চে’

আজ চে’ গুয়েভারার ৪২তম মৃত্যুদিবস। চে’ ছিলেন মনে প্রানে বিপ্লবী। তিনি শুধু কিউবা বা আর্জেন্টিনার না,আসলে সারা বিশ্বের মেহনতি মুক্তিকামী মানুষের অধিকার আদায়ের রোল মডেল। চে’ জন্মেছেন আর্জেন্টিনায়,বিপ্লব করেছেন কিউবায় এবং আরেকটি বিপ্লব করার জন্য সহযোদ্ধা ফিদেল কাস্ত্রোকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে গিয়েছেন লাতিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়ায়। তাঁকে যদি দেশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হত তিনি বলতেন আমি আর্হেন্তিনার(আর্জেন্টিনা),আমি বলিভিয়ার,আমি সান্তাক্লারার,আমি কিউবার,আমি ম্যক্সিকোর।আসলে চে’কে কোন দেশের গন্ডি দিয়ে ডিফাইন করা যাবেনা।চে’ মেহনতি বিপ্লবী মানুষের,চে সারা বিশ্বের। ল্যাটিন আমেরিকার দেশে দেশে পুজিঁবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শোষনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়েছেন অসীম ত্যাগ-তীতিক্ষার মাঝে এবং শেষ পর্যন্ত বলিভিয়ায় নিহত হয়ে বিশ্বের লক্ষ কোটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন। সারা বিশ্বে চে’ গুয়েভারা বিপ্লবের এক মূর্ত প্রতীক। বোধ করি আর কোন ব্যাক্তির অবয়বে বিপ্লব এইভাবে ব্যাপ্ত হয়ে উঠেনি, এমন কি কাস্ত্রোর মাঝেও নয়।

che20g10
হাভানা বন্দরে বোমা ও বিস্কোরকবোঝাই একটি ফরাসি মালবাহী জাহাজ বিস্কোরিত হয়ে ৮০ জন কিউবান মারা যাওয়ার পরদিন ১৯৬০ সালের ৫ মার্চ চে’র এই ছবিটি তোলেন আলোকচিত্রী আলবের্তো কোর্দা।চে’ আসলে তাদের শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দিতে সেদিন সেখানে গিয়েছিলেন। আর তখনই জ্বলে ওঠে কোর্দার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। কোর্দাও হয়ত বুঝতে পারেননি তিনি ফ্রেমবন্দী করতে যাচ্ছেন পৃথিবীর সর্বকালের সেরা এক আলোকচিত্র।

এর্নেস্তো গেভারা দে লা সেরনা ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আর্নেস্তো গুয়েভারা লিঞ্চ এবং মায়ের নাম সিলিয়া দ্যা লা সেরনা। চে’র বাবা ছিলেন একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার।পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে চে’ ছিলেন সবার বড়। রোসারিওতে শৈশব কাটানোর পরে পরিবারের সাথে কর্দোভা চলে আসেন। মাত্র দু’বছর বয়সে তিনি মারাত্মক এ্যাজমায় আক্রান্ত হন, যা তাকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ভুগিয়েছে।

চে’ গুয়েভারার পরিবার রোসারিও শহর থেকে বুয়েন্স আয়ার্সে চলে আসে। বুয়েন্স আয়ার্সের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে তিনি ডাক্তারি পড়েন। তখন কুষ্ঠ রোগীদের সবাই অবহেলার চোখে দেখত। চে’ যখন মেডিকেলের ছাত্র ছিলেন তখন তার এক জন্মদিনে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নদীর উপারে কুষ্টরোগীদের সাথে তিনি জন্মদিন পালন করবেন। কোন বোট ছিলনা সেখানে। তাই তার বন্ধুরা শঙ্কিত হলেন। কিন্তু তিনি সবার বাধা উপেক্ষা করে পানিতে ঝাপিয়ে পড়লেন। সবাই দৌড়ে নদীপাড়ে এসে থেমে গেলেন। বন্ধুরা ভাবলেন যদি নদীর মাঝপথে গিয়ে তাঁর দম শেষ হয়ে যায় ! কিন্তু জেদী চে’ ঠিকই উপারে গেলেন এবং কুষ্ঠ রোগীরা তাকে টেনে তুললো এবং জরিয়ে ধরল।

