত্তর : হ্যাঁ, বাংলাদেশের লেখকরা স্বাধীন।

      প্রশ্ন : তাহলে ড. হুমায়ুন আজাদকে মরতে হলো কেন ?

      লেখকের উত্তর : কারণ, যে বইটা তিনি লিখেছিলেন, তা এতই কুৎসিত যে, যে কেউ বইটা পড়লে আহত হবে। তার জন্য মৌলবাদী হতে হয় না।

      প্রশ্ন : ঠিক এই কারণেই কি তসলিমা নাসরিন দেশ থেকে বিতাড়িত ?

      লেখকের উত্তর : হয়তোবা।

      প্রশ্ন : শহীদ জননী জাহানারা ইমাম দেশদ্রোহীর মামলা মাথায় নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। ওনার অপরাধ কী ছিল ? আপনি কী মনে করেন ?

      লেখকের উত্তর: উনাকে তো কেউ খুন করেনি। উনি তো ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। উনাকে দেশদ্রোহী কখনোই বলা হয়নি। দেশদ্রোহী কথাটা ভুল ইনফরমেশন। তাঁর বিরুদ্ধে কখনোই দেশদ্রোহীর মামলা করা হয় নি। তাছাড়া পুরো ব্যাপারটাই ছিল এত তুচ্ছ, আমরা জানি যে, পুরো ব্যাপারটাই ছিল একটা সাজানো খেলা। এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নেই। মৌলবাদীরা তো আমাকে কতবার মুরতাদ বলেছে, তাতে কি আমি মাথা ঘামিয়েছি কখনো? কখনো না।

      . . .

      সাক্ষাতকার গ্রহণকারী: সাব্বির রহমান খান
      সাক্ষাতকার দাতা: হুমায়ুন আহমেদ


      এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

      জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : সামিউল(২০০৪-১০)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।