পুবের মানুষ যখন পশ্চিমে – ৮

দেশপ্রেমের সংজ্ঞা কী জানিনা তাই ছেলেকে কখনও এই ব্যাপারে শিক্ষা দিতে যাইনি। আর তাছাড়া ছেলের তো আমেরিকান দেশপ্রেম, এই প্রেম আমি শেখাব কেমন করে? একদিন পার্কে বেড়াতে গেলাম। মাঠের একপাশে একটা খালি প্যাকেট পরে ছিল। হয়তো কেউ চিপস খেয়ে ফেলে গেছে। ছেলেকে দেখলাম সে প্যাকেটটা তুলল। ‘ময়লা ধরো না’, আমাকে একথা বলার সুযোগ না দিয়েই ডাস্টবিনের কাছে চলে গেল। তারপর প্যাকেট সেখানে ফেলে দিয়ে হাত ধুয়ে আমার কাছে আসল। মুখটা হাসি হাসি। মনে মনে ভাবলাম ভাগ্যিস ছেলেকে দেশপ্রেম শেখানোর ব্রত নেইনি। আগামীকাল ছেলের বার বছর হবে। হয়তো বাংলাদেশে থাকলে বার বছরের মধ্যেই ছেলের একটা ফেসবুক একাউন্ট থাকতো। ওয়ালে কিছু কথা লিখেই হয়তো সে তার দেশপ্রেম দেখাত। না, কথাটা হয়তো দেশে থাকা মানুষকে আহত করবে। আসলে বলতে চাচ্ছিলাম যে সন্তানের থেকে শিখতে খারাপ লাগে না। সেদিন গাড়ি চালাচ্ছিলাম। পেছনের সীটে ছেলে আর মেয়ে বসা। হঠাৎ তাদের মধ্যে লেগে গেল ঝগড়া। ছেলে মেয়েকে বলল, ‘রাইসা তুমি কুৎসিত।’ আমি ভাবলাম এই বুঝি মেয়ের নাঁকি কান্না শুরু হয়ে যাবে। আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়ে বক্তৃতা শুরু করলো, ‘তুমি আসলে একজন বর্ণবাদী। দেখতে কেমন, গায়ের রং কিরকম এসব দিয়ে একজন মানুষকে বিচার করতে হয়না। বিচার করতে হয় তার চরিত্রের গুণাবলী দিয়ে।’

সময়টা ছিল মার্টিন লুথার কিংএর জন্মদিনের কাছাকাছি। মেয়ে সেই মহান ভদ্রলোককে নিয়ে একটা স্কুল প্রজেক্ট করছিল। এবং সময়মত ভাইকে কিংএর ভাষণের কিছু অংশ শুনিয়ে দিল। এই দেশে বর্ণবাদী একটা বড়সড় রকমের গালি – অনেকটা ছাগু পর্যায়ের। এরকম একটা উপাধি পাওয়ার পর ছেলে তো নড়ে চড়ে বসল। যুক্তিতর্ক দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করলো যে সে একদমই বর্ণবাদী নয়।

আমি আমার শৈশবে ফিরে গেলাম। আমারও সাড়ে তিন বছরের বড় ভাই ছিল (এবং এখনও আছে)। যথারীতি তার সাথেও আমার সিবলিং রাইভালরি চলতো। সে সহজেই আমাকে কাঁদাতে পারতো। জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি আব্বার বন্ধু খান চাচা আমাদের বাসায় আসলেই গেটের কাছ থেকেই একটা জোরে হাঁক দিতেন, ‘কোথায় আমার ছোট বৌমা?’ বনানীতে আমাদের বাড়ির খুব কাছেই খান চাচার বাড়ি ছিল। শুনেছিলাম জন্মের পর পর আমাকে দেখতে এসে খান চাচা ঐদিন থেকেই আমাকে ছোট বৌমা বলে ডাকতে শুরু করেন। শৈশবে এই বিষয়টা আমার কাছে এতো ভয়ংকর ছিল যে তখনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে আর যাকে বিয়ে করি কখনই খান চাচার ছোট ছেলেকে বিয়ে করবো না। ভাইয়া আমার এই দুর্বলতার কথা জানতেন। আমার আরেকটা দুর্বলতা ছিল পরিবারের নারীকুলের মধ্যে আমি ছিলাম কুৎসিৎ হাঁসের ছানা। ভাইয়া একবার আমাকে বুঁচি বা ডাক্তার চাচার ছোট বৌমা বললেই হয়ে গেল। ব্যাস, আমার নাকের পানি আর চোখের পানি একাকার। সে কান্না আর সহজে থামার নয়। ঈশ, আমি যদি তখন মার্টিন লুথার কিঙের বক্তৃতা জানতাম! আমাদের পূবের মানুষজনরা কী বক্তৃতা দিতে জানে না? জানে ঠিকই। কিন্তু আমরা সব একটা জায়গাতে আটকে থাকি। সেদিন বাংলাদেশীদের এক দাওয়াতে (প্রবাসে যা অহরহ হয়) একজন জানালেন ২০০৪-৫ এর দিকে তার এক আত্মীয়ের টেলিফোনের রিং টোনে ১৯৭১এর ২৭শে মার্চের ঘোষণা বাজতে। এখন নাকি ৭’ই মার্চের ভাষণ বাজে। সেই ভদ্রলোক একজন সরকারী চাকরিজীবি। হায়, সরকারী অফিসারদেরই যদি এমন ভাষণ আর ঘোষণার মধ্যে বাউন্সব্যাক করতে হয় তাহলে ফাইলগুলোর না জানি কী অবস্থা। তাও ভালো এবার ইলেকশনের পর আর রিংটোন বদলাতে হলো না।