শিক্ষা শেষ করার আগেই ১৯৫২ সালে ২৯ ডিসেম্বর চব্বিশ বছর বয়সে চে’ তার বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদাসকে সঙ্গে নিয়ে পুরনো নরটন ৫০০ মডেলের মোটরসাইকেলে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে বের হন। এ সময় তারা পেরু, চিলি, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন। এসব দেশের মানুষের জীবন দেখে তিনি ব্যথিত হন। এভাবে সাত মাস ল্যাটিন আমেরিকা ভ্রমণ শেষে দেশে ফেরেন। ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে শল্যচিকিৎসা ও ত্বকবিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে চে’ গুয়েভারা ডাক্তারি পাস করেন। গুয়াতেমালাতে বামপন্থী সরকারের সাথে কিছুদিন কাটান তিনি। এ-সময় আর্নেস্তো গুয়েভারা নামের সাথে ‘চে’ শব্দটি যুক্ত হয়। সহকর্মীদের সাথে কথাবার্তায় ‘ওহে’ বা ‘বন্ধু’ আহবানের সমতূল্য স্প্যানিশ শব্দটি সব-সময় ব্যবহার করার কারণে তার নামের সাথে ‘চে’ শব্দটি যুক্ত হয়।

১৯৫৩ সালে চে গুয়েভারা বলিভিয়ায় যান। এরপর পেরু, ইকুয়েডর, নিকারাগুয়া, কোস্টারিকা হয়ে গুয়াতেমালায় পৌঁছেন ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। গুয়াতেমালায় তখন জাকাবো আরবেনজ সরকারকে উৎখাতের মার্কিন চক্রান্ত চলছিল। চে’ এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আরবেনজ সরকারের পতন ঘটে। ফলে চে’ মেক্সিকোতে চলে যান। গুয়াতেমালায় থাকার সময় তার সঙ্গে পেরুর বিপ্লবী হিল্দা গাদিয়ার বিয়ে হয়।

১৯৫৫ সালের মধ্যভাগে চে’ গুয়েভারার সঙ্গে পরিচয় হয় রাউল কাস্ত্রোর। পরে ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে মারিয়া এন্টোনিয়ার বাড়িতে চে’র সঙ্গে পরিচয় হয় কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর। ফিদেল তখন ফুলজেনসিও বাতিস্তার স্বৈরশাসন থেকে কিউবাকে মুক্ত করার জন্য গেরিলা বাহিনী গঠনে ব্যস্ত। তিনি চে’ গুয়েভারাকে কিউবার বিপ্লবে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। চে’ তার আহ্বানে সাড়া দেন। স্পেনীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কর্নেল আলবার্তো বোয়ার কাছে বিপ্লবীরা গোপনে গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কিন্তু ১৯৫৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকো সিটি থেকে ফিদেলকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। বিপ্লবীদের গোপন আস্তানায় পুলিশ হানা দিয়ে চে’ ও হিল্দাসহ অনেক বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করে। অনেক অত্যাচারের পরও চে’র কাছ থেকে তথ্য বের করতে পারেনি। এক মাস পর কাস্ত্রো ছাড়া পেলেন এবং ৫৭ দিন পর চে’ ও হিল্দাসহ অন্য কমরেডরা ছাড়া পান।

