প্রাপ্তি

খুব ছোটবেলা আমি নিজেকে পুলিশ বলতাম।প্রতিবেশী এক চাচী এখনো আমাকে “পুলিশ কাকা” বলেই ডাকেন।বিক্ষিপ্তভাবে ছোটবেলার কিছু স্মৃতি মনে পড়ে,যেখানে উনাদের বাসার গেটে নক করে চিৎকার করে নিজের পরিচয় দিচ্ছি “আমি পুলিশ”।তবে সে স্বপ্নটা কিভাবে সেনাবাহিনীতে পরিণত হল তা নিজেও জানিনা।শুধু এটুকু মনে আছে ক্যাডেট কলেজে ক্লাশ সেভেনে এক স্যারের প্রশ্নের জবাবে নির্দ্বিধায় বলেছিলাম আমার এইম ইন লাইফ সেনাবাহিনীতে জয়েন করা।সত্যি বলতে কি,কখনো কোন সেকেন্ড থট মাথায় আসেনি সেনাবাহিনী ছাড়া।এইচএসসি পরীক্ষার পর বুয়েট কোচিং এ ভর্তি হয়েছিলাম ঠিকই,তবে রেজাল্টের আগেই আইএসএসবি গ্রীন কার্ড হাতে চলে আসায় সে পথে আর পা বাড়াইনি।মডেল টেস্টগুলোতে চশমা পাওয়াটাও সে পথ ছেড়ে দেবার একটা কারণ হলে হতেও পারে সেটা অস্বীকার করাটা অন্যায় হবে।আজ একটু ব্যাক ক্যালকুলেশন করে দেখলাম আগামী ডিসেম্বর এ আমাদের চাকরির ছয় বছর পূর্ণ হতে চলেছে।সকালে শেভ করতে গিয়ে আয়নায় নিজের চেহারাটা লক্ষ করে মনটা একটু খারাপই হয়ে গেল।কল্পনার সাথে যে অনেক বেশী পার্থক্য দেখছি!!!না না,ভুল বুঝবেন না,নিজের চেহারা সিনেমার নায়কদের মত কল্পনা করিনা।তবে নিজের কথা ভাবতে গেলেই এখনো মনের আয়নায় এক কিশোরের ছবি ভেসে উঠে।ভাঙ্গা চোয়াল,দোমড়ানো ড্রেস,লুজ বেল্ট,পালিশ না করা ফ্যাকাশে অক্সফোর্ড সু(এক কালে যেটা কাল রঙের ছিল) আর কাঁধে ছয় দাগওয়ালা লাল রঙের অ্যাপুলেট।সত্যি বলছি নিজেকে এখনো ক্লাশ টুয়েলভ পড়ি বলে মনে হয়-অনার্স পড়ুয়াদের এখনও নির্দ্বিধায় বড় ভাই ভাবি।ক্যান্টনমেন্টের গাছে ঝুলে থাকা আম কাঁঠাল গুলো তাই এখনো অশ্লীল আহবান জানায়,ক্রিকেট ব্যাট বল শুক্র-শনিবারের ঘুম কেড়ে নেয়,টেবিল টেনিস টেবিলে দুপুরের ঘুম বিসর্জন দেই,বিকালের গেমস এ এখনো অফসাইড নিয়ে তর্কে জড়াই জুনিয়র অফিসার(ওরাও এক্স ক্যাডেট)দের সাথে।তবে নিমকহারাম আয়নাটা বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমি আজ আর কলেজের ক্লাশ টুয়েলভ নই।পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন(খালি মাবাবা বাদে),বন্ধুবান্ধব,সিনিয়র কিংবা জুনিয়র(হারামখোর একেকটা) সবাই প্রায়ই জানতে চায় কবে বিয়ে করব।এমন কী ছুটি যাবার সময় সৈনিকগুলা পর্যন্ত মুখ টিপে হাসে।কারণ আমার ইউনিট আবার অফিসারদের আর্লি ম্যারেজের জন্য বিখ্যাত।সব মিলিয়ে বয়সটা যে আর থেমে নেই সেটা বোঝা যায়।তবে এমন কোন বয়সও হয়নি যে জীবনে পাওয়া না পাওয়ার হিসাব করতে বসব।