আইনেস্টাইনের একটা সুন্দর উক্তি আছে, “প্রতিটা মানুষকেই আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। কাউকেই আইডল বানানো যাবে না।” এই কথাটির মানবিক গুরুত্বের কথা বাদ দিলেও, বাণিজ্যিক গুরুত্ব অস্বীকার করবার জো নেই। যত আইডল তত বাণিজ্য। এই যুগে বাণিজ্য নিয়ে না ভাবলে চলে? চারপাশে এতো বিজ্ঞাপন, এতো কিছু কিনতে বলে কিন্তু পকেটে পয়সা কিভাবে জুটবে সেটা তো কেউ বলে দেয় না। এর একটা তরিকা হলো এক পাত্রে সব ডিম না রাখা। সেটা কিভাবে?

কিছুদিন আগে সুচিত্রা সেন মারা গেলেন। রেস্ট ইন পীস। কথা হলো সুচিত্রা সেন কী সেই আটাত্তর সালেই মারা যাননি? পত্রিকাগুলোর কী দরকার ছিল দিনের পর দিন একজন মৃত মানুষের আবার মারা যাওয়ার সংবাদ দেওয়ার জন্য তাদের একটা বিশাল রিয়েল স্টেট খরচ করবার? সেই জায়গাটিতে কী দেশের কোন শিল্পীকে পাঠকের সামনে পরিচিত করতে পারতেন না? আমার মনের ভাব প্রকাশ করার সাথে সাথে আশপাশের সবাই হই হই করে উঠলো। সুচিত্রা সেন হচ্ছে সুচিত্রা সেন। তাঁর সম্পর্কে এমন কথা বলা যাবে না। বুঝলাম পূবের মানুষ অনেকদিন ধরে পশ্চিমে থাকলেও মন মানসিকতা বদলে যায়নি। কারণ পশ্চিমে এসে আমরা শুধু অফিস করি বা স্কুল-কলেজে যাই। বাদবাকি সামাজিকতা তো সেই পূবের মানুষদের সাথেই। এই পশ্চিমে লিজ টেলর মারা গেলে, মাইকেল জ্যাকসন অক্কা পেলে এখানে যতটা না খবর থাকে, তার থেকে বাংলাদেশে মাতম হয় বেশি। লিজ টেলরের ক্যারিশমা কী সুচিত্রা সেনের থেকে কম ছিল? লিজ টেলরের খবর আসে তাও আবার ভালো কাজে। এই যেমন উনার কিছু গয়না নিলামে উঠবে চ্যারিটেবল কাজে। আমি বললাম, আপনারা দেখেন অস্কার অনুষ্ঠানে যখন একজন পুরস্কার গ্রহণ করে তখন সে প্রথমেই যতজনকে পারে ধন্যবাদ দিয়ে দেয়। বুঝিয়ে দেয় না সে আসলে একা কিছুই নয়। পশ্চিমে একজন সেলেব্রিটি হঠাৎ অক্কা পেলে এদের কোন কিছুই থেমে থাকে না। কারণ এরা এক পাত্রে সব ডিম রাখে না। আর আমাদের দেশে একজন মান্না মারা গেলে পুরো সিনেমা ব্যবসায় ধ্বস। শাবানা সিনেমা করা ছেড়ে দিলে মধ্যবিত্ত হলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।