১৯৫৬ সালের ২৫ নভেম্বর রাতে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে ৮২ জন বিপ্লবী ‘গ্রান্মা’ জাহাজে করে কিউবা অভিযানে যাত্রা করেন। এদের মধ্যে চে’ই ছিলেন একমাত্র বিদেশী। ২ ডিসেম্বর গ্রান্মা জাহাজ কিউবায় পৌঁছে। কিন্তু তাদের এই আগমন সংবাদ বাতিস্তা সরকার আগেই জানতে পেরেছিল। ফলে গ্রান্মা কিউবান উপকূলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বাতিস্তা সরকারের বিমান ও স্খল হামলার শিকার হয় । প্রচণ্ড আক্রমণে ৫ তারিখেই অর্ধেক বিপ্লবী প্রাণ হারান। ফিদেল, রাউল ক্যাস্ট্রো ও চে’ গুয়েভারাসহ অল্প সংখ্যক গেরিলাই প্রাণে রক্ষা পান। এ যুদ্ধে চে’ গুয়েভারা মারাত্মক আহত হন। ফিদেল ও চে’ গুয়েভারা সিয়েরা মায়েস্ত্রার পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নিয়ে গেরিলা বাহিনী পুনর্গঠন করেন। চে’ই প্রথম ব্যাক্তি যিনি অন্য দেশের ফৌজের কমান্দান্তে নিযুক্ত হন। ১৯৫৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি চে’ গুয়েভারা ও হিল্দার কন্যা হিল্দিতা জন্মগ্রহণ করে।


চে’কে নিয়ে গান

১৯৫৭ সালের ২২ জানুয়ারি বিপ্লবীরা সরকারি সেনাবাহিনীর একটি ইউনিটকে পরাজিত করে বিপ্লবের নবপর্যায়ের সূচনা করে। এরপর প্রতিনিয়ত যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করে। ১৯৫৮-এর আগস্ট মাসে বিপ্লবী বাহিনী চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু করে। ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি চে’ গুয়েভারার নেতৃত্বাধীন বাহিনী সরকারি বাহিনীকে পরাজিত করে সান্তক্লারা শহর দখল করে। ফলে স্বৈরাচারী বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটে। বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। আমেরিকা মহাদেশে প্রথম সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় কিউবায়।

১৯৫৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি চে’ গুয়েভারাকে কিউবার নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। ১৯৫৯ সালে চে’ গুয়েভারা কিউবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিযুক্ত হন। ১৯৬১ সালের ২৩ মে তিনি কিউবার শিল্পমন্ত্রী নিযুক্ত হন। কিন্তু তিনি মন্ত্রী ও ব্যাংকের হিসাবে ২,৫০০ ডলার বেতন প্রত্যাখ্যান করেন। শুধু মেজর হিসেবে ২৫০ মার্কিন ডলারের সমতুল্য মাসিক বেতন গ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালের ২ জুন চে’ আলেইদা মার্চকে বিয়ে করেন। চে’ কিউবায় রওনা হওয়ার পরই তার প্রথম স্ত্রী হিল্দা নিজ দেশ পেরুতে ফিরে যান। হিল্দা তার কন্যা হিল্দিতাকে চে’র কাছে পাঠিয়ে দেন।

১৯৬৫ সালের ১৪ মার্চ কঙ্গো, ঘানা, তানজানিয়া ও মিসর সফর শেষে কিউবায় ফেরেন চে’ গুয়েভারা। এরপর আর কোনদিন তাকে জনসম্মুখে দেখা যায়নি। তিনি তখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকা ও আফিন্সকায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত করার। তার লক্ষ্য ছিল বিশটি নতুন ভিয়েতনাম সৃষ্টি করা। ১৯৬৫ সালের ১ এপ্রিল চে’ গুয়েভারা তার সহযোদ্ধা ও কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রোকে লেখা এক চিঠিতে কিউবার শিল্পমন্ত্রীর পদ, মেজরের পদ, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ এবং কিউবার নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। তিনি তার বিদায়ী চিঠিতে লিখেছিলেন,