তারপরও মনটা কেন জানি রিওয়াইন্ড করে বিএমএ লাইফে চলে যাচ্ছে।আহ!সেই বিএমএ।কলেজে থাকতে ক্যাপ্টেন দিদার(তখন দিদার ভাইয়া ডেকেছিলাম) নামে এক অফিসার বলেছিলেন,উনার নাকি এখনও বিশ্বাস হয়না উনি বিএমএ লাইফ শেষ করতে পেরেছেন।আজ প্রায় ছয় বছর পর নিজেকে নিয়ে ঠিক একই সন্দেহ হচ্ছে।আসলেই কি আমি বিএমএ ট্রেনিং শেষ করতে পেরেছি!!অতীত নিয়ে একটু সন্দেহ থাকলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে একদম নেই।পূবের সূর্য পশ্চিমে উঠলে উঠতেও পারে,তবে আমি আর একবার বিএমএ থেকে অফিসার হয়ে বের হতে পারবনা- অসম্ভব ব্যাপার সেটা।
বেশ কিছুক্ষণ লিখার চেষ্টা করলাম বিএমএ তে প্রথম রাত(দিন হবেনা কারণ রিপোর্ট করতে হয় বিকাল চারটায়। ) ঠিক কি হয়েছিল।সে রাতের বিভীষিকা লিখে প্রকাশ করার মত শব্দ খুঁজে পেলাম না।তাই আপাতত ক্ষ্যামা দিলাম।সে রাতে নরক ভেঙে পড়েছিল বললেও বোধ হয় কম বলা হবে।সারা রাতের হরকৎ শেষে পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্টের আগে যে সিনিয়র মাটিতে বসিয়ে একটু চোখ বন্ধ করার অনুমতি দিয়েছিলেন তাকে ফেরেশতা মনে হয়েছিল।তবে পরের তিন মাস সে ফেরেশতার মত মানুষটাই জীবন কয়লা করে দিবে তা কি আর তখন জানতাম!!!
ফার্স্ট টার্ম মানে আমার কাছে একটা ঝাপসা সময়।শুধু দৌড় আর দৌড়,এর মাঝে একটা স্বপ্ন-একবেলা ভরপেট খাওয়া আর তারপর টানা ঘুম!!!!!মার্চ করতে করতে ঘুমাচ্ছি,আর স্টাফ এসে দুই হাত দিয়ে কান ডলে লাল করে ঘুম ভাংগাচ্ছে মনে হলে নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়।নাইট ফলিনে কর্পোরালের সামনে নিজের ঘাড়ে আরেকজনকে বসিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমানোটা বোধহয় কোন রূপকথা।ভরা শীতের সময় প্রতি রাতে দুইটা আড়াইটা পর্যন্ত চলত নাইট ফলিন।মাঝে মাঝে কোন সিনিয়র পানিশমেন্ট না দিয়ে গল্প করতেন,সাহস দিতেন।খোলা মাঠে কনকনে বাতাসের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নিজেরাই স্যারের কাছে পারমিশন চাইতাম একটা টাচ এন্ড ব্যাক দিয়ে আসার।যেখানে ফ্রন্টরোল দিলেই সারা শরীর ভিজে যায়,সেখানে ড্রেনে চুবান কিংবা ট্যাপ ছেড়ে ভিজিয়ে নেয়া খুব কমন ছিল।কেন আমাদের একজনেরও নিউমোনিয়া হয়নি সেটা আজও আমার কাছে বিস্ময়।তিন মাস পর প্রথম প্যারেন্টস ডে।মাবাবা অনেক মজার খাবার নিয়ে এলেও অবাক হয়ে লক্ষ করলাম গলা দিয়ে খাবার নামছেনা।দু চামচ মুখে দিতেই পেট ভরে গেল!!!খাওয়াটাও যে প্র্যাক্টিসের ব্যাপার সেটা সেই প্রথম টের পেলাম।
নাহ থাক আর লিখবনা।কারণ অনেক দিন পর গতকাল রাতে বিএমএ’র কথা মনে করে সারা রাত স্বপ্নে ফ্রন্টরোল,টাচ এন্ড ব্যাক’রা হানা দিয়ে আমাকে ঘুমাতে দেয়নি।তাছাড়া বিএমএ’র স্মৃতি নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়।আমার দুর্বল লেখায় সেটা অন্যদের কাছে গাঁজাখুরি মনে হওয়ার চান্স অনেক বেশি।তার চেয়ে বিএমএ থেকে আমার প্রাপ্তি নিয়ে বলি।বিএমএ ট্রেনিং আমাকে আওলাদ নজরুল মাহমুদের মত শখানেক জানের দুষমন দিয়েছে।যারা প্রতিটা মুহূর্তে হাসিমুখে বাঁশ দিতে জানে।