মানুষের জীবনে বিনোদন দরকার। শোবিজ বিনোদনের একটা বড় জায়গা। সিনেমাকে আমি শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করিনা। এটি হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করার মাধ্যমও বটে। যশরাজ ফিলম এখন বাংলাদেশের বিশাল বাজারে ঢোকার চেষ্টা চালাচ্ছে। ওদের ছবিগুলো বাংলাদেশের হলগুলোতে চালিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাবে। এক শুধু শেয়ার বাজার চিপড়ে টাকা নিলেই তো হবে না। কিছু ভারতীয় ছবি ভালো হয় মানছি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তো চালের থেকে আকাঁড়া বেশি। ভারতে ধর্ষণের সংখ্যা বেড়ে গেছে। প্রতি বিশ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে দায়ী করা হচ্ছে। এর পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে। আপনি যদি শিল্প-সাহিত্য পছন্দ করতে চান তাহলে আপনার একটি প্রস্তুতির দরকার পরবে। কিন্তু খাদ্য আর সেক্স – এই দুটি জিনিসে বিনোদিত হতে গেলে মানুষকে কোন প্রস্তুতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়না। আবার এই দুটির কোনটি যদি অস্বাস্থ্যকর হয় তবে তা হিতে বিপরীত ঘটনা ঘটায়।

শিল্প আর অশ্লীলতার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? যখন একটি মেয়েকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে দর্শক মেয়েটির অনুভূতির সাথে একাত্ম হয়ে যান, মেয়েটিকে একটি মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন তখন সেটি শিল্প। একজন মেরিল স্ট্রিপ যে ভূমিকাতেই অভিনয় করেন না কেন – অভিনয় ক্ষমতার গুণে তিনি আমাদের সে চরিত্রটির প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলেন। আর অশ্লীলতা হচ্ছে এক কথায় পতিতাবৃত্তি। অনেকে আবার পতিতাবৃত্তির পক্ষে সাফাই গাওয়াটাকে আধুনিকতা বলে মনে করেন। আসলে একজন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে এর প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হবে। স্টাইনব্যাক তাঁর ইস্ট অব ইডেনে খুব ছোট্ট পরিসরে এর বর্ণনা করেছেন। এড্যাম আর চার্লস দুই ভাই। চার্লসের অনেক অর্থ-সম্পদ রয়েছে। কিন্তু থাকে খুব সাধারণভাবে। বিয়ে করেনি। সারাদিনে হয়তো দুইবার স্টেক বানিয়ে খায়। আর সপ্তাহে একবার সেক্সের প্রয়োজনে পতিতালয়ে যায়। চালর্সের কাছে তার প্রয়োজন মিটানোটাই মুখ্য। একজন পতিতার মুখও সে হয়তো মনে করতে পারবে না। অর্থাৎ পতিতারা তার কাছে কোন মানুষ হিসেবে পরিগণিত হয়না। এখন পুরো বিষয়টি চার্লসের দিক দিয়ে দেখলে তাকে দোষ দেওয়া যায় না। আমরা যখন পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বিবেচনার কথা বলি তখন আসলে আমরা এই চার্লসের প্রয়োজনীয়তার কথাটাই প্রথমে চিন্তা করি। এর পেছনে যে দাসপ্রথার থেকেও যে নিকৃষ্টতম অন্ধকার জগত রয়েছে সে কথা সম্পূর্ণভাবে ভুলে যাই। ভুলে যাই যে যারা পতিতাবৃত্তিতে আসছে তারা চার্লস নয়। সদিচ্ছায় তারা এখানে আসেনা। তাদেরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এই পেশায় আনা হয়। যারা আসে তারা অনন্যোপায়হীন। কারণ একজন পতিতা হয়ে যে কাজটি তাদের করতে হয় তার মানসিক আর শারীরিক চাপ একজন সাধারণ নারীর পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। একজন মানুষ মাত্রই অনেকরকম অনুভূতির সমষ্টি। অথচ একজন পতিতাকে তার সব অনুভূতিগুলো শিঁকেয় তুলে শরীর-সর্বস্ব জড়বস্তুতে পরিণত হতে হয়। কোন মানুষ সদিচ্ছায় এমনটি হতে চাইবে না। এইজন্য দেখা যায় পতিতাবৃত্তির সাথে ড্রাগ, খুন, ব্ল্যাকমেইল, চোরাকারবারির মতো অন্যসব অপরাধ জড়িয়ে আছে। তবে হ্যাঁ, একথা ঠিক যে অনেক নারীই নিজ ইচ্ছায় এ পেশায় আসে – তার মানে এই নয় যে পতিতাবৃত্তি তাতে অপরাধ মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানের অধিকাংশ হিন্দি চলচ্চিত্র হচ্ছে পতিতাবৃত্তির ডিজিটাল রূপায়ন। এখানে অর্থ-বৈভবের কাছে আর সব কিছুই নস্যি। তাই প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে উচ্চশিক্ষিত নারীরা এ পেশায় এসে স্বেচ্ছায় সেক্স বিক্রি করছে। রেস্টুরেন্টে খাবার বিক্রি হলে চলচ্চিত্রে সেক্স বিক্রি হতে অসুবিধা কোথায়? আমরা অস্বাস্থ্যকর খাবারের যেমন বিরোধিতা করবো, ঠিক তেমনি অস্বাস্থ্যকর সেক্সেরও বিরোধিতা করবো। বাংলাদেশে শুধু হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনের বিরোধিতাই যথেষ্ট নয়, হিন্দি চলচ্চিত্রের অনুকরণে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র বানানোর বিরোধিতাও করা উচিত। আর এই ইন্টারনেটের যুগে ভালো ছবিগুলো চাইলেই ঘরে বসে দেখে ফেলা যায়। আমরা কেন যশরাজের ব্যাংকব্যালেন্স ভরবার নিরব দর্শক থাকবো? আমাদের দেশের চলচ্চিত্রকে ঘিরে হাজার হাজার কর্মসংস্থান গড়ে উঠুক। সেখানে আমাদের সাধারণ জীবনের গল্প অসাধারণভাবে ফুটে উঠুক। আমরা প্রবাসীরা বিদেশে বসে দেশের ছবি দেখতে চাই।