“ ঠিক এই মুহূর্তে আমার অনেক পুরনো কথা মনে পড়ছে, সেই যখন তোমার সঙ্গে মারিয়া এন্টোনিয়ার বাড়িতে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। সেদিন তুমি আমাকে বিপ্লবে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছিলে। তখনকার সেই উত্তেজনাকর সময়ের কথা মনে পড়ছে। একদিন প্রশ্ন উঠেছিল¬ মৃত্যুকে বরণ করবে কে? এ প্রশ্নের উত্তর নিজেরাই পেয়েছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম যে বিপ্লবে যেমন বিজয়ের আনন্দ আছে, তেমনি আছে মৃত্যুর বেদনা। বিজয় অর্জনের সুকঠিন সংগ্রামে অনেক কমরেডকে হারাতে হয়। আমি মনে করি কিউবার বিপ্লবে আমার দায়িত্ব আমি পরিপূর্ণভাবে পালন করতে পেরেছি। হে বন্ধু আমার, কমরেডগণ ও কিউবার মানুষ, বিদায়। কিউবার কোনো আইন আজ আমাকে আটকে রাখতে পারবে না। কিন্তু কিউবার সঙ্গে আমার অন্যরকম এক সম্পর্ক আছে, যা কোনদিনই ছিন্ন হবে না।“

সম্মান, খ্যাতি, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি¬ সব ফেলে তিনি যাত্রা করলেন বিপ্লবের সুকঠিন পথে। বলিভিয়াতে থাকার সময় তিনি ‘সিআইএ’ মদদপুষ্ট বলিভিয়ান বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর বলিভিয়ার লা হিগুয়েরাতে ‘সিআইএ’ এর ট্রেনিং-প্রাপ্ত সরকারী বাহিনীর লোকদের হাতে প্রাণ হারান। নিরস্ত্র বন্ধী চে’কে কোন সৈনিক গুলি করতে রাজি হচ্ছিল না। অবশেষে মারিও তিরান নামের বলিভীয় সেনাবাহিনীর একজন মাতাল সার্জেন্ট উপরের নির্দেশক্রমে বিপ্লবী চে’ গুয়েভারার উপরে গুলি চালায়। গুলি করার পূর্বে সেনারা জানতে চেয়েছিল চে নিজের অমরত্বের কথা ভাবছেন কি-না। উত্তরে চে’ বলেন “ না, আমি বিপ্লবের অমরত্বের কথা ভাবছি।“ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি চে’কে গুলি করে হত্যা করে, দু’হাত কেটে নিয়ে, অজ্ঞাতস্থানে মাটি চাপা দিয়ে গুম করেও শেষ করে দিতে পারেনি। জীবিত চে’র চেয়ে মৃত চে’ অনেক বেশি শক্তিশালী। চে’র মত বিপ্লবী উদার এবং প্রেমের সংমিশ্রন কারো ব্যক্তিত্বে সত্যিই বিরল। আজো চে’ সাম্রাজ্যবাদ, নয়া সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদের কাছে ভয়ানক আতঙ্ক।


কমান্দান্তে চে’গুয়েভারা

গত বছর চে’র ৮০ তম জন্মদিনে ভক্তদের উদ্দোগে জন্মাস্থান সান্তা ফে অঞ্চলের রোসারিওতে দশ ফুট উচু একটি ব্রোঞ্জের মুর্তি স্থাপন করা হয়। উল্লেখ্য ১৯৭০ বা ১৯৮০’র দশকে সামরিক একনায়কতন্ত্রের দিনে আর্জেন্টিনায় চে’ চর্চা বা কারো কাছে চে’র ছবি বা বই পাওয়া ছিল মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তির মত ঝুকিপূর্ন। আর্জেন্টিনার বিশিষ্ট ঐতিহাসিক এবং চে’ বিশেষজ্ঞ মারিও ও’ডেনেল চে’ গুয়েভারার স্বাতন্ত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন,” কেনেডি বা মাও’র মত অনেক ব্যক্তিত্বই আছেন লাইব্রেরী জুড়ে। আর চে’ আছেন রাজপথে।”