তারপরও কোন বিপদে পড়ে এই হারামখোর গুলাকেই ডাক দেই।আর প্রথম তিন মাস জীবনকে নরক বানিয়ে দেয়া সিনিয়রদের(রিয়াজ স্যার,সেলিম স্যার,সাইদুল স্যার) আজ অভিভাবক হিসেবে পেয়েছি।তিনজনই এক্স ক্যাডেট এবং তিনজনকেই আমাদের প্লাটুনের অনেকে আব্বা ডাকি।শুধু তাই না,ভাবিদেরকেও নিজেদের ভেতর আম্মা ডাকি।যদিও সেলিম আব্বা নিজের বিয়ের আগেই নাতির মুখ দেখে ফেলেছেন অলরেডি(এই দুঃখ কই রাখি)।আর্থিক প্রাপ্তি কিংবা দু দুটি দেশ ভ্রমণের পিছনেও যে আমার বিএমএ ট্রেনিং সেটা না বললেও চলে।তবে সব অর্জন ছাপিয়ে যায় একটি আত্মোপলব্ধি-মানুষ হিসাবে সৃষ্টিকর্তা আমাদের কত ক্ষমতা দিয়েছেন সেটা আর্মিতে না আসলে কোনদিন জানা হতনা ।মানুষের অসাধ্য কিছু নেই কথাটা বোধ হয় সত্যি নয়।তবে মানুষের সাধ্য অনেক কিছুই যে মানুষ জানেনা সে সত্যটা জেনেছি ট্রেনিঙের সময়। আধাপেট খেয়ে কিংবা না খেয়ে,গড়ে তিন ঘন্টা ঘুমিয়ে চব্বিশ ঘন্টার বাকিটা সময় শুধু রগড়ার উপর থেকেছি।অস্ত্র,রেশন মিলে পিঠে ২৫ কেজি বোঝা নিয়ে প্রতিদিন ৩০ কিলো পথ হেটে শেল্টার চেঞ্জ করেছি।রাত গুলোতে থাকত অপারেশন প্র্যাকটিস।এমনকি রোজার দিনেও বিএমএ’র শিডীউল এ কোন ছাড় দেয়া হয়নি।বরং আমার মত অনেকের কাছে রমজান মাসই বেটার মনে হবে-কারণ অন্তত ইফতার আর সেহরিতে কোন ফুড বদারেশন করা হয়নি আমাদের সময়।কোন একটা ফাকাআপের জন্য ছয় ফুট লম্বা জুয়েলের পুরা শরীরটাকে সিমেন্টের শেল দিয়ে ঢেকে দিয়েছি (শেল কবর)।বগলা নামে এক কোর্সমেটকে চার হাত পা টেনে ঝুলিয়ে তার পিঠের উপর তিনজন বসতে দেখেছি(এখনকার আব্বাদের আদেশে)।মাঘ মাসের হাড়কাপানো শীতে ভেজা ড্রেস+শরীর(নাইস বাথ) নিয়ে ফুল স্পীড ফ্যানের নীচে দাঁড়িয়ে থাকার পরও একটু কফ জমেনি বুকে!!রাতভর হাটার পর ক্লান্ত শরীরে ঘাসের বুকে জমে থাকা বৃষ্টির পানি খাবার পরও পেটে সামান্য মোচড়ও দেয়নি!!!
এই ধরনের অনেক আপাত আষাঢ়ে গল্প বিএমএতে প্রতিটা ক্যাডেটের নিত্য দিনের অভিজ্ঞতা।লিখে বুঝানো কিংবা শেষ করার ক্ষমতা আমার নেই।শুধু এটুকু বলব “সাড়ে পাচফুট এই নশ্বর শরীরটার সীমাবদ্ধতা অনেক অনেক ………কম”-এই সত্য আবিষ্কার করতে পারাটাই আমার সৈনিক জীবনের সবচে বড় প্রাপ্তি।

১,৪৫৪ বার দেখা হয়েছে

১০ টি মন্তব্য : “প্রাপ্তি”

  1. রুম্মান (১৯৯৩-৯৯)

    এত কিছু চিন্তা না কইরা রিক্রিয়েশন এলাউন্সটা ডিমান্ড কইরা ফালাও 😛


    আমার কি সমস্ত কিছুই হলো ভুল
    ভুল কথা, ভুল সম্মোধন
    ভুল পথ, ভুল বাড়ি, ভুল ঘোরাফেরা
    সারাটা জীবন ভুল চিঠি লেখা হলো শুধু,
    ভুল দরজায় হলো ব্যর্থ করাঘাত
    আমার কেবল হলো সমস্ত জীবন শুধু ভুল বই পড়া ।

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : রাকিব(৯৮-০৪,মকক)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।