কিছুদিন আগে বিল গেটস এক সেমিনারে বললেন ২০৩৫ সালের মধ্যে এই পৃথিবী থেকে দারিদ্র দূর হবে। কী কারণে বিল গেটস এই কথা বলেন? নিজের পকেটের সব অর্থ দান করে দিলেই কি দারিদ্র দূর হবে? তাহলে তো অনেক আগেই হতো। দানের টাকা দিয়ে কোন অবস্থার পরিবর্তন হয়না। অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সরাসরি উৎপাদন জড়িত। আশা করা হচ্ছে ডিজিটাল রেভ্যুলিউশনের কারণে অনেক মানুষ তার উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে। আর এমনটা হতে থাকলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। হ্যাঁ, এখন পর্যন্ত ভদ্রস্ত একটি কর্মসংস্থানই মানুষের অবস্থা ফেরাতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই কর্মসংস্থানের জন্য আমরা এখনও পশ্চিম বিশ্বের দিকে তাকিয়ে থাকি। ওরা কিছু সৃষ্টি করবে, নতুন নতুন চাকরির বাজার তৈরি করবে – তারপর আউটসোর্সিং এর নামে পূবের বিশ্বে কিছু ছুঁড়ে মারবে। আর আমরা সেইসব জুটিয়ে নিয়ে মধ্যবিত্ত হব, গাড়ি-বাড়ি করব। মহিলাদেরও কিছু কাজের সংস্থান জুটবে। বিশ্ব শতাব্দীর প্রথম ভাগে গার্মেন্টস শিল্প পশ্চিমে একটা বড় সংখ্যক কর্মসংস্থান যোগাত। পরবর্তীতে তারা এটি পূবের গোলার্ধে পাঠিয়ে দেয়। বর্তমান বিশ্বে কম্পিউটার আর গাড়ির ম্যানফ্যাকচারিংএর চাকরির বাজারটাও এরা পূর্ব গোলার্ধে পাঠিয়েছে। সবটা না হলেও কিছুটা।