আসলে সামরিক শাসনামলে চে’কে নিষ্ঠুর-হিংস্র এক ব্যক্তি হিসাবে চিত্রিত করা হতো রাষ্ট্রীয়ভাবে। কিন্তু ৯ অক্টোবর সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে নিহত হওয়ার আগেই তিনি পৌছে গিয়েছেন লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ে। চে’ কে নিয়ে লেখার দুঃসাহস করেছি কিন্তু শেষে এসে অতৃপ্তি থেকেই যাচ্ছে। কারন যতই লিখি শেষ করা যাবেনা। কারন খোদ ল্যাটিন আমেরিকার লেখক গ্যাব্রিয়েল মার্সিয়া মারকুয়েজ বলেছেন,”আমি হাজার হাজার বছর ধরে এক নাগাড়ে লিখে যেতে পারি কোটিরো বেশি পৃষ্ঠা শুধুমাত্র চে’ কে নিয়ে।”

চে’ কে নিয়ে গবেষণা, বই সিনেমা বা টি-শার্ট ক্যাপ নিয়ে বানিজ্য যাই বলেন না কেন, সব কিছুর মাত্রাই অসীম। চে’ কে নিয়ে বানানো টি শার্ট পৃথিবীতে সবচেয়ে বিক্রিত টি শার্ট। আমি মামুনুর রশীদের মঞ্চনাটক “চে’র সাইকেল” দেখেছি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে। মাত্র তিনজন মিলে এতগুলো ক্যারেক্টার এত সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যা মুগ্ধতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। চঞ্চল চৌধুরী একাই করেছেন ছয়টি ক্যারেক্টার আর মামুনুর রশীদ করেছেন দুইটি। চে’ সম্পর্কে যত জানি ততই অভিভূত হই। তাকে নিয়ে প্রচারণা করার কারনে নাট্যকার মামুনুর রশীদের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ অনেক।

চে’ কে নিয়ে উন্মাদনা চলতেই থাকবে যুগ যুগ ধরে। আসলে চে’ কে হত্যা করার মাধ্যমে তারা বিপ্লবী মুক্তিকামী মানুষের চেতনাকে হত্যা করতে চেয়েছে। কিন্তু বস্তুত তারা তাঁকে এবং বিপ্লবকে অমরত্বের পথে আরেকধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতেই সাহায্য করেছে মাত্র। আর অপরাধী করে গিয়েছে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষকে। সুনীলের “তোমার মৃত্যু আমাকের অপরাধী করে দেয়” কবিতাটি আমাকে খুব নাড়া দেয়। তখন নিজেকেও সত্যি অপরাধী মনে হয়।

২,৯১৪ বার দেখা হয়েছে

২৯ টি মন্তব্য : “চে’”

    • রেজওয়ান (৯৯-০৫)

      চে'র নাম শুনে নি এমন লোকের সংখ্যা কম......অনেককেই দেখা যায় চে'র টি শার্ট পরে ঘুরে...কেউ কেউ প্রোফাইল পিকচারও দেয়....কিন্তু তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানে এমন লোকের সংখ্যা সত্যি খুব কম। ধন্যবাদ আপনাকে এত চমৎকার একটা লেখা উপহার দেয়ার জন্য...... :clap:

      জবাব দিন
  1. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    হায় রে! পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীরা চে' এর টিশার্ট বিক্রি করে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে!

    অনেক ইনফরমেটিভ ব্লগ দিলেন আবদুল্লাহ ভাই-অনেক কিছু জানতে পারলাম।

    জবাব দিন
  2. রায়হান আবীর (৯৯-০৫)

    খুবি চমৎকার একটা লেখা। আবদুল্লাহ ভাই একটা রিকোয়েস্ট। বাংলা উইকেতে চে' এর আর্টিকেলটা দুর্দশায় আক্রান্ত। আপনি একটু যোগ করে দেন। বাংলা উইকির লিংক

    জবাব দিন
    • আব্দুল্লাহ্‌ আল ইমরান (৯৩-৯৯)

      চে' কে নিয়ে লিখব অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম।এবং এই দিনই পোষ্ট করার ইচ্ছা ছিল।কষ্টের কথা হচ্ছে গত দিন লেখা রেডি করি কিন্তু কাল পোষ্ট করতে গিয়ে ইলেভেন্থ আওয়ারে খুজে পাইনি।কাজের চাপে থাকার কারনে ঠিক ঠাহর করতে পারিনি।কিন্তু হতোদ্দম না হয়ে আবার লেখা রেডি করি ব্যস্ততার মাঝেও অতি অল্প সময়ে।তাই আমারো মনমত হয়নি।আবার এডিট করে আরেকটু বেটার ডেলিভারী দেব ইনশাল্লাহ্‌।তারপরও চে'কে নিয়ে লিখে শেষ করা যাবেনা জানি।আমার মত নব্য লেখকদের জন্য দুঃসাধ্য কাজ বটে।

      জবাব দিন
  3. জুবায়ের অর্ণব (৯৮-০৪)

    চে গুয়েভারাকে আমি খুবই পছন্দ করি। সে আমার কাছে সবসময়ই হয়েছে তারুণ্যের প্রতীক। আমরা মানুষ যারা কিনা জানিনা জীববিদ্যাগতভাবেই কিনা বুদ্বুদে বসবাস করতে ভালোবাসি, যতো ছোট বুদ্বুদ ভালোবাসা ততো বেশী- সেখানে বায়োলজিকেই মধ্যাঙ্গুলী প্রদর্শন করে চে গুয়েভারা যেন বুদ্বুদ ভেংগে পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়লো। কি পরিমান প্রাণশক্তিতে সে ভরপুর ছিলো ভাবি- যে বছরের পর বছর জঙ্গল থেক জঙ্গলে দেশহীন স্বজনহীন একটা মানুষ শুধু নিজের স্বপ্নের নৌকায় নিজের পৌরুষের বৈঠা হাতে পেরি দিয়ে চলছে মহাদেশের পর মহাদেশ। ত্যাগের প্রতীকও চে। আজ চে মৃত। তারপরও ভালো লাগে যখন ভাবি যে- হয়তো নতুন প্রজন্ম সামারের এক রোদেলা দিনে রাস্তায় বেরিয়ে অনেক অনেক টিশার্টে একই মুখ দেখে ভেবে যাবে কে এই ব্যক্তি।

    জবাব দিন
  4. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    El Che

    চে গুয়েভারা কে নিয়ে আমার দেখা সবচে কম্পলিট ডক্যুমেন্টারি।
    আগ্রহীরা দেখতে পারেন, দেড় ঘন্টার কিছু বেশি দৈর্ঘ্যের এই ইতিহাসের দলিলটি।
    শেষের দিকে বলিভিয়ানদের চে'র মৃতদেহ সবাইকে দেখানোর দৃশ্যতে এই মহান বিপ্লবীর অর্ধ খোলা চোখ আর তাকে ঘিরে কিছু পশ্চিমার ঔদ্ধত্য দেখে নিজেকে ধরে রাখা কঠিন।

    অনেক ধন্যবাদ আব্দুল্লাহ লেখাটার জন্য।


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  5. তৌফিক (৯৬-০২)

    খুব ভালো লেগেছে। সুনীলের "চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়" কবিতাটা আমার অনেক প্রিয় একটা কবিতা।

    বলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর,
    বুকের মধ্যখান দিয়ে নেমে গেছে শুকনো রক্তের রেখা।
    খোলা চোখ দুটো চেয়ে আছে,
    সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে ছড়িয়ে আসে অন্য গোলার্ধে।।

    স্মৃতি থেকে লিখলাম, উলটাপালটা হতে পারে। আমার চে-কে চেনা এই কবিতা দিয়েই।

    জবাব দিন
  6. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    অনেক পরে পড়লাম লেখাটা। খুব সুন্দর করে লিখছো। পরিশ্রম করেছো বুঝাই যায়।