আমি এই মুহূর্তে ভাবছি পূর্ব গোলার্ধ থেকে পশ্চিম গোলার্ধে কী কোন চাকরির বাজার রপ্তানি হয়েছে? হ্যাঁ কিছু গেছে। এই যেমন ব্র্যাক আর গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল, ইয়োগা – আর কী? মজার ব্যাপার হচ্ছে পশ্চিমের মিশনারিজ পাদ্রীরা এসে এশিয়া এবং আফ্রিকার দরিদ্র জনগণকে খ্রিষ্টান হবার মন্ত্রে দীক্ষিত করছে। আর এশিয়া থেকে ধর্মগুরুরা পশ্চিমে গিয়ে সে দেশের বড়লোকদের যোগ ব্যায়াম আর টাই-চি শেখাচ্ছে। এই সিলিকন ভ্যালিতে এখন অনেক মন্দির। মসজিদও। পশ্চিমের সমাজে ধর্মের দৃশ্যমান প্রভাব কম। তরুণদের হয়তো এ নিয়ে মাথা ব্যথাই নেই। কিন্তু একটা বয়সের পর যখন একে একে সব আনন্দের উৎস নিভতে থাকে, তখন সুখ-শান্তি সন্ধানে এদেশের মানুষেরা কোন উপাসনাগার খুঁজে ফেরে। অনেকটা চেরি পিকিং এর মতো নিজের মতো করে একটা ধর্ম বেছে নেয়। সেলেব্রিটিরা অহরহ তা করছে। এই যেমন টম ক্রুজ সিয়ান্টোলজী, ম্যাডোনা কাবালা আর জুলিয়া রবার্ট্স হিন্দু ধর্ম বেছে নিয়েছে। আর পূর্ব থেকে পশ্চিমে আসে মসলা, মানুষ সম্পদ আসে। একটা ব্যাপার বেশ লক্ষণীয়। আমরা পূবের মানুষেরা দলে দলে পশ্চিমে চলে যাই। কিন্তু ধর্মযাজক কিম্বা কোম্পানির হর্তা-কর্তা হওয়া ছাড়া পশ্চিমের মানুষেরা কিন্তু তেমন একটা পূবে স্থায়ী ঠিকানা গাড়ে না। এমনকি সেই ঔপনিবেশিকতার সময়টাতেও পুবের মানুষেরা পুব, পশ্চিম যেই দিকেই রাজ্য দখল করেছে সেখানেই স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন। কিন্তু পশ্চিমের মানুষেরা ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেছে কিন্তু সেখানে স্থায়ী হয়নি। তারা অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকাতে স্থায়ী হয়েছে কিন্তু সভ্যতা শুরু করেছে একেবারে শূন্য থেকে। আদিবাসীদের পরিষ্কার করে শুন্য থেকে দেশটাকে সাজিয়ে নিয়েছে। আবার পশ্চিম বিশ্বে পূবের শাসন তেমন একটা স্থায়ী হয়নি। মুসলিমরা স্পেন দখল করেছিল বটে, কিন্তু পশ্চিমের সব দেশগুলো একাট্টা হয়ে ক্রুসেডের যুদ্ধ শুরু করলো। অটোম্যান সাম্রাজ্যের বারটা বাজিয়ে দিল। ইউরোপে তো এখনও মুসলিম নিধন চলছে। ওরা বোধহয় প্রতিজ্ঞা করেছে ইউরোপে কোন মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র রাখবে না। আবার ঐদিকে দেখা যাচ্ছে পূবের মুসলিম দেশগুলো থেকে দলে দলে ইউরোপের দেশগুলোতে অভিবাসী হচ্ছে। এক বিলিয়ন মুসলিমকে রুখবে কী করে?

ভালবাসা দিবস নাকি শিক্ষানীতি দিবস? তার থেকে বরং ভালবাসা নিয়ে শিক্ষণীয় একটা গল্প বলি। ডেভিড কপারফিল্ডের স্রষ্ঠা চার্লস ডিকেন্সের নামটা তো বোধহয় পরিচিত। সেই চার্লস ডিকেন্সের প্রথমদিককার একটা ভালবাসার একটা গল্প বলি। তরুণ বয়সে ডিকেন্স এক সুন্দরী তরুণীর প্রেমে পড়লেন। মেয়ের নাম মারিয়া বিডওয়েল। ডিকেন্স তখন আদালতে স্টেনোগ্রাফারের কাজ করে। সামনে তেমন উজ্জ্বল ভবিষৎ নেই। মেয়ের বাবা ব্যাংকার। তার কাছে ডিকেন্স তেমন ভালো পাত্র নয়। মারিয়ার ডিকেন্সকে কিছুটা নাচিয়ে শেষে প্রত্যাখান করলেন। শেষে বিয়ে করলেন বাবার পছন্দের কোন বড়লোক তরুণকে। লেখক বাস্তববাদী। মনের দুঃখ কলমের আগায় ঝরিয়ে কিছু চরিত্র তৈরি করলেন। আবার ওদিকে সময়মতো বিয়েও করলেন এব্ং বছর বছর সন্তানের বাবা হতে থাকলেন। আহা সেটি তো আর এই জন্মনিয়ন্ত্রণের যুগ ছিল না। সেই সাথে বাড়তে থাকলো লেখকের পসার, জনপ্রিয়তা এবং অর্থ-সম্পদ। হু হু করে। জীবদ্দশাতেই চার্লস ডিকেন্সের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী ছিল। সেই ভিক্টোরিয়ান যুগে লোকের পেট ভরপুর না থাকলেও তাদের ডিকেন্সের বই পড়া চাই। ভিক্টোরিয়ান যুগের নগরবাসীদের চার্লস ডিকেন্স নেশার মতো বুদ করে রেখেছিলেন। ব্রিটেনের সেই যুগটাকে বাংলাদেশের বর্তমান সময়টার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আবার আটলান্টিকের ওপাড়ে কলোনিয়াল উত্তর আমেরিকাতেও ডিকেন্স অসম্ভব জনপ্রিয়। সেসময় লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্কে একটা পত্রিকা প্রকাশ পেত। সে পত্রিকায় ডিকেন্সের ধারাবাহিক উপন্যাস লেখা থাকতো। জাহাজ ঘাটে ভিড়বার আগেই নিউ ইয়র্কের অধিবাসীরা ঘাট থেকে যাত্রীদের জিজ্ঞেস করতো ডিকেন্সের লেখার পরের পর্বে কি আছে। এহেন জনপ্রিয় ডিকেন্সের কাছে ভক্তদের প্রচুর চিঠি আসতো। তা একদিন একটি চিঠিতে ডিকেন্সের চোখ আটকে গেল। তরুণ বয়সের সেই পুরনো প্রেমিকা মারিয়া ডিকেন্সকে চিঠি পাঠিয়েছে। আবার সেই পুরনো প্রেম উথলে উঠলো। দুজনেই নিজেদের জীবনসঙ্গিদের কাছে গোপন রেখে চুপিচুপি দেখা করতে গেল। আসল ট্র্যাজেডি এখানেই শুরু হলো। চল্লিশোর্ধ মহিলা দেখতে স্থূল হয়ে গেছে এটা ডিকেন্সের জন্য দুঃখজনক ছিল না, যেটি লেখককে আশাহত করেছে তা হলো মহিলার ব্যক্তিত্ব। ডিকেন্সের সাথে সাক্ষাৎকার পর্বে মহিলা নাকি সেই আঠারো বছরের বালিকার মতো আচরণ করতে লাগলেন। তা দেখে ডিকেন্সের ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। এরপর মহিলার উৎসাহ থাকলেও ডিকেন্স আর সম্পর্ক চালিয়ে যাননি। আরেকটি উপন্যাসের চরিত্রের মধ্যে ডিকেন্স এই অভিজ্ঞতার কথা লিখে গেছেন। এবার তা ডিকেন্সের ভাষাতেই তা পড়িঃ

Flora, always tall, had grown to be very broad too, and short of breath; but that was not much. Flora, whom he had left a lily, had become a peony; but that was not much. Flora, who had seemed enchanting in all she said and thought, was diffuse and silly. That was much. Flora, who had been spoiled and artless long ago, was determined to be spoiled and artless now. That was a fatal blow. – Little Dorrit

এখানে শিক্ষণীয় বিষয়টা হলো একসাথে থাকলেই ভালবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যায় – তা কিন্তু নয়। ভালবাসা হারিয়ে যায় আকর্ষণের অভাবে। সময়ের সাথে সাথে মানুষ যদি নিজেকে বদলাতে না পারি, পরিবর্ধিত হতে না পারি তাহলে ভারসাম্য হেলে পড়ে। তখন আকর্ষণটাও মরে যায়। ভালবাসা নিয়ে এটি হল আমার আতলামি? আপনারটা কী?

১,৪৪৭ বার দেখা হয়েছে

১২ টি মন্তব্য : “পুবের মানুষ যখন পশ্চিমে – ৮”

  1. সামিউল(২০০৪-১০)
    একসাথে থাকলেই ভালবাসা জানালা দিয়ে পালায় – তা কিন্তু নয়। ভালবাসা পালায় আকর্ষণের অভাবে।

    কথা সত্য বলেছেন।


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : মোস্তাফিজ (১৯৮৩-১৯৮৯)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।