    পড়তে গিয়ে যে খটকাগুলো লাগছিল তা তপু বলেছে উপরে। তুমি সাজানোর ব্যাপারটা আরেকটু দেখবে? সাল গুলো উলোট পালোট করে লিখছো, ১৯৬৫ এর ঘটনার পরে চলে গিয়েছো ৫৬ তে আবার চলে এসেছো ৬৩ এর দিকে এইরকম। ধারাবাহিক ভাবে লিখলে ভালো হবে (এডিট করে দিতে পার, সময় পেলে)


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  7. আব্দুল্লাহ আল ইমরান

    ফয়েজ ভাই,আমি তপুর জবাবে স্বীকারোক্তি দিয়েছি,খুব তাড়ার মধ্যে লেখা তাই আমি নিজেও স্যাটিস্ফাইড না।অবশ্যই এডিট করব।সবাইকে অনেক ধন্যবাদ উৎসাহ দেয়ার জন্য।

    জবাব দিন
  8. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    ধন্যবাদ আব্দুল্লাহ, আমার এবং আরো অনেকের প্রিয় একটি চরিত্র নিয়ে সময়মতো পোস্টটি দেওয়ার জন্য। পঞ্চাশের দশকের পর জন্ম নেওয়া খুব কম তরুণ-তরুণী আছে যে যুব বয়সে চে'র প্রেমে পড়েনি। বিশ্বের যেখানে অন্যায় আছে, অত্যাচার-বর্নবাদ আছে, সেখানেই আছে চে'গুয়েভারা। বিপ্লবের পক্ষে, ন্যায়ের জন্য, স্বাধীনতা-মুক্তির জন্য, পরিবর্তনের জন্য লড়াকু প্রতিটি মানুষের মধ্যে বাস করে চে'। রোমান্টিকতা আর বিপ্লবের এমন মধুর মিশ্রন বিশ্বের আর কোন মানুষের মধ্যে পাওয়া যাবে?

    কিউবা থেকে আফ্রিকা ঘুরে যখন চে' রীতিমতো গায়েব হয়ে যান। বলিভিয়ার জঙ্গলে গিয়ে বিপ্লবীদের নিয়ে তিনি সে দেশের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখন জানা যায়, কাস্ট্রো এই বিপ্লবে পেছনে সমর্থন জুগিয়েছেন। ল্যাতিন আমেরিকায় বিপ্লব রপ্তানির এই রোমান্টিসিজম আমি সমর্থন না করলেও চে'র জন্য আমার ভালোবাসায় তাতে কোনো কমতি পড়েনা।

    এক অদ্ভূত স্ববিরোধীতা আমার মধ্যে কাজ করে। নিজেই গত ক'দিন ধরে ভাবছি। একদিকে চে' আমার নায়ক; যিনি সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মাধ্যমে সমাজ রূপান্তরে বিশ্বাসী। আরেকদিকে আমি মহাত্মা গান্ধীরও ভক্ত। গান্ধীর অহিংস আন্দোলনও আমাকে ভীষণ টানে। অহিংসার মাধ্যমে হিংসার জবাব দেওয়ার মতো মনোবল, সাহস মোহনচাঁদ করমচাঁদ গান্ধী'র মতো আর কে কবে দেখাতে পেরেছিলেন। প্রবল-প্রতাপশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে অহিংস-সত্যাগ্রহ ছাড়া লড়ার আর কোনো পথ আছে কি?

    একটা বিষয় আব্দুল্লাহ, পড়তে খটকা লাগে। সময়ক্রম অনুযায়ী প্যারাগুলো ঠিক করে দিও। :thumbup:


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  9. আব্দুল্লাহ্‌ আল ইমরান (৯৩-৯৯)

    লাবলু ভাই, অতি শীঘ্র আমি এডিট করব।সময়ক্রম ঠিক হয়নি আমি জানি।তারপরো আপনাদের উপদেশ দেয়ার জন্য ধন্যবাদ যে আপনারা বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন।আসলে চে' মহাত্না সবাই যার যার ক্ষেত্রে ইউনিক।আমি চে'র জন্য :just: উন্মাদ রীতিমত।আবার গান্ধীর অহিংসা আন্দোলন যে কত কার্যকরী সেটি আমি আমার পিতাজীর সাথে স্নায়ুযুদ্ধে বাস্তব প্রমান পেয়েছি। 😛
    জেনারেশন গ্যাপের কারনে কিছু কনফ্লিক্ট যখন হয়েছে তখন ত আর চে'র মত বিদ্রোহ করতে পারিনি।তখন আমি গান্ধীর স্টাইলে শান্তিপূর্ণ ননকোওপারেটিভ মোভমেন্ট করতাম।তখন আমার সফলতাই বলে দেয় এটি কতটা কাজের। :tuski: :khekz:

    জবাব দিন
  10. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    চে গুয়েভারার প্রতি - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়
    আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা ফাঁকা
    আত্মায় অভিশ্রান্ত বৃষ্টিপতনের শব্দ
    শৈশব থেকে বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস
    চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরধী করে দেয়-
    বোলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা
    তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর
    তোমার খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে
    নেমে গেছে
    শুকনো রক্তের রেখা
    চোখ দুটি চেয়ে আছে
    সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে চুটে আসে অন্য গোলার্ধে
    চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।

    শৈশব থেকে মধ্য যৌবন পর্যন্ত দীর্ঘ দৃষ্টিপাত-
    আমারও কথা ছিল হাতিয়ার নিয়ে তোমার পাশে দাঁড়াবার
    আমারও কথা ছিল জঙ্গলে কাদায় পাথরের গুহায়
    লুকিয়ে থেকে
    সংগ্রামের চরম মুহূর্তটির জন্য প্রস্তুত হওয়ার
    আমারও কথা ছিল রাইফেলের কুঁদো বুকে চেপে প্রবল হুঙ্কারে
    ছুটে যাওয়ার
    আমারও কথা ছিল ছিন্নভিন্ন লাশ ও গরম রক্তের ফোয়ারার মধ্যে
    বিজয়-সঙ্গীত শোনাবার-
    কিন্তু আমার অনবরত দেরি হয়ে যাচ্ছে!

    এতকাল আমি এক, আমি অপমান সয়ে মুখ নিচু করেছি
    কিন্তু আমি হেরে যাই নি, আমি মেনে নিই নি
    আমি ট্রেনের জানলার পাশে, নদীর নির্জন রাস্তায়, ফাঁকা
    মাঠের আলপথে, শ্মশানতলায়
    আকাশের কাছে, বৃষ্টির কাছে বৃক্ষের কাছে, হঠাৎ-ওঠা
    ঘূর্ণি ধুলোর ঝড়ের কাছে
    আমার শপথ শুনিয়েছি, আমি প্রস্তুত হচ্ছি, আমি
    সব কিছুর নিজস্ব প্রতিশোধ নেবো
    আমি আমার ফিরে আসবো
    আমার হাতিয়অরহীন হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে, শক্ত হয়েছে চোয়াল,
    মনে মনে বারবার বলেছি, ফিরে আসবো!
    চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়-
    আমি এখনও প্রস্তুত হতে পারি নি, আমার অনবরত
    দেরি হয়ে যাচ্ছে
    আমি এখনও সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলো ছায়ার দিকে রয়ে গেছি,
    আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে
    চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়!

    জবাব দিন
  11. সাবিহা জিতু (১৯৯৩-১৯৯৯)

    পপার-পত্রিকা পড়ে খুব সামান্যই জেনেছি চে সম্পর্কে, একজন বিশ্ববিখ্যাত মানুষের জীবন সম্বন্ধে যা না জানলেই না, ততোটুকুই শুধু। তোর লেখাটা পড়ে কতো না জানা কথা যে জানতে পারলাম...অনেক ধন্যবাদ তোকে। আসলেই

    “ না, আমি বিপ্লবের অমরত্বের কথা ভাবছি।“

    তার মৃত্যু তাকে অমর করেছে আর জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছে দিয়েছে।


    You cannot hangout with negative people and expect a positive life.

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : ইমরান(৯৩-৯৯)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।